📄 তাদের অগোচরে তাদের জন্য দুআ করে
প্রকৃত মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে। কাজেই তার অগোচরে তার জন্য দুআ করে। এ দুআ তার বন্ধুত্বের আন্তরিকতা ও নিষ্কলুষতার পরিচয় বহন করে এবং অন্তরে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও মজবুত করে। তা ছাড়া কারও অজান্তে তার জন্য দুআ করলে তা দ্রুত কবুল হয়। কারণ এ দুআয় নিষ্ঠা, সততা, নিষ্কলুষতা বেশি থাকে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ أَسْرَعَ الدُّعَاءِ إِجَابَةٌ، دَعْوَةُ غَائِبِ لِغَائِبِ
'অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য অপর অনুপস্থিত ব্যক্তির দুআ সর্বাধিক কবুলযোগ্য। '৩৩২
এজন্যই উমর যখন উমরা করতে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন, তখন রাসুলুল্লাহ অনুমতি দেওয়ার পর তার কাছে নিজের জন্য দুআ চাইলেন।
এ ব্যাপারে উমর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
اسْتَأْذَنْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْعُمْرَةِ، فَأَذِنَ لِي، وَقَالَ: «لَا تَنْسَنَا يَا أُخَيَّ مِنْ دُعَائِكَ»، فَقَالَ كَلِمَةً مَا يَسُرُّنِي أَنَّ لِي بِهَا الدُّنْيَا
'আমি নবিজি-এর কাছে উমরা করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন এবং বললেন, হে আমার ভাই, তোমার দুআয় আমাকে ভুলে যেয়ো না। তাঁর এ কথাটি আমার কাছে এতই দামি যে, এর পরিবর্তে যদি পুরো দুনিয়াটাই আমাকে দেওয়া হতো, তবুও আমি খুশি হতাম না।'৩৩৩
এ বিষয়টি (কারও অজান্তে তার জন্য দুআ করলে তা দ্রুত কবুল হওয়া) সাহাবায়ে কিরাম-এর অন্তরে খুব ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। তাই দুআ কবুল হওয়ার বিশেষ মুহূর্তগুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তারা একে অপরের নিকট দুআর দরখাস্ত করতেন। এ সম্পর্কে ইমাম বুখারি আল-আদাবুল মুফরাদে সাফওয়ান বিন আব্দুল্লাহ বিন সাফওয়ান-যার স্ত্রী ছিলেন দারদা বিনতে আবু দারদা-থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন :
قَدِمْتُ عَلَيْهِمُ الشَّامَ، فَوَجَدْتُ أُمَّ الدَّرْدَاءِ فِي الْبَيْتِ، وَلَمْ أَجِدْ أَبَا الدَّرْدَاءِ، قَالَتْ: أَتُرِيدُ الحَجَّ الْعَامَ؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَتْ: فَادْعُ اللَّهَ لَنَا بِخَيْرٍ، فَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ: إِنَّ دَعْوَةَ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ مُسْتَجَابَةٌ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ، عِنْدَ رَأْسِهِ مَلَكُ مُوَكَّلُ، كُلَّمَا دَعَا لِأَخِيهِ بِخَيْرٍ قَالَ: آمِينَ، وَلَكَ بِمِثْلٍ، قَالَ: فَلَقِيتُ أَبَا الدَّرْدَاءِ فِي السُّوقِ فَقَالَ مِثْلَ ذَلِكَ، يَأْثُرُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'একবার আমি শামদেশে আমার শ্বশুরবাড়িতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দারদা-এর মাকে ঘরে পেলাম। দারদা-এর পিতা (আবু দারদা) তখন ঘরে ছিলেন না। তিনি বললেন, তুমি কি এ বছর হজ করার ইচ্ছা করেছ? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আমাদের সার্বিক কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ কোরো। কেননা, নবিজি প্রায়ই বলতেন, অনুপস্থিত কোনো ভাইয়ের জন্য মুসলমানের দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে থাকে। তার মাথার ওপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন। যখনই সে তার কোনো ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দুআ করে, তখন উক্ত ফেরেশতা বলেন, আমিন এবং তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক। সাফওয়ান বলেন, অতঃপর বাজারে গিয়ে আবু দারদা-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনিও নবিজি-এর সূত্রে অভিন্ন কথাই বললেন।'৩৩৪
রাসুলুল্লাহ সাহাবিদের অন্তর থেকে অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতার শেকড় উপড়ে ফেলে তদস্থলে একতার বীজ রোপণ করেছিলেন। যখনই সুযোগ পেতেন, একতা ও ভ্রাতৃত্বের অনুভব তাদের অন্তরসমূহে জাগিয়ে দিতেন। যেন জামাআতের মাঝে থেকেও কোনো মুসলমান নিজেকে একা না ভাবে, যে একাকিত্ববোধ মানুষের হৃদয়কে পাষাণ করে দেয় এবং মনকে বিষণ্ণ করে তোলে।
সাহাবিদের মাঝে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করার প্রতি রাসুলুল্লাহ-এর আন্তরিক প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ দেখুন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَجُلُ : اللهُمَّ اغْفِرْ لِي وَلِمُحَمَّدٍ وَحْدَنَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ حَجَبْتَهَا عَنْ نَاسٍ كَثِيرٍ
'একবার জনৈক ব্যক্তি দুআ করার সময় বললেন, হে আল্লাহ, শুধু আমাকে ও মুহাম্মাদ-কে ক্ষমা করে দাও। তখন নবিজি বললেন, তুমি তো অনেক মানুষকে দুআ থেকে বঞ্চিত করে দিলে!'৩৩৫
এ কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ লোকটাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, অন্যান্য মুসলমানের জন্য দুআ না করে শুধু নিজের জন্য দুআ করা, নিজের সাথে রাসুলুল্লাহ-কে শরিক করলেও এটা ইসলামের শিষ্টাচার নয়। ইসলাম চায়, মুমিন নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপরজনের জন্যও তাই পছন্দ করুক।
সারকথা হলো, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যে তার ভাই ও বন্ধুদের ভালোবাসে, তাদের সাথে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক রাখে, তাদের কল্যাণকামী হয়, তাদের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থায় তাদের ইজ্জত-আবরু ও ধন- সম্পদের হিফাজত করে, নিজের ওপর তাদের অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেয়, তাদের কোনো ভুল হয়ে গেলে ক্ষমা করে দেয়-সর্বোপরি তাদের সাথে উত্তমরূপে জীবনযাপন করে। এ ছাড়াও ভাই-বন্ধুদের প্রতি সে উদার হয়, কৃপণতা করে না; সত্যবাদী হয়, মিথ্যা বলে না; অঙ্গীকার পালনকারী হয়, বিশ্বাসঘাতকতা করে না; একমুখী থাকে; ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় না। তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রশান্তমনে ও হাসিমুখে কথা বলে। কথা বা কাজের মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দেয় না। এ সবই একজন প্রকৃত মুসলমানের গুণাবলি। এগুলো যার ভেতর আছে, সেই ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুসলমান।