📄 সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর উপকার করে
প্রকৃত মুসলমান তার সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর উপকার করে। উপকারের পরিমাণ কম হলে তা করতে লজ্জাবোধ করে না, যেমনটা মূর্খরা করে থাকে। মূর্খরা (অনেক সময়) উপকারকে ছোট মনে করে প্রতিবেশীর জন্য তা করা থেকে বিরত থাকে। ফলে নিজেও সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, প্রতিবেশীকেও উপকার থেকে বঞ্চিত রাখে।
প্রতিবেশীকে ছোট উপকার করতে সাধারণত মেয়েরাই বেশি লজ্জা পায়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলেন:
يَا نِسَاءَ المُسْلِمَاتِ، لَا تَحْقِرَنَّ جَارَةُ لِجَارَتِهَا، وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ
'হে মুসলিম নারীরা, তোমাদের কোনো প্রতিবেশী যদি ছাগলের খুরও উপহার দেয়, তবুও তা তুচ্ছজ্ঞান করবে না (অর্থাৎ দাতা যেন লজ্জার বশীভূত হয়ে দান থেকে বিরত না থাকে এবং গ্রহীতাও যেন অল্প বলে অবজ্ঞা না করে)।'২৫০
হাদিসে ছাগলের খুর বলে কম বা নিম্নমানের উপহার বুঝানো হয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীর কোনো ছোট উপকার করতে লজ্জাবোধ করবে না এবং একইভাবে যার উপকার করা হয়েছে, সে যেন ছোট বলে তাকে অবজ্ঞা না করে। কারণ, প্রবাদ আছে 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।'
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ 'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।'২৫১
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ 'খেজুরের সামান্য একটা অংশের (সদকা করার) মাধ্যমেও হলে তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো। ২৫২
উল্লিখিত হাদিস থেকে বুঝা গেল, প্রথমত, কোনো প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীকে ছোট উপহার দিতে লজ্জা করবে না। তার পাশাপাশি হাদিস থেকে এটাও বুঝা গেল যে, উপহারগ্রহীতা প্রতিবেশীর ছোট উপহারকে অবজ্ঞা করবে না; বরং তার শুকরিয়া আদায় করবে। এর মাধ্যমে উভয় প্রতিবেশীর মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতার সম্পর্ক কায়েম হবে। তাদের মাঝে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জাগবে। তা ছাড়া উপকারকারীর শুকরিয়া আদায় করা মুসলমানদের অন্যতম উত্তম চরিত্রও বটে।
এজন্য রাসুলুল্লাহ তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন:
لَا يَشْكُرُ اللَّهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ
'যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। '২৫৩
📄 মুসলিম ও অমুসলিম উভয় প্রকার প্রতিবেশীর সাথে সে সদ্ব্যবহার করে
প্রকৃত মুসলমান শুধু আত্মীয় প্রতিবেশী ও মুসলমান প্রতিবেশীর সাথেই ভালো ব্যবহার করে, তা নয়; বরং অমুসলিম প্রতিবেশীর সাথেও উত্তম ব্যবহার করে এবং তার উপকার করে। কেননা, ইসলামের উদারনীতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন উমর -এর আমল দেখুন। তাঁর ব্যাপারে বর্ণিত আছে :
أَنَّهُ ذُبِحَتْ لَهُ شَاةٌ، فَجَعَلَ يَقُولُ لِغُلَامِهِ: أَهْدَيْتَ لِجَارِنَا الْيَهُودِيَّ؟ أَهْدَيْتَ لِجَارِنَا الْيَهُودِيَّ؟ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ
'তার ঘরে একটি ছাগল জবাই করা হলো। তখন তিনি ভৃত্যকে ডেকে বললেন, আমাদের প্রতিবেশী ওই ইহুদি লোকটার ঘরে কি হাদিয়া পাঠানো হয়েছে (দুবার বললেন)? কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে, একসময় আমি ধারণা করতে শুরু করেছিলাম, অচিরেই বুঝি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করা হবে।'২৫৪
এজন্যই যুগ যুগ ধরে ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় مسلمانوں পাশে নিরাপত্তা ও স্বস্তির সাথে বসবাস করে আসছে। তাদের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু ও ধর্মপালনের ওপর মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনিষ্টের আশঙ্কা নেই। তারা করে না। মুসলমানদের এলাকায় পাহাড়ের ওপর তাদের বড় বড় গির্জাগুলো তার জীবন্ত সাক্ষী। গির্জার আশপাশে হাজার হাজার মুসলমান বসবাস করে, কিন্তু তারা তাদের সাথে উত্তম আচরণ করে, প্রতিবেশীর হক যথাযথ আদায় করে এবং অন্যায়ভাবে তাদের ওপর আক্রমণ করে না।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ 'ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। '২৫৫
📄 সদ্ব্যবহার ও উপকারের ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে এগিয়ে রাখে
প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নিকটতম প্রতিবেশীকে অন্যদের ওপর প্রাধান্য দেয়। কেননা, এটাই ইসলামের নির্দেশ। দুই নিকটতম প্রতিবেশীর মাঝে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার কারণে ও তাদের মাঝে সাধারণত খুব স্পর্শকাতর কিছু বিষয় জড়িয়ে থাকার কারণে ইসলাম সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যাতে তাদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সখ্যতা দৃঢ় হয়।
এ সম্পর্কে আয়িশা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ لِي جَارَيْنِ فَإِلَى أَيِّهِمَا أُهْدِي؟ قَالَ: إِلَى أَقْرَبِهِمَا مِنْكِ بَابًا 'আমি রাসুলুল্লাহ-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমার প্রতিবেশী তো দুজন আছে। তাহলে কার কাছে হাদিয়া পাঠাব? তিনি বললেন, দুজনের মধ্যে যার দরজা তোমার অধিকতর নিকটবর্তী, তার নিকট?'২৫৬
সাহাবায়ে কিরাম প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের এ নির্দেশনা অনুসরণ করতেন। এজন্য সদ্ব্যবহার ও উপকার করার ক্ষেত্রে তাঁরা নিকটতম প্রতিবেশীকে দূরতম প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দিতেন।
এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা বলেন: وَلَا يَبْدَأُ بِجَارِهِ الْأَقْصَى قَبْلَ الْأَدْنَى، وَلَكِنْ يَبْدَأُ بِالْأَدْنَى قَبْلَ الْأَقْصَى
'নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে বাদ দিয়ে দূরবর্তী প্রতিবেশী থেকে (হাদিয়া-তোফহা প্রেরণ) শুরু করবে না; বরং দূরবর্তী প্রতিবেশীর পূর্বে নিকটবর্তী প্রতিবেশী থেকে শুরু করবে।'২৫৭
ইসলাম নিকটবর্তী প্রতিবেশীকে অন্যান্য প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলে। এর অর্থ কোনোভাবেই এটা নয় যে, ইসলাম দূরবর্তী প্রতিবেশীদের থেকে একদম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; বরং নিকটবর্তী বা দূরবর্তী প্রত্যেক প্রতিবেশীর হক ও অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার প্রতি ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। তবে নিকটবর্তী প্রতিবেশীর সাথে একটু বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার কারণে এবং তার সাথে স্বাভাবিকভাবেই কিছু স্পর্শকাতর বিষয় জড়িয়ে থাকার কারণে তাকে অন্যান্য প্রতিবেশীর ওপর প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।
📄 প্রকৃত মুসলমান একজন উত্তম প্রতিবেশী হয়ে থাকে
প্রকৃত মুসলমান তার প্রতিবেশীদের জন্য একজন আদর্শ ও উত্তম প্রতিবেশী হয়। প্রতিবেশীদের সাথে উত্তম আচরণ করা ও তাদের প্রতি উপকার করাকে অন্তর থেকে নিজের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব মনে করে সে। এটাকে আল্লাহ ও মানুষের নিকট আলাদা মর্যাদা পাওয়ার অন্যতম উপায় মনে করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ، وَخَيْرُ الجِيْرَانِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ
'আল্লাহর নিকট সে সঙ্গীই উত্তম, যে তার সঙ্গীদের নিকট উত্তম এবং আল্লাহর নিকট সে প্রতিবেশীই উত্তম, যে তার প্রতিবেশীদের নিকট উত্তম। '২৫৮
এজন্যই ইসলাম উত্তম প্রতিবেশী থাকাকে মুসলমানদের অন্যতম সৌভাগ্য বলে অভিহিত করেছে। কেননা, প্রতিবেশী উত্তম হলে মানুষ সব সময় স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করে।
এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
مِنْ سَعَادَةِ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ المسكنُ الواسع والجار الصالح والمركب الهنيء
'একজন মুসলমানের জন্য প্রশস্ত বাসভবন, উত্তম প্রতিবেশী ও রুচিসম্মত বাহন সৌভাগ্যস্বরূপ। '২৫৯
সালাফে সালিহীন উত্তম প্রতিবেশীকে মূল্যবান নিয়ামত ও গনিমত মনে করতেন। তার মোকাবেলায় ধন-সম্পদ ও সকল পার্থিব স্বার্থকে তুচ্ছ মনে করতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা হলো, সাঈদ বিন আস রা.-এর প্রতিবেশী তার বাড়ি বিক্রি করার জন্য দাম ঠিক করলেন এক লক্ষ দিরহাম। তারপর ক্রেতাকে বললেন, এ হলো শুধু বাড়ির দাম। সাঈদ রা.-এর প্রতিবেশিত্ব কত দামে কিনতে পারবে? এ ব্যাপারে সাঈদ রা. যখন জানতে পারলেন, তখন তার নিকট বাড়ির দাম পাঠিয়ে দিয়ে তাকে তার বাড়িতেই থাকতে বললেন।
এতক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা করে আসছি উত্তম প্রতিবেশী সম্পর্কে। এখন খারাপ প্রতিবেশীর ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।