📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ইলম বা জ্ঞান মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক ও সম্মানের বিষয়

📄 ইলম বা জ্ঞান মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক ও সম্মানের বিষয়


প্রকৃত মুসলমান বিশ্বাস করে, তার আকল বা বুদ্ধিকে ইলম অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। এজন্যই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ইলম অর্জন করা ফরজ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةُ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
'ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ।'৯৭
মুসলমানের সকল পদক্ষেপ ও কাজ ইলম ও বুদ্ধির সমন্বয়ে হওয়া চাই। তাই তাকে অবশ্যই ইলম অর্জন করতে হবে। তা ছাড়া আল্লাহ তাআলার নিকট ইলমওয়ালাদের অনেক মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহভীতি ও তাকওয়ার জন্য তাদের বিশেষায়িত করা হয়েছে।
তিনি ইরশাদ করেছেন :
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ 'আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।'৯৮
আল্লাহকে যারা যথাযথ ভয় করে, তাদের ফিকির ও দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত হয়। বিশাল সৃষ্টিজগৎ ও জীবনের মাঝে তারা আল্লাহর কুদরত ও বড়ত্ব অনুধাবন করতে পারে। আর এরাই হলো প্রকৃত আলিম।
অন্য আয়াতে অন্যদের ওপর জ্ঞানীদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে তিনি ইরশাদ করেন :
هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ 'যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।'৯৯
সাফওয়ান বিন আসসাল মুরাদি বলেন :
أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمْ، وَهُوَ مُتَّكِيُّ فِي الْمَسْجِدِ عَلَى بُرْدٍ لَهُ فَقُلْتُ لَهُ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنِّي جِئْتُ أَطْلُبُ الْعِلْمَ، فَقَالَ: مَرْحَبًا بطالبِ الْعِلْمِ، طَالِبُ الْعِلْمِ لَتَحُقَّهُ الْمَلَائِكَةُ وَتُظِلُّهُ بِأَجْنِحَتِهَا، ثُمَّ يَرْكَبُ بَعْضُهُ بَعْضًا حَتَّى يَبْلُغُوا السَّمَاءَ الدُّنْيَا مِنْ حُبِّهِمْ لِمَا يَطْلُبُ.
'আমি নবিজি-এর নিকট আসলাম। তখন নবিজি মসজিদে চাদরাবৃত হয়ে বসে ছিলেন। এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি ইলম শিখতে এসেছি। তিনি বললেন, স্বাগতম হে তালিবে ইলম। তালিবে ইলমের সম্মানে ফেরেশতারা তাদের পাখা বিছিয়ে দেয় এবং পাখা দিয়ে তাকে ছায়া দান করে। তারপর ইলম অন্বেষণকারীর ইলমের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনার্থে তারা একে অপরের ওপর সওয়ার হয়ে দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।'১০০
আরও অসংখ্য হাদিসে ইলমের ফজিলতের কথা বিবৃত হয়েছে এবং ইলম তলব করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তাই সত্যিকারের মুসলমান হতে হলে তাকে অবশ্যই দ্বীনি জ্ঞানসম্পন্ন বা দ্বীনি জ্ঞান অন্বেষণকারী হতে হবে। এ দুই শ্রেণির বাইরে তৃতীয় প্রকারের কেউ হওয়া যাবে না।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করে

📄 মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ করে


সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করা, যা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করে, প্রকৃত জ্ঞানার্জন নয়। আমৃত্যু অধ্যয়ন করতে থাকা এবং দিনদিন জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধি করা-ই হলো প্রকৃত জ্ঞানার্জনের স্বরূপ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا 'আর আপনি বলুন, হে আমার পালনকর্তা, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।'১০১
ইলমের দিক দিয়ে অনেক ওপরে ওঠা সত্ত্বেও আমাদের সালাফ আরও অধিক ইলম অর্জন করার সাধনা থেকে বিরত থাকেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা ইলম শিক্ষা করেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, চর্চা করতে থাকলে ইলম জীবন্ত থাকে। ইলমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে ইলম হ্রাস পেতে থাকে। এজন্য তাঁরা ধারাবাহিক ইলমের চর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক মূল্যবান বাণী উচ্চারণ করেছেন। এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার ইবনে আবু গাসসান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: لَا تَزَالُ عَالِمًا مَا كُنْتَ مُتَعَلَّمًا فَإِذَا اسْتَغْنَيْتَ كُنْتَ جَاهِلًا
'তুমি যতক্ষণ শিখতে থাকবে, ততক্ষণ জ্ঞানী থাকবে। অতএব যখন অর্জিত জ্ঞানকে তুমি যথেষ্ট মনে করবে, তখন তুমি অজ্ঞ মানুষে পরিণত হবে।'১০২
ইমাম মালিক বলেন: لَا يَنْبَغِي لِأَحَدٍ يَكُونُ عِنْدَهُ الْعِلْمُ أَنْ يَتْرُكَ التَّعَلَّمَ
'যার ইলম আছে, তার জন্য (আরও অধিক) ইলম অর্জনের পথ পরিত্যাগ করা সমীচীন নয়।'১০০
ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারক-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে: قِيلَ لِابْنِ الْمُبَارَكِ، إِلَى مَتَى تَطْلُبُ الْعِلْمَ؟ قَالَ: حَتَّى الْمَمَاتِ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
'আব্দুল্লাহ বিন মুবারক-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কতদিন পর্যন্ত আপনি ইলম শিখবেন? তিনি উত্তর দিলেন, মৃত্যু পর্যন্ত।'১০৪
তাঁর ব্যাপারে আরও বর্ণিত হয়েছে: وَقِيلَ لَهُ مَرَّةً أُخْرَى مِثْلَ ذَلِكَ فَقَالَ: لَعَلَّ الْكَلِمَةَ الَّتِي تَنْفَعُنِي لَمْ أَكْتُبْهَا بَعْدُ
'তাঁকে আরেকবার এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, আর আমার মনে হয়, যে ইলম দ্বারা আমি উপকৃত হব, তা এখন পর্যন্ত (পুরোপুরি) অর্জন করতে পারিনি।'১০৫
ইবনে মানাজির বলেন: سَأَلْتُ أَبَا عَمْرِو بْنَ الْعَلَاءِ حَتَّى مَتَى يَحْسُنُ بِالْمَرْءِ أَنْ يَتَعَلَّمَ؟ فَقَالَ: مَا دَامَ تَحْسُنُ بِهِ الْحَيَاةُ
'আমি ইমাম আবু আমর বিন আলা -কে প্রশ্ন করলাম, কতদিন পর্যন্ত ইলম শিক্ষা করা উচিত? তিনি উত্তর দিলেন, যতদিন জীবন থাকে।'১০৬
বর্ণিত হয়েছে : سُئِلَ سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ مَنْ أَحْوَجُ النَّاسِ إِلَى طَلَبِ الْعِلْمِ؟ قَالَ: أَعْلَمُهُمْ، إِنَّ الْخَطَأَ مِنْهُ أَقْبَحُ
'সুফইয়ান বিন উয়াইনা -কে প্রশ্ন করা হলো, ইলম অর্জন করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি কার? তিনি উত্তরে বললেন, যে সবচেয়ে বড় আলিম। কারণ, তার ভুল সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ক্ষতিকর হয়।'১০৭
'তাফসিরে কাবির'-সহ অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (মৃত্যু: ৬০৬ হি.) তার সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিম ও ইমাম ছিলেন। ইলমে কালামসহ অন্য সকল অধিবিদ্যায় (metaphysics) ছিল তার অদ্বিতীয় পাণ্ডিত্য। তার ইলমের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসুরা তার কাছে জ্ঞানের তৃষ্ণা নিবারণ করতে আসত। তিনি যখন মারভ শহরে সফর করেন, তখন সেখানকার আলিম ও শিক্ষার্থীরা তার সাক্ষাৎলাভে ধন্য হতে এবং তার জ্ঞানভান্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য সমবেত হলো। তাদের মধ্যে ইলমুল আনসাব বা কুলুজি বিদ্যায় পারদর্শী এক ছাত্রও আসলো। তার বয়স এখনো বিশ অতিক্রম করেনি। ইমাম রাজি কুলুজি বিদ্যা তেমন ভালো পারতেন না। যখন এই ছাত্রের মাঝে কুলুজি বিদ্যার পাণ্ডিত্য দেখতে পেলেন, তখন তার কাছ থেকে এই বিদ্যা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তারপর যথারীতি সে ছাত্রকে শিক্ষকের আসনে বসিয়ে এবং তিনি তার সামনে বিনয়ের সাথে বসে ওই বিদ্যা শিখলেন। ইলম শিক্ষা করার জন্য ইমাম রাজির এ বিনম্রতা তাকে ছোট করেনি; বরং তার মর্যাদাকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ আল্লামা ইয়াকুত হামাবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুজামুল উদাবা'-এ আজিজুদ্দিন ইসমাইল বিন হাসান সূত্রে উপরোক্ত ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণনা করার পর লেখেন, 'ইলমের প্রতি এত সম্মান তাঁর মতো মহান ব্যক্তিরাই দেখাতে পারেন।'
আহ! ইলমের প্রতি কত ভালোবাসা ছিল সালাফের অন্তরে! কত মর্যাদা দিতেন তারা ইলমকে! ইলমের জন্য কতকিছুই না করতেন তারা!

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মুসলমানকে যেসব বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে

📄 মুসলমানকে যেসব বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে


একজন মুসলমানের জন্য প্রথমে কুরআন মাজিদের জ্ঞানার্জন করা আবশ্যক। তিলাওয়াত, তাজবিদ, অর্থ, তাফসিরসহ সবকিছু। তারপর শিখতে হবে হাদিসের জ্ঞান। এ ছাড়াও সিরাত, সাহাবা ও তাবিয়িদের জীবনচরিত ইত্যাদি ইসলামি জ্ঞানও শিখতে হবে। ইবাদত ও লেনদেনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়িলও শিখতে হবে। এটা সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। পক্ষান্তরে যারা দ্বীনি ইলম অর্জন করেছে, দ্বীনের সকল খুঁটিনাটি বিষয়ের মাসআলা-মাসায়িল ও আহকামও তাদের শিখে নিতে হবে। আরবি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করাও মুসলমানের জন্য জরুরি।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করে

📄 নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করে


সত্যিকারের প্র্যাক্টিসিং মুসলমান সাধারণভাবে দ্বীনের ইলম অর্জন করার পর নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য অর্জন করার প্রতি আগ্রহী হয়। সেটা দ্বীনি কোনো জ্ঞান হতে পারে, আবার দুনিয়াবি কোনো জ্ঞানও হতে পারে। যেমন: গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, মহাকাশবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদি। ব্যবসা কিংবা কোনো হস্তশিল্পও হতে পারে। যে বিষয়েই পড়াশোনা করুক, পুরো বিষয়টাকে সম্পূর্ণ আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে। যে ভাষার সাথে উক্ত জ্ঞানের সম্পর্ক আছে, কঠোর মেহনত করে সে ভাষা শিখে নিতে হবে। উক্ত জ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। কঠোর অধ্যবসায় ও অত্যধিক অধ্যয়ন করে উদ্ভাবনের যোগ্যতা অর্জন করে নিতে হবে। তখনই বর্তমান সময়ে মুসলমানরা জ্ঞানের জগতে সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। পৃথিবীর বুকে মুসলমানদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। তবে সবকিছু করতে হবে একমাত্র দ্বীনের স্বার্থে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। আমাদের সালাফ তাদের যুগের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তবে তারা এগুলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই শিখেছিলেন। দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিল করা কখনো তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00