📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রতিবেশীর সাথে পাপকর্মে লিপ্ত হয় না

📄 প্রতিবেশীর সাথে পাপকর্মে লিপ্ত হয় না


প্রকৃত মুসলমান বিশেষভাবে প্রতিবেশীর সাথে পাপকর্মে লিপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকে। কেননা, প্রতিবেশীর সাথে পাপকর্ম করা সাধারণত সহজ হয়ে থাকে বিধায় তা তুলনামূলক বেশি সংঘটিত হয়। এজন্য অপরাধ হিসাবেও তা বেশি গুরুতর।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
سَأَلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصْحَابَهُ عَنِ الزَّنَا؟ قَالُوا: حَرَامٌ، حَرَّمَهُ اللهُ وَرَسُولُهُ، فَقَالَ: «لِأَنْ يَزْنِي الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةٍ، أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ»، وَسَأَلَهُمْ عَنِ السَّرِقَةِ؟ قَالُوا: حَرَامٌ، حَرَّمَهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُولُهُ، فَقَالَ: «لِأَنْ يَسْرِقَ مِنْ عَشَرَةِ أَهْلِ أَبْيَاتٍ، أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ بَيْتِ جَارِهِ
'রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিগণকে ব্যভিচারের বিধান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন, হারাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ এটাকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, কোনো ব্যক্তি দশজন মেয়ের সাথে ব্যভিচার করার চেয়ে মারাত্মক গুনাহ হলো প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করা। অতঃপর তাদের থেকে চুরির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলো। তাঁরা উত্তরে বললেন, তা হারাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ তা হারাম করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, প্রতিবেশীর বাড়িতে চুরি করা দশ বাড়িতে চুরি করার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ।'২৬৫
ইসলামে প্রতিবেশীর মর্যাদা সুরক্ষিত। মানবরচিত কোনো সমাজব্যবস্থা প্রতিবেশীকে এমন মর্যাদা দিতে পারেনি। বরং এসব সমাজব্যবস্থা প্রতিবেশীর ইজ্জত-সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শেখায়। কারণ, প্রতিবেশীর মান- ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা অন্যদের তুলনায় সহজ। এর জন্য প্রচুর সময়ও পাওয়া যায়। তবে অতি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমানকে দেখা যায়, তারা জানালার পাশের ঘরের তরুণীকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল গান গায়, অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে। এ ধরনের অমুসলমানসুলভ কাজকর্ম মুসলমানদের থেকে প্রকৃত মুসলমানিত্ব ও ইমানি আখলাক চলে যাওয়ার কারণে এবং মুসলমানরা বিভিন্ন মানবরচিত অসভ্য চিন্তাধারা লালন করার দরুন সংঘটিত হচ্ছে। নচেৎ ইসলামপূর্ব জাহিলি যুগেও এ ধরনের খারাপ কাজের নজির পাওয়া যায় না, ইসলামি যুগে তো থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ইসলামি যুগে প্রতিবেশী নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নজির দেখুন একজন মুসলিম কবির কবিতায় :
وأغض طرفي ما بدت لي جارتي " حتى يواري جارتي مأواها
'যখন আমার প্রতিবেশিনী হঠাৎ আমার সামনে পড়ে যায়, আমার দৃষ্টি তখন অবনমিত হয়ে পড়ে। ততক্ষণ দৃষ্টি উত্তোলন করি না, যতক্ষণ না প্রতিবেশিনী তার ঘরে ঢুকে যায়।'
কবি আরমাবি বলেন:
ناري ونار الجار واحدة * وإليه قبلي تنزل القدر ما ضرجارا لي أجاوره * ألا يكون لبابه ستر أعمى إذا ما جارتي برزت * حتى تغيب جارتي الخدر
'আমি ও আমার প্রতিবেশী এক আগুন দিয়ে উনুন জ্বালাই। আমার পূর্বেই তার ঘরে পৌঁছে যায় রান্নার হাঁড়ি। তবে আমার প্রতিবেশী আমাকে নিয়ে কোনো আশঙ্কা করে না, যখন তার ঘরের দরজায় কোনো পর্দা থাকে না। কারণ, প্রতিবেশিনী যখন বের হয়, তখন আমি অন্ধ হয়ে যাই, যতক্ষণ না সে তার অন্দরমহলে প্রবেশ করে।'
মোটকথা, ইসলাম বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে। তার ইজ্জত-আবরুর হিফাজত করতে এবং যথাসাধ্য তার প্রয়োজন পূরণ করে দিতে আদেশ করেছে। তার ঘরের মেয়ে ও অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া ও তাকে কোনো ধরনের কষ্ট দেওয়া থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। এজন্য প্রকৃত মুসলমান সর্বযুগে, সব সময়, সকল সমাজে উত্তম ও আদর্শ প্রতিবেশী হিসাবে খ্যাতিলাভ করে।
প্রকৃত সচেতন মুসলমান-যে প্রতিবেশীর ব্যাপারে ইসলামের সকল নির্দেশনা মেনে চলে-প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করার আগে হাজারবার চিন্তা করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
أَوَّلُ خَصْمَيْنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ جَارَانِ 'কিয়ামতের দিন যে দুজন ঝগড়াকারীর বিচার আগে হবে, তারা পরস্পর প্রতিবেশী।'২৬৬

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রতিবেশীর উপকার করতে অবহেলা করে না

📄 প্রতিবেশীর উপকার করতে অবহেলা করে না


প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীদের জন্য তার উপকার ও অনুগ্রহের দরজা সব সময় উন্মুক্ত রাখে, যেন তাদের হক আদায়ে কোনো ধরনের অবহেলা ও শিথিলতা না হয় এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিম্নোক্ত হাদিসটি তার ওপর প্রযোজ্য হয়ে না যায়, যে হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন :
كَمْ مِنْ جَارٍ مُتَعَلِّقُ بِجَارِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ: يَا رَبِّ، هَذَا أَغْلَقَ بَابَهُ دُونِي، فَمَنَعَ مَعْرُوفَهُ 'অনেক প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন তার প্রতিবেশীকে অভিযুক্ত করবে এবং বলবে, হে আমার প্রভু, এ ব্যক্তি আমার জন্য তার দরজা বন্ধ করে রেখেছিল এবং আমাকে তার প্রতিবেশীসুলভ সদ্ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করেছিল।'২৬৭
কিয়ামতের দিন বিশাল জনসমুদ্রের সম্মুখে যখন এ অভিযোগ করা হবে, তখন কী পরিমাণ লজ্জা লাগবে, একটু ভাবুন তো!
ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মুসলমান একটি শক্ত ও উঁচু ভবনের মতো। এ উম্মাহর প্রতিজন সন্তান এ ভবনের একেকটি ইট। কোনো ভবন তখনই টিকে থাকে, যখন তার এক ইটের সাথে আরেক ইটের মিলবন্ধন শক্ত হয় এবং একটির সাথে আরেকটির সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। অন্যথায় তা নিমিষেই ধসে পড়বে। তাই ইসলাম তার অনুসারীদের মাঝে আত্মিক মিলবন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববন্ধন সৃষ্টি করেছে, যেন মুসলমানদের ভবন মজবুত হয় এবং দুনিয়ার কোনো শক্তি তাকে ধসিয়ে দিতে না পারে।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا 'মুমিন মুমিনের জন্য ভবনের কাঠামোস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে'। ২৬৮
অপর এক হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন : مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ، وَتَرَاحُمِهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌّ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى 'পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দয়া প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সকল মুমিন এক দেহের ন্যায়, যার একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়'। ২৬৯
যে দ্বীন সকল মুসলমানের মাঝে এমন গভীর সম্পর্ক রাখার কথা বলে, সে দ্বীন প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা তো সহজেই অনুমেয়। এজন্য প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর সাথে গভীর বন্ধুত্ব রাখে, তার প্রয়োজনে পাশে থাকে এবং তার সাথে উত্তম আচরণ করে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে

📄 প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে


প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর অনিষ্ট ও তার পক্ষ থেকে আসা কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ করে। প্রতিবেশী থেকে কোনো দোষ সংঘটিত হলে রেগে যায় না; বরং তাকে ক্ষমা করে দেয়। কারণ, সে বিশ্বাস করে, এ ধৈর্য ও ক্ষমা আল্লাহর কাছে বৃথা যাবে না; বরং বিনিময়ে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জিত হবে।
এ প্রসঙ্গে আবু জার থেকে একটি হাদিস বর্ণিত আছে: 'মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আবু জার -এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বললাম, হে আবু জার, আপনার পক্ষ থেকে আমার কাছে একটি হাদিস পৌঁছেছে, তাই আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য খুব আগ্রহী ছিলাম।
আবু জার বললেন, তোমার পিতা আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত হোক! এখন তো আমার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে (এখন বলো, যা বলার)। আমি বললাম, যে হাদিসটি আমার নিকট পৌঁছেছে তা হলো, রাসুলুল্লাহ আপনাকে বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির লোকদের ভালোবাসেন এবং তিন শ্রেণির লোকদের অপছন্দ করেন। আবু জার বললেন, হ্যাঁ, সত্যিই তো বলেছেন, আমি খামোখা রাসুলুল্লাহ -এর ওপর মিথ্যাচার করতে যাব কেন? আমি বললাম, তা বলছি না, আমি শুধু জানতে চাইছি, সে তিন শ্রেণির লোক কারা, যাদের আল্লাহ ভালোবাসেন? তিনি বললেন, সে ব্যক্তি, যে আল্লাহর রাস্তায় ধৈর্য সহকারে ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় জিহাদ করেছে, অতঃপর শহিদ হয়েছে। কুরআনের আয়াতেই তার প্রমাণ আছে। অতঃপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانُ : مَرْصُوصٌ (আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সীসাঢালা প্রাচীর।) ২৭০ আমি বললাম, তারপর কে?' তিনি বললেন, সে ব্যক্তি, যার খারাপ প্রতিবেশী তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়, কিন্তু সে তার ওপর ধৈর্যধারণ করে, যতক্ষণ না আল্লাহ তার জন্য জীবন বা মৃত্যু দানের মাধ্যমে যথেষ্ট হয়ে যান।... '২৭১

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রতিবেশীর মন্দ আচরণের মোকাবেলায় মন্দ আচরণ করে না

📄 প্রতিবেশীর মন্দ আচরণের মোকাবেলায় মন্দ আচরণ করে না


রাসুলুল্লাহ সাহাবায়ে কিরাম-কে ইসলামের যে উন্নত আখলাক শিক্ষা দিয়েছেন, তার অন্যতম হলো, প্রতিবেশীর মন্দ আচরণের মোকাবেলায় মন্দ আচরণ করবে না; বরং যথাসাধ্য তার ওপর ধৈর্যধারণ করবে। হতে পারে, এর কারণে তার মন গলে যাবে এবং কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কেননা, সে যখন দেখতে পাবে, প্রতিবেশীর সাথে এত খারাপ ব্যবহার করা ও এত কষ্ট দেওয়া সত্ত্বেও সে তার প্রতি খারাপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে ধৈর্য ধরে যাচ্ছে, তখন তার মনে লজ্জার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া অমূলক নয়।
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন সাল্লাম রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ বললেন, ধৈর্য ধরো। তারপর দ্বিতীয়বার এসে একই কথা বললেন, রাসুলুল্লাহ -ও একই উত্তর দিলেন। তৃতীয়বারে এসে যখন বললেন, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তোমার আসবাবপত্র নিয়ে রাস্তায় নিক্ষেপ করো। তারপর যে-ই তোমার কাছে আসবে, তাকেই বলো যে, আমার প্রতিবেশী আমাকে কষ্ট দিয়েছে। তার প্রতি অভিসম্পাত করার জন্য এটাই যথেষ্ট। (অর্থাৎ প্রতিবেশীর দেওয়া কষ্টের ওপর ধৈর্য না ধরে এভাবে অভিযোগ করাকে রাসুলুল্লাহ অপছন্দ করেছেন, তাই তাকে এভাবে উত্তর দিয়েছেন।) আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের ওপর যে ইমান রাখে, তার উচিত প্রতিবেশীর সম্মান করা। ২৭২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00