📄 প্রতিবেশীর উপকার করতে অবহেলা করে না
প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীদের জন্য তার উপকার ও অনুগ্রহের দরজা সব সময় উন্মুক্ত রাখে, যেন তাদের হক আদায়ে কোনো ধরনের অবহেলা ও শিথিলতা না হয় এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিম্নোক্ত হাদিসটি তার ওপর প্রযোজ্য হয়ে না যায়, যে হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন :
كَمْ مِنْ جَارٍ مُتَعَلِّقُ بِجَارِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ: يَا رَبِّ، هَذَا أَغْلَقَ بَابَهُ دُونِي، فَمَنَعَ مَعْرُوفَهُ 'অনেক প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন তার প্রতিবেশীকে অভিযুক্ত করবে এবং বলবে, হে আমার প্রভু, এ ব্যক্তি আমার জন্য তার দরজা বন্ধ করে রেখেছিল এবং আমাকে তার প্রতিবেশীসুলভ সদ্ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করেছিল।'২৬৭
কিয়ামতের দিন বিশাল জনসমুদ্রের সম্মুখে যখন এ অভিযোগ করা হবে, তখন কী পরিমাণ লজ্জা লাগবে, একটু ভাবুন তো!
ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মুসলমান একটি শক্ত ও উঁচু ভবনের মতো। এ উম্মাহর প্রতিজন সন্তান এ ভবনের একেকটি ইট। কোনো ভবন তখনই টিকে থাকে, যখন তার এক ইটের সাথে আরেক ইটের মিলবন্ধন শক্ত হয় এবং একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। অন্যথায় তা নিমিষেই ধসে পড়বে। তাই ইসলাম তার অনুসারীদের মাঝে আত্মিক মিলবন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববন্ধন সৃষ্টি করেছে, যেন মুসলমানদের ভবন মজবুত হয় এবং দুনিয়ার কোনো শক্তি তাকে ধসিয়ে দিতে না পারে।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا 'মুমিন মুমিনের জন্য ভবনের কাঠামোস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে'। ২৬৮
অপর এক হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন : مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ، وَتَرَاحُمِهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌّ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى 'পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দয়া প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সকল মুমিন এক দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়'। ২৬৯
যে দ্বীন সকল মুসলমানের মাঝে এমন গভীর সম্পর্ক রাখার কথা বলে, সে দ্বীন প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা তো সহজেই অনুমেয়। এজন্য প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর সাথে গভীর বন্ধুত্ব রাখে, তার প্রয়োজনে পাশে থাকে এবং তার সাথে উত্তম আচরণ করে।
📄 প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে
প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর অনিষ্ট ও তার পক্ষ থেকে আসা কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে। প্রতিবেশী থেকে কোনো দোষ সংঘটিত হলে রেগে যায় না; বরং তাকে ক্ষমা করে দেয়। কারণ, সে বিশ্বাস করে, এ ধৈর্য ও ক্ষমা আল্লাহর কাছে বৃথা যাবে না; বরং বিনিময়ে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জিত হবে।
এ প্রসঙ্গে আবু জার থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে: 'মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আবু জার -এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বললাম, হে আবু জার, আপনার পক্ষ থেকে আমার কাছে একটি হাদিস পৌঁছেছে, তাই আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য খুব আগ্রহী ছিলাম।
আবু জার বললেন, তোমার পিতা আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত হোক! এখন তো আমার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে (এখন বলো, যা বলার)। আমি বললাম, যে হাদিসটি আমার নিকট পৌঁছেছে তা হলো, রাসুলুল্লাহ আপনাকে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির লোকদের ভালোবাসেন এবং তিন শ্রেণির লোকদের অপছন্দ করেন। আবু জার বললেন, হ্যাঁ, সত্যিই তো বলেছেন, আমি খামোখা রাসুলুল্লাহ -এর ওপর মিথ্যাচার করতে যাব কেন? আমি বললাম, তা বলছি না, আমি শুধু জানতে চাইছি, সে তিন শ্রেণির লোক কারা, যাদের আল্লাহ ভালোবাসেন? তিনি বললেন, সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর রাস্তায় ধৈর্য সহকারে ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় জিহাদ করেছে, অতঃপর শহিদ হয়েছে। কুরআনের আয়াতেই তার প্রমাণ আছে। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانُ : مَرْصُوصٌ (আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।) ২৭০ আমি বললাম, তারপর কে?' তিনি বললেন, সে ব্যক্তি, যার খারাপ প্রতিবেশী তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়, কিন্তু সে তার ওপর ধৈর্যধারণ করে, যতক্ষণ না আল্লাহ তার জন্য জীবন বা মৃত্যু দানের মাধ্যমে যথেষ্ট হয়ে যান।... '২৭১
📄 প্রতিবেশীর মন্দ আচরণের মোকাবেলায় মন্দ আচরণ করে না
রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরাম-কে ইসলামের যে উন্নত আখলাক শিক্ষা দিয়েছেন, তার অন্যতম হলো, প্রতিবেশীর মন্দ আচরণের মোকাবেলায় মন্দ আচরণ করবে না; বরং যথাসাধ্য তার ওপর ধৈর্যধারণ করবে। হতে পারে, এর কারণে তার মন গলে যাবে এবং কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কেননা, সে যখন দেখতে পাবে, প্রতিবেশীর সাথে এত খারাপ ব্যবহার করা ও এত কষ্ট দেওয়া সত্ত্বেও সে তার প্রতি খারাপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে ধৈর্য ধরে যাচ্ছে, তখন তার মনে লজ্জার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়।
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ বললেন, ধৈর্য ধরো। তারপর দ্বিতীয়বার এসে একই কথা বললেন, রাসুলুল্লাহ -ও একই উত্তর দিলেন। তৃতীয়বারে এসে যখন বললেন, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তোমার আসবাবপত্র নিয়ে রাস্তায় নিক্ষেপ করো। তারপর যে-ই তোমার কাছে আসবে, তাকেই বলো যে, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে। তার প্রতি অভিসম্পাত করার জন্য এটাই যথেষ্ট। (অর্থাৎ প্রতিবেশীর দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য না ধরে এভাবে অভিযোগ করাকে রাসুলুল্লাহ অপছন্দ করেছেন, তাই তাকে এভাবে উত্তর দিয়েছেন।) আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর যে ইমান রাখে, তার উচিত প্রতিবেশীর সম্মান করা। ২৭২
📄 প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে সচেষ্ট
প্রকৃত মুসলমান সব সময় প্রতিবেশীর হক ও অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দেয়। সুতরাং কষ্টের মুহূর্তে তার সহযোগী হয়, খুশির সময় তার প্রফুল্লতায় শরিক হয়, অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যায়, মৃত্যুবরণ করলে মৃত্যুপরবর্তী কার্যক্রমে উপস্থিত হয় এবং স্বজনদের সান্ত্বনা দেয়। প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর আবেগ-অনুভূতির মূল্যায়ন করে এবং এমন কোনো কাজ করে না, যা তার অনুভূতিতে আঘাত লাগে বা তাকে কোনো ধরনের কষ্ট দেয়।
এটাই প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে ইসলামের বিধান ও শিক্ষা। প্রকৃত মুসলমান এ বিধান যথাযথ বাস্তবায়ন করে বিধায় তাকে সমাজ একজন আদর্শ ও উত্তম প্রতিবেশী হিসাবে চেনে। ভেবে দেখুন, আপনার ভেতর কি এসব গুণ আছে?