📄 নিজের ওপর ভাইদের অগ্রাধিকার দেয়
প্রকৃত মুসলমান উদার ও প্রশস্ত মনের অধিকারী। ভাই-বন্ধুদের জন্য তার সাহায্যের হাত সব সময় খোলা রাখে। কারণ, এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রকৃত মুসলমানের ভাই-বন্ধুরা মুত্তাকি মুমিনই হয়ে থাকে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَا تُصَاحِبْ إِلَّا مُؤْمِنًا، وَلَا يَأْكُلْ طَعَامَكَ إِلَّا تَقِيُّ 'কেবল মুমিনকেই বন্ধু বানাবে। আর মুত্তাকি ব্যক্তিই যেন তোমার খাবার খায়।' ৩২৩
এজন্য প্রকৃত মুসলমান তার উদারতা ও বদান্যতার গুণকে খুবই চাতুর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করে। সুতরাং তার উদার মন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখে না; বরং বেছে বেছে মুত্তাকি মুমিন ভাইদের প্রতি সে উদারতা প্রকাশ করে। মানবিকতার দোহাই দিয়ে দুগ্ধবতী গাভীর মতো তার উদারতার উলান নিকৃষ্ট নাস্তিক ও কাফিরদের জন্যেও বাধাহীনভাবে ঝুলিয়ে রাখে না। কেননা, এতে তাদের অনিষ্টে আক্রান্ত হওয়ার যথেষ্ট ভয় আছে। তা ছাড়া দুষ্ট প্রকৃতির অবিশ্বাসীদের থেকে এ আশাও করা যায় না যে, তারা দ্বীনদার মুসলমানদের সরলতা ও উদারতা দেখে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে। তদুপরি, এসব দুষ্ট কাফিররা দ্বীনদার মুসলমানদের এ ধরনের সরলতাকে দুর্বলতা ও বোকামি ভেবে মনে মনে হাসে। তাই তাদের এত সম্মান করে দাওয়াত খাওয়ানোর কোনোই প্রয়োজন নেই। অবশ্য কাফিরদের মধ্যে স্বভাবজাত কিছু ভালো মানুষও থাকে। দাওয়াতের উদ্দেশ্যে তাদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করতে কোনো সমস্যা নেই; বরং এর প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
প্রকৃত মুসলমান উদার হওয়ার পাশাপাশি বিচক্ষণ ও সতর্কও হয়। তার উদারতা ভিন্ন পাত্রে ব্যয়িত হয় না। এটাই ইসলামের অন্যতম মৌলিক চরিত্র। এ চরিত্র যার মাঝে থাকে, সে মানুষের ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভ করে। সাহাবিদের মাঝে এ গুণ পুরোপুরিভাবে বিদ্যমান ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় আলি -এর একটি কথা থেকে।
আলি বলেন:
لِأَنْ أَجْمَعَ نَفَرًا مِنْ إِخْوَانِي عَلَى صَاعٍ أَوْ صَاعَيْنِ مِنْ طَعَامٍ، أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَخْرُجَ إِلَى سُوقِكُمْ فَأُعْتِقَ رَقَبَةً
'আমার (মুসলমান) ভাইদের দাওয়াত করে এক সা' বা দুই সা' খাবার খাওয়ানো আমার কাছে বাজারে গিয়ে কোনো গোলাম আজাদ করে দেওয়া অপেক্ষা প্রিয়তর। '৩২৪
এর কারণ হলো, এ ধরনের ভালোবাসাপূর্ণ খাবারের দাওয়াত মুসলমানদের মনে হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে। মানুষের প্রতি মানুষের মনে সৌহার্দ্য ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে, যা বর্তমান বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থায় অনুপস্থিত। কারণ, এ সমাজব্যবস্থায় শুধু ব্যক্তিস্বার্থের দিকে লক্ষ করা হয়। তবে মানুষ স্বভাবগতভাবে ভালোবাসার কাঙাল। তাই বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থাতেও ভালোবাসা ও হৃদ্যতার অনুপস্থিতি তাদের খুব পীড়া দেয়। সত্যিকারের বন্ধু ও বন্ধুত্ব না থাকায় তারা খুব কষ্ট অনুভব করে। তাই বন্ধু ও বন্ধুত্বের শূন্যতাপূরণে তারা কুকুর লালনপালন ও তাদের গুরুত্ব সহকারে যত্ন নেওয়ার প্রতি মনোযোগী হয়। কুকুরদের মাঝেই তারা হারানো ভালোবাসা ও হৃদ্যতাকে খুঁজে বেড়ায়।
সম্প্রতি ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফ্রান্সে কুকুরের সংখ্যা সাত মিলিয়ন, যা সে দেশের জনসংখ্যার ৫২ শতাংশের সমান! এসব কুকুর তাদের মালিকদের সাথে নিকটাত্মীয়দের মতো বসবাস করে। আর প্যারিসের হোটেলগুলোতে কুকুর আর কুকুরের মালিক একসাথে একপাত্রে খাওয়াকে মোটেই আশ্চর্যের বিষয় মনে করা হয় না!
এ সম্পর্কে প্যারিসের প্রাণী অধিকার-বিষয়ক একটি সংস্থার একজন দায়িত্বশীলকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ফরাসিরা কুকুরদের সাথে এত ঘনিষ্ঠ আচরণ করে কেন? উত্তরে তিনি বললেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই ভালোবাসতে চায়, ভালোবাসা পেতে চায়। কিন্তু এরা মানুষের মাঝে এমন কাউকে পায় না, যার সাথে ভালোবাসা বিনিময় করা যায়। তাই তারা বাধ্য হয়ে কুকুরের মাঝে ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায়। ৩২৫
পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বস্তুবাদী লোকেরা তাদের সমাজে কোনো নিঃস্বার্থ মানুষ-বন্ধু পায় না, যার সাথে ভালোবাসা বিনিময় করা যায়। তাই তারা জীব-জন্তুদের মাঝে ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও হৃদ্যতা খুঁজে বেড়ায়, যা তাদের চারপাশের লোকদের চেয়ে জন্তু-জানোয়ারের মাঝে ঢের বেশি আছে। ইসলামের আলো ও ইমানের নিয়ামত থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই তাদের মনুষ্যত্বের এমন অধঃপতন হয়েছে। মানুষ হয়েও তারা আজ জন্তু-জানোয়ারের নিকট ভালোবাসার ভিখারি!
আরবের কিছু মুসলিম ও অমুসলিম কবি-সাহিত্যিক যখন পশ্চিমা দেশে পাড়ি জমান, তখন সর্বপ্রথম তাদের নজর পড়ে পশ্চিমা লোকদের আবেগ-অনুভূতির অধঃপতনের দিকে। তারা দেখতে পেলেন, পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা মানুষের কাছ থেকে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব কেড়ে নিয়েছে। ফলে দেখতে শুনতে মানুষ মনে হলেও আসলে তারা একেকটা রোবট! জীবন বলতে তারা বুঝে কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি আর পয়সা কামাইয়ের পাশবিক প্রতিযোগিতা। কোনো বন্ধুর জন্য তাদের অন্তর প্রফুল্ল হয় না; বন্ধুকে ভুবনভোলানো মুচকি হাসি উপহার দিতে জানে না তারা! আবেগ-অনুভূতি কেমন যেন ভোঁতা হয়ে গেছে তাদের! কিন্তু পশ্চিমা দেশে পাড়ি জমানো আরব কবি-সাহিত্যিকরা বেড়ে উঠেছেন ইসলামি দেশে। উদারতা ও আন্তরিকতার মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে তারা বড় হয়েছেন। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে-এ শিক্ষা সমাজ থেকেই পেয়েছেন তারা। এজন্য পশ্চিমা দেশে গিয়ে তাদের কেমন যেন বেখাপ্পা লাগতে শুরু করল। তাই কবিতা ও লেখনীর মাধ্যমে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, ও পারস্পরিক সম্পর্কের দিকে পশ্চিমাদের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন তারা। সেখান থেকে একটি কবিতা এখানে উল্লেখ করা হলো। এখানে কবি এমন এক পশ্চিমা ব্যক্তিকে দাওয়াত দিচ্ছেন, যার অন্তরে বস্তুবাদের কদর্য জমেছে, সভ্যতার আলো যার চোখ ধাঁধিয়ে রেখেছে এবং যন্ত্রের বিকট আওয়াজে যার কান বধির হয়ে গেছে।
কবি বলেন :
يا بن ودي، يا صاحبي يا رفيقي * ليس حبي تطفلا أو ثقالة فأجبني ((بيا أخي)) يا صديقي * وأعد، إنها ألذ مقالة وإذا شئت أن تسير وحيدا * وإذا ما اعترتك مني ملالة فامض، لكنما ستسمع صوتي صارخا * (يا أخي) يؤدي الرسالة وسيأتيك أين كنت صدى حبي * فتدري جماله وجلاله
'প্রিয়তম বন্ধু, সঙ্গী আমার! (আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি।) আমার ভালোবাসা ছেলেমি নয়, নয় কোনো ভণিতা।
একটিবার আমাকে "ভাই” বলে ডাকো প্রিয়তম! আবারও ডাকো, আবারও; তুমি অবাক হবে, কী স্বাদ রয়েছে ছোট্ট এ শব্দে!
(পার্থিব জীবনের এ দীর্ঘ পথে) তুমি যদি একাকী পথ চলতে চাও, আর আমাকে (সঙ্গী হিসাবে) তোমার ভীষণ বিরক্ত লাগে!
তবে একাকীই চলো; কিন্তু (চলার পথে) তুমি শুনতে পাবে আমার "ভাই, ভাই” ডাকের চিৎকার, যা পৌঁছে দেয় ভালোবাসার পয়গাম।
যত দূরেই যাও, আমার ভালোবাসার প্রতিধ্বনি পৌঁছবে তোমার কাছে। সেদিন তুমি ভালোবাসার সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব বুঝতে পারবে।'
ইউসুফ আসআদ গানিমের কাছে বস্তুবাদী জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। ভোগবাদের ভারে নুয়ে পড়া ও বস্তুবাদের সহিংস শুকনো ঢেউয়ে ডুবিয়ে যাওয়া এ জীবন তার কাছে কেমন যেন বিষিয়ে উঠল। কারণ, এ জীবনে যে আন্তরিকতা, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি বলতে কিছুই নেই! তাই আরবের ইসলামি ভূমিতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার আকুতি ঝরে পড়ল তার কলম থেকে। যে ভূমি নবুওয়াতের অবতরণস্থল, আধ্যাত্মিকতার উৎসমূল, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও স্বচ্ছতার দেশ। জাঁকজমক ও কোলাহলমুখর শহর ত্যাগ করে আরবের তাঁবুতে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, যদি আমার পুরো জীবন বাষ্প হয়ে ক্ষণিকের জন্যও আরবের কোনো ভূমিতে উড়ে বেড়াত, আমি সে জীবনের জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতাম। কারণ, এ জীবন ক্ষণিকের হলেও তা অতিবাহিত হতো এমন এক দুনিয়ায়, যার অধিবাসীদের অন্তরে রয়েছেন আল্লাহ! পশ্চিমা বিশ্বে বস্তুবাদের কষাঘাতে আমি জর্জরিত। এখানের জীবন ভীষণ বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে আমার কাছে। আমার যান্ত্রিক বাহন গাড়ি ও উড়োজাহাজ তোমরা নিয়ে নাও। আমি আগের সেই ধীরস্থির উট ও ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হতে চাই। আমার পশ্চিমা দুনিয়া নিয়ে নাও। মাটি, সাগর, আকাশ সব নিয়ে নাও। বিনিময়ে আমাকে একটি আরবের তাঁবু দাও, যা আমি কখনো স্থাপন করব লেবাননের কোনো পাহাড়ি টিলার ওপর, কখনো স্থাপন করব প্যাপিরাসের উপত্যকায়, কখনো কলকল রবে বয়ে চলা ছোট্ট কোনো আরব্য নদীর তীরে, কখনো ওমানের সবুজ-শ্যামল বাগানে, কখনো স্থাপন করর সৌদি আরবের বিস্তৃত মরুপ্রান্তরে, কখনো ইয়ামানের কোনো অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে, কখনো পিরামিডের পাদদেশে, আবার কখনো স্থাপন করব লিবিয়ার কোনো মরূদ্যানে। আমাকে একটি আরবি তাঁবু দাও, যার বিনিময়ে গোটা পৃথিবী দিয়ে দেবো; তবুও আমি লাভবান হব...।
বিদেশে বসবাসকারী আরবের সাহিত্যিকদের লেখনীতে এ ধরনের আরও অনেক কবিতা ও প্রবন্ধ রয়েছে। প্রতিটি লেখনীতে আবেগ-অনুভূতির প্রতি আরব শরণার্থীদের তৃষ্ণা চিত্রিত হয়েছে, যা তারা বস্তুবাদী পশ্চিমা বিশ্বে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি লেখায় উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তাদের প্রবল আগ্রহের কথা, যেখানে ইসলাম সবার মাঝে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ছড়িয়ে রেখেছে।
মুসলমান ভাইদের খানার দাওয়াত দেওয়া ইসলামে পছন্দনীয় এবং দাওয়াতে যথাসম্ভব উদার হওয়া মুসতাহাব। কারণ, এর মাধ্যমে মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও মজবুত ও শক্তিশালী হয়। ফলে প্রকৃত মুসলমানরা এটাকে নিজেদের অন্যতম মৌলিক চরিত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে। একইভাবে মুসলমান ভাইয়ের দাওয়াত কবুল করা ইসলামে ওয়াজিব। অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এজন্য সাহাবায়ে কিরাম একদিকে মুসলমান ভাইদের দাওয়াত দিতেন, অপরদিকে কেউ দাওয়াত দিলে তা অবশ্যই কবুল করতেন। দাওয়াত কবুল করাকে তারা নিজেদের ওপর আবশ্যক ও দাওয়াতকারীর অধিকার মনে করতেন। দাওয়াতে সাড়া না দেওয়াকে গুনাহ মনে করতেন। এর প্রমাণ আল-আদাবুল মুফরাদের একটি হাদিসে আছে। হাদিসটি ইমাম বুখারি জিয়াদ বিন আনউম আফরিকি সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
তিনি (জিয়াদ বিন আনউম) বলেন:
أَنَّهُمْ كَانُوا غُزَاةً فِي الْبَحْرِ زَمَنَ مُعَاوِيَةَ، فَانْضَمَّ مَرْكَبُنَا إِلَى مَرْكَبِ أَبِي أَيُّوبَ الْأَنْصَارِيِّ، فَلَمَّا حَضَرَ غَدَاؤُنَا أَرْسَلْنَا إِلَيْهِ، فَأَتَانَا فَقَالَ: دَعَوْتُمُونِي وَأَنَا صَائِمٌ، فَلَمْ يَكُنْ لِي بُدُّ مِنْ أَنْ أُجِيبَكُمْ، لِأَنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ لِلْمُسْلِمِ عَلَى أَخِيهِ سِتَّ خِصَالٍ وَاجِبَةٍ، إِنْ تَرَكَ مِنْهَا شَيْئًا فَقَدْ تَرَكَ حَقًّا وَاجِبًا لِأَخِيهِ عَلَيْهِ : يُسَلِّمُ عَلَيْهِ إِذَا لَقِيَهُ، وَيُجِيبُهُ إِذَا دَعَاهُ، وَيُشَمِّتُهُ إِذَا عَطَسَ، وَيَعُودُهُ إِذَا مَرِضَ، وَيَحْضُرُهُ إِذَا مَاتَ، وَيَنْصَحُهُ إِذَا اسْتَنْصَحَهُ
'মুআবিয়া-এর শাসনামলে আমরা সমুদ্রপথে একটি যুদ্ধাভিযানে যাচ্ছিলাম। তখন একসময় আমাদের নৌকা আবু আইয়ুব আনসারি -এর নৌকার পাশাপাশি চলতে লাগল। এ অবস্থায় যখন আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় আসলো, আমরা তাঁর জন্যও কিছু খাবার পাঠালাম। তখন তিনি আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা আমাকে এমন অবস্থায় দাওয়াত করেছ যখন আমি রোজাদার। তবে তোমাদের দাওয়াত কবুল না করার কোনো উপায়ও নেই আমার কাছে। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য ছয়টি অধিকার রয়েছে। কেউ যদি সেখান থেকে কোনো একটি ত্যাগ করে, সে তার ভাইয়ের ওয়াজিব অধিকার ত্যাগকারী বলে সাব্যস্ত হবে। (সে ছয়টি বিষয় হলো,) যদি তার সাথে তোমার দেখা হয়, তখন তাকে সালাম করবে; যদি সে তোমাকে দাওয়াত দেয়, তা কবুল করবে; যদি সে হাঁচি দেওয়ার পর আল-হামদুলিল্লাহ বলে, তুমি তার জবাব দেবে (ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে); সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে; যদি সে মারা যায়, তখন তার নিকট (অর্থাৎ তার গোসল, কাফন-দাফন, জানাজা ইত্যাদিতে) উপস্থিত হবে; আর যদি তোমাকে উপদেশ দেয়, তাহলে উপদেশ গ্রহণ করবে। '৩২৬
সাহাবায়ে কিরাম কোনো ওজর ব্যতীত মুসলমানের দাওয়াত কবুল না করাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর অবাধ্যতা মনে করতেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: شَرُّ الطَّعَامِ طَعَامُ الْوَلِيمَةِ ، يُمْنَعُهَا مَنْ يَأْتِيهَا، وَيُدْعَى إِلَيْهَا مَنْ يَأْبَاهَا، وَمَنْ لَمْ يُجِبِ الدَّعْوَةَ، فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ
'নিকৃষ্ট খানা হলো ওই ওলিমার খানা, যেখানে এমন লোকদের দাওয়াত দেওয়া হয় না, যারা ওলিমায় শরিক হবে এবং এমন লোকদের দাওয়াত করা হয়, যারা দাওয়াত কবুল করে না। আর যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর অবাধ্যতা করে। '৩২৭
ইমানি ভ্রাতৃত্ব কোনো স্লোগান নয়, যা মুখে তুললেই দায়িত্ব খতম হয়ে যায়; কোনো গর্বের বিষয় নয়, যা শুধু ঘোষণা করাই কাম্য; বরং এটা এমন এক পবিত্র সম্পর্ক, যার জন্য অবশ্যপালনীয় বিষয় ও কিছু হক রয়েছে। এ বিষয়গুলো কেবল সে ব্যক্তিই পালন করতে পারে, যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি যথাযথ ইমান আছে এবং যে ইসলামকে পূর্ণরূপে অনুসরণ করে চলে। এমন ইমান ও ইসলামের ছাপ আমরা আনসারি সাহাবিদের কর্মে দেখতে পাই, যারা মুহাজিরদের প্রতি অনন্য ভালোবাসা প্রদর্শন ও তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছিলেন। মুহাজিরগণ যখন নিজেদের দ্বীন বাঁচাতে সর্বস্ব ত্যাগ করে মদিনায় চলে আসলেন, তখন আনসার সাহাবিরা প্রয়োজনীয় সবকিছু তাদের সামনে পেশ করে দিলেন। এমনকি তাদের একজন তার মুহাজির ভাইকে বললেন, এগুলো আমার সম্পদ; এখান থেকে অর্ধেক তুমি নিয়ে নাও। আর এ দুজন আমার বিবি, কোনটি তোমার পছন্দ হয় দেখো। যাকে পছন্দ হবে, তার নাম আমাকে বলবে; তাহলে আমি তাকে তালাক দিয়ে দেবো, যেন ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তুমি তাকে বিয়ে করতে পারো। মুহাজির ভাইটিও এ সহানুভূতির উত্তর খুব সুন্দরভাবেই দিলেন। তিনি বললেন, তোমার ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনে আল্লাহ বরকত দান করুন। আমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি শুধু আমাকে বাজারটা দেখিয়ে দাও, আমি সেখানে ব্যবসা করব।
আরেকজন আনসার সাহাবির মেহমানদারির নমুনা দেখুন। এক মুহাজির ভাই তার কাছে এমন অবস্থায় মেহমান হলেন, যখন তার ঘরে বাচ্চাদের খানা ব্যতীত কিছুই ছিল না। তখন তিনি তার ও পরিবারের ওপর মুহাজির ভাইকে প্রাধান্য দিলেন। স্ত্রীকে বললেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। তারপর বাতি নিভিয়ে দিয়ে যা আছে তা মেহমানের সামনে উপস্থিত করো। আমরাও তার পাশে বসে থাকব, যেন তিনি মনে করেন, আমরাও তার সাথে খাচ্ছি। তবে আমরা খাব না। এভাবে তারা দস্তরখানের পাশে বসলেন, তবে খানা খেলেন শুধু মেহমান। তারা স্বামী-স্ত্রী না খেয়ে রাত অহিবাহিত করলেন। এরপর সকালে আনসারি সাহাবিটি যখন রাসুলুল্লাহ -এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, গতরাতের মেহমানের জন্য যা করেছ, তাতে আল্লাহ তোমাদের ওপর খুবই সন্তুষ্ট হয়েছেন।
আনসার কর্তৃক মুহাজিরদের প্রাধান্য দেওয়ার আরেকটি নজির হলো :
قَالَتِ الْأَنْصَارُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اقْسِمْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ إِخْوَانِنَا النَّخِيلَ، قَالَ: «لَا فَقَالُوا : تَكْفُونَا المَثُونَةَ، وَنَشْرَكْكُمْ فِي الثَّمَرَةِ، قَالُوا: سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
'আনসার সাহাবিগণ নবিজি -কে বললেন, আমাদের খেজুর বাগান আমাদের ও আমাদের (মুহাজির) ভাইদের মাঝে বণ্টন করে দিন। নবিজি বললেন, না, তা হয় না। তখন তারা বললেন, তাহলে তারা বাগানের উৎপাদনকাজে আমাদের সহযোগিতা করবেন, তারপর ফল ভাগ করার সময় আমাদের সাথে তাদের জন্যও ভাগ থাকবে। তখন আনসার ও মুহাজির সবাই বললেন, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।'৩২৮
মুহাজিরগণও আনসার সাহাবিদের মহানুভবতার কথা স্বীকার করেছেন। তারা রাসুলুল্লাহ -কে বললেন :
مَا رَأَيْنَا مِثْلَ قَوْمٍ قَدِمْنَا عَلَيْهِمْ أَحْسَنَ بَدْلًا مِنْ كَثِيرٍ وَلَا أَحْسَنَ مُوَاسَاةٌ فِي قَلِيلٍ، كَفَوْنَا الْمُؤْنَةَ، وَأَشْرَكُونَا فِي الْمَهْنَا، قَدْ خِفْنَا أَنْ يَذْهَبُوا بِالْأَجْرِ كُلِّهِ، فَقَالَ: «لَا، مَا أَثْنَيْتُمْ عَلَيْهِمْ وَدَعَوْتُمُ اللَّهَ لَهُمْ
‘আমরা আনসারদের মতো অন্য কোনো গোত্র দেখিনি, যারা সম্পদ কম হলে মৌখিক সহানুভূতি জানায় এবং সম্পদ পর্যাপ্ত থাকলে খরচ করে। আমাদের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, তারা আমাদের (বাগান করার) রসদপাতি জোগাড় করে দেবেন (তারপর আমরা বাগান করব) এবং উৎপাদিত ফল-ফলাদিতে আমাদের অংশীদার করবেন। কারণ, আমরা ভয় পাচ্ছি যে, সব সাওয়াব এরাই অর্জন করে নেবেন। রাসুলুল্লাহ বললেন, না, এমন হবে কেন? তোমরা যে তাদের প্রশংসা করেছ এবং তাদের জন্য দুআ করেছ, এর বিনিময়ে তোমরাও সাওয়াবের অংশ পাবে।’ ৩২৯
আনসার সাহাবিদের ফজিলতের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তাদের উত্তম আমলের স্বীকারোক্তি দিয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে আয়াত নাজিল করেছেন। যতদিন কুরআনের তিলাওয়াত হবে, ততদিন তাদের মহত্ত্ব ও মহানুভবতার কথা মানুষের মাঝে চর্চা হতে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন : وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। আর যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।’ ৩৩০
রাসুলুল্লাহ যখন মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে দিলেন, তখন আনসার সাহাবিগণ এ ইমানি ভ্রাতৃত্বের দাবি আদায়ের জন্য যা যা করা উচিত, সবই করেছেন। তারা মুহাজির ভাইদের জন্য তা-ই পছন্দ করেছেন, যা নিজেদের জন্য পছন্দ করেছেন। পার্থিব কোনো বিষয় থেকে তাদের বঞ্চিত রাখেননি। সন্তুষ্টচিত্তে সেখান থেকে মুহাজির ভাইদের অংশ দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি হিজরতের পর প্রথমদিকে আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কারণে আনসার সাহাবিগণ থেকে মুহাজিরগণ উত্তরাধিকার পাওয়ার বিধান ছিল।
সহিহ বুখারিতে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন :
كَانَ المُهَاجِرُونَ لَمَّا قَدِمُوا المَدِينَةَ ، يَرِثُ المُهَاجِرُ الْأَنْصَارِيَّ دُونَ ذَوِي رَحِمِهِ، لِلْأُخُوَّةِ الَّتِي آخَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَهُمْ، فَلَمَّا نَزَلَتْ: {وَلِكُلٍّ جَعَلْنَا مَوَالِيَ} [النساء: ٣٣] نَسَخَتْ... إِلَّا النَّصْرَ، وَالرِّفَادَةَ، وَالنَّصِيحَةَ، وَقَدْ ذَهَبَ المِيرَاثُ، وَيُوصِي لَهُ.
'মুহাজিররা যখন মদিনায় আসলেন, তখন মুহাজির ব্যক্তি আনসারি ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও নবিজি-এর বেঁধে দেওয়া ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের কারণে উত্তরাধিকার পেতেন। পরে যখন وَلِكُلُّ جَعَلْنَا مَوَالِيَ )আর আমি প্রত্যেকটির জন্যই উত্তরাধিকারী করেছি। [সুরা আন-নিসা: ৩৩]) এ আয়াত নাজিল হলো, তখন মুহাজির ও আনসারের মাঝে মিরাসের বিধান রহিত হয়ে গেল।...কিন্তু সাহায্য-সহযোগিতা, সহমর্মিতা, কল্যাণকামিতা বহাল থেকে যায়। মিরাসের বিধান রহিত হয়ে গেলেও তাদের জন্য অসিয়ত করা যাবে। '৩৩১
টিকাঃ
৩২৫. উস্তাজ ওয়াহিদুদ্দিন খানের কলাম থেকে, যা 'সর্বযুগে ও সকল জায়গায় ইসলামি অনুশাসনের বাস্তবায়ন ওয়াজিব' শিরোনামে কুয়েতের 'আল-মুজতামা' ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। ২৪ জিলকদ ১৩৯৬ হিজরি/১৬ নভেম্বর ১৯৮৬ ইংরেজি, ম্যাগাজিন সংখ্যা: ৩২৫।
📄 তাদের অগোচরে তাদের জন্য দুআ করে
প্রকৃত মুসলমান নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করে। কাজেই তার অগোচরে তার জন্য দুআ করে। এ দুআ তার বন্ধুত্বের আন্তরিকতা ও নিষ্কলুষতার পরিচয় বহন করে এবং অন্তরে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও মজবুত করে। তা ছাড়া কারও অজান্তে তার জন্য দুআ করলে তা দ্রুত কবুল হয়। কারণ এ দুআয় নিষ্ঠা, সততা, নিষ্কলুষতা বেশি থাকে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ أَسْرَعَ الدُّعَاءِ إِجَابَةٌ، دَعْوَةُ غَائِبِ لِغَائِبِ
'অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য অপর অনুপস্থিত ব্যক্তির দুআ সর্বাধিক কবুলযোগ্য। '৩৩২
এজন্যই উমর যখন উমরা করতে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন, তখন রাসুলুল্লাহ অনুমতি দেওয়ার পর তার কাছে নিজের জন্য দুআ চাইলেন।
এ ব্যাপারে উমর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
اسْتَأْذَنْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْعُمْرَةِ، فَأَذِنَ لِي، وَقَالَ: «لَا تَنْسَنَا يَا أُخَيَّ مِنْ دُعَائِكَ»، فَقَالَ كَلِمَةً مَا يَسُرُّنِي أَنَّ لِي بِهَا الدُّنْيَا
'আমি নবিজি-এর কাছে উমরা করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন এবং বললেন, হে আমার ভাই, তোমার দুআয় আমাকে ভুলে যেয়ো না। তাঁর এ কথাটি আমার কাছে এতই দামি যে, এর পরিবর্তে যদি পুরো দুনিয়াটাই আমাকে দেওয়া হতো, তবুও আমি খুশি হতাম না।'৩৩৩
এ বিষয়টি (কারও অজান্তে তার জন্য দুআ করলে তা দ্রুত কবুল হওয়া) সাহাবায়ে কিরাম-এর অন্তরে খুব ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। তাই দুআ কবুল হওয়ার বিশেষ মুহূর্তগুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তারা একে অপরের নিকট দুআর দরখাস্ত করতেন। এ সম্পর্কে ইমাম বুখারি আল-আদাবুল মুফরাদে সাফওয়ান বিন আব্দুল্লাহ বিন সাফওয়ান-যার স্ত্রী ছিলেন দারদা বিনতে আবু দারদা-থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন :
قَدِمْتُ عَلَيْهِمُ الشَّامَ، فَوَجَدْتُ أُمَّ الدَّرْدَاءِ فِي الْبَيْتِ، وَلَمْ أَجِدْ أَبَا الدَّرْدَاءِ، قَالَتْ: أَتُرِيدُ الحَجَّ الْعَامَ؟ قُلْتُ: نَعَمْ، قَالَتْ: فَادْعُ اللَّهَ لَنَا بِخَيْرٍ، فَإِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ: إِنَّ دَعْوَةَ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ مُسْتَجَابَةٌ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ، عِنْدَ رَأْسِهِ مَلَكُ مُوَكَّلُ، كُلَّمَا دَعَا لِأَخِيهِ بِخَيْرٍ قَالَ: آمِينَ، وَلَكَ بِمِثْلٍ، قَالَ: فَلَقِيتُ أَبَا الدَّرْدَاءِ فِي السُّوقِ فَقَالَ مِثْلَ ذَلِكَ، يَأْثُرُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
'একবার আমি শামদেশে আমার শ্বশুরবাড়িতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দারদা-এর মাকে ঘরে পেলাম। দারদা-এর পিতা (আবু দারদা) তখন ঘরে ছিলেন না। তিনি বললেন, তুমি কি এ বছর হজ করার ইচ্ছা করেছ? আমি বললাম, জি হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আমাদের সার্বিক কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ কোরো। কেননা, নবিজি প্রায়ই বলতেন, অনুপস্থিত কোনো ভাইয়ের জন্য মুসলমানের দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে থাকে। তার মাথার ওপর একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন। যখনই সে তার কোনো ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দুআ করে, তখন উক্ত ফেরেশতা বলেন, আমিন এবং তোমার জন্যও অনুরূপ কল্যাণ হোক। সাফওয়ান বলেন, অতঃপর বাজারে গিয়ে আবু দারদা-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনিও নবিজি-এর সূত্রে অভিন্ন কথাই বললেন।'৩৩৪
রাসুলুল্লাহ সাহাবিদের অন্তর থেকে অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতার শেকড় উপড়ে ফেলে তদস্থলে একতার বীজ রোপণ করেছিলেন। যখনই সুযোগ পেতেন, একতা ও ভ্রাতৃত্বের অনুভব তাদের অন্তরসমূহে জাগিয়ে দিতেন। যেন জামাআতের মাঝে থেকেও কোনো মুসলমান নিজেকে একা না ভাবে, যে একাকিত্ববোধ মানুষের হৃদয়কে পাষাণ করে দেয় এবং মনকে বিষণ্ণ করে তোলে।
সাহাবিদের মাঝে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করার প্রতি রাসুলুল্লাহ-এর আন্তরিক প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ দেখুন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَجُلُ : اللهُمَّ اغْفِرْ لِي وَلِمُحَمَّدٍ وَحْدَنَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَقَدْ حَجَبْتَهَا عَنْ نَاسٍ كَثِيرٍ
'একবার জনৈক ব্যক্তি দুআ করার সময় বললেন, হে আল্লাহ, শুধু আমাকে ও মুহাম্মাদ-কে ক্ষমা করে দাও। তখন নবিজি বললেন, তুমি তো অনেক মানুষকে দুআ থেকে বঞ্চিত করে দিলে!'৩৩৫
এ কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ লোকটাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, অন্যান্য মুসলমানের জন্য দুআ না করে শুধু নিজের জন্য দুআ করা, নিজের সাথে রাসুলুল্লাহ-কে শরিক করলেও এটা ইসলামের শিষ্টাচার নয়। ইসলাম চায়, মুমিন নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপরজনের জন্যও তাই পছন্দ করুক।
সারকথা হলো, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যে তার ভাই ও বন্ধুদের ভালোবাসে, তাদের সাথে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক রাখে, তাদের কল্যাণকামী হয়, তাদের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থায় তাদের ইজ্জত-আবরু ও ধন- সম্পদের হিফাজত করে, নিজের ওপর তাদের অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেয়, তাদের কোনো ভুল হয়ে গেলে ক্ষমা করে দেয়-সর্বোপরি তাদের সাথে উত্তমরূপে জীবনযাপন করে। এ ছাড়াও ভাই-বন্ধুদের প্রতি সে উদার হয়, কৃপণতা করে না; সত্যবাদী হয়, মিথ্যা বলে না; অঙ্গীকার পালনকারী হয়, বিশ্বাসঘাতকতা করে না; একমুখী থাকে; ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায় না। তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রশান্তমনে ও হাসিমুখে কথা বলে। কথা বা কাজের মাধ্যমে কাউকে কষ্ট দেয় না। এ সবই একজন প্রকৃত মুসলমানের গুণাবলি। এগুলো যার ভেতর আছে, সেই ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুসলমান।