📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সন্তানদের জন্য উদারচিত্তে ব্যয় করে

📄 সন্তানদের জন্য উদারচিত্তে ব্যয় করে


ইসলাম সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সহজাত স্নেহ-ভালোবাসা ও মায়া- মমতাকে যথেষ্ট মনে করেনি। কেননা, অনেক সময় মানুষের জীবন এমন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যে, তখন সন্তানের প্রতি মনোযোগ দেওয়াও হয়ে ওঠে না; তাদের জন্য জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো উৎসর্গ করা তো অনেক দূরের কথা। অথবা অনেক সময় মানুষ জীবন নিয়ে এমন বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে যে, সন্তান লালনপালনের দায়িত্বভার বহন করা কিংবা তাদের পেছনে ব্যয় করার কোনো ইচ্ছাই আর তাদের মনে থাকে না। এজন্য ইসলাম পিতা-মাতার সহজাত আদর-ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতার জন্যও অনেক বড় সাওয়াব নির্ধারণ করে রেখেছে, যেন পরিস্থিতির কারণে সহজাত স্নেহ-ভালোবাসা না থাকলেও সাওয়াবের আশায় সন্তানদের লালনপালন ও তাদের জন্য ব্যয় করতে পিতা- মাতা আগ্রহী হন। এ সম্পর্কিত দু-একটি হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، هَلْ لِي مِنْ أَجْرٍ فِي بَنِي أَبِي سَلَمَةَ أَنْ أُنْفِقَ عَلَيْهِمْ، وَلَسْتُ بِتَارِكَتِهِمْ هَكَذَا وَهَكَذَا، إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ؟ قَالَ: نَعَمْ، لَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ
'আমি রাসুলুল্লাহ-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আবু সালামার সন্তানদের জন্য আমি যা খরচ করি, তার বিনিময়ে আমি কি সাওয়াব পাব? আমি চাই না যে, তারা আমার হাতছাড়া হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ুক। কেননা, তারা তো আমারই সন্তান। তখন রাসুলুল্লাহ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, তাদের জন্য তুমি যা খরচ করবে, তার সাওয়াব পাবে।'১৯৬
আবু মাসউদ বদরি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ
'কোনো ব্যক্তি সাওয়াবের আশা নিয়ে তার পরিবার-পরিজনের (ভরণপোষণের) জন্য যা খরচ করে, তা সদকা হিসাবে পরিগণিত হবে।'১৯৭
শুধু তাই নয়; বরং পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করাকে ইসলাম সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ ও অধিক সাওয়াবপূর্ণ খরচ বলে অভিহিত করেছে।
এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
دِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارُ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ
'একটি দিনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করেছ, একটি দিনার দিয়ে দাস মুক্ত করেছ, একটি দিনার নিঃস্বদের দান করেছ এবং একটি দিনার তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) সেই দিনারটিই উত্তম, যা তুমি পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ।'১৯৮
সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে:
أَفْضَلُ دِينَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ، دِينَارُ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ، وَدِينَارُ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ عَلَى دَابَّتِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِينَارُ يُنْفِقُهُ عَلَى أَصْحَابِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'কোনো ব্যক্তি যেসব দিনার ব্যয় করে থাকে, তন্মধ্যে ওই দিনারটি সবচেয়ে উত্তম, যা সে নিজের পরিবার-পরিজনের (ভরণপোষণের) জন্য ব্যয় করে, অথবা আল্লাহর পথে (অর্থাৎ জিহাদের উদ্দেশ্যে) তার বাহনের জন্য ব্যয় করে, অথবা আল্লাহর পথে (জিহাদের ময়দানে) তার সঙ্গী-সাথিদের জন্য ব্যয় করে।'১৯৯
প্রকৃত মুসলমান পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের পরিবার- পরিজন ও অন্যদের জন্য যা-ই ব্যয় করে, তার বিনিময়ে তাকে অনেক বড় সাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া হবে। এমনকি প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখে ভালোবেসে খাবারের একটি গ্রাস তুলে দিলেও তার জন্য সাওয়াব দেওয়া হবে! এ কথার কথা নয়, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ এমনই বলেছেন।
সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ তাকে বলেছেন:
وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ
'তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যা-ই ব্যয় করবে, তার সাওয়াব দেওয়া হবে। এমনকি খাবারের যে লুকমা তুমি স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তারও সাওয়াব দান করা হবে।'২০০
প্রকৃত মুসলমান পরিবারের লোকদের অনাহারে অর্ধাহারে রেখে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন ও দায়িত্বমুক্ত থাকতে পারে না। কেননা, রাসুলুল্লাহ পারিবারিক দায়িত্ব আদায় না করে বসে থাকা লোকদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি বাক্য উচ্চারণ করেছেন এবং বড় গুনাহ ও কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
'কোনো ব্যক্তি পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে (ভরণপোষণের ক্ষেত্রে) তার ওপর নির্ভরশীলদের রিজিক (দায়িত্ব পালন না করে বা তাতে অবহেলা করে) নষ্ট করে। '২০১

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মায়া-মমতা ও খরচের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে পার্থক্য করে না

📄 মায়া-মমতা ও খরচের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে পার্থক্য করে না


অনেক মানুষ মেয়েসন্তান হলে চরম নাখোশ হয়। তারা আশা করে, আল্লাহ যদি তাদের শুধু পুত্রসন্তানই দান করতেন! এর কারণ হলো, তারা জানে না যে, যাকে আল্লাহ কন্যাসন্তান দান করেছেন, আর সে তার ব্যাপারে ধৈর্য ধরেছে, তাদের ভালোভাবে প্রতিপালন করেছে, মেয়ে বলে তাদের প্রতি মায়া-মমতা ও ভালোবাসায় কোনোরূপ ঘাটতি রাখেনি, সেই পিতার জন্য আল্লাহ কত বড় পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন! কী মহান সৌভাগ্য কন্যাসন্তানের স্নেহশীল পিতার জন্য অপেক্ষা করছে, তা যদি এরা জানত, তাহলে মেয়েসন্তানের পিতার প্রতি রীতিমতো ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠত এবং তারাও কন্যাসন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করত!
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، فَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَّتِهِ، كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ 'যার তিনটি মেয়েসন্তান আছে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করেছে (অর্থাৎ তাদের নিয়ে বিরক্ত হয়নি এবং ধৈর্য সহকারে তাদের লালনপালন করেছে), সাধ্য অনুযায়ী তাদের পানাহারের ব্যবস্থা করেছে, তাদের লেবাস-পোশাকের ব্যবস্থা করেছে, কিয়ামতের দিন এ মেয়েরা তার ও জাহান্নামের মাঝে অন্তরায় হবে।'২০২
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، يُؤْوِيهِنَّ ، وَيَكْفِيهِنَّ، وَيَرْحَمُهُنَّ، فَقَدْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ الْبَتَّةَ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنْ بَعْضِ الْقَوْمِ: وَثِنْتَيْنِ، يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: وَثِنْتَيْنِ
'যার তিনটি কন্যাসন্তান আছে এবং সে তাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যয়ভার বহন করে, তাদের আদর-স্নেহ করে, তার জন্য বেহেশত অবধারিত হয়ে যায়। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, কারও যদি দুটি কন্যাসন্তান থাকে? তিনি বললেন, দুটি থাকলেও। '২০৩
এ হাদিসগুলো শোনার পর, এমন সাওয়াব ও প্রতিদানের ব্যাপারে জানার পর, কোনো পিতা কি কন্যাসন্তানের লালনপালন ও তাদের ব্যয়ভার বহন করতে অবহেলা করতে পারে?
ইসলাম এমন এক জীবনব্যস্থা, যা সর্বযুগের সকল জায়গার মানুষদের ঘটনাপ্রবাহের ওপর দৃষ্টি রাখে এবং তাদের সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দেয়। তাই ইসলাম এ ব্যাপারেও লক্ষ রেখেছে যে, কন্যাসন্তান কখনো তালাকপ্রাপ্ত হয়ে পিতার ঘরে ফিরে আসবে, তখন পিতার আর্থিক অবস্থা ও আয় কম হওয়ার কারণে বা অধিক সন্তানের কারণে খুব একটা সচ্ছল না হতে পারে। ইসলাম বলে, এমন মুহূর্তে যদি কোনো পিতা স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত মেয়েসন্তানের ব্যয়ভার বহন করে এবং তার দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার চেষ্টা করে, এটা তার জন্য সবচেয়ে বড় সদকা এবং আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল ইবাদত হবে।
রাসুলুল্লাহ সুরাকা বিন জুশুম-কে বললেন:
أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ، أَوْ مِنْ أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ؟ قَالَ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ ، قَالَ : ابْنَتُكَ مَرْدُودَةً إِلَيْكَ، لَيْسَ لَهَا كَاسِبٌ غَيْرُكَ
'আমি কি তোমাকে সবচেয়ে বড় সদকার খাত কী, তা জানিয়ে দেবো না? অথবা বললেন, আমি কি তোমাকে সবচেয়ে বড় সদকার অন্যতম খাতের ব্যাপারে অবহিত করব না? তিনি বললেন, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ বললেন, তা হচ্ছে তোমার মেয়ে, যে স্বামীর ঘর থেকে (তালাকপ্রাপ্ত হয়ে) তোমার নিকট ফিরে এসেছে এবং তার জন্য তুমি ছাড়া অন্য কোনো উপার্জনকারী নেই।'২০৪
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় সন্তানরা যেরূপ আদর-ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতা পেয়ে থাকে, পশ্চিমা বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থায় তারা তা থেকে বঞ্চিত। কেননা, পশ্চিমা সমাজে সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, আঠারো বছরে উপনীত হলেই তাকে নিজ দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। তারুণ্যের কোমলতা চলে যাওয়ার পূর্বেই তাকে পেশ করা হয় কঠিন বস্তুবাদী জীবনের সামনে। এতে তার যতই কষ্ট হোক না কেন, বাবা-মার ভালোবাসার উষ্ণ পরশ আর সে পায় না। বস্তুত, এমনই আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে মানবরচিত ভুলে ভরা সমাজব্যবস্থা আর আল্লাহর প্রবর্তিত নিখুঁত ও নির্ভেজাল শরিয়ার মাঝে। একটি ব্যবস্থা (শরিয়াব্যবস্থা) মানুষের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে, আরেকটি মানুষের জীবনকে ভোগবাদ ও বস্তুবাদের আঘাতে দুর্বিষহ করে তোলে।
ফলে দেখা যায়, বস্তুবাদী পৃথিবীর প্রতি চরম বিতৃষ্ণ হয়ে অনেক যুবক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ছাড়াও এ বস্তুবাদী সমাজ পৃথিবীকে একদল অবিবাহিত মা উপহার দেয়। কী অশ্লীল আর নোংরা এ উপহার! সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, এ ধরনের আত্মহত্যাকারী ও অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা দিনদিন তত বেড়েই চলছে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সন্তানদের ওপর কড়া নজর রাখে

📄 সন্তানদের ওপর কড়া নজর রাখে


প্রকৃত মুসলমান সন্তানদের ওপর দুচোখ খোলা রেখে কড়া নজর রাখে। তারা কী পড়ছে বা কী লিখছে, তার ওপর নজর রাখে। তাদের প্রিয় অভ্যাস বা প্রিয় বস্তু কী, কিংবা তাদের অজান্তেই কোনো অভ্যাস বা বস্তু তাদের প্রিয় হয়ে যাচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে। কাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করছে, কাদের সাথে দিনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে, তার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখে। ছুটির দিনে বা অবসর সময়ে কোন জায়গায় তারা বেড়াতে যায়, কী করে সময় অতিবাহিত করে, তা খোলা চোখে নিরীক্ষণ করে। এ সবকিছু তারা সন্তানদের অজান্তেই করে। জীবনের সকল গলিতে তারবিয়াতের প্রকাশ্য সি সি ক্যামেরা বসিয়ে তাদের পথচলার সাবলীলতাকে বিনষ্ট করে না। তবে যখন তাদের পড়াশোনায় বা প্রিয় প্রসঙ্গ নির্বাচনে বিচ্যুতি দেখা যায়, সাথে সাথেই তাদের সর্তক করে দেয়। খারাপ ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখলে বা আপত্তিকর স্থানে যেতে দেখলে তা থেকে বারণ করে। ধূমপান ইত্যাদি কোনো খারাপ স্বভাব তার মাঝে দেখতে পেলে কিংবা সময় ও শক্তি বিনষ্টকারী মাকরুহ ও হারাম খেলাধুলার প্রতি আসক্ত হতে দেখলে কোনোরূপ বিলম্ব না করে উত্তম পদ্ধতিতে তাদের নিষেধ করে এবং সত্য ও সুন্দরের পথ দেখিয়ে দেয়।
এর কারণ হলো, প্রত্যেক সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলাম নিয়ে জন্মলাভ করে। পরবর্তী সময়ে তার পিতা-মাতাই তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি হাদিসে এমনটাই বলা হয়েছে।
নিম্নে পিতা-মাতার জন্য সন্তান লালনপালন এবং তাদের সুস্থ বিবেক ও ব্যক্তিত্ব গঠনের কিছু কার্যকর টিপস দেওয়া হলো :
* সন্তানদের হাতে অধ্যয়নের জন্য এমন বই তুলে দেবেন, যা তাদের বুদ্ধির পরিধি প্রশস্ত করবে, তাদের মাঝে উত্তম চরিত্র স্থাপন করবে এবং তাদের ভালো ও আদর্শ মানুষ হওয়ার পাথেয় জোগাবে। এমন বই থেকে সন্তানদের দূরে রাখবেন, যা তাদের বিবেক-বুদ্ধি বিনষ্ট করবে, স্বভাব-চরিত্র ধ্বংস করবে এবং মনের ভেতর থেকে ভালো ও কল্যাণমূলক কাজের প্রবণতা দূর করে দেবে।
* এমন স্বভাবসমূহকে তাদের নিকট প্রিয় করে তুলতে হবে, যেগুলো তাদের অন্তরে ভালো ও কল্যাণমূলক কাজের প্রবণতা বৃদ্ধি করবে এবং হক ও সত্যের প্রতি আগ্রহবোধ ও জজবা বাড়িয়ে দেবে। তাদের মাঝে উত্তম রুচিবোধ সৃষ্টি করবে। এমন কোনো অভ্যাস বা স্বভাব তাদের প্রিয় হতে দেবেন না, যা তাদের মাঝে খারাপ ও মন্দ কাজের প্রেরণা জোগাবে, ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হতে প্রলুব্ধ করবে এবং তাদের অন্তরে কুরুচিপূর্ণ ভাবনা সৃষ্টি করবে।
* সন্তানরা যেন এমন ছেলেদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে, যারা তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, জাহান্নামে নয়। হক ও সত্যের পথে পরিচালিত করবে, বাতিল ও ভ্রান্তির পথে নয়। হিদায়াত, সফলতা, উন্নতি ও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের দিকে পথনির্দেশ করবে, গোমরাহি, ব্যর্থতা, অধঃপতন ও পিতা-মাতার অবাধ্যতার প্রতি নয়। প্রবাদ আছে, 'সঙ্গদোষে স্বভাব নষ্ট।' পিতা-মাতার অবহেলার সুযোগ নিয়ে, খারাপ লোকের সাথে বন্ধুত্ব করার কারণে কত মানুষ যে পাপের পথে পা বাড়িয়েছে, কত মানুষ ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়েছে, তার নজির মানব-ইতিহাসে খুব একটা কম নয়।
দার্শনিক কবি আদি বিন জাইদ আল-ইবাদি সত্যই বলেছেন :
إذا كنت في قوم فصاحب خيارهم " ولا تصحب الأردى فتردى مع الردي عن المرء لا تسأل وسل عن قرينه " فكل قرين بالمقارن يقتدي
'কোনো জাতির মাঝে থাকতে হলে তুমি তাদের ভালো মানুষদের সংশ্রবে থাকবে, বাজে লোকদের নয়; অন্যথায় তুমিও তাদের মতো নষ্ট হয়ে যাবে।
কারও ব্যাপারে জানতে হলে ব্যক্তিকে নয়; বরং আগে যাচাই করে দেখো, তার বন্ধুবান্ধব কেমন। কারণ, বন্ধু (সাধারণত) তার বন্ধুকেই অনুসরণ করে।'
এভাবে প্রকৃত মুসলমান পিতাকে সন্তানদের লালনপালনের ক্ষেত্রে তাদের বইপুস্তক, ম্যাগাজিন, বন্ধু, প্রিয় প্রসঙ্গসমূহ, স্কুল-মাদরাসা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠী, প্রচারমাধ্যম ইত্যাদি বিষয়— যেগুলো সাধারণত সন্তানদের ব্যক্তিত্ব, আমল, আখলাক, মানসিকতা, মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও আকিদায় প্রভাব ফেলে থাকে— সেসবে ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা, এসব বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি না রাখলে সন্তানদের আমলি তারবিয়াত ব্যাহত হবে এবং তাদের ভেতর বিভিন্ন চারিত্রিক ব্যাধি বাসা বেঁধে ফেলবে।
আমরা দেখি, অনেক পরিবার সন্তানদের সুষ্ঠু লালনপালন ও তাদের নেক সন্তান হিসাবে গড়ে তুলতে শতভাগ সফল, আবার অনেক পরিবার এ ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ। এর পেছনের রহস্য হলো, যেসব পরিবার সন্তানদের লালনপালনের দায়িত্ব সুচারুরূপে আনজাম দিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করেছে, সেসব পরিবারের সন্তানেরা পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য কল্যাণের কারণ হয়েছে। পক্ষান্তরে যেসব পরিবার সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দেয়নি এবং এ সম্পর্কিত ইসলামের আদেশ-নিষেধ মেনে চলেনি, সেসব পরিবারের সন্তানেরা পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য আপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা জীবিত থাকতেও সবার জন্য আপদ হয়ে থাকে। মৃত্যুর পরেও এদের অনিষ্ট থেকে মানুষ রেহাই পায় না।
এ ধরনের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوًّا لَكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ
'হে মুমিনগণ, তোমাদের কোনো কোনো স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের দুশমন। অতএব, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। '২০৫
আজ যদি এসব সন্তানের পিতা-মাতা ও অভিভাবক তাদের লালনপালনের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করত, তাহলে এরা পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের শত্রু হতো না।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সন্তানদের মাঝে সমতা বিধান করে

📄 সন্তানদের মাঝে সমতা বিধান করে


সন্তান লালনপালনে ইসলামের আরেকটি নীতি হলো, সকল সন্তানের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠা করা। কোনো বিষয়ে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার না দেওয়া। কেননা, সন্তান যখন বুঝতে পারে, বাবা-মার কাছে সে ও তার অন্যান্য ভাইবোন একই সমান, তখন সুস্থ মানসিকতা নিয়ে সে বড় হয়। কোনো ধরনের হীনম্মন্যতাবোধ তার মাঝে থাকে না। ভাইবোনদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকে না; বরং সবার মাঝে সবার জন্য ভালোবাসা ও উদারতা থাকে। একে অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। এজন্য ইসলাম এ বিষয়টির প্রতি খুব গুরুত্ব দিয়েছে।
ইমাম বুখারি ও মুসলিম নুমান বিন বাশির সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
আমার পিতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট গিয়ে বললেন, আমার এ ছেলেকে আমার একটি গোলাম উপহার দিয়েছি। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার অন্য সন্তানদেরও কি এর মতো উপহার দিয়েছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে তা ফিরিয়ে নাও।'
অপর রিওয়ায়াতে এসেছে:
'তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমার সকল সন্তানের জন্যই কি এমন করেছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার করো। তখন আমার পিতা এসে উপহারটি ফিরিয়ে নিলেন।'
অপর এক বর্ণনায় এসেছে:
'রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে বাশির, এ ব্যতীত তোমার আর কোনো সন্তান আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে। তিনি বললেন, এর মতো কি সবাইকে দান করেছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে আমাকে (তোমার এ কাজের) সাক্ষী বানিয়ো না। কেননা, আমি জুলুমের সাক্ষী হই না। তারপর বললেন, তুমি কি এটা পছন্দ করো যে, তোমার প্রত্যেক সন্তান তোমার সাথে সমানভাবে সদ্ব্যবহার করবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তাহলে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের মাঝে সমতা বিধান করো।'২০৬
প্রকৃত মুসলমান তার সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করে। উপহার, ভরণপোষণ ও আচরণের ক্ষেত্রে একজনকে আরেকজনের ওপর প্রাধান্য দেয় না। ফলে তাদের প্রত্যেকেই তার জন্য দুআ করে, প্রত্যেকের অন্তরে তার জন্য মহব্বত থাকে, প্রত্যেক সন্তান তাকে সম্মান করে এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00