📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 আল্লাহর জন্য তাদের ভালোবাসে

📄 আল্লাহর জন্য তাদের ভালোবাসে


প্রকৃত মুসলমানের অন্যতম মহান গুণ হলো, ভাই-বন্ধুদের প্রতি আন্তরিক, নির্ভেজাল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এ ভালোবাসাকেই সত্যিকারের ভ্রাতৃত্ব বলা হয়, যার বর্ণনা কুরআন ও হাদিসে এসেছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাসে এ সম্পর্কের প্রভাব অনন্য। এ সম্পর্ক জাতি-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে এক মুসলমানের সাথে অপর মুসলমানের সম্পর্ক। এ সম্পর্কের ভিত্তি ইমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন।
আল্লাহ তাআলা বলেন : إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ 'মুমিনরা পরস্পর ভাই-ভাই।'২৭৩
আর ইমানি ভ্রাতৃত্ব রক্ত ও মনের সকল সম্পর্কের চেয়ে দৃঢ় ও শক্তিশালী।
তাই এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, এ অনন্য ভ্রাতৃত্ব মুসলমানদের মনে এমন এক ভালোবাসা সৃষ্টি করে, যার উচ্চতা, স্বচ্ছতা, গভীরতা ও স্থায়িত্ব রীতিমতো বিস্ময়কর। ইসলাম এ ভালোবাসার নাম দিয়েছে 'আল্লাহর জন্য ভালোবাসা'। প্রকৃত মুসলমান এ ভালোবাসার মাঝে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করে।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে: ثَلَاثُ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ 'তিনটি বিষয় যে ব্যক্তির মাঝে থাকবে, সে ইমানের স্বাদ পাবে। এক. আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তার নিকট অন্য সবার চেয়ে অধিক প্রিয়তর হওয়া। দুই. কোনো ব্যক্তিকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা। তিন. কুফর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমনভাবে অপছন্দ করা, যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে। '২৭৪

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর মহব্বতকারীদের মর্যাদা

📄 আল্লাহর জন্য পরস্পর মহব্বতকারীদের মর্যাদা


যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের উচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদিসে তাদের উচ্চ মর্যাদার চিত্র আঁকা হয়েছে, যা আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জান্নাতে তৈরি করে রেখেছেন এবং এমন মহান নিয়ামতের কথা উল্লেখ হয়েছে, যা কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দান করবেন।
তন্মধ্যে একটি হাদিস হলো 'সাত ব্যক্তির হাদিস', যে হাদিসে এমন সাত শ্রেণির লোকের কথা বর্ণিত হয়েছে, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন।
সে সাত শ্রেণির লোক হলো :
إِمَامُ عَدْلُ ، وَشَابٌ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقُ فِي المَسَاجِدِ، وَرَجُلَانِ تَحَابًا فِي اللهِ ، اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ دَعَتْهُ امْرَأَةُ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ: إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ، وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا، فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ
এক. ন্যায়পরায়ণ বাদশা; দুই. সে যুবক, যে আল্লাহর ইবাদত করে তার যৌবন অতিবাহিত করে; তিন. সে ব্যক্তি, যার কলব মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে; চার. এমন দুই ব্যক্তি, যারা পরস্পরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে; পাঁচ. সে ব্যক্তি, যাকে কোনো সুন্দরী রমণী খারাপ কাজের প্রতি আহ্বান করেছে, আর সে 'আমি আল্লাহকে ভয় করি' বলে তার ডাকে সাড়া দেয়নি; ছয়. সে ব্যক্তি, যে গোপনে সদকা করে, এমনকি তার ডান হাত যা দান করে, সে সম্পর্কে তার বাম হাতেরও ধারণা থাকে না; সাত. এমন ব্যক্তি, যে একাকিত্বের মুহূর্তে আল্লাহর জিকির করে চোখের অশ্রু ঝরায়। ২৭৫
এ হাদিসে আল্লাহর জন্য পরস্পর মহব্বতকারীদের সেই বাছাই করা সাত শ্রেণির লোকের দলভুক্ত করা হয়েছে, যাদের আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ছায়াতলে স্থান দেবেন এবং দয়া ও করুণার চাদরে জড়িয়ে নেবেন। একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় মর্যাদা ও সম্মান আর কী হতে পারে?
শুধু তাই নয়, কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য মহব্বতকারীদের প্রতি আলাদা মনোযোগ দেবেন। সেদিন তিনি বলবেন, أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي 'আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের জন্য পরস্পর মহব্বতকারীরা কোথায়? আজকের এ দিনে-যেদিন আমার (আরশের) ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই-আমি আমার (আরশের) ছায়াতলে তাদের স্থান দেবো।'২৭৬
কিয়ামতের কঠিনতম ভয়াবহ দিনে এর চেয়ে উত্তম পুরস্কার ও উচ্চ মর্যাদা আর কী হতে পারে, যা আল্লাহর জন্য একে অপরকে মহব্বতকারীরা পাবে!?
এর কারণ হলো, একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা-যে ভালোবাসায় পার্থিব কোনো স্বার্থ থাকে না-অনেক কঠিন এক বিষয়। এটা শুধু তাদের পক্ষেই সম্ভব, যাদের অন্তর স্বচ্ছ ও পরিশুদ্ধ, যাদের নিকট আল্লাহর সন্তুষ্টির তুলনায় দুনিয়া অতি তুচ্ছ। কাজেই এমন লোকদের জন্য ঈর্ষনীয় মর্যাদা ও পুরস্কার থাকতেই পারে। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
মুআজ বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : الْمُتَحَابُّونَ فِي جَلَالِي لَهُمْ مَنَابِرُ مِنْ نُورٍ يَغْبِطُهُمُ النَّبِيُّونَ وَالشُّهَدَاءُ
'আমার জন্য যারা পরস্পরকে ভালোবাসে, তাদের জন্য নুরের মিম্বর থাকবে, যা দেখে নবিগণ ও শহিদগণ পর্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়বেন।'২৭৭
শুধু এতটুকুই নয়; বরং আল্লাহ তাআলা এর চেয়েও অনেক বড় নিয়ামত তাদের দান করবেন। তা হচ্ছে, স্বয়ং তিনিই তাদের ভালোবাসবেন! আবু হুরাইরা -এর হাদিসে এ মহান পুরস্কারের কথা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ বলেন:
أَنَّ رَجُلًا زَارَ أَخَا لَهُ فِي قَرْيَةٍ أُخْرَى، فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ، عَلَى مَدْرَجَتِهِ، مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ، قَالَ: أَيْنَ تُرِيدُ؟ قَالَ: أُرِيدُ أَنَّا لِي فِي هَذِهِ الْقَرْيَةِ، قَالَ : هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا؟ قَالَ: لَا ، غَيْرَ أَنِّي أَحْبَبْتُهُ في اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، قَالَ: فَإِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ
'এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য অপর এক গ্রামে গেলেন। তার যাত্রাপথে আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতাকে দাঁড় করে দিলেন। যখন ওই ব্যক্তি সেই ফেরেশতার কাছে পৌঁছলেন, তখন তিনি বললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? লোকটি উত্তর দিলেন, এ গ্রামে আমার এক ভাই আছে, তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। ফেরেশতা বললেন, তোমার ওপর কি তার কোনো অবদান রয়েছে, যার কারণে তুমি তার নিকট যাচ্ছ? লোকটি উত্তর দিলেন, আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি, এ ছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই। তখন ফেরেশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এ মর্মে তোমাকে অবহিত করার জন্য দূত হয়ে এসেছি যে, তুমি যেরূপ ওই লোকটিকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসো, আল্লাহও অনুরূপ তোমাকে ভালোবাসেন।'২৭৮
কত মহান সে ভালোবাসা, যে ভালোবাসার পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হয়! এ ভালোবাসা যার যত গভীর, সে তত উত্তম। হাদিস শরিফে এমনটাই এসেছে।
রাসুলুল্লাহ বলেছেন: مَا تَحَابًا الرَّجُلَانِ إِلَّا كَانَ أَفْضَلُهُمَا أَشَدَّهُمَا حُبًّا لِصَاحِبِهِ
'যে দুই ব্যক্তি একে অপরকে ভালোবাসে, তাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যার ভালোবাসা বেশি গভীর। '২৭৯
কাউকে ভালোবাসলে সেটা তাকে জানিয়ে দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে ভালোবাসার প্রসার ঘটবে, যা ইসলামি সমাজের জন্য খুবই ইতিবাচক।
এজন্য রাসুলুল্লাহ বলেছেন: إِذَا أَحَبَّ الرَّجُلُ أَخَاهُ فَلْيُخْبِرْهُ أَنَّهُ يُحِبُّهُ
'কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে ভালোবাসে, সে যেন তাকে ভালোবাসার কথা বলে দেয়। '২৮০
রাসুলুল্লাহ অনুধাবন করেছিলেন, সুষ্ঠু সমাজ ও উম্মাহ গঠনে স্বার্থহীন এ ভালোবাসা খুব ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাই তিনি সুযোগ পেলেই পরস্পর ভালোবাসার প্রতি মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং ভালোবাসার ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। যেন হৃদয়সমূহের বদ্ধ দুয়ার খুলে যায় এবং পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয়।
এ সম্পর্কে আনাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :
أَنَّ رَجُلًا كَانَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَرَّ بِهِ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي لَأُحِبُّ هَذَا، فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَعْلَمْتَهُ؟» قَالَ: «لَا»، قَالَ: «أَعْلِمْهُ» قَالَ: فَلَحِقَهُ، فَقَالَ: «إِنِّي أُحِبُّكَ فِي اللهِ»، فَقَالَ: «أَحَبَّكَ الَّذِي أَحْبَبْتَنِي لَهُ
'এক ব্যক্তি নবিজি -এর নিকট ছিলেন। তার পাশ দিয়ে আরেকজন ব্যক্তি চলে গেলেন। তখন তিনি (পাশে থাকা ব্যক্তি) নবিজি -কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ওই ব্যক্তিকে (পাশ দিয়ে যিনি চলে গেলেন) আমি ভীষণ ভালোবাসি। নবিজি বললেন, ভালোবাসার কথা তাকে বলেছ? তিনি বললেন, না। তখন নবিজি বললেন, তাকে জানিয়ে দাও যে, তুমি তাকে ভালোবাসো। তখন তিনি তার কাছে গিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর জন্য আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। তিনি উত্তর দিলেন, দুআ করি, যে আল্লাহর জন্য তুমি আমাকে ভালোবাসো, সে আল্লাহও যেন তোমাকে ভালোবাসেন। '২৮১
ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির সমাজ বিনির্মাণের জন্য রাসুলুল্লাহ নিজেও সাহাবিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেন। সে ধারাবাহিকতায় একদিন তিনি মুআজ -এর হাত ধরে বললেন :
يَا مُعَاذُ، وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ، وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ، فَقَالَ: أُوصِيكَ يَا مُعَاذُ لَا تَدَعَنَّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ تَقُولُ: اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
'হে মুআজ, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর তোমাকে নসিহত করছি, তুমি প্রতি (ফরজ) নামাজের পর অবশ্যই বলবে, হে আল্লাহ, আমাকে আপনার জিকির, শোকর ও উত্তম ইবাদত করতে সহযোগিতা করুন।'২৮২
মুআজ এ পবিত্র ভালোবাসার সৌরভ সকল দেশের মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দিলেন। সবাইকে জানিয়ে দিলেন যে, একে অপরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে এমন مسلمانوں জন্য আল্লাহ তাআলা অনেক বড় সাওয়াব ও পুরস্কার রেখেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো, আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা।
এ সম্পর্কে ইমাম মালিক তার মুয়াত্তা গ্রন্থে সহিহ সনদে আবু ইদরিস খাওলানি থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন :
دَخَلْتُ مَسْجِدَ دِمَشْقَ فَإِذَا فَتًى شَابٌ بَرَّاقُ الثَّنَايَا، وَإِذَا النَّاسُ مَعَهُ إِذَا اخْتَلَفُوا فِي شَيْءٍ أَسْنَدُوا إِلَيْهِ، وَصَدَرُوا عَنْ قَوْلِهِ، فَسَأَلْتُ عَنْهُ، فَقِيلَ هَذَا مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ، فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ هَجَرْتُ فَوَجَدْتُهُ قَدْ سَبَقَنِي بالتهجيرِ، وَوَجَدْتُهُ يُصَلِّي، قَالَ: فَانْتَظَرْتُهُ حَتَّى قَضَى صَلَاتَهُ، ثُمَّ جِئْتُهُ مِنْ قِبَلِ وَجْهِهِ، فَسَلَّمْتُ عَلَيْهِ، ثُمَّ قُلْتُ: وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ لِلَّهِ، فَقَالَ: اللَّهِ؟ فَقُلْتُ: اللهِ، فَقَالَ: اللهِ؟ فَقُلْتُ: اللهِ، فَقَالَ: اللَّهِ؟ فَقُلْتُ: اللهِ. قَالَ: فَأَخَذَ بِحُبْوَةِ رِدَائِي فَجَبَذَنِي إِلَيْهِ، وَقَالَ: أَبْشِرْ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: قَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَايِّينَ فِيَّ، وَالْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ، وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِي، وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِي
'আমি দামেশকের মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে এক যুবককে দেখলাম, তার দাঁতগুলো অতিউজ্জ্বল সাদা (মুক্তার মতো)। তার সঙ্গে অনেক মানুষ আছে। যখনই কোনো ব্যাপারে মতবিরোধ হচ্ছে, সে যুবকের কথাকেই নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হচ্ছে এবং তার কথাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিবেচিত হচ্ছে। আমি লোকদের কাছে জানতে চাইলাম যুবকটি কে? তারা বলল, তিনি মুআজ বিন জাবাল। পরদিন ভোরে আমি মসজিদে গিয়ে দেখলাম, তিনি আমার পূর্বেই সেখানে গিয়ে নামাজ পড়ছেন। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। নামাজ শেষ হলে আমি তার সামনে গেলাম। তারপর তাকে সালাম করে বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। তিনি বললেন, আল্লাহরই জন্য? আমি বললাম, জি, আল্লাহরই জন্য। তিনি আবার বললেন, আল্লাহরই জন্য? আমি বললাম, জি, আল্লাহরই জন্য। অতঃপর তিনি আমার চাদরের এক কোনা ধরে নিজের দিকে টেনে নিলেন এবং বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ করো। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ভালোবাসা সেই সকল লোকের জন্য ওয়াজিব, যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, আমারই জন্য একে অপরের সাথে বসে, আমারই জন্য পরস্পর সাক্ষাৎ করে এবং আমারই জন্য একজন অন্যজনের জন্য খরচ করে।'২৮৩

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মুসলমানদের জীবনে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রভাব

📄 মুসলমানদের জীবনে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার প্রভাব


এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ইমানের অন্যতম শর্ত। এ ভালোবাসা তাদের জান্নাতের পথ ধরিয়ে দেয়।
হাদিসটি আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا، وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا، أَفَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى أَمْرٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
'সেই সত্তার শপথ করে বলছি, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মাঝে ইমান থাকবে। আর তোমাদের মাঝে ততক্ষণ পর্যন্ত (পরিপূর্ণ) ইমান আসবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন আমল বলে দেবো না, যা করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? (সে বিষয়টা হলো,) তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার করো।'২৮৪
রাসুলুল্লাহ তাঁর আল্লহপ্রদত্ত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, মুসলমানদের অন্তরসমূহ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণার কদর্য বের করতে হলে তাদের মাঝে সত্যিকার ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে। এ ভ্রাতৃত্ব একদিকে তাদের মনে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য, পারস্পরিক কল্যাণকামিতা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করবে; অপরদিকে মন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতা দূর করে দেবে। এজন্য তিনি তাদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর নির্দেশ দেন।
রাসুলুল্লাহ অনেকবার, অসংখ্যবার এ বিষয়টির প্রতি সাহাবিদের উৎসাহ দিয়েছেন, যেন তাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বদ্ধমূল হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে এ ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করেই রাসুলুল্লাহ একটি সোনালি প্রজন্ম তৈরি করে যান, যারা আসমানের বার্তা জমিনের আনাচে- কানাচে যথাযথভাবে পৌঁছে দেন।
যদি তাদের অন্তরে এ পবিত্র ভালোবাসা না থাকত, তাহলে জিহাদের ময়দানে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এমন দৃষ্টান্তহীন রক্ত ঝরানো ও প্রাণ উৎসর্গ করা তাদের পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব হতো না। তাদের মাঝে এমন বিস্ময়কর সত্য ভালোবাসা ছিল বলেই রাসুলুল্লাহ মানব-ইতিহাসের পাতায় এমন একদল মানুষের অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যারা ছিলেন একটি প্রাসাদের ন্যায়, একটি দেহের মতো। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ তাদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে :
الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
'মুমিন মুমিনের জন্য ভবনের কাঠামোস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে। '২৮৫
অপর এক হাদিসে তিনি বলেন:
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ، وَتَرَاحُمِهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌّ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
'পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দয়া প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সকল মুমিন এক দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়। ২৮৬
অন্য হাদিসে বলেন:
الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ، اشْتَكَى كُلُّهُ، وَإِنِ اشْتَكَى، رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ 'সকল মুসলমান একজন ব্যক্তির মতো, যার চোখ বা মাথায় ব্যথা আসলে পুরো শরীর সে ব্যথা অনুভব করে।'২৮৭
রাসুলুল্লাহ -এর এ সকল হাদিস ও নির্দেশনা জানার পর প্রকৃত মুসলমানের অন্তর মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যে ভরপুর হয়ে যায়। ফলে সে পৃথিবীতে কল্যাণ ও মঙ্গলের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হয়ে ওঠে। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাকে ভালোবাসেন।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে না

📄 ভাই-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং তাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে না


প্রকৃত মুসলমান জানে, ইসলাম যেভাবে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের প্রতি আহবান জানিয়েছে; সেভাবে শত্রুতা, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও একে অপরকে পরিত্যাগ করা হারাম করেছে। ইসলাম এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যে দুব্যক্তি পরস্পরকে সত্যিকারার্থে ভালোবাসে, ছোটোখাটো ভুলত্রুটি তাদের ভালোবাসায় চিড় ধরাতে পারে না। কেননা, আল্লাহর জন্য ভালোবাসার বন্ধন কোনো একজনের গুনাহের কারণে ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো নড়বড়ে নয়।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: مَا تَوادَّ اثنان في اللهِ جَلَّ وعز أو في الإسلامِ فَيُفَرِقَ بَينَهُمَا أَوَّل ذَنبٍ يَحدِثه أَحدُهُمَا
'যে দুজনের পারস্পরিক ভালোবাসা তাদের কোনো একজন থেকে সংঘটিত প্রথম গুনাহের কারণে ছিন্ন হয়ে যায়, তাদের ভালোবাসা আল্লাহ বা ইসলামের জন্য ছিল না।'২৮৮
ইসলাম মানুষের মানবিক স্বভাব সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত। ইসলাম জানে, মানুষের মনে রাগ ও মান-অভিমান আসাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তাই অভিমান ও রাগের আগুন নিভিয়ে ফেলার একটা সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ সময়সীমার ভেতর ঝগড়াকারীদ্বয়ের কোনো একজন বা উভয়জন অগ্রসর হয়ে বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর রাগ করে থাকা হারাম।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ، يَلْتَقِيَانِ: فَيُعْرِضُ هَذَا وَيُعْرِضُ هَذَا، وَخَيْرُهُمَا الَّذِي يَبْدَأُ بِالسَّلَامِ
'কোনো মুসলমান ব্যক্তির জন্য অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে তিন দিনের অধিক রাগ করে কথা না বলে থাকা এবং সাক্ষাৎ হলে একজন এদিকে অপরজন ওদিকে তাকিয়ে থাকা বৈধ নয়। আর তাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম, যে প্রথমে সালাম দেয়।'২৮৯
প্রকৃত মুসলমান অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে রাগ করে কথা না বলে থাকতে পারে না। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলেই থাকুক, সে তাকে সালাম দিয়ে বিবাদ মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কেননা, দুই বিবাদকারীর মধ্যে সেই উত্তম, যে প্রথমে সালাম দিয়ে বিবাদের মীমাংসা করে ফেলে। এবার অপর ভাই যদি সালামের উত্তর দেয়, তাহলে মীমাংসা করার সাওয়াবে উভয়জন শরিক হবে। আর যদি সালামের উত্তর না দেয়, তাহলে প্রথমজন সম্পর্ক ছিন্ন করা ও রাগ করে কথা না বলে থাকার পাপ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু যে সালামের উত্তর দেয়নি, সে একাই গুনাহগার থাকবে।
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ এসেছে। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি:
لَا يَحِلُّ لِرَجُلٍ أَنْ يَهْجُرَ مُؤْمِنًا فَوْقَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ، فَإِذَا مَرَّتْ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ فَلْيَلْقَهُ فَلْيُسَلِّمْ عَلَيْهِ، فَإِنْ رَدَّ عَلَيْهِ السَّلَامَ فَقَدِ اشْتَرَكَا فِي الْأَجْرِ، وَإِنْ لَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ فَقَدْ بَرِئَ الْمُسْلِمُ مِنَ الْهِجْرَةِ
'কোনো ব্যক্তির জন্য কোনো মুমিনের সাথে তিন দিনের অধিক সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা বৈধ নয়। তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেলে তার সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে সালাম করবে। যদি সালামের উত্তর দেয়, তাহলে উভয়জন সাওয়াবের মধ্যে শরিক হবে। আর যদি সালামের উত্তর না দেয়, তবে প্রথমজন সম্পর্ক ছিন্ন করার পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।'২৯০
মোটকথা, তিন দিনের অধিক কোনো মুসলমানের সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে থাকা বৈধ নয়। তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব মীমাংসা করে নিতে হবে। অন্যথায় সময় যত বৃদ্ধি পাবে, পাপের বোঝাও তত ভারী হতে থাকবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَنْ هَجَرَ أَخَاهُ سَنَةً فَهُوَ كَسَفْكِ دَمِهِ
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সাথে এক বছর সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকল, সে যেন তাকে হত্যা করল।'২৯১
ইসলাম ধর্মে মুসলমানদের তারবিয়াতের ভিত্তি পারস্পরিক ভালোবাসা, নৈকট্য ও হৃদ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে মুসলমানদের প্রতি কোনোরূপ শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণাবোধ থাকে না। তার ভেতর এসব খারাপ গুণাবলি থাকবেই বা কীভাবে, যখন রাসুলুল্লাহ-এর নিম্নোক্ত বাণীগুলো তার কানে বাজতে থাকে!
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا تَقَاطَعُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا ، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَكُونُوا إِخْوَانًا كَمَا أَمَرَكُمُ اللهُ
'তোমরা একে অপরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না, শত্রুতা কোরো না, বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পরে হিংসা কোরো না; বরং আল্লাহ তাআলার নির্দেশমাফিক পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও।'২৯২
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الحَدِيثِ، وَلَا تَحَسَّسُوا، وَلَا تَجَسَّسُوا، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
'তোমরা অবশ্যই কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা বলা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা, কুধারণা ও অনুমাননির্ভর কথা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তোমরা অন্যের দোষ খুঁজে বেড়াবে না, গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হবে না, কান কথা বলবে না, পরস্পরে হিংসা করবে না, একে অপরের প্রতি বিদ্বেষভাব রাখবে না এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না; বরং আল্লাহর বান্দা হয়ে সবাই ভাই-ভাই হয়ে থাকবে।'২৯৩
আরেক হাদিসে তিনি বলেন:
لَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَنَاجَشُوا ، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ، وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَاهُنَا وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ، دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ
‘তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করবে না, ধোঁকা দেবে না, বিদ্বেষ পোষণ করবে না, শত্রুতা করবে না এবং একজনের বেচা- কেনার প্রস্তাবের ওপর আরেকজন প্রস্তাব করবে না; বরং সকলে আল্লাহর বান্দা ও ভাই-ভাই হয়ে থাকবে। এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, (বিপদে) একা ফেলে যায় না এবং তাকে অবজ্ঞা করে না। এ ছাড়া তিনবার বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, তাকওয়া এখানে (অর্থাৎ এ সবকিছু সুষ্ঠুভাবে করার জন্য অন্তরে তাকওয়া থাকতে হবে)। কোনো ব্যক্তি খারাপ হওয়ার জন্য তার কোনো মুসলমান ভাইকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছজ্ঞান করাই যথেষ্ট। এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের জানমাল ও মান-সম্মান (বিনষ্ট করা) হারাম।'২৯৪
যে মুসলমান রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসগুলো নিয়ে চিন্তা করে, যা সকল উত্তম চরিত্র ও উন্নত গুণকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে, তার মাঝে কখনো মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ থাকতে পারে না। তবে হ্যাঁ, কারও অন্তরে যদি রোগ থাকে, স্বভাবে যদি রূঢ়তা থাকে, মেজাজে যদি বক্রতা থাকে, তবে তার কথা ভিন্ন।
এজন্যই রাসুলুল্লাহ ইসলামি চরিত্র ও উদারতা-বিবর্জিত এসব রুক্ষ ও কঠোর স্বভাবের লোকদের আখিরাতে তাদের কঠোর অবস্থার কথা জানিয়ে দিয়ে সতর্ক করেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, যদি তারা নিজেদের স্বভাব অনুযায়ী কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতার ওপর অটল থাকে, তাহলে আখিরাতে তারা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকবে, জান্নাতের দরজাসমূহ তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে :
تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَيَوْمَ الْخَمِيسِ، فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكْ بِاللهِ شَيْئًا، إِلَّا رَجُلًا كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ، فَيُقَالُ: أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا
‘সোমবার ও বৃহস্পতিবারে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর শিরক করে না এমন সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু যে ব্যক্তির অন্তরে তার ভাইয়ের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ আছে, তাকে ক্ষমা করা হয় না। তখন এ কথা বলা হয় যে, এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে। এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে। এ দুজনের ক্ষমাকে মুলতবি রাখো, যতক্ষণ না তারা মীমাংসা করে ফেলে।'২৯৫
আবু দারদা বলেন:
أَلَا أُحَدِّثُكُمْ بِمَا هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الصَّدَقَةِ وَالصِّيَامِ؟ صَلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ، أَلَا وَإِنَّ الْبُغْضَةَ هِيَ الْحَالِقَةُ
‘আমি কি তোমাদের এমন বিষয় সম্পর্কে বলব না, যা সদকা দেওয়া ও রোজা রাখার চেয়েও উত্তম? তা হলো, পারস্পরিক বিদ্বেষভাব ও শত্রুতা মিটমাট করে ফেলা। জেনে রেখো, (মুসলমানের প্রতি) শত্রুতা ও বিদ্বেষ দ্বীনকে মুণ্ডন করে দেয়।'২৯৬
আবু দারদা তাঁর দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা ও চিন্তার প্রখরতার কারণে রাসুলুল্লাহ -এর ভরসার পাত্র ছিলেন। তিনি ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন ইসলামের গভীরে দৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছেন, কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করলে তাদের আমল ধ্বংস হয়ে যায়, প্রতিদান বিনষ্ট হয়ে যায় এবং আমলনামা থেকে সাওয়াব মুছে যায়। এজন্যই তিনি বলেছেন, মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা মিটিয়ে ফেলা সদকা করা ও রোজা রাখার চেয়েও উত্তম। কেননা, সে যদি সম্পর্কহীনতা, রাগ, হিংসা ও শত্রুতার ওপর অটল থাকে, তাহলে শুধু সদকা আর রোজা কেন, কোনো আমলের সাওয়াবই তো তার আমলনামায় স্থায়ী হতে পারবে না।
তবে আবু দারদা কথাটি নিছক নিজের গবেষণা থেকে বলেননি; বরং রাসুলুল্লাহ-এর হাদিস থেকেই বলেছেন। হাদিসটি সুনানে তিরমিজিতে তাঁরই সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ، قَالُوا: bَلَى، قَالَ: «صَلَاحُ ذَاتِ البَيْنِ، فَإِنَّ فَسَادَ ذَاتِ البَيْنِ هِيَ الحَالِقَةُ»: «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ وَيُرْوَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «هِيَ الحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ، وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ»
'আমি কি এমন এক আমলের ব্যাপারে তোমাদের বলব, যা রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে উত্তম? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, হিংসা-বিদ্বেষ মিটিয়ে ফেলা। কেননা, হিংসা-বিদ্বেষ হলো মুণ্ডনকারী (ধ্বংসকারী)। ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ বলেছেন। নবিজি থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বললেন, এটা (অর্থাৎ হিংসা-বিদ্বেষ) মুণ্ডনকারী। তবে আমি মাথা মুণ্ডানোর কথা বলছি না; বরং দ্বীন মুণ্ডিয়ে ফেলার কথা বলছি। '২৯৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00