📄 মুসলমান ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে
প্রকৃত মুসলমান আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। দুনিয়ার ব্যস্ততা, ধন- সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তান আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা থেকে তাকে বিরত রাখে না। প্রত্যেক আত্মীয়ের সাথে গুরুত্ব ও নৈকট্য বিবেচনায় যথাযথভাবে সুসম্পর্ক রাখে এবং সদ্ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে প্রথম মায়ের সাথে, তারপর পিতার সাথে, তারপর এদের পরে সবচেয়ে নিকটাত্মীয়ের সাথে, তারপর এর পরের নিকটাত্মীয়ের সাথে... এভাবে সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখে।
এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :
قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ؟ قَالَ: أُمُّكَ، ثُمَّ أُمُّكَ، ثُمَّ أُمُّكَ، ثُمَّ أَبُوكَ، ثُمَّ أَدْنَاكَ أَدْنَاكَ 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার সদাচারের বেশি হকদার কে? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা, তারপর তোমার পিতা, তাদের পরে ক্রমপর্যায়ে তোমার নিকটাত্মীয়রা।'২২৫
আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অনুগ্রহ করলে দ্বিগুণ সাওয়াব হয়। একটি আত্মীয়তা- সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব, আরেকটি সদকার সাওয়াব। তাই আত্মীয়-স্বজন যদি গরিব হয়, তাহলে দান-সদকার ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য দেওয়া উত্তম। কারণ এতে দ্বিগুণ সাওয়াব হওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের ভালোবাসাও অর্জিত হয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর স্ত্রী জাইনাব সাকাফিয়্যা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ এ বিষয়টির প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
হাদিসটি নিম্নরূপ:
عَنْ زَيْنَبَ امْرَأَةِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَصَدَّقْنَ، يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ، وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ» قَالَتْ: فَرَجَعْتُ إِلَى عَبْدِ اللهِ فَقُلْتُ: إِنَّكَ رَجُلٌ خَفِيفٌ ذَاتِ الْيَدِ، وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أَمَرَنَا بِالصَّدَقَةِ، فَأْتِهِ فَاسْأَلْهُ، فَإِنْ كَانَ ذَلِكَ يَجْزِي عَنِّي وَإِلَّا صَرَفْتُهَا إِلَى غَيْرِكُمْ، قَالَتْ: فَقَالَ لِي عَبْدُ اللَّهِ: بَلِ ائْتِيهِ أَنْتِ، قَالَتْ: فَانْطَلَقْتُ، فَإِذَا امْرَأَةُ مِنَ الْأَنْصَارِ بِبَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاجَتِي حَاجَتُهَا، قَالَتْ: وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أُلْقِيَتْ عَلَيْهِ الْمَهَابَةُ، قَالَتْ: فَخَرَجَ عَلَيْنَا بِلَالُ فَقُلْنَا لَهُ: ائْتِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَخْبِرُهُ أَنَّ امْرَأَتَيْنِ بِالْبَابِ تَسْأَلَا نِكَ: أَتُجْزِئُ الصَّدَقَةُ عَنْهُمَا، عَلَى أَزْوَاجِهِمَا، وَعَلَى أَيْتَامٍ فِي حُجُورِهِمَا؟ وَلَا تُخْبِرْهُ مَنْ نَحْنُ ، قَالَتْ: فَدَخَلَ بِلَالٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَهُ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ هُمَا؟ فَقَالَ: امْرَأَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ وَزَيْنَبُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّ الزَّيَانِبِ ؟ قَالَ: امْرَأَةُ عَبْدِ اللَّهِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَهُمَا أَجْرَانِ: أَجْرُ الْقَرَابَةِ، وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মহিলা সম্প্রদায়, তোমরা সদকা করো, যদিও তা তোমাদের গয়না-অলংকার থেকে হোক। জাইনাব বলেন, তখন আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ-এর নিকট গিয়ে বললাম, আপনি তো দরিদ্র লোক, এদিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর কাছে গিয়ে জেনে আসুন, আপনাকে সদকা করলে তা আদায় হবে কি না? না হলে অন্য কাউকে দিতে হবে আরকি! আব্দুল্লাহ বললেন, তুমি গেলেই বরং ভালো হবে। তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। সেখানে এক আনসারি মহিলাকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের উভয়ের প্রয়োজন ছিল অভিন্ন। এদিকে আমাদের মনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভয় কাজ করছিল বিধায় সরাসরি তাঁর নিকট যেতে পারছিলাম না। তখনই বিলাল আমাদের দিকে বেরিয়ে এলেন। আমরা তাকে বললাম, ভাই, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট গিয়ে একটু বলুন, দুজন মহিলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং তারা জানতে চায়, যদি তাদের স্বামী ও তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম শিশুদের সদকা করে, তাহলে আদায় হবে কি না? বিলাল রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তা বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ওরা কারা? বিলাল বললেন, জনৈক আনসারি মহিলা আর জাইনাব। রাসুলুল্লাহ বললেন, জাইনাব তো অনেক আছে, তুমি কোন জাইনাবের কথা বলছ? তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ-এর স্ত্রী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, (স্বামী ও নিজেদের তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম শিশুদের সদকা করলে) তারা দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। একে তো আত্মীয়তা- সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব, দ্বিতীয়ত সদকার সাওয়াব। '২২৬
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
‘মিসকিনকে সদকা করলে এক সদকার সাওয়াব। আর আত্মীয়কে দান করলে দুই সদকার সাওয়াব। প্রথমত, সদকার সাওয়াব; দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব।'২২৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ সময় ও সুযোগ পেলেই সাহাবিগণকে আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করার তাগিদ দিতেন।
নিম্নোল্লিখিত হাদিস থেকে সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় :
فَلَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الآيَةُ: {لَنْ تَنَالُوا البِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ} [آل عمران: ٩٢] قَامَ أَبُو طَلْحَةَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَقُولُ: {لَنْ تَنَالُوا البِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ} [آل عمران: ۹۲] وَإِنَّ أَحَبَّ أَمْوَالِي إِلَيَّ بَيْرُحَاءَ، وَإِنَّهَا صَدَقَةٌ لِلَّهِ، أَرْجُو بِرَّهَا وَذُخْرَهَا عِنْدَ اللهِ، فَضَعْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ حَيْثُ أَرَاكَ اللهُ، قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَحْ ذَلِكَ مَالُ رَابِحُ، ذَلِكَ مَالُ رَابِحٌ، وَقَدْ سَمِعْتُ مَا قُلْتَ، وَإِنِّي أَرَى أَنْ تَجْعَلَهَا فِي الأَقْرَبِينَ» فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ: أَفْعَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَقَسَمَهَا أَبُو طَلْحَةَ فِي أَقَارِبِهِ وَبَنِي عَمِّهِ
'যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় না করো। [সুরা আলি ইমরান: ৯২] তখন আবু তালহা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ বলছেন, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় না করো।" আর বাইরুহা বাগানটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। এটি আমি আল্লাহর নামে সদকা করে দিলাম। আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়স্বরূপ থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভালো মনে করেন, তাকে দান করুন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, বাহ! এ সম্পদ অনেক লাভজনক, এ সম্পদ অনেক লাভজনক! তুমি যা বলেছ, তা আমি শুনলাম। আমার মতে এ বাগান তোমার আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে দেওয়া সবচেয়ে উত্তম হবে। তখন আবু তালহা বললেন, তাই করব হে আল্লাহর রাসুল! অতঃপর আবু তালহা বাগানটি তাঁর নিকটাত্মীয় ও চাচার বংশধরদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।'২২৮
রাসুলুল্লাহ ﷺ অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এ সম্পর্কিত একটি হাদিস সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُونَ مِصْرَ وَهِيَ أَرْضُ يُسَمَّى فِيهَا الْقِيرَاطُ، فَإِذَا فَتَحْتُمُوهَا فَأَحْسِنُوا إِلَى أَهْلِهَا، فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا أَوْ قَالَ ذِمَّةٌ وَصِهْرًا
'অচিরেই তোমরা মিশর বিজয় করবে। সেখানে কিরাতের প্রচলন রয়েছে। তোমরা যখন সে দেশ জয় করবে, তখন তার অধিবাসীদের সাথে সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করবে। কেননা, তারা একদিকে তোমাদের করায়ত্তে চলে আসবে, অপরদিকে তাদের সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কও আছে। অথবা বলেছেন, তারা একদিকে তোমাদের করায়ত্তে চলে আসবে, অপরদিকে তাদের সাথে বৈবাহিক সূত্রে তোমাদের আত্মীয়তা আছে।'২২৯
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কিরাম বলেন, মিশরীয়দের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক হলো, হাজিরা ও ইসমাইল তাদের জাতি থেকে ছিলেন। আর বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা হলো, রাসুলুল্লাহ-এর ছেলে ইবরাহিম-এর মাতা মারিয়া ছিলেন তাদেরই বংশের মেয়ে।
আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি ইসলামে কী পরিমাণ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে দেখুন। কত বছর, কত যুগ আগের আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখতে আদেশ করা হয়েছে। এজন্যই প্রকৃত মুসলমান তার কাছের ও দূরের সকল আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখে এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের হক ও অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দেয়।
📄 অমুসলিম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখে
ইসলাম উদারতা ও মানবতার ধর্ম। তাই ইসলাম মুসলিম আত্মীয়দের মতো অমুসলিম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রক্ষা করার কথা বলে। যেমন : আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে উচ্চ আওয়াজে বলতে শুনেছি :
إِنَّ آلَ أَبِي فُلَانٍ لَيْسُوا بِأَوْلِيَائِي، إِنَّمَا وَلِيِّيَ اللَّهُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ، وَلَكِنْ لَهُمْ رَحِمٌ سَأَبُلُّهَا بِبَلَاهَا
'অমুক গোত্রের লোকেরা আমার বন্ধু নয়। আমার বন্ধু হলো আল্লাহ ও সৎকর্মশীল মুসলমানগণ। তবে তাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। সুসম্পর্কের বারিধারা দিয়ে সেটাকে আমি জিইয়ে রাখি (অর্থাৎ তাদের সাথে আত্মীয়তা-সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষা করে চলি)।'২৩০
আবু হুরাইরা থেকে আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন :
لَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ {وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ} [الشعراء: ٢١٤]، دَعَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُرَيْشًا، فَاجْتَمَعُوا فَعَمَّ وَخَصَّ، فَقَالَ: يَا بَنِي كَعْبِ بْنِ لُؤَيِّ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي مُرَّةَ بنِ كَعْبٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ شَمْسٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي هَاشِمٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا فَاطِمَةُ، أَنْقِذِي نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ، فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلَالِهَا
'যখন এ আয়াত নাজিল হলো, “আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।” (সুরা আশ-শুআরা : ২১৪) তখন রাসুলুল্লাহ কুরাইশের বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ লোক সবাইকে ডেকে একত্র করলেন। অতঃপর বললেন, হে আবদে শামসের বংশধর, হে কাব বিন লুয়াইর সন্তানেরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের বাঁচাও। হে মুররা বিন কাবের বংশধর, হে আবদে মানাফের উত্তরসূরিরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে বনি হাশেম, জাহান্নাম থেকে বাঁচো। হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান-সন্ততিরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে ফাতিমা, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। কেননা, আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোনো জিম্মাদারি নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। অবশ্য তোমাদের সাথে যে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রয়েছে, তা আমি সুসম্পর্কের প্রবাহ দ্বারা সিক্ত রাখব (অর্থাৎ তা আমি অবশ্যই অটুট রাখব)। '২৩১
প্রকৃত মুসলমানের হৃদয় থেকে অনুগ্রহ ও করুণার স্রোতধারা কখনো বন্ধ হয় না; বরং এ স্রোতধারা অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনকেও সিঞ্চিত করে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ উচ্চাঙ্গ ও আলংকারিক ভাষায় আত্মীয়তা-সম্পর্কের উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلَالِهَا‘ তবে তোমাদের সাথে আমার যে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রয়েছে, সেটা সুসম্পর্কের স্রোতধারা দিয়ে সিক্ত রাখব।' এখানে আত্মীয়তা-সম্পর্ককে তিনি একটি জমিনের সাথে তুলনা করেছেন, যেটাকে তিনি সুসম্পর্কের স্রোতধারা দিয়ে সিক্ত করবেন। ফলে বিচ্ছিন্নতা, শত্রুতা ও রুক্ষতার আবর্জনা বিদূরিত হয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে এ জমিন। এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম তাদের অমুসলিম আত্মীয়- স্বজনদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতেন। যেমন উমর-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ-এর পক্ষ থেকে হাদিয়া পাওয়া একসেট পোশাক তার এক মুশরিক বৈপিত্রেয় ভাইকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
ইতিপূর্বে আমরা অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ইসলামের নির্দেশ পড়ে এসেছি। এখানে অমুসলিম আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেখতে পেলাম। এটাই ইসলামের উদারতা, মানবিকতা ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বাস্তব প্রমাণ। এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বিশ্বজগতের জন্য রহমত নামে অভিহিত করা হয়েছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ 'আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।'২৩২
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ حُسْنَ الْأَخْلَاقِ 'আমি সুন্দর চরিত্রাবলির পূর্ণতাদানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।'২৩৩
📄 আত্মীয়তা-সম্পর্কের ব্যাপক অর্থ অনুধাবন করে
প্রকৃত মুসলমানের নিকট আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা মানে কেবল তাদের কিছু টাকা-পয়সা দান করা নয়; বরং তার কাছে এ সম্পর্কের অর্থ আরও ব্যাপক। যেমন: তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তাদের কল্যাণ কামনা করা, সাহায্য-সহযোগিতা করা, অগ্রাধিকার দেওয়া, ইনসাফ করা ও টাকা-পয়সার অভাব থাকলে দান করা। এ সবকিছুই আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার অর্থের অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও রয়েছে, তাদের সাথে উত্তম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা, হাসিমুখে ও প্রশান্ত হৃদয়ে সাক্ষাৎ করা, ভুবনভোলানো মুচকি হাসি উপহার দেওয়া। এগুলো ছাড়াও আরও যেসব বিষয় পারস্পরিক ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও সৌহাদ্য-সম্প্রীতি সৃষ্টি করে, সেগুলোও আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপকতার অন্তর্ভুক্ত। এজন্যই রাসুলুল্লাহ খুব ব্যাপক বাক্য উচ্চারণ করে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরশাদ করেছেন: بُلُّوا أَرْحَامَكُمْ وَلَوْ بِالسَّلَامِ
'আত্মীয়তা-সম্পর্ক সিক্ত রাখো; যদিও তা সালাম করার মাধ্যমে হোক। '২৩৪
📄 আত্মীয়-স্বজনরা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে
প্রকৃত মুসলমান আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। তারা তার সাথে সুসম্পর্ক না রাখলেও সে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। কেননা, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম কার্যকর উপায় এবং ইসলামের অন্যতম মৌলিক গুণ। এ ছাড়াও হাদিস শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী সে ব্যক্তিই প্রকৃত আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারী, যে আত্মীয়দের পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে।
হাদিসটি নিম্নরূপ: لَيْسَ الوَاصِلُ بِالْمُكَافِي، وَلَكِنِ الوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا
'যে ব্যক্তি আত্মীয়দের পক্ষ থেকে সুসম্পর্ক রাখার বিনিময়ে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে, সে প্রকৃত আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়; বরং সে ব্যক্তিই প্রকৃত আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারী, যে আত্মীয়দের পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে।'২৩৫
রাসুলুল্লাহ হাদিসে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারীর মাঝে ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমা ও উদারতা-এসব গুণের প্রশংসা করেছেন। আর এ গুণগুলো তার মাঝে তখনই প্রতিফলিত হবে, যখন আত্মীয়-স্বজন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। তা ছাড়া আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারীর সাথে সুসম্পর্ক রাখবেন। এ ঘোষণা সুসম্পর্কের বিনিময়ে সুসম্পর্ক রক্ষাকারীর বেলায় যতটুকু প্রযোজ্য, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি প্রযোজ্য সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যে আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা সত্ত্বেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পাপ ও আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারীর পুণ্যের বিবরণ দিয়েছেন।
হাদিসটি হলো :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ لِي قَرَابَةً أَصِلُهُمْ وَيَقْطَعُونِي، وَأُحْسِنُ إِلَيْهِمْ وَيُسِيئُونَ إِلَيَّ، وَأَحْلُمُ عَنْهُمْ وَيَجْهَلُونَ عَلَيَّ، فَقَالَ: «لَئِنْ كُنْتَ كَمَا قُلْتَ، فَكَأَنَّمَا تُسِفُهُمُ الْمَلَّ وَلَا يَزَالُ مَعَكَ مِنَ اللهِ ظَهِيرٌ عَلَيْهِمْ مَا دُمْتَ عَلَى ذَلِكَ»
'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ -কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের সাথে আমি সুসম্পর্ক রাখি, কিন্তু তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে ভালো আচরণ করি, বিনিময়ে তারা আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। আমি তাদের প্রতি সহনশীল থাকি, কিন্তু তারা আমার সাথে মূর্খতাসুলভ আচরণ করে। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই নিক্ষেপ করেছ। আর যতদিন তুমি এ অবস্থানে অটল থাকবে, ততদিন তাদের বিপক্ষে আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন।'২৩৬
এ হাদিসে লক্ষ করুন, এখানে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষাকারীর ধৈর্য ও সহনশীলতার পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের বলা হয়েছে গরম ছাই ভক্ষণকারী। আসলে অপকারের বিনিময়ে উপকারের পুরস্কার এবং উপকারের বিনিময়ে অপকারের শাস্তি এমনই হয়ে থাকে। আপনি কোনটা বেছে নেবেন?
উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসের মর্ম অনুধাবন করে প্রকৃত মুসলমান সব সময় আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। তাদের পক্ষ থেকে যতই সম্পর্কহীনতা, খারাপ ও মূর্খতাসুলভ আচরণ আসুক, সবগুলোর ওপর ধৈর্য ও সহনশীল থাকে। এসবের মোকাবেলায় ধৈর্য হারিয়ে সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
الرَّحِمُ مُعَلَّقَةٌ بِالْعَرْشِ تَقُولُ مَنْ وَصَلَنِي وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَنِي قَطَعَهُ اللهُ
'আত্মীয়তা-সম্পর্ক আরশের সাথে সংযুক্ত। সে বলে, আমাকে যে রক্ষা করবে, আল্লাহ তার সাথে সুসম্পর্ক রাখবেন; আর আমাকে যে ছিন্ন করবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন।'২৩৭