📄 প্রকৃত মুসলমান কোন প্রকারের মেয়েকে স্ত্রী হিসাবে চায়
প্রকৃত মুসলমান বর্তমান সময়ের আধুনিক যুবতিদের ফিগার ও পারফিউমের কড়া গন্ধে বিমোহিত হয় না; বরং সে দেখে একজন প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মুসলিম রমণীর স্বপ্ন। এজন্য এমন মেয়েকে সে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে বেছে নেয়, যার মাঝে ইসলামের সৌন্দর্য ও উন্নত গুণাবলি আছে। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য, লাবণ্য ও কমনীয়তা দেখে সে কারও প্রতি আকৃষ্ট হয় না, যেমনটি বর্তমান সময়ে ইসলামি আদর্শ-বিবর্জিত যুবকরা হয়ে থাকে। বরং প্রকৃত মুসলিম মাত্রই দ্বীনদারি, বুদ্ধিমত্তা ও উত্তম চরিত্রের অনুসন্ধান করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعِ لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
'মেয়েদের বিয়ে করার ব্যাপারে (সাধারণত) চারটি জিনিসের প্রতি লক্ষ রাখা হয়। তার অর্থ-সম্পদ, বংশমর্যাদা, রূপ-সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদারি বিচার করে বিয়ে করবে; (অন্যথায়) ধুলোয় ধূসরিত হোক তোমার উভয় হাত।'১৪৩
রাসুলুল্লাহ-এর এ নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলমান যুবককে জীবনসঙ্গিনী চয়নের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিকেই প্রথম গুরুত্ব দিতে হবে, তবে তার অর্থ এ নয় যে, চেহারার সৌন্দর্য ও লাবণ্যের দিকে কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপই করা যাবে না। কেননা, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ-ই অন্য হাদিসে বিয়ের পূর্বে মেয়ের চেহারা দেখে নেওয়াকে উত্তম বলেছেন। এতে বিয়ের পর 'মেয়েকে ভালো লাগছে না বা তাকে দেখে চক্ষু শীতল হচ্ছে না' জাতীয় কোনো রকমের জটিলতা বা বিব্রত অবস্থায় পড়তে হবে না।
মুগিরা বিন শুবা রা. বলেন:
خَطَبْتُ امْرَأَةً عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنظَرْتَ إِلَيْهَا؟ قُلْتُ: لَا ، قَالَ: فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّهُ أَجْدَرُ أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا
'রাসুলুল্লাহ-এর যুগে আমি এক মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম। তখন রাসুলুল্লাহ আমাকে বললেন, মেয়েকে দেখেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, প্রথমে তাকে দেখে নাও। কেননা, তোমাদের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টিতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'১৪৪
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :
خَطَبَ رَجُلُ امْرَأَةً مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هَلْ نَظَرْتَ إِلَيْهَا؟ قَالَ: لَا ، فَأَمَرَهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا
'এক ব্যক্তি এক আনসারি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাসুলুল্লাহ তাকে বললেন, মেয়ে দেখেছ? তিনি বললেন, না। তখন রাসুলুল্লাহ তাকে মেয়ে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।'১৪৫
এভাবে একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও গুণাবলির পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্যও একটি মৌলিক গুণ, যা স্ত্রীর মাঝে সব পুরুষই কামনা করে। এ দুটির একটি আরেকটির ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। এজন্য তিনি ইবনে আব্বাস -কে বলেন:
أَلَا أُخْبِرُكَ بِخَيْرِ مَا يَكْذِرُهُ الْمَرْءُ الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ، إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ، وَإِذَا أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ، وَإِذَا غَابَ عَنْهَا حَفِظَتْهُ
'আমি কি তোমাকে জানিয়ে দেবো না যে, মানুষের সবচেয়ে উত্তম সম্পদ কী? তা হচ্ছে পুণ্যবতী স্ত্রী, যার দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়, যাকে আদেশ করলে তা মেনে চলে এবং যার কাছ থেকে অনুপস্থিত থাকলে তার (সম্পদের) হিফাজত করে।' ১৪৬
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
سُئِلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ النِّسَاءِ خَيْرُ؟ فَقَالَ: خَيْرُ النِّسَاءِ مَنْ تَسَرُّ إِذَا نَظَرَ، وَتُطِيعُ إِذَا أَمَرَ، وَلَا تُخَالِفُهُ فِي نَفْسِهَا وَمَالِهَا
'নবিজি -কে প্রশ্ন করা হলো, সর্বোত্তম নারী কে? তিনি বললেন, যার দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়, যাকে আদেশ করলে তা মান্য করে এবং নিজের ব্যক্তিসত্তা ও সম্পদের বিষয়ে স্বামীর সাথে কোনোরূপ বিরোধিতায় লিপ্ত হয় না। ১৪৭
এটাই স্ত্রী সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ স্ত্রী হলো সে, যে তার স্বামীকে প্রশান্তি ও স্থিরতা দিতে পারে। দাম্পত্য জীবনে আনন্দ ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। একজন আদর্শ মা হয়ে উপহার দিতে পারে একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু প্রজন্ম। জন্ম দিতে পারে ইসলামের জন্য আত্মদানকারী জানবাজ মুজাহিদদের। গর্ভে ধারণ করতে পারে যুগের শ্রেষ্ঠ আলিম ও বিদ্বান ব্যক্তিদের।
রাসুলুল্লাহ বৈবাহিক সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন। যেখানে শরীর, বিবেক, আত্মা ও মনের মাঝে সুষ্ঠু ভারসাম্য থাকবে। সাময়িক রাগ ও ভুল-বুঝাবুঝির কারণে সম্পর্ক নড়বড়ে হয়ে যাবে না। দীর্ঘস্থায়ী মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে না। এজন্য প্রকৃত মুসলমান বিয়ে করবে একজন আদর্শ মেয়েকে, যার মাঝে উপরোক্ত সকল গুণ বিদ্যমান থাকবে। আর ছলনাময়ী সুন্দরী মেয়েদের ফাঁদ থেকে অনেক দূরে থাকতে হবে। মুখে স্লোগান তুলতে হবে, 'ছলনাময়ী সুন্দরী নারীদের "না" বলুন।'
📄 দাম্পত্য জীবনে ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলে
প্রকৃত মুসলমান বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে জীবনযাপন ও আচার-ব্যবহারে ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করে। স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ ও তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা ও উৎসাহ দেখলে রীতিমতো আশ্চর্য হতে হয়।
ইসলাম স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম স্ত্রীকে এমন মর্যাদার স্তরে উন্নীত করেছে, যা অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার কাছ থেকে কল্পনাও করা যায় না। রাসুলুল্লাহ ﷺ সকল পুরুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন: اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ، فَإِنَّ المَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضَّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ
'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সৎ ও উত্তম আচরণ করো। কেননা, তাদেরকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের ওপরের দিককার হাড় সবচেয়ে বেশি বাঁকা। যদি তুমি তা সোজা করতে চাও, তাহলে তা ভেঙে ফেলবে। আর যদি যেমন আছে তেমন রাখো, তাহলে তা বাঁকা হতে থাকবে। অতএব, তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করো। '১৪৮
সহিহাইনের অপর এক বর্ণনায় এসেছে : المَرْأَةُ كَالضَّلَعِ، إِنْ أَقَمْتَهَا كَسَرْتَهَا، وَإِنِ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَفِيهَا عِوَجُ
'স্ত্রীলোক পাঁজরের বাঁকা হাড়ের মতো। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙে ফেলবে। আর তুমি যদি তার বক্রতা মেনে নিয়ে তার নিকট থেকে ফায়দা পেতে চাও, তাহলে ফায়দা পাবে। '১৪৯
সহিহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এসেছে :
إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ لَنْ تَسْتَقِيمَ لَكَ عَلَى طَرِيقَةٍ، فَإِنِ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَبِهَا عِوَجٌ، وَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهَا، كَسَرْتَهَا وَكَسْرُهَا طَلَاقُهَا
'স্ত্রীলোককে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে কখনো তোমার সাথে সহজ ব্যবহার করবে না বা সোজা হয়ে চলবে না। তুমি যদি তার বক্রতা মেনে নিয়ে তার নিকট থেকে ফায়দা পেতে চাও, তাহলে ফায়দা পাবে। আর যদি তার বক্রতা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙে ফেলবে। আর ভেঙে ফেলার অর্থ হলো তালাক।'১৫০
রাসুলুল্লাহ-এর এমন অলংকারসমৃদ্ধ উচ্চাঙ্গের উপমায় মহিলাদের সহজাত স্বভাব সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। তা হলো, মেয়েরা এক অবস্থার ওপর স্থির থাকে না, যেমনটি স্বামীরা তাদের থেকে আশা করে। তাই একজন প্রকৃত মুসলমান স্বামীকে এ কথা জেনে নিতে হবে যে, এটাই স্ত্রীর সহজাত অভ্যাস, এ অভ্যাস ঠিক করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। স্ত্রীর মেয়েসুলভ মান-অভিমান ও মেয়েলি আচরণগুলো মেনে নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা তার মাঝে যে বক্রতা রেখেছেন, সে বক্রতাসহ তাকে গ্রহণ করতে হবে। এ বক্রতা সোজা করতে গেলে ভেঙে যাবে, অর্থাৎ বিবাহবিচ্ছেদ ঘটবে।
যখন মুসলমান স্বামীর মনে রাসুলুল্লাহ-এর এ নির্দেশনা ভালোভাবে বদ্ধমূল হয়ে যাবে, ফলে স্ত্রীর ছোটখাটো ভুলগুলো ক্ষমা করে দেবে এবং তার মেয়েলি রাগ ও অভিমানে ধৈর্য ধরবে, তখন তাদের দাম্পত্য জীবন সুখী ও শান্তিময় হবে এবং তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি, চিল্লাচিল্লি ও ঝগড়াঝাঁটি হবে না।
হাদিসটির ওপর একটু গবেষকের দৃষ্টি দিয়ে তাকান, এখানে রাসুলুল্লাহ কথা শুরু করেছেন 'স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করো' বলে। তারপর মেয়েদের সহজাত অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা দিলেন। শেষে আবার বললেন, 'স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করো।' এখান থেকেই বুঝা যায়, স্ত্রীদের প্রতি কী পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়ার আদেশ করেছেন রাসুলুল্লাহ ! প্রকৃত মুসলমান যখন এ হাদিসটি জেনে নেয়, তখন এর ওপর আমল না করে কি আর পারে!?
স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ এত বেশি গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি বিদায় হজের ভাষণে তাদের ব্যাপারে (আলাদাভাবে) অসিয়ত করতে পর্যন্ত ভুলেননি। এটি সেই ভাষণ, যা সম্পর্কে তাঁর ধারণা হয়ে গিয়েছিল যে, বড় জনসমাগমের সামনে এটাই তাঁর শেষ ভাষণ। আর তাই এ ভাষণে মুসলমানদের জন্য অধিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তিনি এক এক করে তুলে ধরেছেন।
এ ভাষণে স্ত্রীদের সম্পর্কে তিনি বলেন :
أَلَا وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّمَا هُنَّ عَوَانُ عِنْدَكُمْ، لَيْسَ تَمْلِكُونَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ، إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، فَإِنْ فَعَلْنَ فَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ ، وَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّجٍ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً ، أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا، وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا، فَأَمَّا حَقُّكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ فَلَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ، وَلَا يَأْذَنَّ فِي بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ، أَلَا وَحَقُّهُنَّ عَلَيْكُمْ أَنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ فِي كِسْوَتِهِنَّ وَطَعَامِهِنَّ.
'শোনো, আমি তোমাদের স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ দিচ্ছি। তারা তোমাদের নিকট বন্দীর মতো। তাদের ওপর তোমাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই, যদি না তারা কোনো প্রকাশ্য অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে। যদি তারা তা-ই করে, তাহলে তোমরা তাদের বিছানা পৃথক করে দিয়ো এবং একান্ত প্রয়োজন হলে হালকাভাবে প্রহার কোরো। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয়ে যায়, তবে তাদের প্রতি বাড়াবাড়ির পথ অন্বেষণ কোরো না। জেনে রেখো, তোমাদের যেরূপ অধিকার রয়েছে স্ত্রীদের ওপর, তোমাদের স্ত্রীদেরও তদ্রূপ অধিকার রয়েছে তোমাদের ওপর। তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের অপছন্দনীয় লোককে তোমাদের বিছানা মাড়াতে (অর্থাৎ বসতে) দেবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোককে তোমাদের ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। আর তোমাদের ওপর তাদের অধিকার এই যে, তোমরা যথাসম্ভব তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাবার-দাবারের উত্তম ব্যবস্থা করবে।'১৫১
প্রকৃত মুসলমান রাসুলুল্লাহ-এর এ অসিয়ত অবশ্যই শুনেছে। এখানে সে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার কী এবং স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার কী, তা জেনে নিয়েছে। জেনে নিয়েছে, স্ত্রীর প্রতি দয়া করা এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক। তাই প্রকৃত মুসলিমের দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর ওপর জুলুমের ঘটনা বা স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার ঘটনা সংঘটিত হয় না বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না।
স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ-এর আরও অনেক হাদিস রয়েছে। এক হাদিসে তিনি স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহারকারী স্বামীকে উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে অভিহিত করেছেন।
ইরশাদ করেছেন: أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
'সেই মুমিন ইমানের দিক দিয়ে সবার সেরা, যার চরিত্র সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ সে, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। '১৫২
রাসুলুল্লাহ-এর স্ত্রীদের নিকট কতিপয় মহিলা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসলেন। তখন রাসুলুল্লাহ ঘোষণা করলেন : لَقَدْ طَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ نِسَاءُ كَثِيرُ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ لَيْسَ أُولَئِكَ بِخِيَارِكُمْ
'মুহাম্মাদের স্ত্রীদের নিকট অনেক মেয়ে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসে। ওরা (অভিযোগকারিণীদের স্বামীরা) ভালো মানুষ নয়।'১৫০
স্ত্রীদের প্রতি ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও তাদের পছন্দ না হলেও তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার আদেশ প্রদানে ইসলাম অন্যান্য দ্বীন ও জীবনব্যবস্থার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। মানব-ইতিহাসে অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা নারীদের প্রতি এত গুরুত্ব দেয়নি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
'নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো। অতঃপর যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।'১৫৪
এ পবিত্র আয়াতের আহ্বান সত্যিকারের মুসলমানের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছে। ফলে সে তার হঠাৎ করে আসা রাগ দমন করে এবং স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা কমে যেতে দেখলে কার্যকর কোনো উপায় অবলম্বন করে পুনরায় ভালোবাসা নবায়ন করতে চেষ্টা করে। এভাবেই ইসলাম অনেক দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। সাময়িক আবেগ ও খামখেয়ালিপনার আক্রমণ থেকে এ পবিত্র বন্ধনকে হিফাজত করে।
এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করল। কারণ, তাকে আর ভালো লাগছিল না। তখন উমর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বললেন, 'আফসোস তোমার জন্য! ঘরসমূহের ভিত্তি কি শুধুই ভালোবাসার ওপর? (স্ত্রীর প্রতি) দায়িত্ববোধ ও (সামাজিক) লজ্জাবোধের কি এখানে কোনোই দখল নেই?'
ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য সম্পর্ক মনের আবেগ ও খামখেয়ালিপনার ঊর্ধ্বে।
আর প্রকৃত মুসলমানের মাঝে মনুষ্যত্ব, মহত্ত্ব, মনের সৌন্দর্য, সহনশীলতা, হৃদয়ের প্রশস্ততা ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাকে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা না থাকলেও তার সাথে উত্তম আচরণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। তার মাঝে স্ত্রীকে ভালো না লাগলেই ছেড়ে দেওয়ার পাশবিক প্রবণতা ও প্রয়োজন ফুরালেই ছুড়ে ফেলার ব্যবসায়িক মানসিকতা থাকে না।
প্রকৃত মুসলমান অবশ্যই আল্লাহর আদেশ মেনে চলে। তাই স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা না থাকলেও তার সাথে উত্তমভাবে জীবনযাপন করে এবং তার সাথে সদ্ব্যবহার করে। কারণ, সে সর্বজ্ঞ মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে জানে যে, অনেক সময় মানুষ যাকে অপছন্দ করে এবং যার থেকে দূরে থাকে, তার মাঝেই নিহিত থাকে সমূহ কল্যাণ ও বরকত। তাই প্রকৃত বিচক্ষণ মুসলমান ভালোবাসতে হলে কীভাবে বাসতে হবে, অপছন্দ করতে হলে কীভাবে করতে হবে, তা ভালোভাবেই জানে। কাজেই কাউকে ভালোবাসলে অন্ধের মতো ভালোবাসে না; আর কাউকে অপছন্দ করলে তার প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ঘটায় না। বরং দুইয়ের মাঝে সুষ্ঠু ভারসাম্য রক্ষা করে চলে।
তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ বলেছেন, মুমিনা স্ত্রী তার স্বামীর যতই অপছন্দনীয় হোক, তার ভেতর এমন কিছু গুণ অবশ্যই থাকে, যা স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তাই অপছন্দ করার কারণগুলোর দিকে না তাকিয়ে এমন গুণগুলোর দিকে তাকানো উচিত, যা স্বামীকে সন্তুষ্ট করে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةٌ، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
'কোনো মুমিনের জন্য তার মুমিন স্ত্রীকে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কেননা, তার ভেতর অপছন্দ করার মতো বিষয় যেমন আছে, তেমনই পছন্দ করার মতো বিষয়ও আছে। '১৫৫
📄 প্রকৃত মুসলমান একজন আদর্শ স্বামী
প্রকৃত মুসলমান স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বান ও সদাচারী হওয়ার নির্দেশ-সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও হাদিস সম্পর্কে অবগত থাকে। তাই এ সকল আয়াত ও হাদিস তাকে একজন আদর্শ স্বামীতে পরিণত করে। সে স্ত্রীর সাথে উত্তমভাবে জীবনযাপন করে, তার সাথে ভালো ও ভদ্রজনোচিত ব্যবহার করে। বিয়ের পর সময় যতই গড়িয়ে যাক, বয়স যতই বৃদ্ধি পেতে থাকুক, তার ভালোবাসা ও সদাচারে কোনোরূপ ঘাটতি আসে না।
যখন সে ঘরে প্রবেশ করে, তখন স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে হাসিমুখে ও প্রশান্ত মনে সাক্ষাৎ করে। প্রথমে এসে সবাইকে সালাম করে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً 'অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র দুআ। '১৫৬
রাসুলুল্লাহ -ও সালাম করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি আনাস -কে বলেছেন:
يَا بُنَيَّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ يَكُونُ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ 'প্রিয় বৎস, যখন তুমি তোমার পরিবারের নিকট যাবে, তখন সালাম করবে। এটা তোমার ও তোমার পরিবারের জন্য বরকত বয়ে আনবে। '১৫৭
সালামের কারণে যে বরকত আসার কথা রাসুলুল্লাহ বলেছেন, বিভিন্নভাবে তার প্রকাশ ঘটবে। যেমন: স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হৃদ্যতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। তাদের মাঝে হাসি-আনন্দ থাকবে। স্ত্রীর কাজে স্বামী হাত লাগাবে। স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে বা শরীর খারাপ লাগলে প্রেমভরা হাতে তার সেবা করবে। যথাসাধ্য স্ত্রীর যত্ন নেবে এবং তার বৈধ প্রয়োজনাদি পূর্ণ করে দেবে। শরিয়তের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী স্ত্রীর মেয়েলি মান-অভিমান ও আহ্লাদ মেনে নেবে। এভাবে স্ত্রীর মনে তার প্রতি ভালোবাসা ও নির্ভরতা সৃষ্টি করবে। এ ছাড়াও তাকে পর্যাপ্ত সময় দেবে। সময়ের সবটুকু অংশ অধ্যয়ন, কাজ, দায়িত্ব ও বন্ধুদের মাঝে কাটিয়ে না দিয়ে স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট সময় হাতে রাখবে। এটা পুরুষদের ওপর স্ত্রীদের ইসলামপ্রদত্ত অধিকার। ইসলাম বলে, স্বামীর জন্য পুরো সময় ইবাদতে কাটিয়ে দেওয়া জায়িজ নেই; স্ত্রীকে দেওয়ার মতো কিছু সময় অবশ্যই হাতে রাখতে হবে। অন্যথায় দ্বীনের মাঝে ভারসাম্য থাকবে না; অথচ এ ভারসাম্যের ওপরই পুরো দ্বীনের ভিত্তি। আব্দুল্লাহ বিন আমর-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ যখন জানতে পারলেন যে, তিনি ইবাদতে অতিরঞ্জন করছেন, তখন তাঁকে বললেন :
أَلَمْ أُخْبَرْ أَنَّكَ تَصُومُ النَّهَارَ، وَتَقُومُ اللَّيْلَ؟، فَقُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: فَلَا تَفْعَلْ صُمْ وَأَفْطِرْ، وَقُمْ وَنَمْ، فَإِنَّ لِجَسَدِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْجِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِزَوْرِكَ عَلَيْكَ حَقًّا...
'শুনলাম, তুমি নাকি প্রতিদিন রোজা রাখো, আর প্রতিরাতে সারারাত ধরে নফল নামাজ পড়ো? তিনি বললেন, জি, হে আল্লাহর রাসুল। রাসুলুল্লাহ বললেন, এমন কোরো না; বরং (মাঝেমধ্যে) রোজা রাখবে, আবার (মাঝেমধ্যে) রোজা রাখবে না। রাতের কিছু অংশ ঘুমাবে, কিছু অংশে ইবাদত করবে। কেননা, তোমার ওপর তোমার শরীরের অধিকার রয়েছে, চোখের অধিকার রয়েছে, স্ত্রীর অধিকার রয়েছে এবং মেহমানের অধিকার রয়েছে।'১৫৮ উসমান বিন মাজউন-এর স্ত্রী খাওলা বিনতে হাকিম রাসুলুল্লাহ-এর স্ত্রীদের নিকট জীর্ণশীর্ণ কাপড় ও বিশ্রী বেশভূষা নিয়ে আসলেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার অবস্থা এমন কেন? তিনি বললেন, আমার স্বামী সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে থাকে, সারাদিন রোজা রাখে। (তো সুন্দর পোশাক-আশাক পরে ও সাজসজ্জা করে কী লাভ!?)। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীগণ তাঁকে এ কথা জানালেন। তখন তিনি উসমান বিন মাজউন -এর সাথে দেখা করে তাকে তিরস্কার করলেন। তাকে বললেন, আমাকে কি তুমি আদর্শ হিসাবে মানো না? তিনি বললেন, অবশ্যই মানি, আমার সত্তা আপনার ওপর কুরবান হোক! এর পরে খাওলা রা. আসলেন সুন্দর ও সুবাসমাখা বেশে। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, উসমান, আমাদের জন্য বৈরাগ্য ফরজ করা হয়নি। আমাকে কি তুমি তোমার আদর্শ হিসাবে মানো না? নিঃসন্দেহে আমিই আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তাঁর বিধিবিধান আমিই সবার চেয়ে বেশি মেনে চলি।'১৫৯
রাসুলুল্লাহ ﷺ এ নির্দেশনা তাঁর সকল সাহাবির মাঝে প্রচার করে দিয়েছিলেন। তাঁদেরকে ইবাদত-বন্দেগি ও স্ত্রীদের সাথে জীবনযাপনের মাঝে সুষ্ঠু ভারসাম্য রক্ষা করে চলার সবক দিয়েছিলেন। তাই পরবর্তী সময়ে এ ভারসাম্যই তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তাঁরা একে অপরকে এভাবে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে নসিহত করতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ যদি দুনিয়াবিমুখতা অবলম্বন করতেন, স্ত্রীদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকতেন এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করতেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে এ বিষয়ে অবহিত করে তার সংশোধনের চেষ্টা করতেন।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা ইমাম বুখারি রহ. আবু জুহাইফা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু জুহাইফা রা. বলেন:
آخَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ سَلْمَانَ، وَأَبِي الدَّرْدَاءِ، فَزَارَ سَلْمَانُ أَبَا الدَّرْدَاءِ، فَرَأَى أُمَّ الدَّرْدَاءِ مُتَبَدِّلَةٌ، فَقَالَ لَهَا: مَا شَأْنُكِ؟ قَالَتْ: أَخُوكَ أَبُو الدَّرْدَاءِ لَيْسَ لَهُ حَاجَةُ فِي الدُّنْيَا، فَجَاءَ أَبُو الدَّرْدَاءِ فَصَنَعَ لَهُ طَعَامًا، فَقَالَ: كُلْ؟ قَالَ: فَإِنِّي صَائِمٌ، قَالَ: مَا أَنَا بِآكِلٍ حَتَّى تَأْكُلَ، قَالَ: فَأَكَلَ، فَلَمَّا كَانَ اللَّيْلُ ذَهَبَ أَبُو الدَّرْدَاءِ يَقُومُ، قَالَ: نَمْ، فَنَامَ، ثُمَّ ذَهَبَ يَقُومُ فَقَالَ : نَمْ، فَلَمَّا كَانَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ قَالَ: سَلْمَانُ قم الآنَ، فَصَلَّيَا فَقَالَ لَهُ سَلْمَانُ : إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِي حَقٌّ حَقَّهُ، فَأَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: صَدَقَ سَلْمَانُ
‘নবিজি ﷺ সালমান ও আবু দারদা রা.-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন। এরপর একদিন সালমান রা. আবু দারদা রা.-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। সেখানে উম্মে দারদা রা.-কে অতিসাধারণ পোশাকে দেখতে পেয়ে বললেন, আপনার এ অবস্থা কেন? তিনি বললেন, আপনার ভাই আবু দারদার তো দুনিয়ার কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই! এরই মাঝে আবু দারদা রা. এলেন। তারপর সালমান রা. -এর জন্য খাবার প্রস্তুত করে তাকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি রোজা রেখেছি। তখন সালমান রা. বললেন, আপনি যতক্ষণ না খাবেন, ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও তার সাথে খেলেন। অতঃপর যখন রাত হলো, তখন আবু দারদা রা. সালাতে দাঁড়ালেন। তখন সালমান রা. তাকে বললেন, আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর আবার দাঁড়ালে তিনি বললেন, আরেকটু ঘুমান। অবশেষে যখন রাতের শেষ প্রহর আসলো, তখন সালমান রা. বললেন, এখন উঠুন। তারপর তারা উভয়েই নামাজ পড়লেন। এরপর সালমান রা. বললেন, আপনার ওপর আপনার রবের যেমন হক আছে, তেমনই আপনার ওপর আপনার নিজের ও আপনার স্ত্রীরও হক আছে। সুতরাং আপনাকে প্রত্যেক হকদারের হক আদায় করতে হবে। তারপর তিনি নবিজি ﷺ-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে জানালে তিনি বললেন, সালমান সত্যই বলেছে। ১৬০
প্রকৃত মুসলমান বৈবাহিক জীবনকে খুব উপভোগ করে। স্ত্রীর সাথে হাসি- কৌতুক, রসিকতা ও সুস্থ বিনোদন করে জীবনটাকে অনেক উপভোগ্য করে তোলে। কারণ, এটাও রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ। রাসুলুল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে সুসংগঠিত করা, জিহাদের সৈন্যদল প্রস্তুত করাসহ অসংখ্য কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে স্ত্রীদের সাথে আমোদ-প্রমোদ ও সুস্থ বিনোদন করতেন। ব্যস্ততা তাঁকে স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহারে, চারিত্রিক উদারতায়, সহাস্যবদনে কথা বলায় ও সুস্থ বিনোদনে একজন আদর্শ স্বামী হতে বাধা দিতে পারেনি।
এ সম্পর্কিত একটি ঘটনা আয়িশা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: 'আমি রাসুলুল্লাহ -এর জন্য “হারিরা” (আটার তৈরি এক ধরনের প্রোটিন জাতীয় খাবার) রান্না করে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম। তখন সাওদা তাঁর নিকট ছিলেন। রাসুলুল্লাহ ছিলেন তার ও আমার মাঝে। আমি সাওদা -কে বললাম, আপনিও খান। তিনি খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আমি বললাম, না খেলে আপনার মুখে মেখে দেবো। তবুও তিনি খেলেন না। তাই আমি হারিরার ভেতর হাত ঢুকিয়ে তার মুখে মেখে দিলাম। তা দেখে রাসুলুল্লাহ তাকে ধরে হাসতে হাসতে বললেন, এবার তুমিও ওর মুখে মেখে দাও। আরেক বর্ণনায় আছে, তখন রাসুলুল্লাহ তাঁর হাঁটু নিচু করে দিলেন যেন সাওদা আমার থেকে তা নিতে পারেন। তারপর পাত্র থেকে তিনি কিছুটা খেয়ে হাতটা আমার মুখে মুছে দিলেন। এ কাণ্ড দেখে রাসুলুল্লাহ অনেক হাসলেন। '১৬১
এখানে দেখুন, রাসুলুল্লাহ স্ত্রীদের সাথে কত মজার রসিকতা করলেন! এটা নিঃসন্দেহে স্ত্রীদের প্রতি তাঁর উদারচিত্ততা, উত্তম ব্যবহার ও বড় মনের পরিচয় বহন করে।
আয়িশা বর্ণনা করেন: 'এক সফরে তিনি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে ছিলেন। সে সফরে রাসুলুল্লাহ তার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে হেরে গেলেন। তখন তার শরীর হালকা- পাতলা ছিল। তিনি স্বাস্থ্যবান হওয়ার পর আরেক সফরে তাকে নিয়ে বের হলে আবার প্রতিযোগিতা করলেন। এবারে রাসুলুল্লাহ তাকে হারিয়ে দিয়ে বললেন, আগের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম। ১৬২
প্রিয়তমা স্ত্রীর মনে আনন্দ দেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ এর চেয়েও বড় কাজ করেছেন। নিজেই তাকে আড়াল করে (পাপাচারমুক্ত) খেলা দেখিয়েছেন।
এ সম্পর্কে আয়িশা বর্ণনা করেন :
‘একদিন রাসুলুল্লাহ বসা ছিলেন। এমন সময় তিনি লোকজন ও শিশু- কিশোরদের হর্ষোল্লাস শুনতে পেলেন। দেখতে পেলেন, হাবশিরা নাচছে আর লোকজন তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য উপভোগ করছে। তখন তিনি বললেন, আয়িশা, চলো খেলা দেখে আসি। তিনি বলেন, তখন আমি তাঁর কাঁধের ওপর আমার গাল রেখে দুই কাঁধের মাঝখান দিয়ে খেলা দেখতে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, আয়িশা, মন ভরেছে? আমি বললাম, না। আমি আসলে তাঁর কাছে আমার গুরুত্ব কতটুক তা দেখতে চাইছিলাম। দেখলাম, তিনি কিছুক্ষণ এক পায়ের ওপর, কিছুক্ষণ অপর পায়ের ওপর পালাক্রমে ভর দিয়ে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছেন।'১৬৩
অন্য বর্ণনায় আয়িশা বলেন:
وَاللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُومُ عَلَى بَابٍ حُجْرَتِي، وَالْحَبَشَةُ يَلْعَبُونَ بِحِرَابِهِمْ، فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَسْتُرُنِي بِرِدَائِهِ، لِكَيْ أَنْظُرَ إِلَى لَعِبِهِمْ، ثُمَّ يَقُومُ مِنْ أَجْلِي، حَتَّى أَكُونَ أَنَا الَّتِي أَنْصَرِفُ، فَاقْدِرُوا قَدْرَ الْجَارِيَةِ الْحَدِيثَةِ السِّنِّ، حَرِيصَةً عَلَى اللهْوِ
‘কসম খেয়ে বলছি, রাসুলুল্লাহ -কে আমার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, যখন হাবশিরা মসজিদের মাঠে বল্লম দিয়ে খেলছিল। তিনি তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করছিলেন, যেন তাঁর কাঁধ ও কানের মাঝ দিয়ে আমি খেলা দেখতে পারি। আমার জন্য তিনি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, যতক্ষণ না আমি নিজেই সেখান থেকে সরে আসি। এখন তোমরা অনুমান করে দেখো যে, খেলাধুলায় আগ্রহী অল্পবয়স্কা একজন বালিকার (খেলা দেখার) আগ্রহের মাত্রা কতটুকু হতে পারে।'১৬৪
প্রকৃত মুসলমান যখন রাসুলুল্লাহ -এর জীবনীতে স্ত্রীদের সাথে তাঁর সহজ-সরল আচরণ ও রসিকতার ঘটনা দেখতে পায়, তখন সেও আপন স্ত্রীর সাথে উত্তম জীবনযাপনকারী ও নম্র-ভদ্র-সহজ-সরল আচরণকারী হয়ে ওঠে। আর বৈধতার গণ্ডির ভেতর থেকে তাকে রসিকতা ও আনন্দ-বিনোদন করার সুযোগ দেয়।
প্রকৃত মুসলমান মূর্খ স্বামীদের মতো বদমেজাজি নয়, যারা রান্না পছন্দ না হলে বা ঠিক সময় খাবার প্রস্তুত করতে না পারলে কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো দোষ পেলে দুনিয়া ওলটপালট করে দেয়। রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শে আদর্শবান প্রকৃত মুসলমান স্ত্রীর সাথে ভদ্র, ধৈর্যশীল ও উদারচিত্তে আচরণ করে। এ ধরনের কোনো ভুল হলে ক্ষমা করে দেয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেননি। পছন্দ হলে খেতেন, আর পছন্দ না হলে রেখে দিতেন। ১৬৫
রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন তাঁর স্ত্রীদের কাছে তরকারি আছে কি না জানতে চাইলেন। তারা উত্তর দিলেন, ঝোল ছাড়া কিছুই নেই। তিনি সেটাই খেলেন। আর বললেন, نِعْمَ الْأُدُمُ الْخَلُ، نِعْمَ الْأُدُمُ الْخَلُّ 'ঝোল কত উত্তম তরকারি! ঝোল কত উত্তম তরকারি!'১৬৬
যেসব স্বামী নামের জালিম পুরুষ পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রীর ওপর তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে, খানা দিতে একটু দেরি হলে বা খানা তেমন সুস্বাদু না হলে স্ত্রীদের গালিগালাজ করে বা মারধর করে, অথচ এর পেছনে যৌক্তিক কোনো অজুহাতও থাকতে পারে, কিন্তু এসব অজুহাত জানার পূর্বেই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে—এ সকল মূর্খ স্বামীদের রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ হাদিসগুলো দেখে নেওয়া অতীব জরুরি। এ কথা তাদের বুঝে নেওয়া জরুরি যে, তারা যা করে তা পুরুষত্ব নয়; বরং স্ত্রীর প্রেম-ভালোবাসা অর্জন করতে পারাই আসল পুরুষত্বের নিদর্শন।
প্রকৃত মুসলমান তার স্ত্রীর সাথে যেমন উত্তম আচরণ ও ভালো ব্যবহার করে, তেমনই স্ত্রীর বান্ধবীদের সাথেও উত্তম আচরণ ও ভালো ব্যবহার করে। কারণ, রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও এমনই করতেন।
এ ব্যাপারে আয়িশা রা. বর্ণনা করেন:
كَانَتْ عَجُوزُ تَأْتِي النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَبَشُّ بِهَا وَيُكْرِمُهَا، فَقُلْتُ: بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي، إِنَّكَ لَتَصْنَعُ بِهَذِهِ الْعَجُوزِ شَيْئًا لَا تَصْنَعُهُ بِأَحَدٍ قَالَ: إِنَّهَا كَانَتْ تَأْتِينَا عِنْدَ خَدِيجَةَ، أَمَا عَلِمْتِ أَنَّ كَرَمَ الْوُدِّ مِنَ الْإِيمَانِ
‘এক বৃদ্ধা মাঝেমধ্যে নবিজি ﷺ-এর নিকট আসতেন। তিনি আসলে নবিজি ﷺ খুশি হতেন এবং তাকে খুব সম্মান করতেন। আমি বললাম, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! এ বুড়ির প্রতি আপনি এত আগ্রহী হন কেন? তার সাথে এমন ব্যবহার করেন কেন, যা অন্যদের সাথে করেন না? নবিজি ﷺ উত্তর দিলেন,
খাদিজা বেঁচে থাকতে এ মহিলা আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন (অর্থাৎ তিনি খাদিজার বান্ধবী ছিলেন)। তুমি কি জানো না যে, বন্ধুত্বের মর্যাদা দেওয়া ইমানেরই অংশ?'১৬৭
স্ত্রীরও মাঝেমধ্যে রাগ আসে। যেকোনো কারণে হঠাৎ অভিমান করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। আবার স্বামীর সামনে বিভিন্ন উপায়ে এ রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। এমন অবস্থায় মুসলমান স্বামীকে স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। এটাকে স্ত্রীর সহজাত মেয়েলি স্বভাব মনে করে ধৈর্য ধরতে হবে। এভাবেই তার রাগ ও অভিমান ভাঙাতে হবে। রাসুলুল্লাহ -ও এমনটাই করতেন, যখন তাঁর স্ত্রীগণ তাঁর সাথে অভিমান করতেন বা কোনো স্ত্রী তাঁর সাথে (সাময়িক) কথা বলা বন্ধ করে দিতেন।
উমর বিন খাত্তাব বলেন:
وَكَانَ مَنْزِلِي فِي بَنِي أُمَيَّةَ بْنِ زَيْدٍ بِالْعَوَالِي، فَتَغَضَّبْتُ يَوْمًا عَلَى امْرَأَتِي، فَإِذَا هِيَ تُرَاجِعُنِي، فَأَنْكَرْتُ أَنْ تُرَاجِعَنِي، فَقَالَتْ: مَا تُنْكِرُ أَنْ أُرَاجِعَكَ، فَوَاللَّهِ إِنَّ أَزْوَاجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُرَاجِعْنَهُ، وَتَهْجُرُهُ إِحْدَاهُنَّ الْيَوْمَ إِلَى اللَّيْلِ ، فَانْطَلَقْتُ فَدَخَلْتُ عَلَى حَفْصَةَ، فَقُلْتُ: أَتُرَاجِعِينَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَقَالَتْ: نَعَمْ، فَقُلْتُ: أَتَهْجُرُهُ إِحْدَاكُنَّ الْيَوْمَ إِلَى اللَّيْلِ؟ قَالَتْ: نَعَمْ، قُلْتُ: قَدْ خَابَ مَنْ فَعَلَ ذَلِكَ مِنْكُنَّ، وَخَسِرَ، أَفَتَأْمَنُ إِحْدَاكُنَّ أَنْ يَغْضَبَ اللهُ عَلَيْهَا لِغَضَبِ رَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَإِذَا هِيَ قَدْ هَلَكَتْ، لَا تُرَاجِعِي رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَا تَسْأَلِيهِ شَيْئًا، وَسَلِينِي مَا بَدَا لَكِ
'আমাদের কুরাইশ নারীরা ততটা স্বাধীনভাবাপন্ন ছিল না, যতটা ছিল আনসার নারীরা। যখন আমরা আনসার ভাইদের নিকট এলাম, তখন আমাদের নারীরাও সে স্বাধীনচেতা মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হলো। মদিনার উপকণ্ঠে বনি উমাইয়া বিন জাইদের এলাকায় ছিল আমাদের বাড়ি। একবার আমি কোনো ব্যাপারে আমার স্ত্রীর ওপর রাগান্বিত হলে সেও আমার কথার প্রত্যুত্তর দিতে থাকল। এটা আমার কাছে অপছন্দনীয় ঠেকল। তখন সে বলল, আপনি আমার এ প্রত্যুত্তরে অবাক হচ্ছেন? আল্লাহর কসম! নবিজি -এর স্ত্রীগণও (কখনোসখনো) তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করেন। তাদের কেউ কেউ তো রাগ করে পুরো দিন নবিজি-এর সাথে কথা বলেন না। এটা আমাকে আশ্চর্যান্বিত করল। তাই আমি (আমার মেয়ে রাসুলুল্লাহ -এর স্ত্রী) হাফসা -এর কাছে গেলাম। তাকে বললাম, তোমরা কি রাসুলুল্লাহ-এর সাথে রাগ করে তাঁর কথার প্রত্যুত্তর দিয়ে থাকো? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাদের কেউ কি সকাল হতে রাত পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ -এর সাথে রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে থাকো? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তোমাদের মধ্যে যে এরূপ আচরণ করেছে, সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে! তোমরা কি মনে করো যে, রাসুলুল্লাহ -কে রাগান্বিত করার মাধ্যমে আল্লাহর ক্রোধের মুখোমুখি হয়েও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে? তাই কখনো তুমি রাসুলুল্লাহ -এর সাথে রাগান্বিত হয়ে কথা বলবে না এবং তাঁর কাছ থেকে কোনো কিছু চাইবে না। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকেই বলবে। '১৬৮
এরপর উমর রাসুলুল্লাহ-এর নিকট গিয়ে তার ও হাফসার কথোপকথনের ব্যাপারে জানালেন। উমর-এর কথা শুনে রাসুলুল্লাহ মুচকি হাসলেন।
প্রত্যেক মুসলমানকে রাসুলুল্লাহ -এর এসব গুণ অবশ্যই অর্জন করতে হবে এবং সকল বিষয়ে রাসুলুল্লাহ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলতে হবে। আর তখনই ‘ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ কথাটির স্বার্থকতা প্রমাণিত হবে। বর্তমান সময়ে অহরহ পারিবারিক কলহ-বিবাদ হচ্ছে, দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, এসব মূলত রাসুলুল্লাহ-এর দাম্পত্য জীবন-সম্পর্কিত আদর্শ না জানার কারণে কিংবা জেনেও না মানার কারণে হচ্ছে। যদি দাম্পত্য জীবনে রাসুলুল্লাহ -এর উল্লিখিত গুণাবলি ও আদর্শ মেনে চলা হয়, তাহলে পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সুখের হাওয়া প্রবাহিত হবে। প্রত্যেক ঘর থেকে কলহ-বিবাদের কোলাহল বিদায় হয়ে প্রশান্তির শীতলতা নেমে আসবে।
টিকাঃ
১৬৪. হাদিসটির শেষোক্ত বাক্য দ্বারা আয়িশা -এর উদ্দেশ্য, রাসুলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীর বৈধ আনন্দ-বিনোদনের ব্যাপারে কতটা গুরুত্ব দিতেন, তা বর্ণনা করা। তিনি অল্পবয়স্কা হওয়ায় স্বাভাবিকত খেলাধুলা ও বিনোদনের প্রতি বেশি আগ্রহী ছিলেন। আর রাসুলুল্লাহ একজন আদর্শ স্বামী হিসাবে তাঁর এ আগ্রহ বা চাহিদার অবমূল্যায়ন করেননি। বৈধতার সীমার মধ্যে রেখে তাঁকে এ বিষয়ে সাহায্য করেছেন এবং এজন্য তাঁকে এতটা সময় দিয়েছেন যে, খেলাধুলার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় ধরে দেখতে থাকায় তার বিরক্তি চলে এসেছে, কিন্তু রাসুলুল্লাহ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে সঙ্গ দিয়ে গেছেন, বিরক্তির কোনো চিহ্ন পর্যন্ত প্রকাশ করেননি। শেষ বাক্যে আয়িশা সেটাই বলছিলেন যে, চিন্তা করে দেখো, খেলাধুলায় আমার এত আসক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় হয়ে যাওয়ায় আমি সেখান থেকে উঠে চলে এসেছি, কিন্তু আল্লাহর রাসুল এ দীর্ঘ সময়ে কোনো বিরক্তিভাব দেখাননি। আসলে একজন প্রকৃত মুসলিম স্বামীর এমনই হওয়া উচিত। এমন স্বামীকেই বলে আদর্শ স্বামী, যার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি ছিলেন রাসুলুল্লাহ । (অনুবাদক)
📄 সফল স্বামী
প্রকৃত মুসলমান দাম্পত্য জীবনে রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শ মেনে চলে। তাই সে সমাজে একজন সফল স্বামী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। নেককার, পূত-পবিত্র ও সতী-সাধ্বী স্ত্রীর হৃদয়ের মণিকোঠায় তার জন্য ভালোবাসার প্রাসাদ নির্মিত হয়। কারণ, সে স্ত্রীর ভালোবাসা আদায়ের জন্য নববি পদ্ধতি অনুসরণ করে। কথা বলার সময় তাকে মুচকি হাসি উপহার দেয়। তার মেয়েলি মান-অভিমান ও আহ্লাদগুলো মেনে নেয়। মিষ্টিকথার ফুলঝুরি দিয়ে তার অভিমান ভাঙায়। একটিবারের জন্যও সে ভুলে যায় না যে, তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে, যার বক্রতা সোজা করার সাধ্য তার নেই।