📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের কল্যাণ কামনা করে

📄 তাদের কল্যাণ কামনা করে


প্রকৃত মুসলমান আল্লাহ, কুরআন, রাসুল, مسلمانوں নেতাগণ ও সকল মুসলমানের কল্যাণ কামনা করে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ»
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য। '৩০৪
প্রকৃত মুসলমান ভাই-বন্ধুদের কল্যাণকামী হয়। তাদের সাথে ধোঁকাবাজি করে না এবং প্রতারণা করে না। কারণ, সে জানে, কল্যাণকামিতা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি, যার ব্যাপারে প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা রাসুলুল্লাহ -এর নিকট অঙ্গীকার করেছিলেন।
এ সম্পর্কে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
بَايَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ
'আমি রাসুলুল্লাহ-এর নিকট নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা ও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি।'৩০৫
পূর্বের হাদিসে আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ দ্বীনের পরিচয় দিয়েছেন মাত্র একটি শব্দ 'নাসিহা' বা কল্যাণকামিতার মাধ্যমে। এখান থেকেই বুঝা যায়, কল্যাণকামিতা হলো দ্বীনের মূলভিত্তি। কেননা, কল্যাণকামিতা ছাড়া মানুষের ইমান যথার্থ হয় না এবং ইসলাম সুন্দর হয় না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৩০৬
এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপরের জন্যও তাই পছন্দ করা সহজ বিষয় নয়। তবে কোনো মানুষের মনে যখন এ কথা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, নিজের জন্য যা পছন্দ করে অপরের জন্যও তা পছন্দ করা ইমানের অন্যতম শর্ত এবং কল্যাণকামিতাই হলো দ্বীন, তখন তার জন্য এটা মোটেই কঠিন কিছু থাকে না; বরং সেটা প্রকৃত মুসলমানের স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। বিগত সময় ও বর্তমান সময়ের প্রকৃত মুসলমানদের মাঝে এর নজির ভুরিভুরি আছে।
এ জায়গায় এসে একটি কাহিনি মনে পড়ে গেল, যা বুড়োবুড়িরা বলে থাকেন। এ কাহিনি শামের কিছু ব্যবসায়ীদের। তখনকার সময়ের প্রত্যেক জিনিসের জন্য আলাদা আলাদা বাজার বসত। যেমন সকল আতরের দোকান এক বাজারে, সকল রঙের দোকান এক বাজারে, সকল দর্জির দোকান এক বাজারে। এভাবে অন্যান্য বস্তুরও আলাদা আলাদা বাজার বসত। তখন তাদের একজনের নিকট প্রথম ক্রেতা যে আসত, তাকে স্বাভাবিকভাবে জিনিস বিক্রি করত। এরপর তার দোকানে দ্বিতীয় ক্রেতা আসলে সে প্রথমে দেখে নিত, পাশের দোকানদার এতক্ষণ ধরে কাউকে কিছু বিক্রি করতে পেরেছে কি না। যদি দেখত, না, এখনো সে কিছু বিক্রি করতে পারেনি, তখন ক্রেতাকে ভদ্রভাবে বলত, আপনি পাশের দোকান থেকে ক্রয় করুন। কারণ, আমি একটু আগে বিক্রি করেছি, আর সে এতক্ষণ পর্যন্ত কিছুই বিক্রি করতে পারেনি।
সুবহানাল্লাহ! ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার কেমন প্রকৃষ্ট উদাহরণ! আসলে যাদের অন্তরে এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, কল্যাণকামিতা দ্বীনের মূলভিত্তি; আর প্রকৃত মুমিন হতে হলে অপর ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করতে হবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে, তাদের মাঝে এমন ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয়।
মুসলমানদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার আরেকটি দাবি হলো, কারও মাঝে দোষ দেখতে পেলে তা চুপিসারে তাকে জানিয়ে দেওয়া।
এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা বলেন: الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ أَخِيهِ، إِذَا رَأَى فِيهَا عَيْبًا أَصْلَحَهُ
'মুমিন তার (অপর মুমিন) ভাইয়ের জন্য আয়নাস্বরূপ। যখন তার মাঝে কোনো দোষ দেখতে পায়, তখন তা সংশোধন করে দেয়। '৩০৭
আবু হুরাইরা তার কথাটি রাসুলুল্লাহ-এর নিম্নের হাদিস থেকে বলেছেন, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন :
الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ أَخِيهِ، وَالْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ، يَكُفُّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ، وَيَحُوطُهُ مِنْ وَرَائِهِ
'মুমিন তার (মুমিন) ভাইয়ের আয়নাস্বরূপ। আর মুমিন তো মুমিনের ভাই, যে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পদের হিফাজত করে এবং তার অবর্তমানেও তার প্রতি সমর্থন জানায়। '৩০৮
আগেও উল্লেখ করেছি, অধিকাংশ মানুষের জন্য অপরের কল্যাণ কামনা করা এবং নিজের জন্য যা পছন্দ করে, সবার জন্যও তা পছন্দ করা অনেক কঠিন। কিন্তু এ বিষয়টি প্রকৃত মুসলমানের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। তাই চাইলেও সে এর বিপরীত করতে পারে না। কেননা, প্রকৃত মুসলমানের মাঝে ইসলামের আখলাক-চরিত্র ও উত্তম গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত থাকে। সেজন্য তার থেকে সব সময় ইসলামের সৌন্দর্যই প্রকাশ পায়। কারণ, যে পাত্রে যা আছে, তাই তো সেখান থেকে ঝরবে! ফুল থেকে তো শুধু সুরভিই ছড়ায়! ভালো জমি থেকে সর্বদা ভালো ফসলই উৎপাদিত হয়!
কবি খুব সুন্দর বলেছেন :
وهل ينبت الخطي إلا وشيجه ** وتغرس إلا في منابتها النخل
'উত্তম বল্লম উৎপাদিত করতে হলে তার আসল শেকড় লাগে। তেমনই খেজুর বৃক্ষ উৎপাদন করতে হলে তার উৎপাদনস্থলেই রোপণ করতে হয়।'

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং কৃত অঙ্গীকার পালন করে

📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং কৃত অঙ্গীকার পালন করে


ইসলাম তার সকল অনুসারীকে স্বীয় বন্ধুদের সাথে সদাচারী ও বিশ্বস্ত হতে বলে। এমনকি পিতা-মাতার বন্ধুদের সাথেও সদ্ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে, যার বিস্তারিত বিবরণ 'পিতা-মাতার সাথে মুসলমানের সম্পর্ক' অধ্যায়ে গত হয়েছে। কেননা, তা নিঃস্বার্থ ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের আলামত। সালাফে সালিহিন তাদের জীবনে এ গুণ পুরোপুরিভাবে অবলম্বন করেছিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন দিনার ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন :
أَنَّ رَجُلًا مِنَ الْأَعْرَابِ لَقِيَهُ بِطَرِيقِ مَكَّةَ، فَسَلَّمَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ، وَحَمَلَهُ عَلَى حِمَارٍ كَانَ يَرْكَبُهُ. وَأَعْطَاهُ عِمَامَةٌ، كَانَتْ عَلَى رَأْسِهِ فَقَالَ ابْنُ دِينَارٍ: فَقُلْنَا لَهُ: أَصْلَحَكَ اللَّهُ إِنَّهُمُ الْأَعْرَابُ وَإِنَّهُمْ يَرْضَوْنَ بِالْيَسِيرِ، فَقَالَ عَبْدُ اللهِ: إِنَّ أَبَا هَذَا كَانَ وُدًّا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ أَبَرَّ الْبَرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدٌ أَبِيهِ»
'একদিন মক্কার পথে চলার সময় এক বেদুইনের সাথে ইবনে উমর -এর দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন, এরপর যে গাধার ওপর তিনি উপবিষ্ট ছিলেন তাতে তাকে তুলে নিলেন এবং তার মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিল তা তাকে প্রদান করলেন। ইবনে দিনার বলেন, তখন আমরা তাকে বললাম, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন! এরা গ্রাম্য মানুষ, সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়! (তাই এতসব করার কী প্রয়োজন ছিল?) উত্তরে ইবনে উমর বললেন, এ লোকটির পিতা উমর বিন খাত্তাব -এর বন্ধু ছিলেন। আর আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সুসম্পর্ক রাখা অনেক বড় সাওয়াবের কাজ। '৩০৯
রাসুলুল্লাহ মুসলমানদের অন্তরসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন খুব ভালোভাবেই করেছিলেন; বিধায় তাদের অন্তরসমূহে বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের বীজ বপন করা তাঁর জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল। তাই যখনই সুযোগ পেতেন, তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَهُ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سَلَمَةَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ بَقِيَ مِنْ بِرِّ أَبَوَيَّ شَيْءٌ أَبَرُّهُمَا بِهِ بَعْدَ مَوْتِهِمَا؟ قَالَ: «نَعَمُ الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا، وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا، وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا مِنْ بَعْدِهِمَا، وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا تُوصَلُ إِلَّا بِهِمَا، وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا»
'বনু সালাম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কি কোনো পন্থা আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আর তা হলো, তাদের জন্য দুআ করা, তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা, তাদের কৃত ওয়াদাসমূহ বাস্তবায়ন করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবের সম্মান করা এবং তাদের সূত্র ধরে যারা তোমার আত্মীয় হয়েছে, তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।'৩১০
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও বিশ্বস্ততা টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এমনকি খাদিজা রা.-এর বান্ধবীদের সাথে তিনি এত বেশি সদ্ব্যবহার করতেন যে, আয়িশা রা.-এর মনে খাদিজা রা.-এর প্রতি নারীসুলভ ঈর্ষা জেগে উঠত।
আয়িশা রা. নিজেই তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
مَا غِرْتُ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا ، وَرُبَّمَا ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِّعُهَا أَعْضَاءً، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةُ إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ «إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدُ»
নবিজি -এর সহধর্মিনীদের মধ্যে খাদিজা -এর প্রতি আমার যে পরিমাণ ঈর্ষা ছিল, অন্য কারও প্রতি সে পরিমাণ ছিল না; অথচ তাকে আমি কোনোদিন দেখিইনি! তবুও তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার কারণ হলো, নবিজি তাকে একটু বেশিই স্মরণ করতেন। যখনই কোনো ছাগল জবাই করতেন, তা থেকে কিছু গোশত খাদিজার বান্ধবীদের নিকট অবশ্যই পাঠিয়ে দিতেন। অনেক সময় আমি বলেই বসতাম, দুনিয়াতে বুঝি খাদিজা ছাড়া আর কোনো স্ত্রী-ই নেই! তখন তিনি বলতেন, হ্যাঁ, তার মতো স্ত্রী একজনই ছিল। তা ছাড়া সে আমার সন্তানের জন্ম দিয়েছে। '৩১১
অপর এক বর্ণনায় আছে:
وَإِنْ كَانَ لَيَذْبَحُ الشَّاةَ فَيُهْدِي فِي خَلَائِلِهَا مِنْهَا مَا يَسَعُهُنَّ 'আর কোনো ছাগল জবাই করলে তা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অংশ তার (খাদিজার) বান্ধবীদের কাছে হাদিয়া পাঠাতেন। '৩১২
এটাই ইসলাম ধর্মে বন্ধুত্বের স্বরূপ, যেখানে দূরের বন্ধু অর্থাৎ মৃত পিতা-মাতা ও স্ত্রীদের বান্ধবীদের সাথেও সদ্ব্যবহার করা হয়। তাহলে আমাদের নিকটতম বন্ধুদের সাথে কেমন উত্তম ব্যবহার ও সদাচরণ করতে হবে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?
ভাই-বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা, সদ্ব্যবহার ও কল্যাণকামিতার অন্যতম দাবি ও বহিঃপ্রকাশ হলো, সর্বাবস্থায় তাদের সহযোগিতা করা। সুতরাং তাদের কেউ যদি হকের ওপর থাকে, তাহলে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে তার সমর্থন করতে হবে এবং তার বিপদ প্রতিহত করার চেষ্টা করতে হবে। পক্ষান্তরে তাদের কেউ যদি হকের বিপক্ষে থাকে, তখনও তাকে সহযোগিতা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার পন্থা হলো, তাকে হকের বিরুদ্ধাচরণ করতে নিষেধ করা এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে অন্যায় ও জুলুমের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
وَلْيَنصُرِ الرَّجُلُ أَخَاهُ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا، إِنْ كَانَ ظَالِمًا فَلْيَنْهَهُ، فَإِنَّهُ لَهُ نَصْرُ وَإِنْ كَانَ مَظْلُومًا فَلْيَنْصُرْهُ
'প্রত্যেক লোকের উচিত তার ভাইয়ের সাহায্য করা, চাই সে জালিম (অত্যাচারী) হোক বা মাজলুম (অত্যাচারিত)। যদি সে জালিম হয়, তাহলে জুলুম থেকে বিরত রাখাই হলো তাকে সাহায্য করা। আর যদি মাজলুম হয়, তাহলে (জুলুম থেকে রক্ষা করে) তাকে সাহায্য করবে।'৩১৩
প্রকৃত মুসলমান তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে না, সে জালিম হোক বা মাজলুম হোক। কেননা, ইসলাম তাকে শিক্ষা দিয়েছে, নিজের জন্য সে যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করতে হবে। যেহেতু সে নিজের ব্যাপারে জালিম হওয়া বা মাজলুম হওয়া কোনোটাই পছন্দ করে না, তাই তার ভাইয়ের ব্যাপারেও তা পছন্দ করবে না। ফলে তার মুসলিম কোনো ভাই যদি মাজলুম হয়, তখন জুলুম থেকে বাঁচিয়ে তাকে সাহায্য করে। আর যদি সে জালিম হয়, তখন জুলুম থেকে বারণ করে তাকে সাহায্য করে। আমি শপথ করে বলতে পারব, এটাই নিঃস্বার্থ নাসিহা বা কল্যাণকামিতা এবং এটাই প্রকৃত সদ্ব্যবহার, যে দুই গুণকে ইসলাম প্রকৃত মুসলমানের গুণ হিসাবে অভিহিত করেছে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে বিনম্র আচরণ করে

📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে বিনম্র আচরণ করে


প্রকৃত মুসলমান তার ভাই-বন্ধুদের সাথে ভদ্র ও বিনম্র আচরণ করে। সে তাদের প্রতি আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ হয়, তারাও তার প্রতি আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ হয়। কেননা, ইসলাম মুসলমানদের এমনই হতে বলে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ
'তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফিরদের প্রতি হবে কঠোর। '৩১৪
আয়াতে মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হওয়ার অর্থের ব্যাপকতায় বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা ও উত্তম লেনদেন সব অন্তর্ভুক্ত।
হাদিস শরিফেও রাসুলুল্লাহ ﷺ বিনয়-নম্রতাকে জীবনের সৌন্দর্য আখ্যা দিয়ে তার প্রতি মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন।
ইরশাদ করেছেন: إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ 'কোনো বিষয়ে বিনয়-নম্রতা থাকলে, তা সে বিষয়কে সুন্দর করে তোলে; আর কোনো বিষয় থেকে বিনয়-নম্রতা উঠিয়ে নেওয়া হলে তা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে। '৩১৫
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সিরাত মুসলমানদের সামনে স্পষ্ট ও উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা ও উদারতার মূর্তপ্রতীক। তাঁর মুখ থেকে কখনো অশ্লীল ও কঠোর শব্দ বের হয়নি। কখনো কোনো মুসলমানকে গালি দেননি।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর খাদিম আনাস বলেন: لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا، وَلَا لَعَانًا، وَلَا سَبَّابًا، كَانَ يَقُولُ عِنْدَ المَعْتَبَةِ: «مَا لَهُ تَرِبَ جَبِينُهُ» 'রাসুলুল্লাহ ﷺ অশ্লীলভাষী ছিলেন না, অধিক অভিসম্পাতকারী ছিলেন না এবং গালিগালাজ করতেন না। কাউকে শাসন করার প্রয়োজন হলে বলতেন, কী হলো তার? ধুলায় মিশ্রিত হোক তার কপাল!'৩১৭

টিকাঃ
৩১৬. এ অংশের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসগণ বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এ শব্দের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির জন্য দুআ করতেন, যেন সে বেশি করে সিজদা করার মাধ্যমে তার কপাল ধুলামিশ্রিত করতে পারে, যেখানে তার পরিশুদ্ধি ও হিদায়াত নিহিত আছে। (অনুবাদক)

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের গিবত করে না

📄 তাদের গিবত করে না


প্রকৃত মুসলমান তার ভাই-বন্ধুদের গিবত করে না। কেননা, কুরআন গিবত করাকে স্পষ্টরূপে হারাম ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابُ رَحِيمٌ 'তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত, তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।'৩১৮
প্রকৃত মুসলমান যখন আয়াতটি পড়ে, তখন গিবত বা পরনিন্দার প্রতি তার অন্তরে প্রচুর ঘৃণা জন্মায়। পরনিন্দাকারীকে আল্লাহ মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণকারীর সাথে তুলনা করেছেন, এ বিষয়টা তার ভেতর চরম ভীতির সঞ্চার করে। তাই সে কখনো কারও গিবত করে ফেললে সাথে সাথে তাকওয়ার দিকে অগ্রসর হয় এবং তাওবা করে ফেলে। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা তাকওয়া ও তাওবার কথা এজন্যই বলেছেন, যেন কেউ গিবত করে ফেললে দ্রুতই তাকওয়া অবলম্বন করে এবং তাওবা করে।
প্রকৃত মুসলমান গিবত থেকে বাঁচার জন্য ভাই-বন্ধুদের ব্যাপারে উত্তম কথা ব্যতীত আর কোনো কথাই বলে না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا : اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: «ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: «إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ، فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ
'তোমরা কি জানো, গিবত কাকে বলে? তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন। তিনি বললেন, (গিবত হলো) তোমার ভাইয়ের ব্যাপারে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে। জনৈক প্রশ্নকারী বললেন, আমি যা বলি, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তখন? তিনি বললেন, তুমি যা বলো, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলে তুমি তার গিবত করেছ। আর যদি তার ভেতর তা না থাকে, তাহলে তুমি তার কুৎসা রটিয়েছ। '৩১৯
প্রকৃত মুত্তাকি মুসলমান প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গিবত থেকে বেঁচে থাকে। যেন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করার মতো কঠিন গুনাহর কাজ তার থেকে প্রকাশ না পায় এবং উপুড় হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে না হয়।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ মুআজ-এর জিহ্বা ধরে তাকে সতর্ক করে বললেন :
كُفَّ عَلَيْكَ هَذَا ، فَقُلْتُ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ، وَإِنَّا لَمُؤَاخَذُونَ بِمَا نَتَكَلَّمُ بِهِ؟ فَقَالَ: تَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا مُعَاذُ، وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ أَوْ عَلَى مَنَاخِرِهِمْ إِلَّا حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ
'এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো। মুআজ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, কথার কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! জিহ্বার গুনাহর কারণেই তো লোকদের জাহান্নামে উপুড় করে নিক্ষেপ করা হবে। '৩২০
গিবত চরম পর্যায়ের নিন্দনীয় এক কুঅভ্যাস। যাদের ভেতর পুরুষত্ব- বলতে কিছু আছে, তাদের মাঝে এ অভ্যাস কক্ষনো থাকতে পারে না। এ নিন্দনীয় অভ্যাসটি শুধু তাদের মাঝেই থাকতে পারে, যারা আসলে পুরুষ নামের কলঙ্ক। এ ধরনের লোকদের দুইটা মুখ থাকে। এক মুখ দিয়ে লোকদের নিকট ভাই-বন্ধুদের গিবত করে বেড়ায়, আরেক মুখ দিয়ে তাদের প্রতি প্রফুল্লতা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করে। এজন্য প্রকৃত মুসলমান গিবত ও দুই রঙে কলুষিত হওয়া থেকে যোজন যোজন দূরে থাকে। কেননা, ইসলাম তাকে পুরুষত্ব শিক্ষা দিয়েছে, চারিত্রিক দৃঢ়তা তার জীবনের অন্যতম সেরা অবলম্বন। তার কথা ও কাজে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি পূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকে। শঠতা, দ্বিমুখিতা, অক্টোপাসের মতো রং বদলানো—এসব নিন্দনীয় অভ্যাস তার মাঝে বিলকুল নেই। চরম ঘৃণা করে সে এসব খারাপ অভ্যাসকে। কেননা, কিয়ামতের দিন এসব লোকই আল্লাহর নিকট সর্বনিকৃষ্ট মানব সাব্যস্ত হবে।
রাসুলুল্লাহ বলেছেন: تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ القِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ ذَا الوَجْهَيْنِ، الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهِ، وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهِ
‘তুমি কিয়ামতের দিন দ্বিমুখী লোকদের আল্লাহর নিকট সর্বনিকৃষ্ট লোক হিসাবে দেখতে পাবে, যারা একদলের কাছে এক মুখ নিয়ে যায়, আরেকদলের কাছে যায় ভিন্ন মুখ নিয়ে। ৩২১
প্রকৃত মুসলমানের মুখ একটাই হয়। সবার সাথে এক মুখ দিয়েই কথা বলে। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলে। কিছু লোকের সাথে হাসিমুখে আর কিছু লোকের সাথে কুঞ্চিত মুখে কথা বলে না। কেননা, সে বিশ্বাস করে, দ্বিমুখিতা স্পষ্ট নিফাক ও শঠতা। আর ইসলাম ও নিফাক কখনো একত্র হতে পারে না। তাই যেসব লোকের মাঝে দ্বিমুখিতা আছে, তারা নিঃসন্দেহে মুনাফিকদের দলভুক্ত। জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরই তাদের শেষ ঠিকানা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00