📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে

📄 তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে


প্রকৃত মুসলমানের প্রকাশ্য একটি গুণ হলো, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। কেননা, এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার প্রতি ইসলাম গুরুত্বারোপ করেছে এবং শরিয়তের অকাট্য নুসুস তথা কুরআনে এর প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যে মুসলমান কুরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করে, যে নির্দেশনা তাকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও উত্তম আচরণের পথ দেখায়, তার মাঝে অবশ্যই এ গুণটি আছে। এটি তার অন্যতম বৈশিষ্ট্যও বটে।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের মর্যাদা এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের ব্যাপারে সজাগ থাকে

📄 তাদের মর্যাদা এবং তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্বের ব্যাপারে সজাগ থাকে


ইসলাম পিতা-মাতাকে এমন উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন করেছে, যা অন্য কোনো ধর্ম বা জীবনব্যবস্থায় কল্পনাও করা যায় না। কেননা, ইসলামে পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করাকে আল্লাহর প্রতি ইমান আনয়ন ও তাঁর দাসত্বের পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাকে মানবজাতির ফজিলত হিসাবে গণনা করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইমানের ঠিক পরেই তার অবস্থান রাখা হয়েছে।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيًْا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'আর আল্লাহর উপাসনা করো, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরিক কোরো না। আর পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো।'১১৮
এজন্যই জগতে যত মানুষ বসবাস করে, তাদের মধ্যে একজন প্রকৃত মুসলমানই পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে সদাচারী ও উত্তম ব্যবহারকারী হয়ে থাকে।
পিতা-মাতার মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক উন্নত। এমনকি তাদের উভয়জন বা একজন যখন বার্ধক্যে উপনীত হবে, তখন তাদের প্রতি কীরূপ আচরণ করতে হবে, কুরআন তা-ও বলে দিয়েছে। পিতা-মাতার প্রতি এমন সম্মান ও দায়িত্ববোধের এমন স্বচ্ছ রূপরেখা কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে কোথাও দেখা যায়নি।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا - إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে "উহ” শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। আর তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও এবং বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন। '১১৯
আল্লাহ তাআলার এ আদেশ একটি বাধ্যতামূলক পালনীয় আদেশ। আয়াতটিতে আবার লক্ষ করুন। তিনি বলেছেন: وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا )তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো)। শুধু তাই নয়, আল্লাহর ইবাদত ও পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের মাঝে একটি স্পষ্ট মিলরেখাও টানা হয়েছে। এভাবেই ইসলাম পিতা-মাতার মর্যাদাকে এমন উচ্চ স্তরে উন্নীত করেছে, যা কোনো যুগের দার্শনিক, সংস্কারক বা চরিত্র-বিজ্ঞানীরা কল্পনাও করতে পারেনি।
কুরআন পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের শুধু একটি রূপরেখা দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি; বরং সন্তানদের মনে তাদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসার উপস্থিতি কামনা করেছে। বলা হয়েছে, 'তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়', তখন তাদের তোমার যত্ন ও হিফাজতের চাদরে ঢুকিয়ে নাও। তাদের এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যে কথায় তারা কষ্ট পাবে, বিব্রত হবে কিংবা মনে সংকীর্ণতাবোধ সৃষ্টি হবে। বলা হয়েছে, 'তাদের “উহ” শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না।' তাই তাদের সাথে কথা বলতে তোমাকে সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এমন ভাষায় কথা বলতে হবে, যা তাদের অন্তরকে আনন্দ দেবে এবং চক্ষু শীতল করবে। বলা হয়েছে, 'আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।' অতএব, তাদের সামনে তোমাকে এমনভাবে চলতে হবে, যেন তোমার মাঝে তাদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, বিনয় ও নম্রতার ছাপ দেখা যায়। বলা হয়েছে, 'আর তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও।' এ ছাড়াও তাদের জন্য সর্বদা দুআ করতে হবে। কোনো দুআয় তাদের কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, 'আর বলো, হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন।'
আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী প্রকৃত মুসলমান যখন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার-সম্পর্কিত আয়াতগুলো পড়ে, তখন তার মাঝে পিতা-মাতার প্রতি মর্যাদাবোধ ও তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার ইচ্ছা ও প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কিত আরও কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
'আর আল্লাহর উপাসনা করো, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরিক কোরো না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার করো। '১২০
অন্যত্র তিনি বলেন: وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا
‘আর আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি।’১২১
অন্য আয়াতে বলেন: وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ
‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে।’১২২
কুরআনের পর বিশাল হাদিসভান্ডারের দিকে নজর দিলেও এমন অসংখ্য হাদিস দেখা যায়, যেগুলোতে পবিত্র কুরআনের মতো পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং যৌক্তিক কারণ পাওয়া গেলেও তাদের অবাধ্যতা ও তাদের সাথে মন্দ আচরণ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেমন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন:
أَيُّ العَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ؟ قَالَ : الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا، قَالَ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: ثُمَّ بِرُّ الوَالِدَيْنِ قَالَ: ثُمَّ أَيُّ؟ قَالَ: الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
‘(আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলাম,) কোন আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, যথাসময়ে নামাজ আদায় করা। আমি বললাম, তারপর কী? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। বললাম, তারপর কোনটি? বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।’১২৩
এখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাকে ইসলামের মহান দুটি আমল তথা যথাসময়ে নামাজ আদায় করা ও আল্লাহর পথে জিহাদ করার মাঝখানে রেখেছেন। নামাজ দ্বীনের ভিত্তি, আর জিহাদ হলো ইসলামের সর্বোচ্চ শিখর। এবার আপনিই অনুধাবন করুন, রাসুলুল্লাহ পিতা-মাতাকে কতটা মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে :
أَقْبَلَ رَجُلٌ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أُبَايِعُكَ عَلَى الْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ، أَبْتَغِي الْأَجْرَ مِنَ اللَّهِ، قَالَ: «فَهَلْ مِنْ وَالِدَيْكَ أَحَدٌ حَيُّ؟» قَالَ: نَعَمْ، بَلْ كِلَاهُمَا، قَالَ: «فَتَبْتَغِي الْأَجْرَ مِنَ اللَّهِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَارْجِعْ إِلَى وَالِدَيْكَ فَأَحْسِنْ صُحْبَتَهُمَا
'এক ব্যক্তি নবিজি -এর নিকট এসে বলল, আমি হিজরত ও জিহাদের ওপর বাইআত হতে এসেছি, আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও প্রতিদানের আশায়। নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা-মাতার মধ্যে কেউ কি জীবিত আছেন? লোকটি বলল, হ্যাঁ, দুজনই আছেন। তখন নবিজি বললেন, আচ্ছা, তুমি তো আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও প্রতিদান পাওয়ার জন্যই এসেছ? লোকটি বলল, জি। তখন নবিজি বললেন, তাহলে তুমি পিতা-মাতার নিকট ফিরে যাও এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।'১২৪
সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الجِهَادِ، فَقَالَ: أَحَيُّ وَالِدَاكَ؟، قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ
'এক ব্যক্তি নবিজি -এর নিকট এসে জিহাদের অনুমতি চাইল। নবিজি বললেন, তোমার কি পিতা-মাতা বেঁচে আছেন? লোকটি হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিলেন। তখন তিনি বললেন, তাদের মাঝেই জিহাদ করো (অর্থাৎ এ মুহূর্তে তাদের সেবা করার মাঝেই তোমার জিহাদের সাওয়াব বিদ্যমান)।'১২৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন জিহাদের জন্য সৈন্য জোগাড় করছিলেন। এ মুহূর্তে তলোয়ার চালাতে সক্ষম যুবকদের তাঁর ভীষণ প্রয়োজন। এমন মুহূর্তেও তাঁর দয়ালু মন জিহাদ করতে আগ্রহী লোকটির পিতা-মাতার অসহায়ত্ব ও সন্তানের প্রতি তাদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে, তাকে জিহাদ না করে পিতা-মাতার সেবা করতে পাঠিয়ে দিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দিলেন, মানুষের সফলতার জন্য প্রণীত ইসলামি জীবনবিধানে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ও তাদের সেবা করার গুরুত্ব অপরিসীম।
সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস ইসলাম গ্রহণ করায় তাঁর মাতা বেজায় অসন্তুষ্ট হলেন। তাঁকে বললেন, তুমি যদি ইসলাম থেকে ফিরে না আসো, তাহলে আমি না খেয়ে মরে যাব। তখন আরবের লোকেরা মায়ের হত্যাকারী বলে তোমাকে তিরস্কার ও ধিক্কারবাণে জর্জরিত করলে মজা বুঝতে পারবে। সাদ উত্তরে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমিও জেনে রাখো, তোমার যদি একশটা প্রাণ থাকে, আর একটার পর একটা যেতে থাকে, তবুও আমি ইসলাম ত্যাগ করব না। এরপর তাঁর মাতা দুদিন না খেয়ে থাকলেন। তৃতীয় দিনে তিনি ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে খানা খেয়ে নিলেন। কিন্তু মাকে এমন কঠোর ভাষায় জবাব দেওয়াটা আল্লাহর পছন্দ হয়নি। তাই সাদ -কে ভর্ৎসনা করে আল্লাহ এ আয়াত নাজিল করলেন :
وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
'পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে।'১২৬
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা এবং দেরি না করে জলদিই তাদের আদেশ পূরণ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা প্রখ্যাত আবিদ জুরাইজ -এর কাহিনি থেকে আরও স্পষ্টরূপে বুঝে আসে। জুরাইজ নামাজ পড়ছিলেন। তখন তার মা তাকে ডাকলেন। জুরাইজ ভাবলেন, আমার মা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি নামাজ বেশি জরুরি? ভাবার পর নামাজে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে মা আবার ডাক দিলেন। আর তিনি মায়ের ডাকে সাড়া না দিয়ে নামাজ অব্যাহত রাখলেন। তৃতীয়বার মায়ের ডাক পড়ল। এবারেও কোনো সাড়া নেই। তখন মা বদদুআ করলেন, 'বেশ্যাদের চেহারা না দেখিয়ে আল্লাহ তোকে মারবেন না।' ওদিকে এক বেশ্যা এক রাখালের সাথে ব্যভিচার করে গর্ভবতী হয়ে পড়ল। যখন লোকলজ্জার ভয় তাকে ঘিরে ধরল, তখন রাখাল পরামর্শ দিল, তোমাকে বাচ্চাটির জন্মদাতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে বলবে, জুরাইজ এই বাচ্চার জন্মদাতা। বেশ্যাটি লোকদের তাই বলে বেড়াল। ফলে জনগণ জুরাইজ -এর উপাসনালয় ভেঙে চুরমার করে দিল এবং বাদশা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মায়ের বদদুআর কথা মনে পড়ল। এতে তার মুখে অনুশোচনার বিরস মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এরপর শাস্তি কার্যকর করার আগমুহূর্তে অনুমতি নিয়ে দুই রাকআত নামাজ পড়লেন তিনি। নামাজের পর বাচ্চাটিকে তার কাছে আনতে বললেন। তারপর বাচ্চার কানে কানে বললেন, তোমার পিতা কে? তখন বাচ্চাটি উত্তর দিল, আমার পিতা অমুক রাখাল। ১২৭ তখন লোকজন তাকবির ধ্বনি দিয়ে উঠল এবং বলল, আমরা সোনা-রুপা দিয়ে আপনার ইবাদতখানা পুনর্নির্মাণ করে দেবো। জুরাইজ বললেন, সোনা-রুপা দিয়ে নয়; বরং আগের মতো মাটি দিয়ে নির্মাণ করে দাও।
এ ঘটনা সম্পর্কে সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ -এর মন্তব্য বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন, জুরাইজ যদি ফকিহ (দ্বীন সম্পর্কে অভিজ্ঞ) হতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, মায়ের ডাকে সাড়া দেওয়া নামাজ চালিয়ে যাওয়া অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লিখিত ঘটনা ও হাদিস থেকে ফুকাহায়ে কিরাম মাসআলা বের করেছেন যে, নফল নামাজ আদায় করার সময় যদি পিতা-মাতার কেউ ডাক দেন, তখন নামাজ ভেঙে ডাকে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে

📄 পিতা-মাতা অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে


ইসলামের মহান নবি তাঁর মহানুভবতা ও উদারতামূলক দিক-নির্দেশনার কারণে মানবিকতার শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করেছেন। তাঁর মহানুভবতার একটি প্রমাণ হলো, তিনি অমুসলিম পিতা-মাতার সাথেও সদ্ব্যবহার করতে ও তাদের সেবা করতে আদেশ করেছেন। এ সম্পকির্ত একটি ঘটনা আসমা বিনতে আবু বকর-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন : قَدِمَتْ عَلَيَّ أُنِّي وَهِيَ مُشْرِكَةً فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قُلْتُ: وَهِيَ رَاغِبَةٌ، أَفَأَصِلُ أُمِّي؟ قَالَ: نَعَمْ صِلِي أُمَّكِ
'আমার কাছে আমার মা আসলেন। রাসুলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় তিনি মুশরিকা ছিলেন। তখন আমি রাসুলুল্লাহ-কে এ ব্যাপারে তাঁর নির্দেশনা জানার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম যে, আমার মা আমার নিকট কিছু চাইছেন; আমি কি তার সাথে মাতৃত্বের সম্পর্ক রাখব?' রাসুলুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, তার সাথে মাতৃত্বের সম্পর্ক বজায় রাখো। ১২৮
কুরআন ও হাদিসের এমন উন্নত নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত একজন প্রকৃত মুসলমান পিতা-মাতার সাথে সবচেয়ে বেশি সদাচারী ও অনুগ্রহশীল হয়ে থাকে। সর্বাবস্থায় এবং সব সময়। সাহাবায়ে কিরাম ও তাঁদের প্রকৃত অনুসারীগণ এমনই ছিলেন।
যেমন এক ব্যক্তি সাইদ বিন মুসাইয়িব-কে বললেন, আমি পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার-সম্পকিত আয়াতটির মর্ম পুরোটাই বুঝেছি, তবে তার একটি অংশ وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا )আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।) এর মর্ম আমি ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি। এখানে 'কাওলে কারিম' বা শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলতে কী বুঝানো হয়েছে আসলে? তখন সাইদ উত্তর দিলেন, এর অর্থ হলো, তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলবে, যেভাবে একজন গোলাম তার মনিবের সাথে কথা বলে। আর ইবনে সিরিন সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাঁর মায়ের সাথে অসুস্থ ব্যক্তির মতো খুব ক্ষীণ আওয়াজে কথা বলতেন। মাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার জন্যই তিনি এমনটি করতেন।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 তাদের অবাধ্য হতে ভয় করে

📄 তাদের অবাধ্য হতে ভয় করে


এ অধ্যায়ে এতক্ষণ ধরে আমরা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করে এসেছি। এখান থেকে পিতা-মাতার নাফরমানি ও অবাধ্যতা সম্পর্কে আলোচনা করব। আশা করি, এ আলোচনা পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেবে।
পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার স্থান যেমন ঠিক ইমানের পরে, তেমনই পিতা-মাতার অবাধ্যতার স্থানও ঠিক শিরকের পরে। এখান থেকেই বুঝা যায়, পিতা-মাতার অবাধ্যতা কতখানি গুরুতর একটি অপরাধ। তা ছাড়া ইসলাম এটাকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহের একটি বলে পরিচয় দিয়েছে। যেমন: আবু বাকরা নুফাই বিন হারিস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الكَبَائِرِ؟ ثَلَاثًا، قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: الإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ...
'আমি কি সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহ সম্পর্কে তোমাদের বলব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সাথে শিরক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।...'১২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00