📘 আদর্শ মুসলিম 📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের পদ্ধতি

📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের পদ্ধতি


প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার সাথে সদাচারী হয়। তাদের প্রতি মর্যাদা ও সম্মানের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। তারা যখন তার কাছে আসেন, তখন তাদের সম্মানার্থে সে দাঁড়িয়ে যায়। তাদের হাত আলতো করে ধরে তাতে চুম্বন করে। তাদের সামনে নিচু আওয়াজে কথা বলে। নম্রভাবে মাথা নত করে রাখে। কথা বলার সময় নম্র, ভদ্র ও শিষ্টাচারপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করে। এমন কোনো শব্দ বা বাক্য মুখ দিয়ে বের করে না, যা তাদের কানে কটু শোনায় বা তাদের মনে আঘাত হানতে পারে। তাদের সাথে আচার-ব্যবহারের সময় এমন কোনো আচরণ তার থেকে প্রকাশ পায় না, যা তাদের প্রতি শিষ্টাচার ও সম্মান প্রদর্শনের পরিপন্থী। কেননা, সে সর্বাবস্থায় ও সকল পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করে :
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا - إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا
وَقُلْ لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের “উহ” শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও এবং বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন।'১৩৮
পিতা-মাতা অনেক সময় সত্য পথ থেকে বিচ্যুত থাকেন। তখন মুসলমান সন্তানের কর্তব্য হলো, খুব বিচক্ষণতার সাথে তাদের প্রতি নম্র, ভদ্র, আন্তরিক, উদার ও একনিষ্ঠ কল্যাণকামী হয়ে তাদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং এভাবেই হকের পথে তাদের দাওয়াত দিতে থাকা। এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে কঠোর হওয়া যাবে না, কোনো রকমের কটুবাক্য ও তিরস্কারমূলক কথা শোনানো যাবে না; বরং তাদের ভালোবাসা ও নম্রতার সহিত বুঝাতে হবে, যাতে তারা সে সত্যের দিকে ফিরে আসে, যার ওপর তাদের সন্তান বিশ্বাস স্থাপন করেছে। সারকথা হলো, পিতা-মাতাকে হকের পথে দাওয়াত দেওয়ার জন্য মুসলমান সন্তানকে হকের অকাট্য প্রমাণাদি, উত্তম কথা এবং ভদ্রজনোচিত আচরণ—এ বিষয়গুলো মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।
পিতা-মাতা মুশরিক হলেও ইসলাম তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়; অথচ শিরক হলো সবচেয় বড় কবিরা গুনাহ!
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ - وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِِي
مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبُهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুবছরে। পাশাপাশি এ নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদের জ্ঞাত করব।'১৩৯
পিতা-মাতা সন্তানের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় ও সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। তাদের মর্যাদা ও সম্মান অনেক ওপরে। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য সবার আগে তার আকিদা ও বিশ্বাস। তাই পিতা-মাতা যদি মুশরিক হন আর তারা সন্তানকে শিরক করার নির্দেশ দেন, তখন তাদের আনুগত্য করা যাবে না। কারণ, স্রষ্টার নাফরমানির ক্ষেত্রে সৃষ্টির আনুগত্য চলে না। তা ছাড়া আকিদার সম্পর্ক অন্য সকল সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। তবে হ্যাঁ, এমন মুহূর্তেও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ও তাদের সেবা করা সন্তানের কর্তব্য।
এজন্য প্রকৃত মুসলমান সর্বাবস্থায় পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। আল্লাহর আনুগত্যের পরিসীমায় থেকে যথাসাধ্য তাদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে, তাদের সেবা করতে ও তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে কোনোরূপ সংকীর্ণতা দেখায় না। তাদের জন্য যথাসাধ্য উত্তম খাবার-দাবার, ভালো পোশাক-আশাক ও সুন্দর আবাসস্থলের ব্যবস্থা করে। মোটকথা, তারা যে সময়ে বাস করেন, সে সময়ের যথোপযুক্ত বৈধ বিলাসিতা ও উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে। এ ছাড়াও তাদের সাথে উত্তম ও সুন্দর ভাষায় হাসিমুখে কথা বলে। তাদের প্রতি আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়।
প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার সাথে শুধু তাদের জীবদ্দশায় সদ্ব্যবহার করে, তা নয়; বরং তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে এবং তাদের জন্য অধিক হারে দুআ করে। মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার পদ্ধতি এটাই। পিতা-মাতার জন্য দুআর বাক্য স্বয়ং আল্লাহ-ই শিখিয়ে দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন: وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
'আর তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও এবং বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন। '১৪০
মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটাই ইসলামের নির্দেশনা, যা এ অধ্যায়ের শুরু থেকে এতক্ষণ আলোচনা করা হলো। আর সে-ই প্রকৃত মুসলমান, যে এ নির্দেশনা পূর্ণরূপে অনুসরণ করে চলে। কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমান বস্তুবাদী-ভোগবাদী জীবনব্যবস্থা ও আধুনিক নগরায়ণ অধিকাংশ মুসলমানকে ইসলামের এ নির্দেশনা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।
বর্তমান সময়ে আমাদের নিকট প্রথমে গুরুত্ব পায় স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। পিতা-মাতার অবস্থান এদের পরে। তা-ও খুব অল্পসংখ্যক পিতা-মাতা এ দ্বিতীয় স্তরের গুরুত্ব পেয়ে থাকেন। অবশ্য সন্তান যদি প্রকৃত মুসলমান হয়, নেককার ও দ্বীনদার হয়, তখন পিতা-মাতা সন্তানের নিকট থেকে তাদের ন্যায্য অধিকার ও যথাযথ গুরুত্ব পেয়ে থাকেন।
আসলে পাশ্চিমা আধুনিক সমাজব্যবস্থা অধিকাংশ মুসলমানের হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে, যে সমাজব্যবস্থায় পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও মুরব্বিদের যত্ন নেওয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা নেই। তাই যে সকল মুসলমান এ সমাজব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত, তাদের নিকট কেবল স্ত্রী-সন্তানই গুরুত্ব পায়। যে পিতা-মাতা সন্তানদের জন্য শত শত নির্ঘুম রজনী কাটিয়েছেন, নিজেদের সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের সুখ কামনা করেছেন, সেই পিতা-মাতার প্রতি একটু ভালোবাসা দেখানোর সময় এসব আধুনিক চিন্তা-চেতনায় পালিত সন্তানদের হয়ে ওঠে না; বরং তাদের খুব ভারী বোঝা মনে হয়, যখন তারা বয়সের ভারে অচল হয়ে পড়েন। তাদের সকল চিন্তা-ভাবনা আবর্তিত হয় স্ত্রী-সন্তানদের ঘিরে। তাদের উন্নত খাবার-দাবার, উত্তম পোশাক-আশাকসহ বিলাসী জীবনের সকল উপকরণ প্রদান করে। মা-বাবার হাতে সুখী জীবনের এসব উপকরণ তুলে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাদের মনে জাগে না। অথচ এমন সময়ে প্রিয় সন্তানের হাত থেকে এসব উপকরণ পাওয়া তাদের বড্ড বেশি প্রয়োজন!
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা নিয়ে তাদের প্রতি মনোযোগী হওয়া, তাদের জন্য যথাসাধ্য ব্যয় করা, সুন্দর কথা ও ভালোবাসামাখা হাসি তাদের উপহার দেওয়া ইত্যাদি বিষয় মুসলমানদের মৌলিক গুণাবলি। জীবনের সুখ-দুঃখ, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা-সব সময় সকল পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলমানের মাঝে এসব গুণাবলি থাকা বাঞ্ছনীয়। তখন এসব গুণাবলি অন্তর কঠোর হয়ে যাওয়া থেকে তাদের রক্ষা করবে। তাদের ভেতর থেকে দাম্ভিকতা ও আত্মম্ভরিতা দূর করে দেবে। তাদের পৌঁছে দেবে মানবিকতার শীর্ষচূড়ায়। সবশেষে নিয়ে যাবে চিরশন্তির জান্নাতে। পক্ষান্তরে যাদের মাঝে এসব গুণাবলি থাকবে না, তারা মানবিকতার নিকৃষ্টতম নিম্নস্তরে নিপতিত হবে, যেখান থেকে জাহান্নামের জ্বলন্ত গর্ত খুব বেশি দূরে নয়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية