📄 স্ত্রীর ওপর আল্লাহপ্রদত্ত কর্তৃত্বকে উত্তম পন্থায় ব্যবহার করে
মুসলমান স্বামী যখন তার স্ত্রীর সাথে ইসলামের উন্নত আদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করে এবং তার সাথে উত্তম ব্যবহার করে, তখন সে স্ত্রীর হৃদয়-রাজ্যের রাজত্ব লাভ করে। তার সব কথা স্ত্রী মেনে চলে। এভাবেই একজন প্রকৃত মুসলমান নারীর ওপর পুরুষের আল্লাহপ্রদত্ত কর্তৃত্বের সার্থক বাস্তবায়ন ঘটায়।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
'পুরুষেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল এজন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এজন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে।'১৬৯
এ কর্তৃত্বের কারণে পুরুষের কাঁধে অনেক জিম্মাদারি ও দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। তাই স্বামী তার স্ত্রীর পরিপূর্ণ জিম্মাদার ও দায়িত্বশীল।
যেমন রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولُ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْإِمَامُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولُ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى أَهْلِ بَيْتِ زَوْجِهَا، وَوَلَدِهِ وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَعَبْدُ الرَّجُلِ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولُ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
'সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকই স্ব-স্ব অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্বশীল এবং সে তার প্রজাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। পুরুষ তার পরিবারের লোকদের দায়িত্বশীল এবং তাদের ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর পরিবারের দায়িত্বশীল, এ ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। সেবক তার মালিকের সম্পদের দায়িত্বশীল, এ ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। সাবধান! মনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকই তার অধীনস্থ লোকদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।'১৭০
ইসলামি সমাজ তার প্রত্যেক সদস্যকে জিম্মাদারি দিয়ে রেখেছে। এমন কোনো সদস্য পাওয়া যাবে না, যার ওপর কোনো ধরনের জিম্মাদারি নেই। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন এক বাস্তবমুখী, গুরুত্বপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক বিষয়; হাসি-তামাশার কোনো বিষয় নয়।
ইসলাম যেভাবে নারীর সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে, তেমনিভাবে উত্তমভাবে জীবনযাপনের জন্য তার কী ভূমিকা রাখতে হবে, তা জেনে নিতে নির্দেশ দিয়েছে এবং শরিয়ত তার জন্য যে সীমারেখা টেনে দিয়েছে, তা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছে। যেন সে তার বার্তা (একজন মুসলিম নারী হিসাবে বিশ্বের সকল নারীদের জন্য যে ইসলামের বার্তা সে বহন করছে) পৌঁছে দিতে পারে এবং উত্তমরূপে তার ভূমিকা পালন করতে পারে। যেন সে ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম গড়তে এবং জীবনকে সার্থক, সুন্দর ও আলোকিত করতে পুরুষদের সাহায্যকারী হতে পারে।
ইসলাম যেখানে স্ত্রীদের সাথে উত্তমভাবে জীবনযাপন করতে এবং ভালো আচরণ করতে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে নারীদেরও তাদের স্বামীদের বৈধ ও ন্যায়ভিক্তিক আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম খুব জোরালো কণ্ঠেই স্ত্রীদের এ নির্দেশ প্রদান করেছে।
যেমন রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لأَحَدٍ َلأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
'আমি যদি কাউকে (আল্লাহ ব্যতীত অন্য) কারও প্রতি সিজদা করার অনুমতি দিতাম, তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর উদ্দেশে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। '১৭১
শুধু এতটুকুই নয়, রাসুলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সন্তুষ্টিকে স্ত্রীর জান্নাতে যাওয়ার অবলম্বন বলে অভিহিত করেছেন।
ইরশাদ করেছেন :
أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَّاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ، دَخَلَتِ الْجَنَّةَ
'যে মহিলা স্বীয় স্বামীর সন্তুষ্টি নিয়ে মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। '১৭২
অপরদিকে, স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীকে শুধরে না যাওয়া পর্যন্ত ফেরেশতাদের অভিসম্পাতে জর্জরিত হওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِذَا بَاتَتِ الْمَرْأَةُ، هَاجِرَةً فِرَاشَ زَوْجِهَا، لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ
'যে নারী স্বামীর বিছানা ত্যাগ করে রাতযাপন করবে, সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তার ওপর অভিশাপ দিতে থাকে। '১৭৩
এ ছাড়াও ইসলাম বিভিন্ন বিধানে নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব জোরালোভাবে ঘোষণা করেছে এবং নারীর ওপর স্বামীর আনুগত্য করা ও তাকে সন্তুষ্ট করা বাধ্যতামূলক করেছে। যেমন: ইসলাম বলে, রমজানের রোজা ব্যতীত অন্য রোজা রাখতে হলে স্বামীর অনুমতি নিয়ে রাখতে হবে। তদ্রূপ স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো মেহমানের আপ্যায়ন করাও স্ত্রীর জন্য নিষিদ্ধ।
এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ، وَلَا تَأْذَنَ فِي بَيْتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ
'স্বামী পাশে থাকাবস্থায় তার অনুমতি না নিয়ে (নফল) রোজা রাখা স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। আর স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী কোনো মেহমানকে ঘরে আসার অনুমতি দিতে পারবে না।'১৭৪
ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর ওপর কর্তৃত্ব দিয়েছে, যেন সে এমন এক প্রকৃত পুরুষ হতে পারে, যে দাম্পত্য জীবন নামক জাহাজের কাপ্তানি করে সেটাকে নিরাপত্তা ও হিদায়াতের তীরে ভিড়াতে পারে। এ কর্তৃত্ব আদায়ে সকল পুরুষকে স্ত্রীদের ফিতনা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কেননা, নারীর ফিতনায় আক্রান্ত হলে পুরুষের চোখে পর্দা পড়ে যায়, মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্বীন হালকা হয়ে যায়। ফলে স্ত্রী যদি সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে জড়িয়ে পড়ে, তখন স্ত্রীকে বাধা দেওয়ার মানসিক শক্তি স্বামীর থাকে না। তার হাত থেকে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বাগডোর ফসকে বেরিয়ে যায়। তখন ঘরের সবকিছু উক্ত পথচ্যুত নারীর অধীনে পরিচালিত হয়। তার হুকুম অমান্য করা যায় না, কথার বিরোধিতা করা যায় না এবং সবকিছুতে তার ইচ্ছা ও আগ্রহেরই প্রতিফলন ঘটে।
এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সত্যই বলেছেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً هِيَ أَضَرُّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
'আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীর ফিতনা থেকে শক্তিশালী কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।' ১৭৫
প্রকৃত মুসলমান সত্যপথ থেকে বিচ্যুত স্ত্রীর ফিতনার সামনে দুর্বল হয় না; যতই শক্তিশালী হোক সে ফিতনা। তাকে সে খুব বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে এ কথা বুঝিয়ে দেয় যে, স্ত্রী তার কাছে যতই প্রিয় হোক, আল্লাহর সন্তুষ্টি তার নিকট আরও অধিক প্রিয় এবং স্ত্রীর প্রতি তার অন্তরে যতই ভালোবাসা থাকুক, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর ভালোবাসার সামনে কিছুই নয়।
এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন :
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
'বলো, তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ করো যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। ১৭৬
এজন্য বর্তমান অনেক (নামধারী) মুসলমানের ঘরে স্ত্রীদের যেসব অবাধ্যতা ও বিরোধিতা দেখা যায়, প্রকৃত মুসলমানের ঘরে তা দেখা যায় না।
যে ব্যক্তি তার স্ত্রী, মেয়ে ও বোনদের মাথায় কাপড়বিহীন, বুক ও বাহু অনাবৃত অবস্থায় বেপর্দা হয়ে রাস্তায় ও বাজারে বের হতে দেখা সত্ত্বেও বাধা দেয় না এবং ইসলামবিরোধী চালচলন থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে না, সে ব্যক্তি পুরুষত্বহীন ও ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুত। অচিরেই সে আল্লাহর ক্রোধাগ্নির গর্তে পতিত হবে। এ গর্ত থেকে বাঁচতে হলে তাকে এমন খাঁটি তাওবা করতে হবে, যা তার অন্তরাত্মা ও ঘুমন্ত পুরুষত্বকে জাগিয়ে দেবে এবং শক্ত মনোবল ও সিরাতে মুসতাকিমের দিকে পথনির্দেশ করবে। এ তাওবার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে স্ত্রী, মেয়ে ও বোনদের ভুল পথ থেকে দ্বীনের পথে নিয়ে আসার সাধ্যাতীত চেষ্টার মাধ্যমে।
ইসলাম নারীর জন্য আলাদা শিষ্টাচার ও বৈশিষ্ট্য প্রণয়ন করেছে। বাইরে বের হতে হলে বা গাইরে মাহরাম১৭৭ পুরুষের সামনে যেতে হলে কী পোশাক পরতে হবে, ইসলাম তা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ পোশাকের নাম শরয়ি হিজাব বা পর্দা। প্রকৃত মুসলিম নারী, যে ইসলামের সফেদ দুধ পান করেছে, ইসলামের স্নিগ্ধ ও স্বচ্ছ পানির নদীতে অবগাহন করেছে এবং ইসলামের সবুজ-শ্যামল-ছায়াময় পরিবেশে বেড়ে উঠেছে, সে সন্তুষ্টচিত্তে ও প্রশান্তমনে পূর্ণ আগ্রহের সহিত এ হিজাব গ্রহণ করে নেয়। সে বিশ্বাস করে, এটা তার জন্য আল্লাহর প্রবর্তিত বিধান, পুরুষদের পক্ষ থেকে কোনো জুলুম নয়।
এটা আল্লাহর বিধান, নারীর ওপর পুরুষদের স্বেচ্ছাচারিতা ও একচেটিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যমূলক কোনো আইন নয়। এটা ইসলামের বিধান, উমাইয়া শাসনামলে ওয়ালিদের খিলাফতের সময় নির্ধারণকৃত কোনো ড্রেসকোড নয়, যেমনটি স্থূলবুদ্ধি ও মাথামোটা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা কোনো জ্ঞান-দর্শন ও কুরআন-হাদিসের কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়া বলে থাকে। তাই প্রকৃত মুসলমান নারী এ বিধান কখনো লঙ্ঘন করে না।
আয়িশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ المُهَاجِرَاتِ الأَوَّلَ، لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ: {وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ} [النور: ٣١] شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا 'আল্লাহ তাআলা প্রাথমিক যুগের মুহাজিরা নারীদের ওপর রহম করুন, যখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত “তারা যেন তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ ওড়না দ্বারা আবৃত করে” [সুরা আন-নুর : ৩১] নাজিল করলেন, তখন তারা নিজেদের চাদর ছিঁড়ে ওড়না হিসাবে ব্যবহার করলেন।'১৭৮
অপর এক বর্ণনায় সাফিয়া বিনতে শাইবা বলেন: 'একদিন আমরা আয়িশা -এর নিকট বসে কুরাইশ মহিলাদের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম, তখন আয়িশা বললেন, কুরাইশ মহিলাদের ফজিলত আছে তা ঠিক, তবে শপথ করে বলছি, আমি আনসারি মহিলাদের চেয়ে ফজিলতপূর্ণ, পবিত্র কুরআনের সত্যায়নকারী ও অবতীর্ণ আয়াতের ওপর (দ্রুত) বিশ্বাস স্থাপনকারী কোনো মহিলা দেখিনি। যখন সুরা নুরের এ আয়াত “তারা যেন তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ ওড়না দ্বারা আবৃত করে” অবতীর্ণ হলো আর তাদের পুরুষেরা তাদের নিকট এ আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন, নিজেদের স্ত্রী, মেয়ে, বোন ও নিকটাত্মীয়াদের নিকট এ আয়াত পৌঁছালেন, তখন প্রত্যেক মহিলা আল্লাহর অবতীর্ণ আয়াতের প্রতি বিশ্বাস ও ইমানের দাবি মেনে নিজেদের কালো রঙের চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে ফেললেন। তারপর তারা ওড়নাবৃতা হয়েই (নামাজে) রাসুলুল্লাহ -এর পেছনে দাঁড়ালেন। তখন মনে হচ্ছিল, তাদের মাথার ওপর যেন কাক বসে আছে। '১৭৯
আল্লাহ তাআলা আনসার মহিলাদের ওপর রহম করুন। কী মজবুত তাদের ইমান! কী সত্য ছিল তাদের ইসলাম! আল্লাহর বিধান নাজিল হওয়ার সাথে সাথে তা মেনে নেওয়ার কী আগ্রহ ছিল তাদের মনে! যে মুমিন নারী আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ইমান রাখার দাবি করে, তাকে অবশ্যই আনসার মহিলাদের অনুকরণ করতে হবে। ইসলাম তার জন্য যে বিশেষ পোশাক নির্ধারণ করেছে, তা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিতে হবে। বেপর্দা ও খোলামেলা চলার কোনো অবকাশ তার নেই। এখানে দামেশক বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্দানশীন ছাত্রীদের কথা উল্লেখ না করলে তাদের প্রতি চরম অবিচার করা হবে। তাদের আল্লাহভীতি আনসার মহিলাগণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। দামেশক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় কাভার করতে একদল সাংবাদিক ক্যাম্পাসে আসলেন। তারা পর্দানশীন ছাত্রীদের প্রশ্ন করলেন, গ্রীষ্মের কঠিন গরমে পর্দার ভেতর আপনারা কী করে থাকেন? উত্তরে ছাত্রীরা কুরআনে এ আয়াতাংশটি বলল: قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ 'বলে দাও, জাহান্নামের আগুন অনেক বেশি গরম।'১৮০
এ ছাত্রীদের মতো পূত-পবিত্র ও গুণবতী মেয়েদের নিয়েই প্রকৃত ইসলামি পরিবার গড়ে ওঠে। তাদের থেকে বের হয় সোনালি প্রজন্ম। তাদের গর্ভে জন্ম নেয় দ্বীনের মুজাহিদ ও বীর-সেনানীরা। আনন্দের বিষয় হলো, ফিতনার এ যুগেও এ ধরনের পর্দানশীন যুবতির সংখ্যা খুব একটা কম নয়, আল- হামদুলিল্লাহ।
প্রকৃত মুসলমান তার অধীনস্থ মেয়েদের শরয়ি পর্দা-যা মুসলিম মেয়েদের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য-মেনে চলতে এবং ঘরের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য করে। কারণ, এটা তার দায়িত্ব। পক্ষান্তরে যে পুরুষ এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, এ ব্যাপারে তার কথার ওপর স্ত্রীর কথা প্রাধান্য পায়, ফলে স্ত্রী শরিয়তের সীমা পার হয়ে যায়; আর স্বামী অসহায়ের মতো দেখে যায়, কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না—এমন পুরুষরা নপুংশক; তাদের দ্বীন ও পুরুষত্ব একসাথে বিদায় নিয়েছে।
স্ত্রীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব শুধু বাহ্যিক বিষয়ে নয়; স্ত্রীর ইবাদত ও চালচলনেও স্বামীর দায়িত্ব রয়েছে। সুতরাং স্ত্রী যদি ইবাদতে শিথিলতা করে, আল্লাহর আদেশ পালনে অবহেলা করে কিংবা কোনো পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে, তখন এ ব্যাপারে স্বামীকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। তদ্রূপ স্ত্রীর চরিত্র গঠন, চরিত্রের দৃঢ়তা, চারিত্রিক আবশ্যকীয় বিষয়াদি পালন ইত্যাদির ক্ষেত্রেও স্বামীর দায়িত্ব আছে। এসব বিষয়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো শিথিলতা ও অবহেলা পাওয়া গেলে স্বামী জিজ্ঞাসিত হবে। তাই প্রত্যেক স্বামীর জন্য এ দায়িত্বসমূহ যথাযথ পালন করা বাঞ্ছনীয়। এতে ব্যর্থ হলে নারীর ওপর পুরুষের যে কর্তৃত্ব আল্লাহ দান করেছেন, তার বেলায় সেটা প্রযোজ্য হবে না।
স্ত্রী তার স্বামীর হাতে আমানতস্বরূপ। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বামীর দ্বীনকেই স্ত্রী নিজের দ্বীন হিসাবে বেছে নেয়। জান্নাতে গেলে তারা দুজন একসাথে যায়; আবার জাহান্নামে গেলেও দুজনে একসাথেই যায়। এজন্য আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে তাদের নিজেদের এবং পরিবারের লোকদের একসাথে আগুন থেকে বাঁচাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার- পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণহৃদয় ও কঠোরস্বভাবের ফেরেশতাগণ। আল্লাহ তাআলা তাদের যা করতে আদেশ করেন, তারা তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তারা তা-ই পালন করে।'১৮১
ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন স্বামী পরিবারের নেতৃত্ব দেওয়ায় সফল হবে। মুসলমান স্বামীর পুরুষত্ব রাগ, কঠোরতা, শক্ত ভাষা ব্যবহার ইত্যাদির মাঝে নয়। এসব বিষয়কে মূর্খতার যুগে পুরুষত্ব মনে করা হতো। ইসলামি যুগে এগুলোকে পুরুষত্ব বলা হয় না; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষত্ব হলো, শক্তিশালী ব্যক্তিসত্তা, আকর্ষণশক্তি, উন্নত চারিত্রিক মাধুর্য, ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করার উদার মানসিকতা, আল্লাহর বিধিবিধান লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে কঠোর হওয়া, পরিবারের সদস্যদের ওপর আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা, সত্যের দিকে আহ্বান করার দৃঢ় মনোবল, অপব্যয় ও অপচয়হীন বদান্যতা, দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন দায়িত্বের প্রতি আন্তরিকতা, ইসলামি আদর্শ পরিবার গঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ইত্যাদি। এসব গুণ যার মাঝে আছে, ইসলামের দৃষ্টিতে সেই প্রকৃত পুরুষ। (বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে) নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব কেবল তার বেলায়ই প্রযোজ্য।
টিকাঃ
১৭৭. এখানে গাইরে মাহরাম বলতে উদ্দেশ্য ওই সব পুরুষ, শরিয়তের আলোকে যাদের সাথে বিবাহ বৈধ। (অনুবাদক)