📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 আত্মীয়তা-সম্পর্ক কী?

📄 আত্মীয়তা-সম্পর্ক কী?


প্রকৃত মুসলমানের সদ্ব্যবহার শুধু পিতা-মাতা ও স্ত্রী-সন্তানদের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অন্য সব আত্মীয়-স্বজনের সাথেও সে সদ্ব্যবহার করে। তাদের সাথে ভদ্রজনোচিত আচরণ করে এবং সুসম্পর্ক রাখে। বংশগত দিক থেকে সম্পর্কিত লোকদের আত্মীয়-স্বজন বলে; চাই তাদের সাথে উত্তরাধিকারের সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ইসলামে আত্মীয়তা-সম্পর্কের গুরুত্ব

📄 ইসলামে আত্মীয়তা-সম্পর্কের গুরুত্ব


আত্মীয়তা-সম্পর্কের প্রতি যতটুকু গুরুত্ব ইসলামে দেওয়া হয়েছে, অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থায় ততটুকু দেওয়া হয়নি। ইসলাম এ সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে এবং সম্পর্কচ্ছেদ করার ব্যাপারে শাস্তির হুমকি দিয়েছে। এ সম্পর্কের প্রতি ইসলাম কতটা গুরুত্ব দিয়েছে, তা সৃষ্টির সূচনাকালের একটি ঘটনা থেকে বুঝা যায়। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর সৃষ্টিকর্ম শেষ করলেন, তখন আত্মীয়তা-সম্পর্ক সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে ছিন্ন করার ব্যাপারে অভিযোগ করল। তখন আল্লাহ তাআলা এ বলে আশ্বস্ত করলেন যে, তাকে যে রক্ষা করবে, তার সাথে আল্লাহর সুসম্পর্ক থাকবে এবং তাকে যে ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাআলা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। ঘটনাটি আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ الْخَلْقَ حَتَّى إِذَا فَرَغَ مِنْهُمْ قَامَتِ الرَّحِمُ، فَقَالَتْ: هَذَا مَقَامُ الْعَائِذِ مِنَ الْقَطِيعَةِ ، قَالَ : نَعَمْ ، أَمَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ، وَأَقْطَعَ مَنْ qَطَعَكِ؟ قَالَتْ: بَلَى، قَالَ: فَذَاكِ لَكِ « ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ : {فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطَّعُوا أَرْحَامَكُمْ، أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ، أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا}
‘আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর সৃষ্টিকর্ম সমাপ্ত করলেন, তখন আত্মীয়তা-সম্পর্ক দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে ছিন্ন করার ব্যাপারে আমার অভিযোগ আছে। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ, অভিযোগ ঠিক আছে। তবে তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমাকে যারা রক্ষা করবে, তাদের সাথে আমার সুসম্পর্ক থাকবে; আর তোমাকে যারা ছিন্ন করবে, তাদের সাথে আমি সম্পর্ক ছিন্ন করব? সে বলল, অবশ্যই (তাতে আমি সন্তুষ্ট)। আল্লাহ তাআলা বললেন, তাহলে এটাই তোমার জন্য থাকল। এরপর রাসুলুল্লাহ বলেন, তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পড়তে পারো, “ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন। তারা কি কুরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না, না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?”২০৯
পবিত্র কুরআনের আরও অনেক আয়াতে আত্মীয়তা-সম্পর্কের গুরুত্বের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। সম্পর্কের এ বন্ধনকে রক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ
‘আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচনা করে থাকো এবং আত্মীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো।’২১০
এ আয়াতে তাকওয়া অবলম্বনের পরপরই আত্মীয়তা-সম্পর্ক বিষয়ে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে আত্মীয়তা-সম্পর্কের প্রতি এটা বিশাল গুরুত্বপ্রদান।
প্রকৃত মুসলমানের অন্তরে আত্মীয়তা-সম্পর্কের গুরুত্বের অনুভব সৃষ্টি হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, অনেক আয়াতে ইমান ও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের পর আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপারে নির্দেশ এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন : وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।'২11
তারপর কিছুদূর গিয়েই তিনি বললেন : وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا
'আত্মীয়-স্বজনকে তার হক দান করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় কোরো না।'২১২
অন্য আয়াতে তিনি বলেন : وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ...
'আর উপাসনা করো আল্লাহর, শরিক কোরো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো এবং নিকটাত্মীয়, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফিরের প্রতিও।'২13
আয়াতসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার পরেই আত্মীয়-স্বজনদের অবস্থান। তারপর অন্যান্য মানবিক সম্পর্কগুলো আসে। ইসলামের এ বিধান মানুষের স্বভাবের অনুকূলে। কেননা, মানুষ প্রথমে পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তারপর আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি, তারপর অন্যান্য মানুষের প্রতি।
আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের একদম প্রাথমিক সময়ের অন্যতম মূলনীতি। রাসুলুল্লাহ যখন থেকেই ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেছেন, তখন থেকেই এ বিষয়ের প্রতি লোকদের দাওয়াত দিয়েছেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় আবু সুফইয়ান -এর কথা থেকে, যা তিনি হিরাক্লিয়াসকে বলেছিলেন। যখন হিরাক্লিয়াস তাকে প্রশ্ন করেছিল, আপনাদের নবি আপনাদের কীসের নির্দেশ দেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, তিনি নির্দেশ দেন, একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করো; তাঁর সাথে শিরক করো না; পূর্বপুরুষদের (ভ্রান্ত) কথা পরিত্যাগ করো—এসব কথা বলেন। আর আমাদের নামাজের নির্দেশ দেন এবং সত্যবাদিতা, নিষ্কলুষতা ও আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ দেন।'২১৪
এখান থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ, যেমন: আল্লাহর একত্ববাদ, নামাজ কায়েম করা, সত্যবাদিতা ও নিষ্কলুষতা অবলম্বন ইত্যাদির অন্যতম। এজন্য এ কথা বলাই যায়, ইসলামধর্মে আত্মীয়তা-সম্পর্কের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
ইসলামের প্রাথমিক মূলনীতিগুলো কী ছিল, এ প্রসঙ্গে আমর বিন আমবাসা -এর একটি দীর্ঘ হাদিস রয়েছে। সেখানে তিনি বলেন: دَخَلْتُ عَلَيْهِ بِمَكَّةَ، فَقُلْتُ لَهُ: مَا أَنْتَ؟ قَالَ: أَنَا نَبِيٌّ، فَقُلْتُ: وَمَا نَبِيٌّ؟ قَالَ: أَرْسَلَنِي اللهُ، فَقُلْتُ: وَبِأَيِّ شَيْءٍ أَرْسَلَكَ، قَالَ: أَرْسَلَنِي بِصِلَةِ الْأَرْحَامِ، وَكَسْرِ الْأَوْثَانِ، وَأَنْ يُوَحَدَ اللهُ لَا يُشْرَكُ بِهِ شَيْءٍ...
'আমি (নবুয়তের প্রথম যুগে) মক্কায় রাসুলুল্লাহ -এর নিকট গেলাম। তাঁকে বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি নবি, আমাকে আল্লাহ তাআলা প্রেরণ করেছেন। আমি বললাম, কী কী বিষয় দিয়ে আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে? তিনি বললেন, আমাকে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা, মূর্তি ভেঙে ফেলা, আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক বিলুপ্ত করা—এসব বিষয় নিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।'২১৫
এখানে রাসুলুল্লাহ সংক্ষেপে দ্বীনের মূলনীতির বিবরণ দেওয়ার সময় আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করাকে প্রথমে উল্লেখ করেছেন। এখান থেকেও বুঝা যায়, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলাম ধর্মে কী পরিমাণ গুরুত্ব রাখে!
এজন্য একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং তা ছিন্ন করার ব্যাপারে শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো:
عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الأَنْصَارِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَخْبِرْنِي بِعَمَلٍ يُدْخِلُنِي الجَنَّةَ، ... فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَعْبُدُ اللهَ لَا تُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمُ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ، وَتَصِلُ الرَّحِم...
'আবু আইয়ুব আনসারি থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরিক করবে না, নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে এবং আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করবে।'২১৬
এ হাদিসে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করাকে আল্লাহর ইবাদত, তাওহিদ, নামাজ ও জাকাতের মতো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধানের সাথে মেলানো হয়েছে। প্রমাণ হলো যে, এটা এমন একটি নেক আমল, যা ব্যক্তির জান্নাতলাভের অসিলা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হতে পারে।
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ 'যে ব্যক্তি রিজিকের প্রশস্ততা ও আয়ু বৃদ্ধি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, সে যেন আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে। '২১৭
এ হাদিস থেকে বুঝা গেল, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করলে রিজিক ও বয়সে বরকত হয়।
ইবনে উমর বলতেন:
مَنِ اتَّقَى رَبَّهُ، وَوَصَلَ رَحِمَهُ، نُسِّئَ فِي أَجَلِهِ، وَتَرَى مَالُهُ، وَأَحَبَّهُ أَهْلُهُ 'যে ব্যক্তি তার রবকে ভয় করে এবং আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে, তার মৃত্যু বিলম্ব করা হয় (তার বয়স বৃদ্ধি পায়); তার ধন-সম্পদ বেড়ে যায় এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে খুব ভালোবাসে। '২১৮
যেভাবে আমরা দেখতে পেলাম, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার ফলে মানুষের রিজিক ও বয়সে বরকত হয় এবং সর্বোপরি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলার রহমত অর্জিত হয়। একইভাবে ইসলামের অসংখ্য নুসুসে (আয়াত ও হাদিসে) আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তিও আমরা দেখতে পাই যে, এর কারণে আল্লাহ তাআলা ক্রোধান্বিত হন এবং লোকজনও ক্রোধান্বিত হয় এবং আখিরাতে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারীর বিপদ, বঞ্চনা ও দুর্ভাগ্যের জন্য নিম্নোল্লিখিত একটি হাদিসই যথেষ্ট, যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন : لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ 'আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।'২১৯
এ ছাড়াও অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এমন জাতির ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় না, যাদের মাঝে আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী লোক থাকে। হাদিসটি ইমাম বাইহাকি তার শুআবুল ইমান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
হাদিসটির ভাষ্য নিম্নরূপ:
لَا تَنْزِلُ الرَّحْمَةُ عَلَى قَوْمٍ فِيهِمْ قَاطِعُ رَحِمٍ
'আল্লাহর রহমত এমন সম্প্রদায়ের ওপর বর্ষিত হয় না, যাদের মাঝে আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী থাকে। '২২০
এজন্যই আবু হুরাইরা আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী কোনো ব্যক্তি আছে, এমন কোনো মজলিসে দুআ করতে চাইতেন না। কারণ, এমন মজলিসের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হয় না বিধায় এখানে দুআ করাটাই বৃথা। একবার জুমার রাতে একটি মজলিসে তিনি বললেন :
أُحَرِّجُ عَلَى كُلِّ قَاطِع رَحِمٍ لَمَا قَامَ مِنْ عِنْدِنَا، فَلَمْ يَقُمْ أَحَدٌ حَتَّى قَالَ ثَلَاثًا، فَأَتَى فَتًى عَمَّةً لَهُ قَدْ صَرَمَهَا مُنْذُ سَنَتَيْنِ، فَدَخَلَ عَلَيْهَا، فَقَالَتْ لَهُ: يَا ابْنَ أَخِي مَا جَاءَ بِكَ؟ قَالَ : سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقُولُ كَذَا وَكَذَا، قَالَتِ ارْجِعْ إِلَيْهِ فَسَلْهُ: لِمَ قَالَ ذَاكَ؟ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ أَعْمَالَ بَنِي آدَمَ تُعْرَضُ عَلَى اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَشِيَّةَ كُلِّ خَمِيسٍ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، فَلَا يَقْبَلُ عَمَلَ قَاطِع رَحِمٍ
'আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারীকে আমি ভালোবাসি না। এমন কেউ থাকলে সে যেন এখান থেকে চলে যায়। কেউ মজলিস থেকে উঠল না। তিনি কথাটি আরও দুবার বললেন। তারপর এক যুবক তার ফুফুর কাছে গেল, যার সাথে তার দুবছরের বেশি সময় ধরে সম্পর্ক ছিন্ন ছিল। ফুফু জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা, এতদিন পর হঠাৎ কী মনে করে? যুবক বলল, আমি আবু হুরাইরা-কে এরূপ বলতে শুনলাম। ফফু বললেন, তাঁর নিকট আবার যাও, গিয়ে জিজ্ঞেস করো, কেন তিনি এমন কথা বললেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আবু হুরাইরা বলেন, আমি নবিজি -কে বলতে শুনেছি, আদম-সন্তানের আমলসমূহ আল্লাহর সমীপে প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পেশ করা হয়, তখন আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী কোনো ব্যক্তির আমল কবুল করা হয় না।'২২১
এ হাদিসগুলো প্রকৃত মুসলমানের হৃদয়কে শক্তভাবে নাড়া দেয়। তাই সে যখন দেখতে পায়, আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে বান্দা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়, তার দুআ কবুল হয় না এবং আমল বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে না। কারণ, এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে যে, বান্দা দুআ করে, কিন্তু তার দুআ কবুল হয় না; আমল করে, কিন্তু আমলনামায় তা লেখা হয় না; আল্লাহর রহমতের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু রহমত তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে!
আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করা এমন এক গুনাহ, যা প্রকৃত মুসলমান থেকে কখনো সংঘটিত হতে পারে না। কারণ, এ গুনাহর কারণে আল্লাহর শাস্তি খুব দ্রুতই এসে পড়ে। অনেক সময় আখিরাতের পূর্বেই দুনিয়াতে এ গুনাহের শাস্তি ভোগ করতে হয়।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে : مَا مِنْ ذَنْبٍ أَحْرَى أَنْ يُعَجِّلَ اللهُ لِصَاحِبِهِ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا، مَعَ مَا يَدَّخِرُ لَهُ فِي الْآخِرَةِ، مِنْ قَطِيعَةِ الرَّحِمِ وَالْبَغْيِ 'আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করা ও (ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহের মতো দুনিয়াতেই তড়িৎ শাস্তির উপযুক্ত আর কোনো গুনাহ নেই। পরকালে তার জন্য যে শাস্তি জমা করে রাখা হয়েছে, তা তো আছেই।'২২২
এ হাদিসে আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করাও এক প্রকার জুলুম। আসলেই তো জুলুম! ভালোবাসার বন্ধন ভেঙে ফেলা ও হৃদ্যতার প্রবহমান নদী শুকিয়ে ফেলা জুলুম নয় তো কী!
আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করা যে একটা জুলুম, রাসুলুল্লাহ -এর কথা থেকে সেটা প্রমাণিত হয়।
তিনি বলেন: إِنَّ الرَّحِمَ شُجْنَةٌ مِنَ الرَّحْمَنِ، تَقُولُ: يَا رَبِّ، إِنِّي ظُلِمْتُ، يَا رَبِّ إِنِّي قُطِعْتُ، يَا رَبِّ إِنِّي إِنِّي، يَا رَبِّ، يَا رَبِّ. فَيُجِيبُهَا: أَلَا تَرْضَيْنَ أَنْ أَقْطَعَ مَنْ قَطَعَكِ، وَأَصِلَ مَنْ وَصَلَكِ؟
'আত্মীয়তা-সম্পর্কের সাথে করুণাময়ের বিশেষ একটা সম্পর্ক আছে। সে যখন বলল, হে আমার রব, আমার প্রতি জুলুম করা হয়েছে। হে আমার রব, আমাকে ছিন্ন করা হয়েছে। হে আমার রব, আমাকে, হে আমার রব, আমাকে... তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও, যে তোমাকে ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব; আর যে তোমাকে রক্ষা করবে, আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব?'২২৩
আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তা-সম্পর্ককে আরও একটি উপায়ে সম্মানিত করেছেন। তা হলো, তিনি তার নাম রেখেছেন নিজের নামের মূলধাতু থেকে। অর্থাৎ আরবি ভাষায় আত্মীয়তা-সম্পর্কের প্রতিশব্দ হলো, الرَّحِمُ। আর আল্লাহ তাআলার বিশেষ একটি নাম হলো, الرَّحْمَنُ (পরম করুণাময়)।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: أَنَا الرَّحْمَنُ ، وَأَنَا خَلَقْتُ الرَّحِمَ ، وَاشْتَقَقْتُ لَهَا مِنَ اسْمِي، فَمَنْ وَصَلَهَا وَصَلْتُهُ، وَمَنْ قَطَعَهَا بَتَتُهُ
‘আমি রহমান (পরম করুণাময়)। আর আমি 'রাহিম' বা আত্মীয়তা- সম্পর্ক সৃষ্টি করেছি এবং তার নাম রেখেছি নিজের নামের মূলধাতু থেকে। সুতরাং যে তাকে রক্ষা করবে, আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব; আর যে তাকে ছিন্ন করবে, আমি তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করব।'২২৪
এ হাদিসে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া গেল যে, মুসলমান যতক্ষণ আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর রহম বা করুণার ছায়া তার মাথার ওপর থাকবে। কিন্তু যখনই তা ছিন্ন করবে, তখনই আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মুসলমান ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে

📄 মুসলমান ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে


প্রকৃত মুসলমান আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। দুনিয়ার ব্যস্ততা, ধন- সম্পদ ও স্ত্রী-সন্তান আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করা থেকে তাকে বিরত রাখে না। প্রত্যেক আত্মীয়ের সাথে গুরুত্ব ও নৈকট্য বিবেচনায় যথাযথভাবে সুসম্পর্ক রাখে এবং সদ্ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে প্রথম মায়ের সাথে, তারপর পিতার সাথে, তারপর এদের পরে সবচেয়ে নিকটাত্মীয়ের সাথে, তারপর এর পরের নিকটাত্মীয়ের সাথে... এভাবে সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখে।
এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :
قَالَ رَجُلٌ : يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ؟ قَالَ: أُمُّكَ، ثُمَّ أُمُّكَ، ثُمَّ أُمُّكَ، ثُمَّ أَبُوكَ، ثُمَّ أَدْنَاكَ أَدْنَاكَ 'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ -এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমার সদাচারের বেশি হকদার কে? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা, তারপর তোমার পিতা, তাদের পরে ক্রমপর্যায়ে তোমার নিকটাত্মীয়রা।'২২৫
আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি অনুগ্রহ করলে দ্বিগুণ সাওয়াব হয়। একটি আত্মীয়তা- সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব, আরেকটি সদকার সাওয়াব। তাই আত্মীয়-স্বজন যদি গরিব হয়, তাহলে দান-সদকার ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য দেওয়া উত্তম। কারণ এতে দ্বিগুণ সাওয়াব হওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের ভালোবাসাও অর্জিত হয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর স্ত্রী জাইনাব সাকাফিয়্যা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ এ বিষয়টির প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
হাদিসটি নিম্নরূপ:
عَنْ زَيْنَبَ امْرَأَةِ عَبْدِ اللهِ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَصَدَّقْنَ، يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ، وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ» قَالَتْ: فَرَجَعْتُ إِلَى عَبْدِ اللهِ فَقُلْتُ: إِنَّكَ رَجُلٌ خَفِيفٌ ذَاتِ الْيَدِ، وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أَمَرَنَا بِالصَّدَقَةِ، فَأْتِهِ فَاسْأَلْهُ، فَإِنْ كَانَ ذَلِكَ يَجْزِي عَنِّي وَإِلَّا صَرَفْتُهَا إِلَى غَيْرِكُمْ، قَالَتْ: فَقَالَ لِي عَبْدُ اللَّهِ: بَلِ ائْتِيهِ أَنْتِ، قَالَتْ: فَانْطَلَقْتُ، فَإِذَا امْرَأَةُ مِنَ الْأَنْصَارِ بِبَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاجَتِي حَاجَتُهَا، قَالَتْ: وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ أُلْقِيَتْ عَلَيْهِ الْمَهَابَةُ، قَالَتْ: فَخَرَجَ عَلَيْنَا بِلَالُ فَقُلْنَا لَهُ: ائْتِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَخْبِرُهُ أَنَّ امْرَأَتَيْنِ بِالْبَابِ تَسْأَلَا نِكَ: أَتُجْزِئُ الصَّدَقَةُ عَنْهُمَا، عَلَى أَزْوَاجِهِمَا، وَعَلَى أَيْتَامٍ فِي حُجُورِهِمَا؟ وَلَا تُخْبِرْهُ مَنْ نَحْنُ ، قَالَتْ: فَدَخَلَ بِلَالٌ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلَهُ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ هُمَا؟ فَقَالَ: امْرَأَةٌ مِنَ الْأَنْصَارِ وَزَيْنَبُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّ الزَّيَانِبِ ؟ قَالَ: امْرَأَةُ عَبْدِ اللَّهِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَهُمَا أَجْرَانِ: أَجْرُ الْقَرَابَةِ، وَأَجْرُ الصَّدَقَةِ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মহিলা সম্প্রদায়, তোমরা সদকা করো, যদিও তা তোমাদের গয়না-অলংকার থেকে হোক। জাইনাব বলেন, তখন আমি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ-এর নিকট গিয়ে বললাম, আপনি তো দরিদ্র লোক, এদিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর কাছে গিয়ে জেনে আসুন, আপনাকে সদকা করলে তা আদায় হবে কি না? না হলে অন্য কাউকে দিতে হবে আরকি! আব্দুল্লাহ বললেন, তুমি গেলেই বরং ভালো হবে। তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। সেখানে এক আনসারি মহিলাকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের উভয়ের প্রয়োজন ছিল অভিন্ন। এদিকে আমাদের মনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভয় কাজ করছিল বিধায় সরাসরি তাঁর নিকট যেতে পারছিলাম না। তখনই বিলাল আমাদের দিকে বেরিয়ে এলেন। আমরা তাকে বললাম, ভাই, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট গিয়ে একটু বলুন, দুজন মহিলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং তারা জানতে চায়, যদি তাদের স্বামী ও তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম শিশুদের সদকা করে, তাহলে আদায় হবে কি না? বিলাল রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তা বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ওরা কারা? বিলাল বললেন, জনৈক আনসারি মহিলা আর জাইনাব। রাসুলুল্লাহ বললেন, জাইনাব তো অনেক আছে, তুমি কোন জাইনাবের কথা বলছ? তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ-এর স্ত্রী। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, (স্বামী ও নিজেদের তত্ত্বাবধানে থাকা এতিম শিশুদের সদকা করলে) তারা দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। একে তো আত্মীয়তা- সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব, দ্বিতীয়ত সদকার সাওয়াব। '২২৬
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
الصَّدَقَةُ عَلَى الْمِسْكِينِ صَدَقَةٌ، وَهِيَ عَلَى ذِي الرَّحِمِ ثِنْتَانِ: صَدَقَةٌ وَصِلَةٌ
‘মিসকিনকে সদকা করলে এক সদকার সাওয়াব। আর আত্মীয়কে দান করলে দুই সদকার সাওয়াব। প্রথমত, সদকার সাওয়াব; দ্বিতীয়ত, আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব।'২২৭
রাসুলুল্লাহ ﷺ সময় ও সুযোগ পেলেই সাহাবিগণকে আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করার তাগিদ দিতেন।
নিম্নোল্লিখিত হাদিস থেকে সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় :
فَلَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الآيَةُ: {لَنْ تَنَالُوا البِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ} [آل عمران: ٩٢] قَامَ أَبُو طَلْحَةَ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَقُولُ: {لَنْ تَنَالُوا البِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ} [آل عمران: ۹۲] وَإِنَّ أَحَبَّ أَمْوَالِي إِلَيَّ بَيْرُحَاءَ، وَإِنَّهَا صَدَقَةٌ لِلَّهِ، أَرْجُو بِرَّهَا وَذُخْرَهَا عِنْدَ اللهِ، فَضَعْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ حَيْثُ أَرَاكَ اللهُ، قَالَ: فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَحْ ذَلِكَ مَالُ رَابِحُ، ذَلِكَ مَالُ رَابِحٌ، وَقَدْ سَمِعْتُ مَا قُلْتَ، وَإِنِّي أَرَى أَنْ تَجْعَلَهَا فِي الأَقْرَبِينَ» فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ: أَفْعَلُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَقَسَمَهَا أَبُو طَلْحَةَ فِي أَقَارِبِهِ وَبَنِي عَمِّهِ
'যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় না করো। [সুরা আলি ইমরান: ৯২] তখন আবু তালহা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ বলছেন, “কস্মিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যদি তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় না করো।" আর বাইরুহা বাগানটি আমার সবচেয়ে প্রিয়। এটি আমি আল্লাহর নামে সদকা করে দিলাম। আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়স্বরূপ থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভালো মনে করেন, তাকে দান করুন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, বাহ! এ সম্পদ অনেক লাভজনক, এ সম্পদ অনেক লাভজনক! তুমি যা বলেছ, তা আমি শুনলাম। আমার মতে এ বাগান তোমার আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে দেওয়া সবচেয়ে উত্তম হবে। তখন আবু তালহা বললেন, তাই করব হে আল্লাহর রাসুল! অতঃপর আবু তালহা বাগানটি তাঁর নিকটাত্মীয় ও চাচার বংশধরদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।'২২৮
রাসুলুল্লাহ ﷺ অনেক দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এ সম্পর্কিত একটি হাদিস সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُونَ مِصْرَ وَهِيَ أَرْضُ يُسَمَّى فِيهَا الْقِيرَاطُ، فَإِذَا فَتَحْتُمُوهَا فَأَحْسِنُوا إِلَى أَهْلِهَا، فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا أَوْ قَالَ ذِمَّةٌ وَصِهْرًا
'অচিরেই তোমরা মিশর বিজয় করবে। সেখানে কিরাতের প্রচলন রয়েছে। তোমরা যখন সে দেশ জয় করবে, তখন তার অধিবাসীদের সাথে সহানুভূতিপূর্ণ ব্যবহার করবে। কেননা, তারা একদিকে তোমাদের করায়ত্তে চলে আসবে, অপরদিকে তাদের সাথে তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কও আছে। অথবা বলেছেন, তারা একদিকে তোমাদের করায়ত্তে চলে আসবে, অপরদিকে তাদের সাথে বৈবাহিক সূত্রে তোমাদের আত্মীয়তা আছে।'২২৯
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কিরাম বলেন, মিশরীয়দের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক হলো, হাজিরা ও ইসমাইল তাদের জাতি থেকে ছিলেন। আর বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তা হলো, রাসুলুল্লাহ-এর ছেলে ইবরাহিম-এর মাতা মারিয়া ছিলেন তাদেরই বংশের মেয়ে।
আত্মীয়তা-সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি ইসলামে কী পরিমাণ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে দেখুন। কত বছর, কত যুগ আগের আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখতে আদেশ করা হয়েছে। এজন্যই প্রকৃত মুসলমান তার কাছের ও দূরের সকল আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখে এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের হক ও অধিকার যথাযথভাবে আদায় করে দেয়।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 অমুসলিম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখে

📄 অমুসলিম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রাখে


ইসলাম উদারতা ও মানবতার ধর্ম। তাই ইসলাম মুসলিম আত্মীয়দের মতো অমুসলিম আত্মীয়দের সাথেও সুসম্পর্ক রক্ষা করার কথা বলে। যেমন : আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে উচ্চ আওয়াজে বলতে শুনেছি :
إِنَّ آلَ أَبِي فُلَانٍ لَيْسُوا بِأَوْلِيَائِي، إِنَّمَا وَلِيِّيَ اللَّهُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ، وَلَكِنْ لَهُمْ رَحِمٌ سَأَبُلُّهَا بِبَلَاهَا
'অমুক গোত্রের লোকেরা আমার বন্ধু নয়। আমার বন্ধু হলো আল্লাহ ও সৎকর্মশীল মুসলমানগণ। তবে তাদের সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। সুসম্পর্কের বারিধারা দিয়ে সেটাকে আমি জিইয়ে রাখি (অর্থাৎ তাদের সাথে আত্মীয়তা-সম্পর্ক যথাযথভাবে রক্ষা করে চলি)।'২৩০
আবু হুরাইরা থেকে আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন :
لَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ {وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ} [الشعراء: ٢١٤]، دَعَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُرَيْشًا، فَاجْتَمَعُوا فَعَمَّ وَخَصَّ، فَقَالَ: يَا بَنِي كَعْبِ بْنِ لُؤَيِّ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي مُرَّةَ بنِ كَعْبٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ شَمْسٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي هَاشِمٍ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ، يَا فَاطِمَةُ، أَنْقِذِي نَفْسَكِ مِنَ النَّارِ، فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلَالِهَا
'যখন এ আয়াত নাজিল হলো, “আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন।” (সুরা আশ-শুআরা : ২১৪) তখন রাসুলুল্লাহ কুরাইশের বিশেষ ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ লোক সবাইকে ডেকে একত্র করলেন। অতঃপর বললেন, হে আবদে শামসের বংশধর, হে কাব বিন লুয়াইর সন্তানেরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের বাঁচাও। হে মুররা বিন কাবের বংশধর, হে আবদে মানাফের উত্তরসূরিরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে বনি হাশেম, জাহান্নাম থেকে বাঁচো। হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান-সন্ততিরা, জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে ফাতিমা, নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। কেননা, আল্লাহর দরবারে তোমাদের কোনো জিম্মাদারি নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। অবশ্য তোমাদের সাথে যে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রয়েছে, তা আমি সুসম্পর্কের প্রবাহ দ্বারা সিক্ত রাখব (অর্থাৎ তা আমি অবশ্যই অটুট রাখব)। '২৩১
প্রকৃত মুসলমানের হৃদয় থেকে অনুগ্রহ ও করুণার স্রোতধারা কখনো বন্ধ হয় না; বরং এ স্রোতধারা অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনকেও সিঞ্চিত করে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ উচ্চাঙ্গ ও আলংকারিক ভাষায় আত্মীয়তা-সম্পর্কের উদাহরণ দিয়েছেন। বলেছেন, غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلَالِهَا‘ তবে তোমাদের সাথে আমার যে আত্মীয়তা-সম্পর্ক রয়েছে, সেটা সুসম্পর্কের স্রোতধারা দিয়ে সিক্ত রাখব।' এখানে আত্মীয়তা-সম্পর্ককে তিনি একটি জমিনের সাথে তুলনা করেছেন, যেটাকে তিনি সুসম্পর্কের স্রোতধারা দিয়ে সিক্ত করবেন। ফলে বিচ্ছিন্নতা, শত্রুতা ও রুক্ষতার আবর্জনা বিদূরিত হয়ে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে এ জমিন। এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম তাদের অমুসলিম আত্মীয়- স্বজনদের সাথে উত্তম আচরণ করতেন এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতেন। যেমন উমর-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসুলুল্লাহ-এর পক্ষ থেকে হাদিয়া পাওয়া একসেট পোশাক তার এক মুশরিক বৈপিত্রেয় ভাইকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
ইতিপূর্বে আমরা অমুসলিম পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ইসলামের নির্দেশ পড়ে এসেছি। এখানে অমুসলিম আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেখতে পেলাম। এটাই ইসলামের উদারতা, মানবিকতা ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বাস্তব প্রমাণ। এজন্যই তো রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বিশ্বজগতের জন্য রহমত নামে অভিহিত করা হয়েছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ 'আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।'২৩২
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ حُسْنَ الْأَخْلَاقِ 'আমি সুন্দর চরিত্রাবলির পূর্ণতাদানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।'২৩৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00