📄 সন্তানদের ওপর কড়া নজর রাখে
প্রকৃত মুসলমান সন্তানদের ওপর দুচোখ খোলা রেখে কড়া নজর রাখে। তারা কী পড়ছে বা কী লিখছে, তার ওপর নজর রাখে। তাদের প্রিয় অভ্যাস বা প্রিয় বস্তু কী, কিংবা তাদের অজান্তেই কোনো অভ্যাস বা বস্তু তাদের প্রিয় হয়ে যাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে। কাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করছে, কাদের সাথে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে, তার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখে। ছুটির দিনে বা অবসর সময়ে কোন জায়গায় তারা বেড়াতে যায়, কী করে সময় অতিবাহিত করে, তা খোলা চোখে নিরীক্ষণ করে। এ সবকিছু তারা সন্তানদের অজান্তেই করে। জীবনের সকল গলিতে তারবিয়াতের প্রকাশ্য সি সি ক্যামেরা বসিয়ে তাদের পথচলার সাবলীলতাকে বিনষ্ট করে না। তবে যখন তাদের পড়াশোনায় বা প্রিয় প্রসঙ্গ নির্বাচনে বিচ্যুতি দেখা যায়, সাথে সাথেই তাদের সর্তক করে দেয়। খারাপ ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখলে বা আপত্তিকর স্থানে যেতে দেখলে তা থেকে বারণ করে। ধূমপান ইত্যাদি কোনো খারাপ স্বভাব তার মাঝে দেখতে পেলে কিংবা সময় ও শক্তি বিনষ্টকারী মাকরুহ ও হারাম খেলাধুলার প্রতি আসক্ত হতে দেখলে কোনোরূপ বিলম্ব না করে উত্তম পদ্ধতিতে তাদের নিষেধ করে এবং সত্য ও সুন্দরের পথ দেখিয়ে দেয়।
এর কারণ হলো, প্রত্যেক সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলাম নিয়ে জন্মলাভ করে। পরবর্তী সময়ে তার পিতা-মাতাই তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এমনটাই বলা হয়েছে।
নিম্নে পিতা-মাতার জন্য সন্তান লালনপালন এবং তাদের সুস্থ বিবেক ও ব্যক্তিত্ব গঠনের কিছু কার্যকর টিপস দেওয়া হলো :
* সন্তানদের হাতে অধ্যয়নের জন্য এমন বই তুলে দেবেন, যা তাদের বুদ্ধির পরিধি প্রশস্ত করবে, তাদের মাঝে উত্তম চরিত্র স্থাপন করবে এবং তাদের ভালো ও আদর্শ মানুষ হওয়ার পাথেয় জোগাবে। এমন বই থেকে সন্তানদের দূরে রাখবেন, যা তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিনষ্ট করবে, স্বভাব-চরিত্র ধ্বংস করবে এবং মনের ভেতর থেকে ভালো ও কল্যাণমূলক কাজের প্রবণতা দূর করে দেবে।
* এমন স্বভাবসমূহকে তাদের নিকট প্রিয় করে তুলতে হবে, যেগুলো তাদের অন্তরে ভালো ও কল্যাণমূলক কাজের প্রবণতা বৃদ্ধি করবে এবং হক ও সত্যের প্রতি আগ্রহবোধ ও জজবা বাড়িয়ে দেবে। তাদের মাঝে উত্তম রুচিবোধ সৃষ্টি করবে। এমন কোনো অভ্যাস বা স্বভাব তাদের প্রিয় হতে দেবেন না, যা তাদের মাঝে খারাপ ও মন্দ কাজের প্রেরণা জোগাবে, ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হতে প্রলুব্ধ করবে এবং তাদের অন্তরে কুরুচিপূর্ণ ভাবনা সৃষ্টি করবে।
* সন্তানরা যেন এমন ছেলেদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, যারা তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, জাহান্নামে নয়। হক ও সত্যের পথে পরিচালিত করবে, বাতিল ও ভ্রান্তির পথে নয়। হিদায়াত, সফলতা, উন্নতি ও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের দিকে পথনির্দেশ করবে, গোমরাহি, ব্যর্থতা, অধঃপতন ও পিতা-মাতার অবাধ্যতার প্রতি নয়। প্রবাদ আছে, 'সঙ্গদোষে স্বভাব নষ্ট।' পিতা-মাতার অবহেলার সুযোগ নিয়ে, খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে কত মানুষ যে পাপের পথে পা বাড়িয়েছে, কত মানুষ ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়েছে, তার নজির মানব-ইতিহাসে খুব একটা কম নয়।
দার্শনিক কবি আদি বিন জাইদ আল-ইবাদি সত্যই বলেছেন :
إذا كنت في قوم فصاحب خيارهم " ولا تصحب الأردى فتردى مع الردي عن المرء لا تسأل وسل عن قرينه " فكل قرين بالمقارن يقتدي
'কোনো জাতির মাঝে থাকতে হলে তুমি তাদের ভালো মানুষদের সংশ্রবে থাকবে, বাজে লোকদের নয়; অন্যথায় তুমিও তাদের মতো নষ্ট হয়ে যাবে।
কারও ব্যাপারে জানতে হলে ব্যক্তিকে নয়; বরং আগে যাচাই করে দেখো, তার বন্ধুবান্ধব কেমন। কারণ, বন্ধু (সাধারণত) তার বন্ধুকেই অনুসরণ করে।'
এভাবে প্রকৃত মুসলমান পিতাকে সন্তানদের লালনপালনের ক্ষেত্রে তাদের বইপুস্তক, ম্যাগাজিন, বন্ধু, প্রিয় প্রসঙ্গসমূহ, স্কুল-মাদরাসা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠী, প্রচারমাধ্যম ইত্যাদি বিষয়— যেগুলো সাধারণত সন্তানদের ব্যক্তিত্ব, আমল, আখলাক, মানসিকতা, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও আকিদায় প্রভাব ফেলে থাকে— সেসবে ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা, এসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি না রাখলে সন্তানদের আমলি তারবিয়াত ব্যাহত হবে এবং তাদের ভেতর বিভিন্ন চারিত্রিক ব্যাধি বাসা বেঁধে ফেলবে।
আমরা দেখি, অনেক পরিবার সন্তানদের সুষ্ঠু লালনপালন ও তাদের নেক সন্তান হিসাবে গড়ে তুলতে শতভাগ সফল, আবার অনেক পরিবার এ ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ। এর পেছনের রহস্য হলো, যেসব পরিবার সন্তানদের লালনপালনের দায়িত্ব সুচারুরূপে আনজাম দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করেছে, সেসব পরিবারের সন্তানেরা পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য কল্যাণের কারণ হয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব পরিবার সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দেয়নি এবং এ সম্পর্কিত ইসলামের আদেশ-নিষেধ মেনে চলেনি, সেসব পরিবারের সন্তানেরা পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা জীবিত থাকতেও সবার জন্য আপদ হয়ে থাকে। মৃত্যুর পরেও এদের অনিষ্ট থেকে মানুষ রেহাই পায় না।
এ ধরনের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ
'হে মুমিনগণ, তোমাদের কোনো কোনো স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। '২০৫
আজ যদি এসব সন্তানের পিতা-মাতা ও অভিভাবক তাদের লালনপালনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করত, তাহলে এরা পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের শত্রু হতো না।
📄 সন্তানদের মাঝে সমতা বিধান করে
সন্তান লালনপালনে ইসলামের আরেকটি নীতি হলো, সকল সন্তানের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠা করা। কোনো বিষয়ে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার না দেওয়া। কেননা, সন্তান যখন বুঝতে পারে, বাবা-মার কাছে সে ও তার অন্যান্য ভাইবোন একই সমান, তখন সুস্থ মানসিকতা নিয়ে সে বড় হয়। কোনো ধরনের হীনম্মন্যতাবোধ তার মাঝে থাকে না। ভাইবোনদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকে না; বরং সবার মাঝে সবার জন্য ভালোবাসা ও উদারতা থাকে। একে অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। এজন্য ইসলাম এ বিষয়টির প্রতি খুব গুরুত্ব দিয়েছে।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম নুমান বিন বাশির সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
আমার পিতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার এ ছেলেকে আমার একটি গোলাম উপহার দিয়েছি। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার অন্য সন্তানদেরও কি এর মতো উপহার দিয়েছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে তা ফিরিয়ে নাও।'
অপর রিওয়ায়াতে এসেছে:
'তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার সকল সন্তানের জন্যই কি এমন করেছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার করো। তখন আমার পিতা এসে উপহারটি ফিরিয়ে নিলেন।'
অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
'রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে বাশির, এ ব্যতীত তোমার আর কোনো সন্তান আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে। তিনি বললেন, এর মতো কি সবাইকে দান করেছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে আমাকে (তোমার এ কাজের) সাক্ষী বানিয়ো না। কেননা, আমি জুলুমের সাক্ষী হই না। তারপর বললেন, তুমি কি এটা পছন্দ করো যে, তোমার প্রত্যেক সন্তান তোমার সাথে সমানভাবে সদ্ব্যবহার করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের মাঝে সমতা বিধান করো।'২০৬
প্রকৃত মুসলমান তার সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করে। উপহার, ভরণপোষণ ও আচরণের ক্ষেত্রে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রাধান্য দেয় না। ফলে তাদের প্রত্যেকেই তার জন্য দুআ করে, প্রত্যেকের অন্তরে তার জন্য মহব্বত থাকে, প্রত্যেক সন্তান তাকে সম্মান করে এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করে।
📄 সন্তানদের উন্নত আখলাক-চরিত্র শিক্ষা দেয়
সন্তানদের আদর্শ সন্তান হিসাবে গড়ে তুলতে হলে তাদের অন্তরে উত্তম আখলাক-চরিত্রের বীজ বপন করতে হয়। এজন্য প্রকৃত মুসলমান তার সন্তানদের উন্নত ও উত্তম আখলাক-চরিত্র শিক্ষাদান করে। মানুষকে ভালোবাসা, দুর্বলদের সহায় হওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, ভালো কাজ করার উৎসাহ বোধ করা, মানুষের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আগ্রহ করা ইত্যাদি যত উন্নত ও উত্তম গুণাবলি রয়েছে—সব তাদের শেখায়। কেননা, যেসব হৃদয় এ গুণাবলি দ্বারা সিক্ত নয়, সেসব হৃদয় থেকে কল্যাণের আশা করা যায় না। কারণ, যার ভেতর যা আছে, তা-ই তো বের হবে! তাই পিতা-মাতা যদি সন্তানদের থেকে কল্যাণের প্রত্যাশা রাখেন, তাহলে তাদের ভেতর উত্তম গুণাবলি ও আখলাক-চরিত্রের চারা রোপণ করতে হবে। এজন্যই বলি, যারা নিম্নোল্লিখিত কথাটি বলেছেন, তারা সত্যিই বলেছেন—
الصَّلَاحُ مِنَ اللَّهِ، وَالْأَدَبُ مِنَ الْآبَاءِ
'সৎপথে চলার প্রবণতা আল্লাহর দান, আর আদব-শিষ্টাচার পিতাদের দান।' ২০৭
প্রকৃত মুসলমান ইসলামের তারবিয়াত-পদ্ধতি অনুসরণ করে সন্তানদের সুষ্ঠুভাবে লালনপালন করে। এর জন্য প্রথমে সে নিজের ঘরকে সন্তানদের বেড়ে ওঠার সুষ্ঠু পরিবেশ হিসাবে গড়ে তোলে। সে পরিবেশে সন্তানদের জন্য থাকে উত্তম ব্যবহার, স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, সকল সন্তানের মাঝে সমতা, যত্নের উষ্ণ পরশ, দুর্বলতামুক্ত নম্রতা ও কঠোরতামুক্ত শাসন। যখন সন্তানেরা এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তখন তারা ছোট থাকতেই ইসলামের উত্তম আখলাক ও গুণগুলো অর্জন করে নেয়। তারা হয়ে ওঠে নেককার, পিতা-মাতার অনুগত ও প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী। ভবিষ্যতের যেকোনো কঠিন দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাদের মাঝে এসে যায়। এভাবে প্রত্যেক এমন পরিবার, যা ইসলামের নির্দেশনা ও কুরআনি শিষ্টাচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সে পরিবারের সন্তানেরা শুরু থেকেই উত্তম আখলাক-চরিত্র নিয়ে বড় হয়।
পবিত্র কুরআনে যথার্থই বলা হয়েছে: صِبْغَةَ اللهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً
'আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রঙের চেয়ে উত্তম রং আর কার হতে পারে?'২০৮