📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের প্রতি উদার এবং দোষত্রুটি ক্ষমা করে দেয়

📄 তাদের প্রতি উদার এবং দোষত্রুটি ক্ষমা করে দেয়


প্রকৃত মুসলমানের মনে কোনো মুসলমান ভাইয়ের প্রতি যদি রাগ আসে, তখন রাগ সংবরণ করে ফেলে এবং তাকে দ্রুত ক্ষমা করে দেয়। এতে সে কোনোরূপ অসম্মান ও লজ্জা অনুভব করে না; বরং এটাকে ইহসান বা বিশেষ সৎকর্ম মনে করে, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে এবং তাঁর বিশেষ ভালোবাসার যোগ্য করে তোলে। আর এটা একমাত্র তিনি ইহসানকারীদের বা বিশেষ সৎকর্মশীলদেরই দান করে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, (তারা সৎকর্মশীল)। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '২৯৮
অনেক সময় মানুষ রাগকে তো সংবরণ করে ফেলে, কিন্তু হিংসা-বিদ্বেষের কড়াই তার বক্ষে টগবগ করে ফুটতে থাকে। অতঃপর তা পরিণত হয় চরম শত্রুতায়। প্রকাশ্য রাগ পরিণত হয় গোপন বিদ্বেষে। অথচ শত্রুতা ও হিংসা- বিদ্বেষের চেয়ে রাগ অনেক ভালো ও পবিত্র। তবে প্রকৃত মুসলমান রাগ সংবরণ করার সাথে সাথে তাকে ক্ষমাও করে দেয়। ফলে তার ভেতর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা বাসা বাঁধতে পারে না। এভাবে সে ইহসানকারীদের দলভুক্ত হয়ে যায়।
রাগ যখন সংবরণ করা হয়, তখন মনের ওপর সেটাকে ভারী বোঝা মনে হয় এবং রাগের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মনের ভেতরটাকে পুড়িয়ে ফেলতে থাকে। কিন্তু রাগ সংবরণ করার সাথে সাথে মন থেকে ক্ষমা করে দেওয়া হলে সে বোঝা হালকা হয়ে আসে এবং অন্তর ঠান্ডা ও প্রশান্ত হয়ে যায়। এটাই ইহসান বা বিশেষ সৎকর্ম, যা মুসলমান তার ভাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে করে থাকে।
প্রকৃত মুসলমান অপর মুসলমান ভাইকে ক্ষমা করে দেয়। কেননা, এটা প্রকৃত অর্থে তার প্রতি বিনয় প্রদর্শন, যার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা সম্মান ও মর্যাদা দান করেন।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْمٍ، إِلَّا عِزًّا، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'কেউ কাউকে ক্ষমা করে দিলে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং কেউ কারও প্রতি আল্লাহর জন্য বিনয় প্রদর্শন করলে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। '২৯৯
ক্ষমা করা ও বিনয় প্রদর্শন করা আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা লাভের উপায়। এ দুই বিষয়ও সে ইহসানের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা উদার ও ক্ষমাশীল মুসলমানদের গুণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। এখান থেকে প্রতীয়মান হয়, কেউ রাগ সংবরণ করার পর ক্ষমা করে দিলে সে ইহসানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যাদের আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন এবং এমন সম্মানিত লোকদের দলভুক্ত হয়ে যায়, যাদের লোকজন ভালোবাসে।
প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। কারণ, আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার জন্য অন্যকে ক্ষমা করা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে অন্তর পরিচ্ছন্ন থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সে জানে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
ثَلَاثُ مَنْ لَمْ يَكُنَّ فِيهِ، غُفِرَ لَهُ مَا سِوَاهُ لِمَنْ شَاءَ، مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَمْ يَكُنْ سَاحِرًا يَتَّبِعُ السَّحَرَةَ، وَلَمْ يَحْقِدْ عَلَى أَخِيهِ
'তিনটা গুনাহ যার মধ্যে না থাকবে, তার অন্যান্য গুনাহ আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এক. যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহর সাথে শিরক করত না। দুই. যে ব্যক্তি জাদুকর ছিল না এবং জাদুর অনুসরণ করত না। তিন. যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত না।'৩০০

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 দেখা-সাক্ষাৎ করার সময় হাস্যমুখ থাকে

📄 দেখা-সাক্ষাৎ করার সময় হাস্যমুখ থাকে


উল্লিখিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি মুসলমানকে সাদা মনের মানুষ হতে হয়, যে খোলামনে ও হাসিমুখে ভাই-বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এটার প্রতি উৎসাহিত করে বলেন: لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
‘কোনো উত্তম আমলকে তুচ্ছ মনে কোরো না; যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার মতো (ছোট আমল) হোক। '৩০১
সদা হাস্যমুখ থাকা এমন একটি গুণ, যার প্রতি ইসলাম উৎসাহিত করেছে এবং সেটাকে অন্যতম নেক আমল বলা হয়েছে; যার জন্য সাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া হবে। এর কারণ হলো, মুখের হাসি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার বার্তা দেয়। আর অন্তর পরিচ্ছন্ন থাকা কত বড় গুণ, তা তো একটু আগেই আমরা আলোচনা করে আসলাম। এজন্য রাসুলুল্লাহ মুখে হাসি রাখার প্রতি লোকদের খুব উৎসাহিত করতেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
'তোমার ভাইয়ের সামনে মুচকি হাসা তোমার জন্য একটি সদকা। '৩০২
রাসুলুল্লাহ সাহাবিদের সামনে সব সময় হাসিমুখে থাকতেন। কারও দিকে তাকালে তাকে একটি মুচকি হাসি উপহার দিতেন। এ সম্পর্কে সহিহাইনে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি বলেন: مَا حَجَبَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَآنِي إِلَّا تَبَسَّمَ
'আমি যখনই রাসুলুল্লাহ -কে সালাম দিয়েছি, কোনোবারেই তিনি আমাকে জবাব না দিয়ে থাকেননি। আর আমাকে দেখে সর্বদাই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন।'৩০৩
আলি বলেন, 'যখন দুজন মুসলমান একত্র হয়ে আলাপ-আলোচনা করে, তখন উভয়ের মধ্যে যে হাসিমুখে কথা বলে, তাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন।'
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম — যাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর নির্দেশনা জীবন্ত ছিল — একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করলে মুসাফাহা করতেন এবং কোনো সফর থেকে ফিরলে আলিঙ্গন করতেন। কেননা, এতে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়।
ইবনে সাদ (রাঃ) তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ইমাম শাবি (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন খাইবার থেকে ফিরে আসলেন, তখন জাফর বিন আবি তালিব (রাঃ) তাঁর সাথে দেখা করলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং দুচোখের মাঝখানে চুম্বন করলেন। অতঃপর বললেন, আমি বুঝতে পারছি না, কী কারণে আমি এত আনন্দিত? জাফর ফিরে আসার কারণে, নাকি খাইবার বিজয়ের কারণে? আরেক রিওয়ায়াতে এসেছে, তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং আলিঙ্গন করলেন।
মুসলমানদের পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় সালাম দেওয়া, মুসাফাহা করা ও আলিঙ্গন করা ইসলামে পছন্দনীয়। কেননা, এর মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য অক্ষুণ্ণ থাকে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় ও মজবুত হয়। ফলে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা এবং মুসলমানদের মাঝে ইসলামের সকল বিধান বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যায়।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের কল্যাণ কামনা করে

📄 তাদের কল্যাণ কামনা করে


প্রকৃত মুসলমান আল্লাহ, কুরআন, রাসুল, مسلمانوں নেতাগণ ও সকল মুসলমানের কল্যাণ কামনা করে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا: لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ»
'দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। আমরা (উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, রাসুল, নেতৃস্থানীয় মুসলমান এবং সকল সাধারণ মুসলমানের জন্য। '৩০৪
প্রকৃত মুসলমান ভাই-বন্ধুদের কল্যাণকামী হয়। তাদের সাথে ধোঁকাবাজি করে না এবং প্রতারণা করে না। কারণ, সে জানে, কল্যাণকামিতা ইসলামের অন্যতম মূলনীতি, যার ব্যাপারে প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা রাসুলুল্লাহ -এর নিকট অঙ্গীকার করেছিলেন।
এ সম্পর্কে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
بَايَعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِقَامِ الصَّلَاةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مُسْلِمٍ
'আমি রাসুলুল্লাহ-এর নিকট নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা ও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি।'৩০৫
পূর্বের হাদিসে আমরা দেখেছি, রাসুলুল্লাহ দ্বীনের পরিচয় দিয়েছেন মাত্র একটি শব্দ 'নাসিহা' বা কল্যাণকামিতার মাধ্যমে। এখান থেকেই বুঝা যায়, কল্যাণকামিতা হলো দ্বীনের মূলভিত্তি। কেননা, কল্যাণকামিতা ছাড়া মানুষের ইমান যথার্থ হয় না এবং ইসলাম সুন্দর হয় না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। '৩০৬
এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপরের জন্যও তাই পছন্দ করা সহজ বিষয় নয়। তবে কোনো মানুষের মনে যখন এ কথা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, নিজের জন্য যা পছন্দ করে অপরের জন্যও তা পছন্দ করা ইমানের অন্যতম শর্ত এবং কল্যাণকামিতাই হলো দ্বীন, তখন তার জন্য এটা মোটেই কঠিন কিছু থাকে না; বরং সেটা প্রকৃত মুসলমানের স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়। বিগত সময় ও বর্তমান সময়ের প্রকৃত মুসলমানদের মাঝে এর নজির ভুরিভুরি আছে।
এ জায়গায় এসে একটি কাহিনি মনে পড়ে গেল, যা বুড়োবুড়িরা বলে থাকেন। এ কাহিনি শামের কিছু ব্যবসায়ীদের। তখনকার সময়ের প্রত্যেক জিনিসের জন্য আলাদা আলাদা বাজার বসত। যেমন সকল আতরের দোকান এক বাজারে, সকল রঙের দোকান এক বাজারে, সকল দর্জির দোকান এক বাজারে। এভাবে অন্যান্য বস্তুরও আলাদা আলাদা বাজার বসত। তখন তাদের একজনের নিকট প্রথম ক্রেতা যে আসত, তাকে স্বাভাবিকভাবে জিনিস বিক্রি করত। এরপর তার দোকানে দ্বিতীয় ক্রেতা আসলে সে প্রথমে দেখে নিত, পাশের দোকানদার এতক্ষণ ধরে কাউকে কিছু বিক্রি করতে পেরেছে কি না। যদি দেখত, না, এখনো সে কিছু বিক্রি করতে পারেনি, তখন ক্রেতাকে ভদ্রভাবে বলত, আপনি পাশের দোকান থেকে ক্রয় করুন। কারণ, আমি একটু আগে বিক্রি করেছি, আর সে এতক্ষণ পর্যন্ত কিছুই বিক্রি করতে পারেনি।
সুবহানাল্লাহ! ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার কেমন প্রকৃষ্ট উদাহরণ! আসলে যাদের অন্তরে এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, কল্যাণকামিতা দ্বীনের মূলভিত্তি; আর প্রকৃত মুমিন হতে হলে অপর ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করতে হবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে, তাদের মাঝে এমন ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার বন্ধন মোটেই আশ্চর্যের কিছু নয়।
মুসলমানদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও কল্যাণকামিতার আরেকটি দাবি হলো, কারও মাঝে দোষ দেখতে পেলে তা চুপিসারে তাকে জানিয়ে দেওয়া।
এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা বলেন: الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ أَخِيهِ، إِذَا رَأَى فِيهَا عَيْبًا أَصْلَحَهُ
'মুমিন তার (অপর মুমিন) ভাইয়ের জন্য আয়নাস্বরূপ। যখন তার মাঝে কোনো দোষ দেখতে পায়, তখন তা সংশোধন করে দেয়। '৩০৭
আবু হুরাইরা তার কথাটি রাসুলুল্লাহ-এর নিম্নের হাদিস থেকে বলেছেন, যেখানে তিনি ইরশাদ করেছেন :
الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ أَخِيهِ، وَالْمُؤْمِنُ أَخُو الْمُؤْمِنِ، يَكُفُّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ، وَيَحُوطُهُ مِنْ وَرَائِهِ
'মুমিন তার (মুমিন) ভাইয়ের আয়নাস্বরূপ। আর মুমিন তো মুমিনের ভাই, যে তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পদের হিফাজত করে এবং তার অবর্তমানেও তার প্রতি সমর্থন জানায়। '৩০৮
আগেও উল্লেখ করেছি, অধিকাংশ মানুষের জন্য অপরের কল্যাণ কামনা করা এবং নিজের জন্য যা পছন্দ করে, সবার জন্যও তা পছন্দ করা অনেক কঠিন। কিন্তু এ বিষয়টি প্রকৃত মুসলমানের স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। তাই চাইলেও সে এর বিপরীত করতে পারে না। কেননা, প্রকৃত মুসলমানের মাঝে ইসলামের আখলাক-চরিত্র ও উত্তম গুণাবলি প্রতিষ্ঠিত থাকে। সেজন্য তার থেকে সব সময় ইসলামের সৌন্দর্যই প্রকাশ পায়। কারণ, যে পাত্রে যা আছে, তাই তো সেখান থেকে ঝরবে! ফুল থেকে তো শুধু সুরভিই ছড়ায়! ভালো জমি থেকে সর্বদা ভালো ফসলই উৎপাদিত হয়!
কবি খুব সুন্দর বলেছেন :
وهل ينبت الخطي إلا وشيجه ** وتغرس إلا في منابتها النخل
'উত্তম বল্লম উৎপাদিত করতে হলে তার আসল শেকড় লাগে। তেমনই খেজুর বৃক্ষ উৎপাদন করতে হলে তার উৎপাদনস্থলেই রোপণ করতে হয়।'

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং কৃত অঙ্গীকার পালন করে

📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং কৃত অঙ্গীকার পালন করে


ইসলাম তার সকল অনুসারীকে স্বীয় বন্ধুদের সাথে সদাচারী ও বিশ্বস্ত হতে বলে। এমনকি পিতা-মাতার বন্ধুদের সাথেও সদ্ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে, যার বিস্তারিত বিবরণ 'পিতা-মাতার সাথে মুসলমানের সম্পর্ক' অধ্যায়ে গত হয়েছে। কেননা, তা নিঃস্বার্থ ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের আলামত। সালাফে সালিহিন তাদের জীবনে এ গুণ পুরোপুরিভাবে অবলম্বন করেছিলেন।
আব্দুল্লাহ বিন দিনার ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন :
أَنَّ رَجُلًا مِنَ الْأَعْرَابِ لَقِيَهُ بِطَرِيقِ مَكَّةَ، فَسَلَّمَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ، وَحَمَلَهُ عَلَى حِمَارٍ كَانَ يَرْكَبُهُ. وَأَعْطَاهُ عِمَامَةٌ، كَانَتْ عَلَى رَأْسِهِ فَقَالَ ابْنُ دِينَارٍ: فَقُلْنَا لَهُ: أَصْلَحَكَ اللَّهُ إِنَّهُمُ الْأَعْرَابُ وَإِنَّهُمْ يَرْضَوْنَ بِالْيَسِيرِ، فَقَالَ عَبْدُ اللهِ: إِنَّ أَبَا هَذَا كَانَ وُدًّا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ، وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ أَبَرَّ الْبَرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدٌ أَبِيهِ»
'একদিন মক্কার পথে চলার সময় এক বেদুইনের সাথে ইবনে উমর -এর দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন, এরপর যে গাধার ওপর তিনি উপবিষ্ট ছিলেন তাতে তাকে তুলে নিলেন এবং তার মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিল তা তাকে প্রদান করলেন। ইবনে দিনার বলেন, তখন আমরা তাকে বললাম, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন! এরা গ্রাম্য মানুষ, সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়! (তাই এতসব করার কী প্রয়োজন ছিল?) উত্তরে ইবনে উমর বললেন, এ লোকটির পিতা উমর বিন খাত্তাব -এর বন্ধু ছিলেন। আর আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সুসম্পর্ক রাখা অনেক বড় সাওয়াবের কাজ। '৩০৯
রাসুলুল্লাহ মুসলমানদের অন্তরসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন খুব ভালোভাবেই করেছিলেন; বিধায় তাদের অন্তরসমূহে বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের বীজ বপন করা তাঁর জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল। তাই যখনই সুযোগ পেতেন, তাদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَهُ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سَلَمَةَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ بَقِيَ مِنْ بِرِّ أَبَوَيَّ شَيْءٌ أَبَرُّهُمَا بِهِ بَعْدَ مَوْتِهِمَا؟ قَالَ: «نَعَمُ الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا، وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا، وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا مِنْ بَعْدِهِمَا، وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا تُوصَلُ إِلَّا بِهِمَا، وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا»
'বনু সালাম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কি কোনো পন্থা আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। আর তা হলো, তাদের জন্য দুআ করা, তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করা, তাদের কৃত ওয়াদাসমূহ বাস্তবায়ন করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবের সম্মান করা এবং তাদের সূত্র ধরে যারা তোমার আত্মীয় হয়েছে, তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।'৩১০
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বন্ধুত্বের সম্পর্ক ও বিশ্বস্ততা টিকিয়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। এমনকি খাদিজা রা.-এর বান্ধবীদের সাথে তিনি এত বেশি সদ্ব্যবহার করতেন যে, আয়িশা রা.-এর মনে খাদিজা রা.-এর প্রতি নারীসুলভ ঈর্ষা জেগে উঠত।
আয়িশা রা. নিজেই তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
مَا غِرْتُ عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا ، وَرُبَّمَا ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِّعُهَا أَعْضَاءً، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةُ إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ «إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدُ»
নবিজি -এর সহধর্মিনীদের মধ্যে খাদিজা -এর প্রতি আমার যে পরিমাণ ঈর্ষা ছিল, অন্য কারও প্রতি সে পরিমাণ ছিল না; অথচ তাকে আমি কোনোদিন দেখিইনি! তবুও তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার কারণ হলো, নবিজি তাকে একটু বেশিই স্মরণ করতেন। যখনই কোনো ছাগল জবাই করতেন, তা থেকে কিছু গোশত খাদিজার বান্ধবীদের নিকট অবশ্যই পাঠিয়ে দিতেন। অনেক সময় আমি বলেই বসতাম, দুনিয়াতে বুঝি খাদিজা ছাড়া আর কোনো স্ত্রী-ই নেই! তখন তিনি বলতেন, হ্যাঁ, তার মতো স্ত্রী একজনই ছিল। তা ছাড়া সে আমার সন্তানের জন্ম দিয়েছে। '৩১১
অপর এক বর্ণনায় আছে:
وَإِنْ كَانَ لَيَذْبَحُ الشَّاةَ فَيُهْدِي فِي خَلَائِلِهَا مِنْهَا مَا يَسَعُهُنَّ 'আর কোনো ছাগল জবাই করলে তা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ অংশ তার (খাদিজার) বান্ধবীদের কাছে হাদিয়া পাঠাতেন। '৩১২
এটাই ইসলাম ধর্মে বন্ধুত্বের স্বরূপ, যেখানে দূরের বন্ধু অর্থাৎ মৃত পিতা-মাতা ও স্ত্রীদের বান্ধবীদের সাথেও সদ্ব্যবহার করা হয়। তাহলে আমাদের নিকটতম বন্ধুদের সাথে কেমন উত্তম ব্যবহার ও সদাচরণ করতে হবে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?
ভাই-বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা, সদ্ব্যবহার ও কল্যাণকামিতার অন্যতম দাবি ও বহিঃপ্রকাশ হলো, সর্বাবস্থায় তাদের সহযোগিতা করা। সুতরাং তাদের কেউ যদি হকের ওপর থাকে, তাহলে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে তার সমর্থন করতে হবে এবং তার বিপদ প্রতিহত করার চেষ্টা করতে হবে। পক্ষান্তরে তাদের কেউ যদি হকের বিপক্ষে থাকে, তখনও তাকে সহযোগিতা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার পন্থা হলো, তাকে হকের বিরুদ্ধাচরণ করতে নিষেধ করা এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে অন্যায় ও জুলুমের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
وَلْيَنصُرِ الرَّجُلُ أَخَاهُ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا، إِنْ كَانَ ظَالِمًا فَلْيَنْهَهُ، فَإِنَّهُ لَهُ نَصْرُ وَإِنْ كَانَ مَظْلُومًا فَلْيَنْصُرْهُ
'প্রত্যেক লোকের উচিত তার ভাইয়ের সাহায্য করা, চাই সে জালিম (অত্যাচারী) হোক বা মাজলুম (অত্যাচারিত)। যদি সে জালিম হয়, তাহলে জুলুম থেকে বিরত রাখাই হলো তাকে সাহায্য করা। আর যদি মাজলুম হয়, তাহলে (জুলুম থেকে রক্ষা করে) তাকে সাহায্য করবে।'৩১৩
প্রকৃত মুসলমান তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে না, সে জালিম হোক বা মাজলুম হোক। কেননা, ইসলাম তাকে শিক্ষা দিয়েছে, নিজের জন্য সে যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করতে হবে। যেহেতু সে নিজের ব্যাপারে জালিম হওয়া বা মাজলুম হওয়া কোনোটাই পছন্দ করে না, তাই তার ভাইয়ের ব্যাপারেও তা পছন্দ করবে না। ফলে তার মুসলিম কোনো ভাই যদি মাজলুম হয়, তখন জুলুম থেকে বাঁচিয়ে তাকে সাহায্য করে। আর যদি সে জালিম হয়, তখন জুলুম থেকে বারণ করে তাকে সাহায্য করে। আমি শপথ করে বলতে পারব, এটাই নিঃস্বার্থ নাসিহা বা কল্যাণকামিতা এবং এটাই প্রকৃত সদ্ব্যবহার, যে দুই গুণকে ইসলাম প্রকৃত মুসলমানের গুণ হিসাবে অভিহিত করেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00