📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মুসলমানদের জীবনে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রভাব

📄 মুসলমানদের জীবনে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রভাব


এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ইমানের অন্যতম শর্ত। এ ভালোবাসা তাদের জান্নাতের পথ ধরিয়ে দেয়।
হাদিসটি আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَفَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
'সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মাঝে ইমান থাকবে। আর তোমাদের মাঝে ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) ইমান আসবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন আমল বলে দেবো না, যা করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (সে বিষয়টা হলো,) তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার করো।'২৮৪
রাসুলুল্লাহ তাঁর আল্লহপ্রদত্ত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, মুসলমানদের অন্তরসমূহ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণার কদর্য বের করতে হলে তাদের মাঝে সত্যিকার ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে। এ ভ্রাতৃত্ব একদিকে তাদের মনে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য, পারস্পরিক কল্যাণকামিতা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করবে; অপরদিকে মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতা দূর করে দেবে। এজন্য তিনি তাদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর নির্দেশ দেন।
রাসুলুল্লাহ অনেকবার, অসংখ্যবার এ বিষয়টির প্রতি সাহাবিদের উৎসাহ দিয়েছেন, যেন তাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বদ্ধমূল হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এ ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ একটি সোনালি প্রজন্ম তৈরি করে যান, যারা আসমানের বার্তা জমিনের আনাচে- কানাচে যথাযথভাবে পৌঁছে দেন।
যদি তাদের অন্তরে এ পবিত্র ভালোবাসা না থাকত, তাহলে জিহাদের ময়দানে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এমন দৃষ্টান্তহীন রক্ত ঝরানো ও প্রাণ উৎসর্গ করা তাদের পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব হতো না। তাদের মাঝে এমন বিস্ময়কর সত্য ভালোবাসা ছিল বলেই রাসুলুল্লাহ মানব-ইতিহাসের পাতায় এমন একদল মানুষের অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যারা ছিলেন একটি প্রাসাদের ন্যায়, একটি দেহের মতো। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ তাদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :
الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
'মুমিন মুমিনের জন্য ভবনের কাঠামোস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। '২৮৫
অপর এক হাদিসে তিনি বলেন:
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ، وَتَرَاحُمِهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌّ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
'পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দয়া প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সকল মুমিন এক দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়। ২৮৬
অন্য হাদিসে বলেন:
الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ، اشْتَكَى كُلُّهُ، وَإِنِ اشْتَكَى، رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ 'সকল মুসলমান একজন ব্যক্তির মতো, যার চোখ বা মাথায় ব্যথা আসলে পুরো শরীর সে ব্যথা অনুভব করে।'২৮৭
রাসুলুল্লাহ -এর এ সকল হাদিস ও নির্দেশনা জানার পর প্রকৃত মুসলমানের অন্তর মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যে ভরপুর হয়ে যায়। ফলে সে পৃথিবীতে কল্যাণ ও মঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হয়ে ওঠে। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাকে ভালোবাসেন।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে না

📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে না


প্রকৃত মুসলমান জানে, ইসলাম যেভাবে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের প্রতি আহবান জানিয়েছে; সেভাবে শত্রুতা, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও একে অপরকে পরিত্যাগ করা হারাম করেছে। ইসলাম এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যে দুব্যক্তি পরস্পরকে সত্যিকারার্থে ভালোবাসে, ছোটোখাটো ভুলত্রুটি তাদের ভালোবাসায় চিড় ধরাতে পারে না। কেননা, আল্লাহর জন্য ভালোবাসার বন্ধন কোনো একজনের গুনাহের কারণে ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো নড়বড়ে নয়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: مَا تَوادَّ اثنان في اللهِ جَلَّ وعز أو في الإسلامِ فَيُفَرِقَ بَينَهُمَا أَوَّل ذَنبٍ يَحدِثه أَحدُهُمَا
'যে দুজনের পারস্পরিক ভালোবাসা তাদের কোনো একজন থেকে সংঘটিত প্রথম গুনাহের কারণে ছিন্ন হয়ে যায়, তাদের ভালোবাসা আল্লাহ বা ইসলামের জন্য ছিল না।'২৮৮
ইসলাম মানুষের মানবিক স্বভাব সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত। ইসলাম জানে, মানুষের মনে রাগ ও মান-অভিমান আসাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তাই অভিমান ও রাগের আগুন নিভিয়ে ফেলার একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ সময়সীমার ভেতর ঝগড়াকারীদ্বয়ের কোনো একজন বা উভয়জন অগ্রসর হয়ে বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর রাগ করে থাকা হারাম।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ، يَلْتَقِيَانِ: فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلَامِ
'কোনো মুসলমান ব্যক্তির জন্য অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের অধিক রাগ করে কথা না বলে থাকা এবং সাক্ষাৎ হলে একজন এদিকে অপরজন ওদিকে তাকিয়ে থাকা বৈধ নয়। আর তাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম, যে প্রথমে সালাম দেয়।'২৮৯
প্রকৃত মুসলমান অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে রাগ করে কথা না বলে থাকতে পারে না। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলেই থাকুক, সে তাকে সালাম দিয়ে বিবাদ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কেননা, দুই বিবাদকারীর মধ্যে সেই উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে বিবাদের মীমাংসা করে ফেলে। এবার অপর ভাই যদি সালামের উত্তর দেয়, তাহলে মীমাংসা করার সাওয়াবে উভয়জন শরিক হবে। আর যদি সালামের উত্তর না দেয়, তাহলে প্রথমজন সম্পর্ক ছিন্ন করা ও রাগ করে কথা না বলে থাকার পাপ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু যে সালামের উত্তর দেয়নি, সে একাই গুনাহগার থাকবে।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ এসেছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ مُؤْمِنًا فَوْقَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ، فَإِذَا مَرَّتْ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ فَلْيَلْقَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ، فَإِنْ رَدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ فَقَدِ اشْتَرَكَا فِي الْأَجْرِ، وَإِنْ لَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ فَقَدْ بَرِئَ الْمُسْلِمُ مِنَ الْهِجْرَةِ
'কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো মুমিনের সাথে তিন দিনের অধিক সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা বৈধ নয়। তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেলে তার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে সালাম করবে। যদি সালামের উত্তর দেয়, তাহলে উভয়জন সাওয়াবের মধ্যে শরিক হবে। আর যদি সালামের উত্তর না দেয়, তবে প্রথমজন সম্পর্ক ছিন্ন করার পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।'২৯০
মোটকথা, তিন দিনের অধিক কোনো মুসলমানের সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে থাকা বৈধ নয়। তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব মীমাংসা করে নিতে হবে। অন্যথায় সময় যত বৃদ্ধি পাবে, পাপের বোঝাও তত ভারী হতে থাকবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ هَجَرَ أَخَاهُ سَنَةً فَهُوَ كَسَفْكِ دَمِهِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাথে এক বছর সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকল, সে যেন তাকে হত্যা করল।'২৯১
ইসলাম ধর্মে মুসলমানদের তারবিয়াতের ভিত্তি পারস্পরিক ভালোবাসা, নৈকট্য ও হৃদ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে মুসলমানদের প্রতি কোনোরূপ শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণাবোধ থাকে না। তার ভেতর এসব খারাপ গুণাবলি থাকবেই বা কীভাবে, যখন রাসুলুল্লাহ-এর নিম্নোক্ত বাণীগুলো তার কানে বাজতে থাকে!
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا تَقَاطَعُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَكُونُوا إِخْوَانًا كَمَا أَمَرَكُمُ اللهُ
'তোমরা একে অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না, শত্রুতা কোরো না, বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পরে হিংসা কোরো না; বরং আল্লাহ তাআলার নির্দেশমাফিক পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও।'২৯২
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ، وَلَا تَحَسَّسُوا، وَلَا تَجَسَّسُوا، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
'তোমরা অবশ্যই কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা বলা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াবে না, গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হবে না, কান কথা বলবে না, পরস্পরে হিংসা করবে না, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষভাব রাখবে না এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না; বরং আল্লাহর বান্দা হয়ে সবাই ভাই-ভাই হয়ে থাকবে।'২৯৩
আরেক হাদিসে তিনি বলেন:
لَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَنَاجَشُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ، وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ، دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ
‘তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করবে না, ধোঁকা দেবে না, বিদ্বেষ পোষণ করবে না, শত্রুতা করবে না এবং একজনের বেচা- কেনার প্রস্তাবের ওপর আরেকজন প্রস্তাব করবে না; বরং সকলে আল্লাহর বান্দা ও ভাই-ভাই হয়ে থাকবে। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, (বিপদে) একা ফেলে যায় না এবং তাকে অবজ্ঞা করে না। এ ছাড়া তিনবার বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, তাকওয়া এখানে (অর্থাৎ এ সবকিছু সুষ্ঠুভাবে করার জন্য অন্তরে তাকওয়া থাকতে হবে)। কোনো ব্যক্তি খারাপ হওয়ার জন্য তার কোনো মুসলমান ভাইকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছজ্ঞান করাই যথেষ্ট। এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জানমাল ও মান-সম্মান (বিনষ্ট করা) হারাম।'২৯৪
যে মুসলমান রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসগুলো নিয়ে চিন্তা করে, যা সকল উত্তম চরিত্র ও উন্নত গুণকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে, তার মাঝে কখনো মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকতে পারে না। তবে হ্যাঁ, কারও অন্তরে যদি রোগ থাকে, স্বভাবে যদি রূঢ়তা থাকে, মেজাজে যদি বক্রতা থাকে, তবে তার কথা ভিন্ন।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ইসলামি চরিত্র ও উদারতা-বিবর্জিত এসব রুক্ষ ও কঠোর স্বভাবের লোকদের আখিরাতে তাদের কঠোর অবস্থার কথা জানিয়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, যদি তারা নিজেদের স্বভাব অনুযায়ী কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতার ওপর অটল থাকে, তাহলে আখিরাতে তারা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকবে, জান্নাতের দরজাসমূহ তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে :
تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَيَوْمَ الْخَمِيسِ، فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا، إِلَّا رَجُلًا كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ، فَيُقَالُ: أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا
‘সোমবার ও বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর শিরক করে না এমন সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্তরে তার ভাইয়ের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ আছে, তাকে ক্ষমা করা হয় না। তখন এ কথা বলা হয় যে, এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে। এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে। এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে।'২৯৫
আবু দারদা বলেন:
أَلَا أُحَدِّثُكُمْ بِمَا هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الصَّدَقَةِ وَالصِّيَامِ؟ صَلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ، أَلَا وَإِنَّ الْبُغْضَةَ هِيَ الْحَالِقَةُ
‘আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে বলব না, যা সদকা দেওয়া ও রোজা রাখার চেয়েও উত্তম? তা হলো, পারস্পরিক বিদ্বেষভাব ও শত্রুতা মিটমাট করে ফেলা। জেনে রেখো, (মুসলমানের প্রতি) শত্রুতা ও বিদ্বেষ দ্বীনকে মুণ্ডন করে দেয়।'২৯৬
আবু দারদা তাঁর দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ও চিন্তার প্রখরতার কারণে রাসুলুল্লাহ -এর ভরসার পাত্র ছিলেন। তিনি ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন ইসলামের গভীরে দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছেন, কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করলে তাদের আমল ধ্বংস হয়ে যায়, প্রতিদান বিনষ্ট হয়ে যায় এবং আমলনামা থেকে সাওয়াব মুছে যায়। এজন্যই তিনি বলেছেন, মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা মিটিয়ে ফেলা সদকা করা ও রোজা রাখার চেয়েও উত্তম। কেননা, সে যদি সম্পর্কহীনতা, রাগ, হিংসা ও শত্রুতার ওপর অটল থাকে, তাহলে শুধু সদকা আর রোজা কেন, কোনো আমলের সাওয়াবই তো তার আমলনামায় স্থায়ী হতে পারবে না।
তবে আবু দারদা কথাটি নিছক নিজের গবেষণা থেকে বলেননি; বরং রাসুলুল্লাহ-এর হাদিস থেকেই বলেছেন। হাদিসটি সুনানে তিরমিজিতে তাঁরই সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ، قَالُوا: bَلَى، قَالَ: «صَلَاحُ ذَاتِ البَيْنِ، فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ البَيْنِ هِيَ الحَالِقَةُ»: «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَيُرْوَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «هِيَ الحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ، وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ»
'আমি কি এমন এক আমলের ব্যাপারে তোমাদের বলব, যা রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে উত্তম? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, হিংসা-বিদ্বেষ মিটিয়ে ফেলা। কেননা, হিংসা-বিদ্বেষ হলো মুণ্ডনকারী (ধ্বংসকারী)। ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন। নবিজি থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বললেন, এটা (অর্থাৎ হিংসা-বিদ্বেষ) মুণ্ডনকারী। তবে আমি মাথা মুণ্ডানোর কথা বলছি না; বরং দ্বীন মুণ্ডিয়ে ফেলার কথা বলছি। '২৯৭

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের প্রতি উদার এবং দোষত্রুটি ক্ষমা করে দেয়

📄 তাদের প্রতি উদার এবং দোষত্রুটি ক্ষমা করে দেয়


প্রকৃত মুসলমানের মনে কোনো মুসলমান ভাইয়ের প্রতি যদি রাগ আসে, তখন রাগ সংবরণ করে ফেলে এবং তাকে দ্রুত ক্ষমা করে দেয়। এতে সে কোনোরূপ অসম্মান ও লজ্জা অনুভব করে না; বরং এটাকে ইহসান বা বিশেষ সৎকর্ম মনে করে, যা বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে এবং তাঁর বিশেষ ভালোবাসার যোগ্য করে তোলে। আর এটা একমাত্র তিনি ইহসানকারীদের বা বিশেষ সৎকর্মশীলদেরই দান করে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
'যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, (তারা সৎকর্মশীল)। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '২৯৮
অনেক সময় মানুষ রাগকে তো সংবরণ করে ফেলে, কিন্তু হিংসা-বিদ্বেষের কড়াই তার বক্ষে টগবগ করে ফুটতে থাকে। অতঃপর তা পরিণত হয় চরম শত্রুতায়। প্রকাশ্য রাগ পরিণত হয় গোপন বিদ্বেষে। অথচ শত্রুতা ও হিংসা- বিদ্বেষের চেয়ে রাগ অনেক ভালো ও পবিত্র। তবে প্রকৃত মুসলমান রাগ সংবরণ করার সাথে সাথে তাকে ক্ষমাও করে দেয়। ফলে তার ভেতর হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা বাসা বাঁধতে পারে না। এভাবে সে ইহসানকারীদের দলভুক্ত হয়ে যায়।
রাগ যখন সংবরণ করা হয়, তখন মনের ওপর সেটাকে ভারী বোঝা মনে হয় এবং রাগের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মনের ভেতরটাকে পুড়িয়ে ফেলতে থাকে। কিন্তু রাগ সংবরণ করার সাথে সাথে মন থেকে ক্ষমা করে দেওয়া হলে সে বোঝা হালকা হয়ে আসে এবং অন্তর ঠান্ডা ও প্রশান্ত হয়ে যায়। এটাই ইহসান বা বিশেষ সৎকর্ম, যা মুসলমান তার ভাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে করে থাকে।
প্রকৃত মুসলমান অপর মুসলমান ভাইকে ক্ষমা করে দেয়। কেননা, এটা প্রকৃত অর্থে তার প্রতি বিনয় প্রদর্শন, যার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা সম্মান ও মর্যাদা দান করেন।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
وَمَا زَادَ اللهُ عَبْدًا بِعَفْمٍ، إِلَّا عِزًّا، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ
'কেউ কাউকে ক্ষমা করে দিলে তার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং কেউ কারও প্রতি আল্লাহর জন্য বিনয় প্রদর্শন করলে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। '২৯৯
ক্ষমা করা ও বিনয় প্রদর্শন করা আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান ও মর্যাদা লাভের উপায়। এ দুই বিষয়ও সে ইহসানের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা উদার ও ক্ষমাশীল মুসলমানদের গুণ হিসাবে অভিহিত করেছেন। এখান থেকে প্রতীয়মান হয়, কেউ রাগ সংবরণ করার পর ক্ষমা করে দিলে সে ইহসানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যাদের আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন এবং এমন সম্মানিত লোকদের দলভুক্ত হয়ে যায়, যাদের লোকজন ভালোবাসে।
প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। কারণ, আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার জন্য অন্যকে ক্ষমা করা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে অন্তর পরিচ্ছন্ন থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সে জানে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
ثَلَاثُ مَنْ لَمْ يَكُنَّ فِيهِ، غُفِرَ لَهُ مَا سِوَاهُ لِمَنْ شَاءَ، مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَمْ يَكُنْ سَاحِرًا يَتَّبِعُ السَّحَرَةَ، وَلَمْ يَحْقِدْ عَلَى أَخِيهِ
'তিনটা গুনাহ যার মধ্যে না থাকবে, তার অন্যান্য গুনাহ আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এক. যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহর সাথে শিরক করত না। দুই. যে ব্যক্তি জাদুকর ছিল না এবং জাদুর অনুসরণ করত না। তিন. যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত না।'৩০০

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 দেখা-সাক্ষাৎ করার সময় হাস্যমুখ থাকে

📄 দেখা-সাক্ষাৎ করার সময় হাস্যমুখ থাকে


উল্লিখিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি মুসলমানকে সাদা মনের মানুষ হতে হয়, যে খোলামনে ও হাসিমুখে ভাই-বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এটার প্রতি উৎসাহিত করে বলেন: لَا تَحْقِرَنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ شَيْئًا، وَلَوْ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهِ طَلْقٍ
‘কোনো উত্তম আমলকে তুচ্ছ মনে কোরো না; যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার মতো (ছোট আমল) হোক। '৩০১
সদা হাস্যমুখ থাকা এমন একটি গুণ, যার প্রতি ইসলাম উৎসাহিত করেছে এবং সেটাকে অন্যতম নেক আমল বলা হয়েছে; যার জন্য সাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া হবে। এর কারণ হলো, মুখের হাসি অন্তরের পরিচ্ছন্নতার বার্তা দেয়। আর অন্তর পরিচ্ছন্ন থাকা কত বড় গুণ, তা তো একটু আগেই আমরা আলোচনা করে আসলাম। এজন্য রাসুলুল্লাহ মুখে হাসি রাখার প্রতি লোকদের খুব উৎসাহিত করতেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ
'তোমার ভাইয়ের সামনে মুচকি হাসা তোমার জন্য একটি সদকা। '৩০২
রাসুলুল্লাহ সাহাবিদের সামনে সব সময় হাসিমুখে থাকতেন। কারও দিকে তাকালে তাকে একটি মুচকি হাসি উপহার দিতেন। এ সম্পর্কে সহিহাইনে জারির বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি বলেন: مَا حَجَبَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ أَسْلَمْتُ، وَلَا رَآنِي إِلَّا تَبَسَّمَ
'আমি যখনই রাসুলুল্লাহ -কে সালাম দিয়েছি, কোনোবারেই তিনি আমাকে জবাব না দিয়ে থাকেননি। আর আমাকে দেখে সর্বদাই তিনি মুচকি হাসি উপহার দিতেন।'৩০৩
আলি বলেন, 'যখন দুজন মুসলমান একত্র হয়ে আলাপ-আলোচনা করে, তখন উভয়ের মধ্যে যে হাসিমুখে কথা বলে, তাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন।'
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম — যাদের অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ -এর নির্দেশনা জীবন্ত ছিল — একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করলে মুসাফাহা করতেন এবং কোনো সফর থেকে ফিরলে আলিঙ্গন করতেন। কেননা, এতে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়।
ইবনে সাদ (রাঃ) তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে ইমাম শাবি (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন খাইবার থেকে ফিরে আসলেন, তখন জাফর বিন আবি তালিব (রাঃ) তাঁর সাথে দেখা করলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং দুচোখের মাঝখানে চুম্বন করলেন। অতঃপর বললেন, আমি বুঝতে পারছি না, কী কারণে আমি এত আনন্দিত? জাফর ফিরে আসার কারণে, নাকি খাইবার বিজয়ের কারণে? আরেক রিওয়ায়াতে এসেছে, তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং আলিঙ্গন করলেন।
মুসলমানদের পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় সালাম দেওয়া, মুসাফাহা করা ও আলিঙ্গন করা ইসলামে পছন্দনীয়। কেননা, এর মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য অক্ষুণ্ণ থাকে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় ও মজবুত হয়। ফলে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা এবং মুসলমানদের মাঝে ইসলামের সকল বিধান বাস্তবায়ন করা সহজ হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00