📘 আদর্শ মুসলিম 📄 সন্তানের লালনপালনে শ্রেষ্ঠতম ও কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করে

📄 সন্তানের লালনপালনে শ্রেষ্ঠতম ও কৌশলগত পন্থা অবলম্বন করে


বিচক্ষণ মুসলিম পিতা-মাতা সন্তানের মানসিকতা ও মনের কথা বুঝতে পারে। ফলে সে অনুযায়ী সন্তানের সামনে তারা নিজেদের উপস্থাপন করে। তাদের চরিত্রগঠন ও দিক-নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম ও কৌশলগত উপায় অবলম্বন করে।
মুসলমান পিতা-মাতা বিভিন্ন উপায়ে সন্তানদের হৃদয়ে স্থান করে নেয় এবং তাদের নিকটতম বন্ধু হয়ে যায়। তাদের পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন করে। তাদের সাথে খেলাধুলা করে, হাসি-কৌতুক করে। স্নেহ ও মমতামধুর ভাষায় কথা বলে। ফলে সন্তানরাও মা-বাবাকে ভালোবাসতে শুরু করে। তাদের আদেশ-নিষেধ ও দিক-নির্দেশনা পূর্ণরূপে মেনে চলে। এ আনুগত্য কোনো ভয়ের কারণে নয়; বরং পিতা-মাতার প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার কারণে। পক্ষান্তরে যে বাবা-মা সন্তানদের সাথে কঠোর আচরণ করে, কথায় কথায় তাদের শাসায়, তিরস্কার করে— এদের সন্তানরাও তাদের আনুগত্য করে, তবে এ আনুগত্য ভয়ের কারণে, ভালোবাসা বা ভক্তির কারণে নয়। এ দুই আনুগত্যের মাঝে বড় ব্যবধান রয়েছে। যে আনুগত্য ভক্তি ও ভালোবাসার কারণে হয়, তা আজীবন টিকে থাকে। আর যে আনুগত্য ভয়ের কারণে হয়, তা একসময় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
অনেক মানুষ মনে করে, সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করলে তারা মাথায় উঠে নাচবে, পিতা-মাতার সম্মান করবে না। কিন্তু এ ধারণা ভুল। কেননা, সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে তাদের লালনপালন করা নববি পদ্ধতি। পনেরো শত বছর পূর্বে রাসূলুল্লাহ তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে উম্মাহকে এ পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন।
এ সম্পর্কিত কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো:
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُفُ عَبْدَ اللَّهِ، وَعُبَيْدَ اللهِ، وَكُثَيْرًا بَنِي الْعَبَّاسِ ، ثُمَّ يَقُولُ: مَنْ سَبَقَ إِلَيَّ فَلَهُ كَذَا وَكَذَا قَالَ: فَيَسْتَبِقُونَ إِلَيْهِ فَيَقَعُونَ عَلَى ظَهْرِهِ وَصَدْرِهِ، فَيُقَبِّلُهُمْ وَيَلْتَزَمُهُمْ
‘রাসুলুল্লাহ আব্বাস-এর ছেলে আব্দুল্লাহ, উবাইদুল্লাহ ও কুসাইয়‍্যারকে একসারিতে দাঁড় করিয়ে বলতেন, আমার নিকট যে আগে পৌঁছতে পারবে, তাকে এমন এমন পুরস্কার দেওয়া হবে। তখন তারা দৌড়ে এসে রাসুলুল্লাহ-এর পিঠ ও বুকের ওপর উঠে যেতেন। রাসুলুল্লাহ আদর করে তাদের চুমু খেতেন। '১৮৮
ইমাম বুখারি ও তাবারানি আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন:
أَخَذَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِ الحَسَنِ أَوِ الحُسَينِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا ثُمَّ وَضَعَ قَدَمَيْهِ عَلَى قَدَمَيْهِ ثُم قَالَ: تَرَقَّ
'রাসুলুল্লাহ হাসান অথবা হুসাইন-এর হাত ধরলেন এবং তার পা নিজের পায়ের ওপর রেখে বললেন, আরোহণ করো। '১৮৯
নবিজি হাসান ও হুসাইন-কে কাঁধের ওপর উঠিয়ে এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুসুলভ আচরণ করার মাধ্যমে উম্মাহর সর্বযুগের সকল দেশের পিতা ও দাদা-নানাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে সন্তানদের লালনপালন করতে হবে। বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষ যত সম্মানিত ও মর্যাদাবানই হোক না কেন, সন্তানদের এভাবেই লালনপালন করতে হবে। এ সম্পর্কিত ঘটনাটি শাদ্দাদ-এর সূত্রে ইমাম আহমাদ ও নাসায়ি বর্ণনা করেছেন।
শাদ্দাদ বলেন: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي إِحْدَى صَلَاتَيِ الْعِشَاءِ وَهُوَ حَامِلٌ حَسَنًا أَوْ حُسَيْنًا، فَتَقَدَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ، ثُمَّ كَبَّرَ لِلصَّلَاةِ فَصَلَّى فَسَجَدَ بَيْنَ ظَهْرَانَي صَلَاتِهِ سَجْدَةً أَطَالَهَا، قَالَ أَبِي: فَرَفَعْتُ رَأْسِي وَإِذَا الصَّبِيُّ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَهُوَ سَاجِدٌ فَرَجَعْتُ إِلَى سُجُودِي، فَلَمَّا قَضَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَالَ النَّاسُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّكَ سَجَدْتَ بَيْنَ ظَهْرَانَي صَلَاتِكَ سَجْدَةً أَطَلْتَهَا حَتَّى ظَنَنَّا أَنَّهُ قَدْ حَدَثَ أَمْرُ أَوْ أَنَّهُ يُوحَى إِلَيْكَ، قَالَ: كُلُّ ذَلِكَ لَمْ يَكُنْ وَلَكِنَّ ابْنِي ارْتَحَلَنِي فَكَرِهْتُ أَنْ أُعَجِّلَهُ حَتَّى يَقْضِيَ حَاجَتَهُ
‘রাসুলুল্লাহ ﷺ হাসান অথবা হুসাইন রা.-কে কোলে নিয়ে বের হলেন। তাকে পাশে রেখে তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। তারপর যথারীতি তাকবির বলে নামাজ শুরু করলেন। সিজদায় যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে উঠছেন না দেখে আমি মাথা তুলে তাকালাম। দেখলাম, বাচ্চাটা তাঁর পিঠের ওপর বসে আছে। আমি পুনরায় সিজদায় ফিরে গেলাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এত দীর্ঘক্ষণ সিজদা করলেন যে! তিনি বললেন, বাচ্চাটা আমার ওপর সওয়ার হয়েছিল, আর আমি তার প্রয়োজন পূরণ করার পূর্বে তাড়াহুড়া করাটা ভালো মনে করিনি। ১৯০
সন্তানদের সাথে মুসলমান পিতা-মাতার আচরণ এমনই হওয়া উচিত। যথাসম্ভব তাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করা, বন্ধুসুলভ আচরণ করা, হাসি-কৌতুক করা, তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া একজন সফল বাবা- মা হওয়ার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে মুসলমান পিতা-মাতার মাঝে এ গুণগুলো অবশ্যই থাকা চাই।

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা অনুভব করে

📄 সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা অনুভব করে


একজন আদর্শ পিতা হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম জরুরি হলো, সন্তানদের প্রতি দয়া, স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা থাকা। তখনই সন্তানরা সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে পারবে এবং তাদের অন্তরে সাহস ও মনোবল সৃষ্টি হবে। তাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন হবে এবং বুদ্ধি-বিবেক স্বচ্ছ ও তীক্ষ্ণ হবে।
আদর-স্নেহ ইসলামের একটি মৌলিক চরিত্র। এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণও বটে।
আনাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا كَانَ أَرْحَمَ بِالْعِيَالِ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: «كَانَ إِبْرَاهِيمُ مُسْتَرْضِعًا لَهُ فِي عَوَالِي الْمَدِينَةِ، فَكَانَ يَنْطَلِقُ وَنَحْنُ مَعَهُ فَيَدْخُلُ الْبَيْتَ وَإِنَّهُ لَيُدَّخَنُ، وَكَانَ ظِرُهُ قَيْنًا، فَيَأْخُذُهُ فَيُقَبِّلُهُ، ثُمَّ يَرْجِعُ
'আমি রাসুলুল্লাহ -এর মতো পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক আদর-স্নেহ করতে আর কাউকে দেখিনি। মদিনার উপকণ্ঠে একটি বাড়িতে ইবরাহিম দুধ পান করতেন। রাসুলুল্লাহ হেঁটে হেঁটে সেখানে যেতেন। আমরাও তাঁর সাথে থাকতাম। বাড়িতে প্রবেশ করে তিনি তাকে কোলে নিয়ে চুমু খেতেন, এরপর ফিরে আসতেন।'১৯১
কচি কচি প্রস্ফুটমান মুসলমান শিশুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ -এর দয়া ও মমতা অনেক বিস্তৃত ছিল, আদর-স্নেহের ছায়াময় পরিধি অনেক প্রশস্ত ছিল। খেলাধুলায় ব্যস্ত শিশুদের সাথে মিশে যেতেন তিনি। তাদের ঢেকে নিতেন স্নেহ-ভালোবাসার উষ্ণ চাদরে।
এ সম্পর্কে আনাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ যখন শিশুদের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন হর্ষোৎফুল্ল হয়ে তাদের সাথে মিশতেন এবং তাদের সালাম দিতেন।
তারবিয়াত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ -এর অমর এক বাণী হলো :
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا
'সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের মান-ইজ্জত বুঝে না।'১৯২
আবু হুরাইরা বর্ণনা করেন:
قَبَّلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الحَسَنَ بْنَ عَلِيَّ وَعِنْدَهُ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسِ التَّمِيمِيُّ جَالِسًا، فَقَالَ الأَقْرَعُ: إِنَّ لِي عَشَرَةٌ مِنَ الوَلَدِ مَا قَبَّلْتُ مِنْهُمْ أَحَدًا، فَنَظَرَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
'রাসুলুল্লাহ হাসান-কে চুমু খেলেন। তখন তাঁর নিকট আকরা বিন হাবিস তামিমি ছিলেন। তিনি বললেন, আমার দশটি বাচ্চা আছে, আমি তাদের কখনো চুমু খাইনি। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, যে দয়া (আদর-স্নেহ) করে না, তাকে দয়া করা হবে না।'১৯৩
রাসুলুল্লাহ ছিলেন উম্মাহর মহান অভিভাবক ও লালনপালনকারী। তিনি মানুষের চরিত্র গঠন করতেন। তাদের অন্তরে দয়া-মায়া ও আদর-স্নেহের স্রোতধারা জারি করার চেষ্টা করতেন। তাদের অন্তরসমূহ আদর-ভালোবাসা ও মায়া-মমতায় ভরে দিতে চাইতেন, যা মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَ أَعْرَابِيُّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَتُقَبِّلُونَ صِبْيَانَكُمْ ۚ فَمَا نُقَبِّلُهُمْ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَوَ أَمْلِكُ لَكَ أَنْ نَزَعَ اللَّهُ مِنْ قَلْبِكَ الرَّحْمَةَ؟
'জনৈক বেদুইন নবিজি-এর নিকট এসে বললেন, আপনারা দেখি বাচ্চাদের চুমু খান! আমরা তো আমাদের বাচ্চাদের চুমু খাই না। তখন নবিজি বললেন, তোমাদের অন্তর থেকে আল্লাহ দয়া-মায়া তুলে নিয়েছেন বলে কি আমাদের অন্তর থেকেও তুলে নেবেন?'১৯৪
উম্মুল মুমিনিন আয়িশা বর্ণনা করেন:
وَكَانَتْ إِذَا دَخَلَتْ عَلَيْهِ قَامَ إِلَيْهَا، فَرَحَّبَ بِهَا وَقَبَّلَهَا، وَأَجْلَسَهَا فِي مَجْلِسِهِ، وَكَانَ إِذَا دَخَلَ عَلَيْهَا قَامَتْ إِلَيْهِ فَأَخَذَتْ بِيَدِهِ، فَرَحَّبَتْ بِهِ وَقَبَّلَتْهُ، وَأَجْلَسَتْهُ فِي مَجْلِسِهَا، فَدَخَلَتْ عَلَيْهِ فِي مَرَضِهِ الَّذِي تُوُفِّيَ، فَرَحَّبَ بِهَا وَقَبَّلَهَا
'ফাতিমা যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট আসতেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতেন। তাকে চুম্বন করে পাশে বসাতেন। একইভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিকট গেলে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন। তাঁর হাত ধরে তাঁকে বরণ করে নিতেন। তারপর চুম্বন করে পাশে বসাতেন। মৃত্যুপূর্ববর্তী অসুস্থতার সময়েও যখন ফাতিমা আসলেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে অভিবাদন জানালেন এবং চুম্বন করলেন। '১৯৫
প্রকৃত মুসলমান রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা অনুসরণ করে চলে, তাই সে সন্তানদের প্রতি কখনো নির্দয় হয় না। আচার-আচরণে নীরস ও শুষ্ক হয় না। কথাবার্তায় কঠোর ও রুক্ষ হয় না। এমনকি তার চরিত্রে সহজাত রুক্ষতা ও শুষ্কতা থাকলেও দ্বীনের নির্দেশনা জানার পর তদস্থলে নম্রতা, আদর- স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা স্থাপন করে নেয়। এক কথায় বললে, প্রকৃত মুসলমানের নিকট সন্তানরা হলো তার কলিজার টুকরো, যা শরীর থেকে আলাদা হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করছে এই যা!
কবি খুব সুন্দর বলেছেন:
وإنما لأولادنا بيننا * أكبادنا تمشى على الأرض إن هبت الريح على بعضهم * تمتنع العين من الغمض
'আমাদের ছেলেমেয়ে আমাদের কলিজার টুকরা, যা পৃথিবীর বুকে বিচরণ করে।
বাতাস যদি তাদের শরীরে হালকাও আঘাত করে, উধাও হয়ে যায় আমাদের নিদ্রা।'
সারকথা হলো, পিতা-মাতা মানে মায়া-মমতার মূর্তপ্রতীক, উপচে পড়া স্নেহ- ভালোবাসার আধার এবং ত্যাগ-বিসর্জনের ঊর্মিমালা।

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 সন্তানদের জন্য উদারচিত্তে ব্যয় করে

📄 সন্তানদের জন্য উদারচিত্তে ব্যয় করে


ইসলাম সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সহজাত স্নেহ-ভালোবাসা ও মায়া- মমতাকে যথেষ্ট মনে করেনি। কেননা, অনেক সময় মানুষের জীবন এমন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যে, তখন সন্তানের প্রতি মনোযোগ দেওয়াও হয়ে ওঠে না; তাদের জন্য জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো উৎসর্গ করা তো অনেক দূরের কথা। অথবা অনেক সময় মানুষ জীবন নিয়ে এমন বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে যে, সন্তান লালনপালনের দায়িত্বভার বহন করা কিংবা তাদের পেছনে ব্যয় করার কোনো ইচ্ছাই আর তাদের মনে থাকে না। এজন্য ইসলাম পিতা-মাতার সহজাত আদর-ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতার জন্যও অনেক বড় সাওয়াব নির্ধারণ করে রেখেছে, যেন পরিস্থিতির কারণে সহজাত স্নেহ-ভালোবাসা না থাকলেও সাওয়াবের আশায় সন্তানদের লালনপালন ও তাদের জন্য ব্যয় করতে পিতা- মাতা আগ্রহী হন। এ সম্পর্কিত দু-একটি হাদিস নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، هَلْ لِي مِنْ أَجْرٍ فِي بَنِي أَبِي سَلَمَةَ أَنْ أُنْفِقَ عَلَيْهِمْ، وَلَسْتُ بِتَارِكَتِهِمْ هَكَذَا وَهَكَذَا، إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ؟ قَالَ: نَعَمْ، لَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ
'আমি রাসুলুল্লাহ-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আবু সালামার সন্তানদের জন্য আমি যা খরচ করি, তার বিনিময়ে আমি কি সাওয়াব পাব? আমি চাই না যে, তারা আমার হাতছাড়া হয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ুক। কেননা, তারা তো আমারই সন্তান। তখন রাসুলুল্লাহ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, তাদের জন্য তুমি যা খরচ করবে, তার সাওয়াব পাবে।'১৯৬
আবু মাসউদ বদরি বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ
'কোনো ব্যক্তি সাওয়াবের আশা নিয়ে তার পরিবার-পরিজনের (ভরণপোষণের) জন্য যা খরচ করে, তা সদকা হিসাবে পরিগণিত হবে।'১৯৭
শুধু তাই নয়; বরং পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করাকে ইসলাম সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ ও অধিক সাওয়াবপূর্ণ খরচ বলে অভিহিত করেছে।
এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
دِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ فِي رَقَبَةٍ، وَدِينَارُ تَصَدَّقْتَ بِهِ عَلَى مِسْكِينٍ، وَدِينَارُ أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ، أَعْظَمُهَا أَجْرًا الَّذِي أَنْفَقْتَهُ عَلَى أَهْلِكَ
'একটি দিনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করেছ, একটি দিনার দিয়ে দাস মুক্ত করেছ, একটি দিনার নিঃস্বদের দান করেছ এবং একটি দিনার তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) সেই দিনারটিই উত্তম, যা তুমি পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করেছ।'১৯৮
সহিহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে:
أَفْضَلُ دِينَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ، دِينَارُ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ، وَدِينَارُ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ عَلَى دَابَّتِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَدِينَارُ يُنْفِقُهُ عَلَى أَصْحَابِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
'কোনো ব্যক্তি যেসব দিনার ব্যয় করে থাকে, তন্মধ্যে ওই দিনারটি সবচেয়ে উত্তম, যা সে নিজের পরিবার-পরিজনের (ভরণপোষণের) জন্য ব্যয় করে, অথবা আল্লাহর পথে (অর্থাৎ জিহাদের উদ্দেশ্যে) তার বাহনের জন্য ব্যয় করে, অথবা আল্লাহর পথে (জিহাদের ময়দানে) তার সঙ্গী-সাথিদের জন্য ব্যয় করে।'১৯৯
প্রকৃত মুসলমান পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ, সে বিশ্বাস করে, মুসলমান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের পরিবার- পরিজন ও অন্যদের জন্য যা-ই ব্যয় করে, তার বিনিময়ে তাকে অনেক বড় সাওয়াব ও প্রতিদান দেওয়া হবে। এমনকি প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখে ভালোবেসে খাবারের একটি গ্রাস তুলে দিলেও তার জন্য সাওয়াব দেওয়া হবে! এ কথার কথা নয়, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ এমনই বলেছেন।
সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ তাকে বলেছেন:
وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ بِهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ
'তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যা-ই ব্যয় করবে, তার সাওয়াব দেওয়া হবে। এমনকি খাবারের যে লুকমা তুমি স্ত্রীর মুখে তুলে দাও, তারও সাওয়াব দান করা হবে।'২০০
প্রকৃত মুসলমান পরিবারের লোকদের অনাহারে অর্ধাহারে রেখে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন ও দায়িত্বমুক্ত থাকতে পারে না। কেননা, রাসুলুল্লাহ পারিবারিক দায়িত্ব আদায় না করে বসে থাকা লোকদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি বাক্য উচ্চারণ করেছেন এবং বড় গুনাহ ও কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
'কোনো ব্যক্তি পাপী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে (ভরণপোষণের ক্ষেত্রে) তার ওপর নির্ভরশীলদের রিজিক (দায়িত্ব পালন না করে বা তাতে অবহেলা করে) নষ্ট করে। '২০১

📘 আদর্শ মুসলিম 📄 মায়া-মমতা ও খরচের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে পার্থক্য করে না

📄 মায়া-মমতা ও খরচের ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মাঝে পার্থক্য করে না


অনেক মানুষ মেয়েসন্তান হলে চরম নাখোশ হয়। তারা আশা করে, আল্লাহ যদি তাদের শুধু পুত্রসন্তানই দান করতেন! এর কারণ হলো, তারা জানে না যে, যাকে আল্লাহ কন্যাসন্তান দান করেছেন, আর সে তার ব্যাপারে ধৈর্য ধরেছে, তাদের ভালোভাবে প্রতিপালন করেছে, মেয়ে বলে তাদের প্রতি মায়া-মমতা ও ভালোবাসায় কোনোরূপ ঘাটতি রাখেনি, সেই পিতার জন্য আল্লাহ কত বড় পুরস্কার তৈরি করে রেখেছেন! কী মহান সৌভাগ্য কন্যাসন্তানের স্নেহশীল পিতার জন্য অপেক্ষা করছে, তা যদি এরা জানত, তাহলে মেয়েসন্তানের পিতার প্রতি রীতিমতো ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠত এবং তারাও কন্যাসন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করত!
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، فَأَطْعَمَهُنَّ وَسَقَاهُنَّ وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَّتِهِ، كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ 'যার তিনটি মেয়েসন্তান আছে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করেছে (অর্থাৎ তাদের নিয়ে বিরক্ত হয়নি এবং ধৈর্য সহকারে তাদের লালনপালন করেছে), সাধ্য অনুযায়ী তাদের পানাহারের ব্যবস্থা করেছে, তাদের লেবাস-পোশাকের ব্যবস্থা করেছে, কিয়ামতের দিন এ মেয়েরা তার ও জাহান্নামের মাঝে অন্তরায় হবে।'২০২
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেছেন:
مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ، يُؤْوِيهِنَّ ، وَيَكْفِيهِنَّ، وَيَرْحَمُهُنَّ، فَقَدْ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ الْبَتَّةَ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنْ بَعْضِ الْقَوْمِ: وَثِنْتَيْنِ، يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: وَثِنْتَيْنِ
'যার তিনটি কন্যাসন্তান আছে এবং সে তাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যয়ভার বহন করে, তাদের আদর-স্নেহ করে, তার জন্য বেহেশত অবধারিত হয়ে যায়। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, কারও যদি দুটি কন্যাসন্তান থাকে? তিনি বললেন, দুটি থাকলেও। '২০৩
এ হাদিসগুলো শোনার পর, এমন সাওয়াব ও প্রতিদানের ব্যাপারে জানার পর, কোনো পিতা কি কন্যাসন্তানের লালনপালন ও তাদের ব্যয়ভার বহন করতে অবহেলা করতে পারে?
ইসলাম এমন এক জীবনব্যস্থা, যা সর্বযুগের সকল জায়গার মানুষদের ঘটনাপ্রবাহের ওপর দৃষ্টি রাখে এবং তাদের সকল সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দেয়। তাই ইসলাম এ ব্যাপারেও লক্ষ রেখেছে যে, কন্যাসন্তান কখনো তালাকপ্রাপ্ত হয়ে পিতার ঘরে ফিরে আসবে, তখন পিতার আর্থিক অবস্থা ও আয় কম হওয়ার কারণে বা অধিক সন্তানের কারণে খুব একটা সচ্ছল না হতে পারে। ইসলাম বলে, এমন মুহূর্তে যদি কোনো পিতা স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত মেয়েসন্তানের ব্যয়ভার বহন করে এবং তার দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার চেষ্টা করে, এটা তার জন্য সবচেয়ে বড় সদকা এবং আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল ইবাদত হবে।
রাসুলুল্লাহ সুরাকা বিন জুশুম-কে বললেন:
أَلَا أَدُلُّكَ عَلَى أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ، أَوْ مِنْ أَعْظَمِ الصَّدَقَةِ؟ قَالَ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ ، قَالَ : ابْنَتُكَ مَرْدُودَةً إِلَيْكَ، لَيْسَ لَهَا كَاسِبٌ غَيْرُكَ
'আমি কি তোমাকে সবচেয়ে বড় সদকার খাত কী, তা জানিয়ে দেবো না? অথবা বললেন, আমি কি তোমাকে সবচেয়ে বড় সদকার অন্যতম খাতের ব্যাপারে অবহিত করব না? তিনি বললেন, অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ বললেন, তা হচ্ছে তোমার মেয়ে, যে স্বামীর ঘর থেকে (তালাকপ্রাপ্ত হয়ে) তোমার নিকট ফিরে এসেছে এবং তার জন্য তুমি ছাড়া অন্য কোনো উপার্জনকারী নেই।'২০৪
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় সন্তানরা যেরূপ আদর-ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতা পেয়ে থাকে, পশ্চিমা বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থায় তারা তা থেকে বঞ্চিত। কেননা, পশ্চিমা সমাজে সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, আঠারো বছরে উপনীত হলেই তাকে নিজ দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। তারুণ্যের কোমলতা চলে যাওয়ার পূর্বেই তাকে পেশ করা হয় কঠিন বস্তুবাদী জীবনের সামনে। এতে তার যতই কষ্ট হোক না কেন, বাবা-মার ভালোবাসার উষ্ণ পরশ আর সে পায় না। বস্তুত, এমনই আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে মানবরচিত ভুলে ভরা সমাজব্যবস্থা আর আল্লাহর প্রবর্তিত নিখুঁত ও নির্ভেজাল শরিয়ার মাঝে। একটি ব্যবস্থা (শরিয়াব্যবস্থা) মানুষের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে, আরেকটি মানুষের জীবনকে ভোগবাদ ও বস্তুবাদের আঘাতে দুর্বিষহ করে তোলে।
ফলে দেখা যায়, বস্তুবাদী পৃথিবীর প্রতি চরম বিতৃষ্ণ হয়ে অনেক যুবক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ছাড়াও এ বস্তুবাদী সমাজ পৃথিবীকে একদল অবিবাহিত মা উপহার দেয়। কী অশ্লীল আর নোংরা এ উপহার! সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, এ ধরনের আত্মহত্যাকারী ও অবিবাহিত মায়ের সংখ্যা দিনদিন তত বেড়েই চলছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px