📄 পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে
ইসলামের মহান নবি তাঁর মহানুভবতা ও উদারতামূলক দিক-নির্দেশনার কারণে মানবিকতার শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করেছেন। তাঁর মহানুভবতার একটি প্রমাণ হলো, তিনি অমুসলিম পিতা-মাতার সাথেও সদ্ব্যবহার করতে ও তাদের সেবা করতে আদেশ করেছেন। এ সম্পকির্ত একটি ঘটনা আসমা বিনতে আবু বকর-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন : قَدِمَتْ عَلَيَّ أُنِّي وَهِيَ مُشْرِكَةً فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قُلْتُ: وَهِيَ رَاغِبَةٌ، أَفَأَصِلُ أُمِّي؟ قَالَ: نَعَمْ صِلِي أُمَّكِ
'আমার কাছে আমার মা আসলেন। রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় তিনি মুশরিকা ছিলেন। তখন আমি রাসুলুল্লাহ-কে এ ব্যাপারে তাঁর নির্দেশনা জানার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম যে, আমার মা আমার নিকট কিছু চাইছেন; আমি কি তার সাথে মাতৃত্বের সম্পর্ক রাখব?' রাসুলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, তার সাথে মাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখো। ১২৮
কুরআন ও হাদিসের এমন উন্নত নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত একজন প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে বেশি সদাচারী ও অনুগ্রহশীল হয়ে থাকে। সর্বাবস্থায় এবং সব সময়। সাহাবায়ে কিরাম ও তাঁদের প্রকৃত অনুসারীগণ এমনই ছিলেন।
যেমন এক ব্যক্তি সাইদ বিন মুসাইয়িব-কে বললেন, আমি পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার-সম্পকিত আয়াতটির মর্ম পুরোটাই বুঝেছি, তবে তার একটি অংশ وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا )আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।) এর মর্ম আমি ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। এখানে 'কাওলে কারিম' বা শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলতে কী বুঝানো হয়েছে আসলে? তখন সাইদ উত্তর দিলেন, এর অর্থ হলো, তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলবে, যেভাবে একজন গোলাম তার মনিবের সাথে কথা বলে। আর ইবনে সিরিন সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মায়ের সাথে অসুস্থ ব্যক্তির মতো খুব ক্ষীণ আওয়াজে কথা বলতেন। মাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার জন্যই তিনি এমনটি করতেন।
📄 তাদের অবাধ্য হতে ভয় করে
এ অধ্যায়ে এতক্ষণ ধরে আমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করে এসেছি। এখান থেকে পিতা-মাতার নাফরমানি ও অবাধ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করব। আশা করি, এ আলোচনা পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেবে।
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার স্থান যেমন ঠিক ইমানের পরে, তেমনই পিতা-মাতার অবাধ্যতার স্থানও ঠিক শিরকের পরে। এখান থেকেই বুঝা যায়, পিতা-মাতার অবাধ্যতা কতখানি গুরুতর একটি অপরাধ। তা ছাড়া ইসলাম এটাকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহের একটি বলে পরিচয় দিয়েছে। যেমন: আবু বাকরা নুফাই বিন হারিস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الكَبَائِرِ؟ ثَلَاثًا، قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: الإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ...
'আমি কি সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহ সম্পর্কে তোমাদের বলব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।...'১২৯
📄 সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাতাকে পিতার ওপর প্রাধান্য দেয়
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের সুষ্ঠু ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যেন কোনোরূপ ভুল না হয়, এজন্য এ সম্পর্কিত ইসলামের নির্দেশনাগুলো তিনভাগে বর্ণিত হয়েছে। কিছু নির্দেশনা পিতা-মাতা উভয়কে শামিল করে, কিছু শুধু পিতার জন্য, আর কিছু শুধুই মায়ের জন্য।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-এর নিকট জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জানতে চাইলেন, পিতা-মাতা উভয়ের মধ্যে কেউ জীবিত আছে কি না। এ হাদিসের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দিলেন, পিতা- মাতা উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা আবশ্যক।
উপরোল্লিখিত আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ আসমা-কে তাঁর মুশরিকা মায়ের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: «أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَبُوكَ»
'এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ-কে প্রশ্ন করলেন, কে আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার? উত্তরে তিনি বললেন, তোমার মা। আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? উত্তর দিলেন, তোমার মা। তৃতীয়বার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? উত্তর দিলেন, তোমার মা। চতুর্থবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? এবারে উত্তরে দিলেন, তোমার পিতা। '১৩০
এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাকে পিতার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ-এর পর সাহাবায়ে কিরাম এ বিষয়ের প্রতি مسلمانوںকে তাগিদ দিতেন। এমনকি উম্মাহর অভিজ্ঞ আলিম ও ফকিহ সাহাবি ইবনে আব্বাস মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্যশীল আমল মনে করতেন।
এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে :
أَنَّهُ أَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: إِنِّي خَطَبْتُ امْرَأَةٌ، فَأَبَتْ أَنْ تَنْكِحَنِي، وَخَطَبَهَا غَيْرِي، فَأَحَبَّتْ أَنْ تَنْكِحَهُ، فَغِرْتُ عَلَيْهَا فَقَتَلْتُهَا، فَهَلْ لِي مِنْ تَوْبَةٍ؟
قَالَ: أُمُّكَ حَيَّةُ؟ قَالَ: لَا ، قَالَ : تُبْ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَتَقَرَّبْ إِلَيْهِ مَا اسْتَطَعْتَ. فَذَهَبْتُ فَسَأَلْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ: لِمَ سَأَلْتَهُ عَنْ حَيَاةِ أُمِّهِ؟ فَقَالَ: إِنِّي لَا أَعْلَمُ عَمَلًا أَقْرَبَ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ بِرِّ الْوَالِدَةِ
'এক ব্যক্তি তাঁকে (ইবনে আব্বাস-কে) বললেন, একটি মেয়ের কাছে আমি বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম, কিন্তু সে আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল। আরেক ব্যক্তি তাকে প্রস্তাব পাঠালে সে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল। এতে ঈর্ষাকাতর হয়ে আমি মেয়েটিকে হত্যা করে ফেললাম। এখন কি আমার তাওবার কোনো পথ খোলা আছে? তিনি বললেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? লোকটি বললেন, না, নেই। তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে থাকো এবং তোমার সবটুকু চেষ্টা ব্যয় করে তাঁর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে থাকো।'
এ হাদিসের বর্ণনাকারী আতা বিন ইয়াসার বলেন, তখন আমি ইবনে আব্বাস-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তার মা জীবিত কি না জানতে চেয়েছেন কেন? তিনি বললেন, কারণ মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার চেয়ে আল্লাহর অধিক নৈকট্যশীল কোনো আমল আমার জানা নেই। '১৩১
এজন্যই ইমাম বুখারি তাঁর কিতাব 'আল-আদাবুল মুফরাদ'-এর প্রথম অধ্যায় 'পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার'-এ মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের পরিচ্ছেদকে পিতার সাথে সদ্ব্যবহারের পরিচ্ছেদের পূর্বে উল্লেখ করেছেন। পরিচ্ছেদের এমন বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে পিতার ওপর মায়ের অগ্রাধিকার বুঝাতে চেয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ
‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ ছাড়ানো হয় দুবছরে। তাকে নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।’ ১৩২
কুরআনের বর্ণনার দিকে লক্ষ করুন, এখানে প্রথমে পিতা-মাতা উভয়ের সাথে সন্তানদের সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপর মায়ের ফজিলতের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গর্ভধারণ, দুধপান করানো ও এ দুই কাজ করতে গিয়ে কী নিদারুণ কষ্ট তাকে পোহাতে হয়েছে, তার প্রতি সন্তানদের অবহিত করা হয়েছে। বুঝাই যায়, কুরআনও মায়ের মর্যাদা ও তার প্রতি সদ্ব্যবহার করাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
আয়াতে আরেকটি বিষয় লক্ষ করুন, এখানে বলা হয়েছে, ‘নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ অর্থাৎ আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা যেমন জরুরি, তেমনই সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় করাও বাঞ্ছনীয়। অথচ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সকল ফজিলত ও উত্তম আমলসমূহের মূল। সুবহানাল্লাহ! ইসলাম পিতা-মাতাকে কী উচ্চ মর্যাদাই না দিয়েছে!
কিন্তু বর্তমান সময়ের চিত্র হলো, সন্তান দুনিয়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। রিজিক অনুসন্ধানই তার একমাত্র কাজ। সম্পদের পাহাড় গড়েছে। সুন্দরী বউকে নিয়ে বড় মজায় আছে। কিন্তু পিতা-মাতার প্রতি তার চরম অবহেলা। তাদের একরকম ভুলেই গেছে। তাদের জন্য খরচ করতে তার হাত গুটিয়ে আসে। যাদের অবস্থা এমন, তারা আসলে বুঝতেই পারছে না যে, এ কারণে আল্লাহ তাদের ওপর কতখানি রেগে আছেন এবং যেকোনো সময় তাঁর ক্রোধ তাদের ওপর গজব হয়ে নেমে আসতে পারে!
কিন্তু প্রকৃত মুসলমান এমন নয়। সে সব সময় পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে। তাদের সেবা করে, যত্ন নেয় এবং ভালোবাসে। যথাসাধ্য তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে। আবার এটাকে তাদের প্রতি কোনো করুণা হিসাবে দেখে না; বরং এটাকে তার ওপর পিতা-মাতার হক ও অধিকার মনে করে। এর কারণ হলো, প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার-সম্পর্কিত ইসলামি নির্দেশনাগুলো পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করে চলে এবং রাসুলুল্লাহ -এর এ হাদিসটির ওপর পূর্ণরূপে আমল করে—'তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার অধিকারে।'১৩৩
📄 পিতা-মাতার বন্ধুদের সাথে সদ্ব্যবহার করে
ইসলাম শুধু পিতা-মাতার সাথেই সদ্ব্যবহারের কথা বলে না; বরং তাদের বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের সাথেও ভালো ব্যবহার করতে বলে।
এ সম্পর্কে ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
أَبَرُّ الْبِرِّ أَنْ يَصِلَ الرَّجُلُ وُدَّ أَبِيهِ
'সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো, কোনো ব্যক্তি তার পিতার বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা।'১৩৪
অন্য বর্ণনায় এভাবে বলা হয়েছে:
إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ صِلَةَ الرَّجُلِ أَهْلَ وُدَّ أَبِيهِ bَعْدَ أَنْ يُوَلِّيَ
'নিশ্চয় সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো, স্বীয় পিতার মৃত্যুর পর তার (পিতার) বন্ধুদের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক রাখবে।'১৩৫
আব্দুল্লাহ বিন উমর -এর সাথে তাঁর পিতার এক বন্ধুর দেখা হলো। তিনি তার সাথে একটু বেশিই সদ্ব্যবহার করলেন এবং তাকে খুব বেশি সম্মান দেখালেন। তা দেখে সাথে থাকা কয়েকজন লোক বলল, ওই ব্যক্তিকে দুই দিরহাম সদকা দিয়ে দিলেই সেটা তার জন্য যথেষ্ট হতো! (এত মর্যাদা দেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল?) তখন ইবনে উমর বললেন, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
احفظ ود أبيك لا تقطعه فيُطفىء الله نُورَكَ
'তোমার পিতার বন্ধুত্ব রক্ষা করবে, ছিন্ন করবে না; অন্যথায় আল্লাহ তাআলা তোমার নুর নিভিয়ে দেবেন।'১৩৬
বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলেন :
يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ بَقِيَ مِنْ بِرِّ أَبَوَيَّ شَيْءٍ بَعْدَ مَوْتِهِمَا أَبَرُّهُمَا؟ قَالَ: نَعَمْ، خِصَالُ أَرْبَعُ : الدُّعَاءُ لَهُمَا، وَالاسْتِغْفَارُ لَهُمَا، وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا، وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا، وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا رَحِمَ لَكَ إِلَّا مِنْ قِبْلِهِمَا
'হে আল্লাহর রাসুল, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার কোনো পন্থা কি আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, চারটি পন্থা রয়েছে। এক. তাদের জন্য দুআ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা, দুই. তাদের কৃত ওয়াদাসমূহ বাস্তবায়ন করা, তিন, তাদের বন্ধুবান্ধবদের সম্মান করা, চার. তাদের সূত্র ধরে যারা তোমার আত্মীয় হয়েছে, তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।'১৩৭
পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা, সদ্ব্যবহার ও সম্মান প্রদর্শনের সর্বোচ্চ স্তর হলো, সন্তান পিতা-মাতার বন্ধুদের সাথে তাদের জীবদ্দশায় এবং মরণের পর সুসম্পর্ক রাখবে। তাই প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার বন্ধুবান্ধব ও তাদের প্রিয়জনদের সাথে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক রাখে। তাদের মৃত্যুর পরও সে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলে। তারা সম্পর্কের যে বন্ধন তৈরি করেছিলেন, তা ছিন্ন করে দেয় না। এ ধরনের উচ্চাঙ্গ মানবিক গুণাবলি ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই মানুষের জীবনে সুখ ও শান্তির স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত করে। এ গুণগুলো কেবল একজন প্রকৃত মুসলমানের মাঝেই পাওয়া যায়।
পশ্চিমা সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তান পিতা-মাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার সাথে সাথে পুত্রত্বের সম্পকও ছিন্ন হয়ে যায়। তাই পিতা-মাতার সাথে তার দেখাশোনা ও ভালোবাসা বিনিময় হয় না আর। সন্তান আপন পথে আপন গতিতে চলতে থাকে। যে বাবা-মা তাকে জন্ম দিয়েছেন, শৈশবের দুর্বলতার সময় তার শক্তি হয়ে পাশে ছিলেন, তার সুখের জন্য নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কুরবানি দিয়েছেন এবং সব হারিয়ে এখন বার্ধক্যতাড়িত হয়ে ধুঁকছেন, তাদের প্রতি পেছনে ফিরে তাকাবার সময় তার নেই। মা-বাবার মাথায় একটুখানি ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দেওয়ার ফুরসত তার হয়ে ওঠে না। এটাই পশ্চিমা সমাজে এবং পশ্চিমা-প্রভাবিত অনেক মুসলমান সমাজে পিতা-মাতার অবাধ্যতার চিত্র। পক্ষান্তরে প্রকৃত মুসলমান তার পিতা-মাতার সাথে তাদের জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর সদ্ব্যবহার করে। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও নির্ভেজাল আন্তরিকতা নিয়ে তাদের সেবা করে। তাদের বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে। এখানেই অন্যান্য সমাজব্যবস্থা ও ইসলামের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা মানবজাতির মাঝে পূর্ণাঙ্গ মানবিকতা তৈরি করতে পারেনি।