📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর প্রতি উদার হয়

📄 প্রকৃত মুসলমান প্রতিবেশীর প্রতি উদার হয়


প্রকৃত মুসলমান—যার অন্তর ও বিবেক ইসলামের হিদায়াতের আলোয় আলোকিত—প্রতিবেশীর প্রতি উদার ও ভদ্রজনোচিত আচরণ করে। প্রয়োজনবশত তার বাড়ির কোনো বস্তু দ্বারা প্রতিবেশী উপকৃত হতে চাইলে বাধা দেয় না।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يَمْنَعْ جَارُ جَارَهُ أَنْ يَغْرِزَ خَشَبَهُ فِي جِدَارِهِ
'এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে খুঁটি গাড়া থেকে বাধা দেওয়া উচিত নয়।'২৪৩

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 নিজের জন্য যা পছন্দ করে, প্রতিবেশীর জন্যও তাই পছন্দ করে

📄 নিজের জন্য যা পছন্দ করে, প্রতিবেশীর জন্যও তাই পছন্দ করে


প্রকৃত মুসলমান উদারমনস্ক ও বন্ধুভাবাপন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। প্রতিবেশীর আবেগ-অনুভূতিকে সমীহ করে সে। তার সুখে সুখী হয় এবং তার ব্যথায় ব্যথিত হয়। নিজের জন্য যা পছন্দ করে, প্রতিবেশীর জন্যও তাই পছন্দ করে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করবে।'২৪৪
সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ عَبْدُ حَتَّى يُحِبَّ لِجَارِهِ - أَوْ قَالَ: لِأَخِيهِ - مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
'সে সত্তার শপথ করে বলছি যার হাতে আমার প্রাণ, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রতিবেশীর জন্য অথবা (বলেছেন,) তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।'২৪৫
প্রকৃত মুসলমান গরিব প্রতিবেশীদের খুব দেখাশোনা করে। বিশেষ করে যখন তার ঘরে এমন কোনো ব্যঞ্জন রান্না করা হয়, যার সুগন্ধি আশপাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, সে সুগন্ধি পেয়ে গরিব প্রতিবেশীর জিহ্বায় পানি চলে আসবে, কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় বেচারা শুধু মুখের লালাই চেটে চেটে খাবে। আবার তাদের মধ্যে অনেক অবুঝ শিশু, অসহায় এতিম, নিঃস্ব বিধবা বা অকেজো বৃদ্ধও থাকতে পারে। এমন অবস্থায় প্রকৃত মুসলমান গরিব প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেয়। সেই সুগন্ধিযুক্ত খাবারের কিছু অংশ তাদের কাছেও পাঠিয়ে দেয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ মুমিনদের অন্তরে সামাজিক সহানুভূতির যে চারা রোপণ করে গিয়েছেন, তা সজীব ও জীবন্ত থাকে প্রকৃত মুসলমানের হৃদয়ে।
এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ আবু জার-কে বললেন :
يَا أَبَا ذَرِّ إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً، فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ
'হে আবু জার, কোনো তরকারি রান্না করলে সেখানে ঝোল একটু বেশি দিয়ো এবং প্রতিবেশীদের খবর নিয়ো।'২৪৬
অপর এক বর্ণনায় এসেছে :
إِذَا طَبَخْتَ مَرَقًا فَأَكْثِرُ مَاءَهُ، ثُمَّ انْظُرْ أَهْلَ بَيْتٍ مِنْ جِيرَانِكَ، فَأَصِبْهُمْ مِنْهَا بِمَعْرُوفٍ
'যদি কোনো তরকারি রান্না করো, তখন সেখানে পানি বেশি দিয়ো, তারপর প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের জন্যও কিছু পাঠিয়ে দিয়ো।'২৪৭
প্রকৃত মুসলমানের মন কখনো এ বিষয়ে সায় দেয় না যে, তার প্রতিবেশী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণে কষ্ট পাবে, অথচ সে আরাম-আয়েশ ও বিলাসী জীপনযাপন করবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَا آمَنَ بِي مَنْ بَاتَ شَبْعَانًا وَجَارُهُ جَائِعٌ إِلَى جَنْبِهِ وَهُوَ يَعْلَمُ بِهِ
'সে ব্যক্তি আমার প্রতি (প্রকৃত) বিশ্বাস স্থাপন করেনি, যে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রিযাপন করে; অথচ সে জানে যে, তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত। '২৪৮
আরেক হাদিসে তিনি বলেন:
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ الَّذِي يَشْبَعُ وَجَارُهُ جَائِعُ
'সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে তৃপ্তিভরে খানা খায়; অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। '২৪৯

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 বর্তমান মানবতার করুণ পরিণতির কারণ ইসলামি আখলাকের অনুপস্থিতি

📄 বর্তমান মানবতার করুণ পরিণতির কারণ ইসলামি আখলাকের অনুপস্থিতি


বর্তমান সময়ে বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় মানবতার প্রতি যে দুর্ভোগ নেমে এসেছে, তার একমাত্র কারণ হলো, ইসলাম ও প্রকৃত মুসলমানের অনুপস্থিতি। ইসলামের ইনসাফপূর্ণ মানবিক মূলনীতিগুলো যখন মানবরচিত ভোগবাদী রীতিনীতির আড়ালে হারিয়ে যায়, তখন এমন দুর্ভোগ অস্বাভাবিক কিছু নয়। মানবরচিত ভোগবাদী জীবনব্যবস্থা মানবের চন্দ্রাভিযানের যুগে মানবতাকে উপহার দিয়েছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অসহ্য ব্যথা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ১৯৭৫ সালে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এশিয়া ও আফ্রিকায় বিগত কয়েক বছর ধরে ২০ থেকে ১০০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধা ও অনাহারের কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে আছে। এভাবে চলতে থাকলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩ মিলিয়ন মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়াও সেখানে প্রায় ১,৪৬০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছে।
চলতি বছরে বিশ্ব প্রচারমাধ্যম একটি ঘটনা খুব ফলাও করে প্রচার করেছে। ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো, এক ইউরোপীয় তরুণী চরম খাদ্যসংকটে ভোগা আফ্রিকার একটি অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবী নার্স হিসাবে গমন করেন। সেখানে যাওয়ার পর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পাগলের মতো হয়ে যান তিনি। তার এমনভাবে বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ হলো, একদিন তিনি দেখলেন, কিছু আফ্রিকান শিশু—যাদের সবচেয়ে বড়জনের বয়স আটের বেশি নয়—ক্ষুধার তাড়নায় আমের একটা অংশের জন্য নিজেদের মাঝে বুনো লড়াই লড়ছে। একজনের চক্ষু ফুঁড়ে দেওয়া পর্যন্ত তাদের এ লড়াই অব্যাহত থাকল!
এমন ক্ষুধার কারণে সেখানকার লোকদের শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন থেকে বঞ্চিত থাকে এবং শিশুদের জন্য শরীর গঠনকারী খাদ্য তারা পায় না। ফলে তারা একেকজন জীবন্ত কঙ্কাল হয়ে দুনিয়াতে বিচরণ করে। তাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না বিধায় নানাবিধ রোগে তারা আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
যে সময় এশিয়া ও আফ্রিকায় মানুষ ক্ষুধায় জর্জরিত, সে সময় পশ্চিমা ধনাট্য বিশ্বে—যে বিশ্বে পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র ২০% মানুষ বাস করে, কিন্তু বৈশ্বিক প্রাচুর্যের ৮০% তারা নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে—তাদের ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য পাগলের মতো অসংখ্য কাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। যেমন: বিশ্ববাজারে কফির দাম চড়া রাখার জন্য ১৯৭৫ সালে ব্রাজিল হাজার হাজার কফি গাছ পুড়িয়ে ফেলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসমূহ প্রয়োজনাতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য ও কৃষি উৎপন্নদ্রব্য ধ্বংস করার জন্য প্রতিবছর পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার খরচ করে, যেন বিশ্ববাজারে সেগুলোর দাম চড়া থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর তিন লক্ষ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে খাদ্যশস্য উৎপাদন রোধ করার জন্য, যেন বিশ্ববাজারে সেগুলোর দাম বেশি হয়। মার্কিন মাংস ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ গরুর বাছুর মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলে, যেন বিশ্ববাজারে মাংসের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে; অথচ তখন এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবে মারা যায়। যদি দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব খাদ্যদ্রব্য ধ্বংস না করা হতো, তাহলে পৃথিবীর বুকে কোনো মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগত না।
ইসলামি মানবিক সভ্যতা ও পাশ্চাত্য ভোগবাদী সভ্যতার মাঝে কী বিরাট পার্থক্য! ইসলাম তরকারির সুঘ্রাণের মাধ্যমে গরিব প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার মতো সামান্য অমানবিক কাজের সাথেও আপস করেনি। কিন্তু পাশ্চাত্য ভোগবাদী সভ্যতা ধনাঢ্য লোকদের ধনাঢ্যতা আরও বৃদ্ধি করার জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন প্রাণকে না খাইয়ে মেরে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না!
পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের ভোগবাদী জীবন ও অর্থব্যবস্থা এভাবে মানবতাকে বিপন্ন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। এহেন দুর্ভোগ থেকে মানবতাকে মুক্ত করতে হলে ফিরে আসতে হবে ইসলামের পথে। ভোগবাদের বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে মরা থেকে মানবতাকে মুক্ত করতে হলে তাকে ছেড়ে দিতে হবে ইসলামের মুক্ত বাতাসে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর উপকার করে

📄 সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর উপকার করে


প্রকৃত মুসলমান তার সাধ্যানুযায়ী প্রতিবেশীর উপকার করে। উপকারের পরিমাণ কম হলে তা করতে লজ্জাবোধ করে না, যেমনটা মূর্খরা করে থাকে। মূর্খরা (অনেক সময়) উপকারকে ছোট মনে করে প্রতিবেশীর জন্য তা করা থেকে বিরত থাকে। ফলে নিজেও সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, প্রতিবেশীকেও উপকার থেকে বঞ্চিত রাখে।
প্রতিবেশীকে ছোট উপকার করতে সাধারণত মেয়েরাই বেশি লজ্জা পায়। এজন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলেন:
يَا نِسَاءَ المُسْلِمَاتِ، لَا تَحْقِرَنَّ جَارَةُ لِجَارَتِهَا، وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ
'হে মুসলিম নারীরা, তোমাদের কোনো প্রতিবেশী যদি ছাগলের খুরও উপহার দেয়, তবুও তা তুচ্ছজ্ঞান করবে না (অর্থাৎ দাতা যেন লজ্জার বশীভূত হয়ে দান থেকে বিরত না থাকে এবং গ্রহীতাও যেন অল্প বলে অবজ্ঞা না করে)।'২৫০
হাদিসে ছাগলের খুর বলে কম বা নিম্নমানের উপহার বুঝানো হয়েছে। হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীর কোনো ছোট উপকার করতে লজ্জাবোধ করবে না এবং একইভাবে যার উপকার করা হয়েছে, সে যেন ছোট বলে তাকে অবজ্ঞা না করে। কারণ, প্রবাদ আছে 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।'
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ 'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।'২৫১
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: اتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ 'খেজুরের সামান্য একটা অংশের (সদকা করার) মাধ্যমেও হলে তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো। ২৫২
উল্লিখিত হাদিস থেকে বুঝা গেল, প্রথমত, কোনো প্রতিবেশী তার প্রতিবেশীকে ছোট উপহার দিতে লজ্জা করবে না। তার পাশাপাশি হাদিস থেকে এটাও বুঝা গেল যে, উপহারগ্রহীতা প্রতিবেশীর ছোট উপহারকে অবজ্ঞা করবে না; বরং তার শুকরিয়া আদায় করবে। এর মাধ্যমে উভয় প্রতিবেশীর মাঝে ভালোবাসা ও হৃদ্যতার সম্পর্ক কায়েম হবে। তাদের মাঝে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জাগবে। তা ছাড়া উপকারকারীর শুকরিয়া আদায় করা মুসলমানদের অন্যতম উত্তম চরিত্রও বটে।
এজন্য রাসুলুল্লাহ তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন:
لَا يَشْكُرُ اللَّهَ مَنْ لَا يَشْكُرُ النَّاسَ
'যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারে না। '২৫৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00