📄 তার বাহ্যিক অবয়ব সুন্দর
প্রকৃত মুসলমান পোশাক-আশাক ও বাহ্যিক অবয়ব সুন্দর রাখার প্রতি খুবই যত্নবান থাকে। এজন্য সাজগোজে কোনোরূপ সীমালঙ্ঘন ও অপচয় করা ছাড়াই তাকে দেখলে চোখ জুড়ায় এবং মনে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব হয়। দেখতে অসুন্দর এবং বিশ্রী বেশভূষা নিয়ে সে মানুষের সামনে আসে না। সুন্দর ও পরিপাটি বেশ নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। কেননা, রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘরের ভেতর তো উত্তম বেশভূষা নিয়ে থাকতেনই, সাহাবিদের সামনে আসার সময় আরও উত্তম বেশে বের হতেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ
'আপনি বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে!?'৮৫
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি বলেন :
كَانَ نَفَرُ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ عَلَى الْبَابِ، فَخَرَجَ يُرِيدُهُمْ، وَفِي الدَّارِ رَكْوَةٌ فِيهَا مَاءُ، فَجَعَلَ يَنْظُرُ فِي الْمَاءِ وَيُسَوِّي لِحْيَتَهُ وَشَعْرَهُ. فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَأَنْتَ تَفْعَلُ هَذَا؟ قَالَ: نَعَمْ إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ إِلَى إِخْوَانِهِ فَلِيُهَيِّئْ مِنْ نَفْسِهِ فَإِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ.
'মাকহুল আয়িশা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কয়েকজন সাহাবি দরজার সামনে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাদের কাছে আসার সময় তিনি একটি পানিভর্তি পাত্রে চেহারা দেখে চুল ও দাড়ি ঠিক করে নিলেন। আমি বললাম, আপনিও এমন করতে গেলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, মানুষ যখন তার বন্ধুদের নিকট যাওয়ার ইচ্ছা করে, তখন নিজের বেশভূষা একটু সুন্দর করে নেওয়া উচিত। কেননা, আল্লাহ তাআলা সুন্দর এবং সৌন্দর্যকে তিনি ভালোবাসেন। '৮৬
উল্লিখিত সকল বিষয়ে মুসলমান মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে। অর্থাৎ ইফরাত (সীমালঙ্ঘন) ও তাফরিত (শিথিলতা) এর মাঝামাঝি থাকে। যেমনটি কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে : وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
'আর তারা (মুমিনরা) যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। ৮৭
ইসলাম সাধারণভাবে তার সকল অনুসারী থেকে এবং বিশেষভাবে দায়িদের থেকে কামনা করে যে, তারা যেন সমাজে এমনভাবে চলে, যাতে লোকজন তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। দেখতে অসুন্দর লাগে এবং মন খারাপ হয়ে যায়- এমন বেশে চলাচল করতে নিষেধ করে। বুজুর্গি ও বিনম্রতার নাম দিয়ে জীর্ণশীর্ণ ও বিশ্রী পোশাকে চলাচল করা ইসলাম সমর্থন করে না। কেননা, বুজুর্গদের সর্দার এবং নম্রতার মূর্তপ্রতীক রাসুলুল্লাহ সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। ঘরে ও বাইরে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তা ছাড়া সুন্দর বেশে থাকা মানে আল্লাহর নিয়ামত প্রকাশ করা।
হাদিস শরিফে আছে : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يَرَى أَثَرَ نِعْمَتِهِ عَلَى عَبْدِهِ
'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বান্দার মাঝে তাঁর নিয়ামতের চিহ্ন দেখতে ভালোবাসেন। '৮৮
তাবাকাতে ইবনে সাদে জুনদুব বিন মাকিস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَدِمَ الْوَفْدُ لَبِسَ أَحْسَنَ ثِيَابِهِ، وَأَمَرَ عِلْيَةَ أَصْحَابِهِ بِذَلِكَ. فَلَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ قَدِمَ وَقْدُ كِنْدَةً وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ يَمَانِيَةٌ، وَعَلَى أَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ مِثْلُ ذَلِكَ
'রাসুলুল্লাহ -এর নিকট কোনো প্রতিনিধিদল আসলে তিনি সর্বোত্তম পোশাক পরতেন এবং শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদেরকেও তা পরার আদেশ করতেন। কিন্দার প্রতিনিধিদল যেদিন এসেছিল, সেদিন রাসুলুল্লাহ -কে আমি ইয়ামানি কাপড় পরা অবস্থায় দেখেছি। আবু বকর ও উমর-ও সেদিন অনুরূপ ইয়ামানি পোশাক পরেছিলেন। '৮৯
ইবনে মুবারক, তাবারানি, হাকিম প্রমুখ মুহাদ্দিসিনে কিরাম বর্ণনা করেন:
أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ دَعَا بِقَمِيصِ لَهُ جَدِيدٍ فَلَبِسَهُ فَلَا أَحْسِبُ بَلَغَ تَرَاقِيَهُ حَتَّى قَالَ: «الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي ثُمَّ قَالَ: أَتَدْرُونَ لِمَ قُلْتُ هَذَا؟ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعَا بِثِيَابٍ جُدُدٍ فَلَبِسَهَا قَالَ: فَلَا أَحْسِبُهَا بَلَغَتْ تَرَاقِيَهُ حَتَّى قَالَ مِثْلَ مَا قُلْتُ
'উমর নতুন একটি জামা এনে পরতে লাগলেন। আমার ধারণা, যখন জামা গলার হাড় পর্যন্ত আসলো, তখন বললেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي ( كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي، وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন পোশাক পরিধান করিয়েছেন, যা দ্বারা আমার সতর আবৃত করি এবং আমার চলাফেরায় সৌন্দর্য অবলম্বন করি।) এরপর বললেন, তোমরা জানো, আমি কেন এটা বললাম? আমি রাসুলুল্লাহ-কে নতুন কাপড় এনে পরতে দেখেছি। কাপড় যখন তাঁর গলা মুবারকের হাড় পর্যন্ত আসলো, তখন তিনি আমি যে দুআটি পড়লাম, সে দুআটি পড়লেন। '৯০
তাবাকাতে ইবনে সাদে বর্ণিত হয়েছে:
كَانَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ يَلْبَسُ الْبُرْدَ أَوِ الْخُلَّةَ تُسَاوِي خَمْسُمِائَةٍ أَوْ أَرْبَعُمِائَةٍ
'আব্দুর রহমান বিন আওফ ডোরাকাটা চাদর পরিধান করতেন, যার মূল্য ছিল চারশ বা পাঁচশ দিরহাম। '৯১
উসমান বিন আবু সুলাইমান বর্ণনা করেন :
أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ اشْتَرَى ثَوْبًا بِأَلْفِ دِرْهَمٍ فَلَبِسَهُ
'আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস এক হাজার দিরহাম দিয়ে একটি কাপড় ক্রয় করে পরিধান করেছিলেন। '৯২
সৌন্দর্য ও সাজগোজ যতক্ষণ পর্যন্ত শরিয়া-নির্ধারিত সীমানা ক্রস করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তা বৈধ ও উত্তম। কারণ, আল্লাহ তাআলা সৌন্দর্য অবলম্বন করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন : يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ - قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ
'হে বনি-আদম, তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা গ্রহণ করো। খাও, পান করো এবং অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয় তিনি অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না। আপনি বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে!? আপনি বলুন, এসব নিয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য এবং কিয়ামতের দিন বিশেষভাবে কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত। এমনিভাবে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।'৯৩
সহিহ মুসলিমে ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً، قَالَ: إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ، الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ، وَغَمْطُ النَّاسِ
'যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার আছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এক ব্যক্তি বললেন, কোনো ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, তার পোশাক সুন্দর হোক এবং জুতোজোড়াও খুব সুন্দর হোক! (তাহলে সেটাও কি অহংকার বলে বিবেচিত হবে?) তিনি বললেন, আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে, সত্য ও ন্যায়কে উপেক্ষা করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।'৯৪
সাহাবায়ে কিরাম এবং তাঁদের অনুসারীগণ ইসলামের এ নির্দেশনা যথাযথ ভাবে মেনে চলেছেন। ইমাম আবু হানিফা উত্তম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন। তাঁর শরীর থেকে আতরের সুরভি ছড়াত। ছাত্র ও ভক্তদেরও তিনি উত্তম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করে সুন্দর বেশে থাকার নির্দেশ দিতেন।
একদিন ইমাম আবু হানিফা ؒ তাঁর দরসে এক লোককে জীর্ণ পোশাকে বসতে দেখলে তিনি তাকে এক হাজার দিরহাম দান করলেন, যেন সে তার বেশভূষা ঠিক ও সুন্দর করে নিতে পারে। লোকটি তাঁকে বলল, আমি সচ্ছল। আল্লাহ আমাকে নিয়ামত দান করেছেন। আমার এই টাকার প্রয়োজন নেই। তখন আবু হানিফা ؒ তাকে ভর্ৎসনা করে বললেন, তাহলে তুমি কি এ হাদিস শোনোনি যে, "আল্লাহ তাআলা বান্দার মাঝে তাঁর নিয়ামতের নিদর্শন দেখতে ভালোবাসেন?" তোমার অবশ্যই এ জীর্ণ বেশ পরিবর্তন করা উচিত। যেন তোমাকে দেখে তোমার সাথিদের মন খারাপ হয়ে না যায়।
আল্লাহর পথে যারা আহ্বান করে, তাদের বেশভূষা অন্য সাধারণ মুসলমানের চেয়ে উত্তম ও সুন্দর হওয়া বাঞ্ছনীয়। যাতে লোকেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের দাওয়াতি কথা তাদের অন্তরে ভালোভাবে গেঁথে যায়।
আল্লাহর দ্বীনের দায়িদের অবশ্যই বাহ্যিক অবয়ব সুন্দর করার প্রতি যত্নবান হতে হবে। তাদের শরীর, পোশাক, নখ, চুল সব সময় পরিষ্কার থাকা চাই। একাকী থাকাবস্থায়ও এগুলোর প্রতি যত্নবান হতে হবে। কেননা, এটাই সুস্থ মানসিকতা ও পরিচ্ছন্ন রুচির দাবি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
الْفِطْرَةُ خَمْسٌ - أَوْ خَمْسُ مِنَ الْفِطْرَةِ - الْخِتَانُ، وَالِاسْتِحْدَادُ، وَتَقْلِيمُ الْأَطْفَارِ، وَنَتْفُ الْإِبِطِ، وَقَصُّ الشَّارِبِ
'পাঁচটি বিষয় স্বভাবজাত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। খতনা করা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, বগলের নিচের চুল উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও গোঁফ কাটা।'৯৫
তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সাজসজ্জা বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। অতিরিক্ত ফ্যাশনপ্রিয়তা ও প্রয়োজনাতিরিক্ত সাজসজ্জার পেছনে জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে ফেলা ইসলামে নিষিদ্ধ।
এ সম্পর্কে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:
تَعِسَ عَبْدُ الدِّيْنَارِ، وَالدِّرْهَمِ، وَالْقَطِيفَةِ، وَالخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَّمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ
'দিনার, দিরহাম, মখমলের কাপড় ও চাদরের গোলাম (অর্থাৎ পার্থিব সম্পদ ও বিলাসিতা কামনাকারী ব্যক্তি) ধ্বংস হোক! তাকে দেওয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, আর না দেওয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়।'৯৬
যারা আল্লাহর দ্বীনের প্রতি লোকদের দাওয়াত দেয়, তাদের বিশেষভাবে উল্লিখিত সকল বিষয়ে ইসলাম-নির্দেশিত মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।