📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সদ্ব্যবহার ও উপকারের ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে এগিয়ে রাখে

📄 সদ্ব্যবহার ও উপকারের ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে এগিয়ে রাখে


প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দেয়। কেননা, এটাই ইসলামের নির্দেশ। দুই নিকটতম প্রতিবেশীর মাঝে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার কারণে ও তাদের মাঝে সাধারণত খুব স্পর্শকাতর কিছু বিষয় জড়িয়ে থাকার কারণে ইসলাম সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যাতে তাদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সখ্যতা দৃঢ় হয়।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ لِي جَارَيْنِ فَإِلَى أَيِّهِمَا أُهْدِي؟ قَالَ: إِلَى أَقْرَبِهِمَا مِنْكِ بَابًا 'আমি রাসুলুল্লাহ-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার প্রতিবেশী তো দুজন আছে। তাহলে কার কাছে হাদিয়া পাঠাব? তিনি বললেন, দুজনের মধ্যে যার দরজা তোমার অধিকতর নিকটবর্তী, তার নিকট?'২৫৬
সাহাবায়ে কিরাম প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের এ নির্দেশনা অনুসরণ করতেন। এজন্য সদ্ব্যবহার ও উপকার করার ক্ষেত্রে তাঁরা নিকটতম প্রতিবেশীকে দূরতম প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দিতেন।
এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা বলেন: وَلَا يَبْدَأُ بِجَارِهِ الْأَقْصَى قَبْلَ الْأَدْنَى، وَلَكِنْ يَبْدَأُ بِالْأَدْنَى قَبْلَ الْأَقْصَى
'নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে বাদ দিয়ে দূরবর্তী প্রতিবেশী থেকে (হাদিয়া-তোফহা প্রেরণ) শুরু করবে না; বরং দূরবর্তী প্রতিবেশীর পূর্বে নিকটবর্তী প্রতিবেশী থেকে শুরু করবে।'২৫৭
ইসলাম নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে অন্যান্য প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলে। এর অর্থ কোনোভাবেই এটা নয় যে, ইসলাম দূরবর্তী প্রতিবেশীদের থেকে একদম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; বরং নিকটবর্তী বা দূরবর্তী প্রত্যেক প্রতিবেশীর হক ও অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার প্রতি ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। তবে নিকটবর্তী প্রতিবেশীর সাথে একটু বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার কারণে এবং তার সাথে স্বাভাবিকভাবেই কিছু স্পর্শকাতর বিষয় জড়িয়ে থাকার কারণে তাকে অন্যান্য প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রকৃত মুসলমান একজন উত্তম প্রতিবেশী হয়ে থাকে

📄 প্রকৃত মুসলমান একজন উত্তম প্রতিবেশী হয়ে থাকে


প্রকৃত মুসলমান তার প্রতিবেশীদের জন্য একজন আদর্শ ও উত্তম প্রতিবেশী হয়। প্রতিবেশীদের সাথে উত্তম আচরণ করা ও তাদের প্রতি উপকার করাকে অন্তর থেকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব মনে করে সে। এটাকে আল্লাহ ও মানুষের নিকট আলাদা মর্যাদা পাওয়ার অন্যতম উপায় মনে করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ، وَخَيْرُ الجِيْرَانِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ
'আল্লাহর নিকট সে সঙ্গীই উত্তম, যে তার সঙ্গীদের নিকট উত্তম এবং আল্লাহর নিকট সে প্রতিবেশীই উত্তম, যে তার প্রতিবেশীদের নিকট উত্তম। '২৫৮
এজন্যই ইসলাম উত্তম প্রতিবেশী থাকাকে মুসলমানদের অন্যতম সৌভাগ্য বলে অভিহিত করেছে। কেননা, প্রতিবেশী উত্তম হলে মানুষ সব সময় স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করে।
এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مِنْ سَعَادَةِ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ المسكنُ الواسع والجار الصالح والمركب الهنيء
'একজন মুসলমানের জন্য প্রশস্ত বাসভবন, উত্তম প্রতিবেশী ও রুচিসম্মত বাহন সৌভাগ্যস্বরূপ। '২৫৯
সালাফে সালিহীন উত্তম প্রতিবেশীকে মূল্যবান নিয়ামত ও গনিমত মনে করতেন। তার মোকাবেলায় ধন-সম্পদ ও সকল পার্থিব স্বার্থকে তুচ্ছ মনে করতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা হলো, সাঈদ বিন আস রা.-এর প্রতিবেশী তার বাড়ি বিক্রি করার জন্য দাম ঠিক করলেন এক লক্ষ দিরহাম। তারপর ক্রেতাকে বললেন, এ হলো শুধু বাড়ির দাম। সাঈদ রা.-এর প্রতিবেশিত্ব কত দামে কিনতে পারবে? এ ব্যাপারে সাঈদ রা. যখন জানতে পারলেন, তখন তার নিকট বাড়ির দাম পাঠিয়ে দিয়ে তাকে তার বাড়িতেই থাকতে বললেন।
এতক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা করে আসছি উত্তম প্রতিবেশী সম্পর্কে। এখন খারাপ প্রতিবেশীর ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 খারাপ প্রতিবেশী ঈমানের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত

📄 খারাপ প্রতিবেশী ঈমানের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত


খারাপ প্রতিবেশী এমন এক ব্যক্তি, যে ইমানের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত; যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত এবং দুনিয়াবি জীবনের সকল শ্রেষ্ঠত্বের কেন্দ্রবিন্দু। রাসুলুল্লাহ খুব কঠিন ভাষায় এ ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন: وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لَا يُؤْمِنُ، وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ قِيلَ: وَمَنْ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: الَّذِي لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
'আল্লাহর শপথ, সে ব্যক্তি মুমিন নয় (তিনবার বললেন)! জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কার ব্যাপারে বলছেন? তিনি বললেন, সেই ব্যক্তির ব্যাপারে বলছি, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।'২৬০
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
'সেই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।'২৬১
প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করা কত বড় অপরাধ, তা শাস্তি দেখেই অনুমান করুন! কত বড় সে অপরাধ, যা ব্যক্তিকে ইমানের নিয়ামত থেকে বের করে দেয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বাধা দেয়!
প্রকৃত মুসলমান খারাপ প্রতিবেশী হওয়ার এসব শাস্তির কথা জানে। তাই সে প্রতিবেশীর সাথে খারাপ ব্যবহার করা, ঝগড়া করা কিংবা তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। কারণ, সে জানে, এ বিষয়গুলো তার ইমান ধ্বংস করে দেবে এবং আখিরাত বরবাদ করে দেবে। আর একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্য ও ক্ষতি হলো, ইমান ও আখিরাতের ক্ষতি। প্রকৃত মুসলমান তাই এমন কোনো কাজ করে না, যা তার ইমান ও আখিরাতের ক্ষতি করে।

টিকাঃ
২৬০. উল্লেখ্য যে, কুফর বা শিরকের সাথে জড়িত না হয়ে শুধু গুনাহের কারণে কারও ইমান বিনষ্ট হয় না; গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন! এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'র আকিদা। অতএব, যেসব হাদিসে বিভিন্ন গুনাহ বা জুলুমের কারণে ইমান না থাকার কথা বলা হয়েছে, বিজ্ঞ মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ তথায় পূর্ণাঙ্গ ইমান না থাকার কথা বলেছেন। অর্থাৎ এখানে অর্থ হবে, সে পূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না। নচেৎ এসব হাদিস থেকে শুধু গুনাহের ভিত্তিতে কাউকে বে-ইমান বলা বা কাফির বলা সঠিক নয়, যেমনটি কোনো জাহিরি মাজহাবের লোক করে থাকে। তাই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। (অনুবাদক)

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 খারাপ প্রতিবেশীর আমল বিনষ্ট হয়ে যায়

📄 খারাপ প্রতিবেশীর আমল বিনষ্ট হয়ে যায়


প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণ করলে আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। যতই নেক আমল করুক, তা আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয় না। কারণ, সকল নেক আমল নির্ভর করে ইমানের ওপর। আর উপরোল্লিখিত হাদিসের স্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী খারাপ প্রতিবেশীর ইমান নেই। ২৬২ সুতরাং বুঝা গেল, খারাপ প্রতিবেশীর কোনো আমল আল্লাহ কবুল করেন না। আমল করতে করতে রাতদিন কাটিয়ে দিলেও তার কোনো সাওয়াব আমলনামায় লেখা হয় না।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
قِيلَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ فُلَانَةً تَقُومُ اللَّيْلَ وَتَصُومُ النَّهَارَ، وَتَفْعَلُ، وَتَصَّدَّقُ، وَتُؤْذِي جِيرَانَهَا بِلِسَانِهَا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا خَيْرَ فِيهَا، هِيَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ» قَالُوا: وَفُلَانَةٌ تُصَلِّي الْمَكْتُوبَةَ، وَتَصَّدَّقُ بِأَثْوَارٍ، وَلَا تُؤْذِي أَحَدًا؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «هِيَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ»
'নবিজি -কে প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, অমুক মহিলা রাতে নামাজ পড়ে, দিনে রোজা রাখে, ভালো কাজ করে এবং দান-সদকা করে, কিন্তু কথার মাধ্যমে প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। (তার সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?) রাসুলুল্লাহ বললেন, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই, সে জাহান্নামি। তারা বললেন, আরেকজন মহিলা ফরজ নামাজসমূহ আদায় করে এবং আবশ্যকীয় সদকাগুলো আদায় করে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না। (তার ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?) রাসুলুল্লাহ বললেন, সে জান্নাতি। ২৬৩
রাসুলুল্লাহ কয়েক শ্রেণির লোককে বন্ধ্যা বলেছেন, খারাপ প্রতিবেশী তাদের অন্যতম। তিনি ইরশাদ করেছেন:
ثَلَاثُ هُنَّ الْعَوَاقِرُ: إِمَامٌ إِنْ أَحْسَنْتَ لَمْ يَشْكُرْ وَإِنْ أَسَأْتَ لَمْ يَغْفِرْ، وَجَارُ إِنْ رَأَى خَيْرًا دَفْنَهُ وَإِنْ رَأَى شَرًّا أَشَاعَهُ، وَامْرَأَةً إِنْ حَضَرَتْكَ آذَتْكَ وَإِنْ غِبْتَ عَنْهَا خَانَتْكَ
'তিন শ্রেণির মানুষ বন্ধ্যা। এক. এমন শাসক, যার সাথে ভালো ব্যবহার করলে শুকরিয়া আদায় করে না এবং খারাপ ব্যবহার করলে ক্ষমা করে না। দুই. খারাপ প্রতিবেশী, যে (প্রতিবেশীদের) ভালো কিছু দেখলে তা গোপন রাখে, কিন্তু খারাপ কিছু দেখলে তা প্রচার করে দেয়। তিন. ওই স্ত্রী, যার পাশে থাকলে তোমাকে কষ্ট দেয়, আর দূরে থাকলে বিশ্বাসঘাতকতা করে।' ২৬৪
হাদিস শরিফে খারাপ প্রতিবেশীর যে কুৎসিত চিত্র আঁকা হয়েছে, তা প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে গেঁথে আছে। ফলে প্রতিবেশীদের সাথে খারাপ আচরণ করা বা তাদের কষ্ট দেওয়ার কথা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে না।

টিকাঃ
২৬২. এখানে ইমান না থাকা অর্থ ইমান পরিপূর্ণ নয়। একটু আগে এ সংক্রান্ত বিশদ ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছি। (অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00