📄 উমরা পালন করে
আনুগত্যশীল মুসলমান সামর্থ্য থাকলে হজের সময় ব্যতীত অন্য সময়ে, বিশেষ করে রমজান মাসে উমরা পালন করে। কেননা, রমজান মাসে উমরা করলে রাসুলুল্লাহ -এর সাথে হজ করার সাওয়াব পাওয়া যায়। সহিহ বুখারিতে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :
لَمَّا رَجَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ حَجَّتِهِ قَالَ لِأُمِّ سِنَانٍ الأَنْصَارِيَّةِ: مَا مَنَعَكِ مِنَ الحَجِّ؟ قَالَتْ: أَبُو فُلَانٍ، تَعْنِي زَوْجَهَا، كَانَ لَهُ نَاضِحَانِ حَجَّ عَلَى أَحَدِهِمَا، وَالْآخَرُ يَسْقِي أَرْضًا لَنَا، قَالَ: فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً أَوْ حَجَّةً مَعِي
'যখন নবিজি হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন উম্মে সিনান আনসারি -কে বললেন, তুমি হজে যাওনি যে? তিনি বললেন, অমুকের আব্বুর (স্বামীর প্রতি ইঙ্গিত করে) দুটা উট ছিল। একটাতে সওয়ার হয়ে তিনি হজে গেলেন, আরেকটা জমি সিঞ্চনের কাজে জড়িত ছিল। (এজন্য আমি হজে যেতে পারিনি।) তখন নবিজি বললেন, রমজান মাসে উমরা করা একটি হজ করার সমান অথবা বলেছেন, আমার সাথে হজ আদায় করার সমান।'৫৯
📄 আল্লাহর দাসত্বের বাস্তবায়ন করে
প্রকৃত মুসলমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তাকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।'৬০
মানুষের সকল কর্মতৎপরতা ইবাদত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। প্রকৃত মুসলমান সেটাই করে থাকে। সে তার সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে। তাই তার সকল কাজ ইবাদতে পরিণত হয়।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম ও ব্যাপক উপকারী আমল হলো, জমিনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের সংগ্রাম করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা।
আপনি যদি প্রকৃত মুসলমান হওয়ার দাবি করেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনার ইবাদতে ঘাটতি আছে। কেননা, আপনি আপনার সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সংগ্রাম করছেন না। আপনাকেসহ সকল জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদত কায়েম করা। আর তা তখনই পূর্ণতা লাভ করবে, যখন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর শরিয়ত বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখান থেকে বুঝা গেল, প্রকৃত মুসলমান হতে হলে জীবনের প্রতিটি শাখায় ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যে মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তার কারণও এটাই।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
'নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।'৬১
প্রকৃত মুসলমান হওয়ার দাবি করলে এ আয়াতের অর্থ ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে। আমাদের কেন এ শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত দান করেছেন, তার সঠিক কারণ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে হবে।
📄 অধিকহারে কুরআন তিলাওয়াত করে
প্রকৃত মুসলমান সব সময় কুরআনের সুশীতল ও সুগন্ধিময় ছায়াতলে অবস্থান করে। সেখান থেকে হিদায়াতের স্নিগ্ধতা উপভোগ করে। তাই সে প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে। একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কালাম পড়ে। কুরআনের মর্ম তার ভেতর সংক্রমিত হয়ে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দেয়। হৃদয়ে ইমান ও প্রশান্তি অর্জিত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
'জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।'৬২
কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الأُتْرُجَّةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبُ، وَمَثَلُ المُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ، لَا رِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلْو، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ مَثَلُ الرَّيْحَانَةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الحَنْظَلَةِ، لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ
'যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে তার উদাহরণ হলো কমলা ফল, যা স্বাদে ও গন্ধে উত্তম। আর যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার উদাহরণ হলো খেজুর, যার সুগন্ধি না থাকলেও স্বাদে মিষ্ট। আর যে মুনাফিক কুরআন তিলাওয়াত করে, তার উদাহরণ হলো ফুল, যার সুগন্ধি আছে বটে, তবে স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার উদাহরণ হলো মাকাল ফল, যার কোনো সুগন্ধি নেই এবং স্বাদও খুব তিক্ত। '৬৩
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ 'তোমরা কুরআন পাঠ করো। কেননা, কিয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশ করবে। '৬৪
অন্য হাদিসে তিনি ইরশাদ করেছেন: الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ، وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ، وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ، لَهُ أَجْرَانِ 'কুরআন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি মহাসম্মানিত পুণ্যবান লিপিকার ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তার জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বারবার পড়ে, তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। '৬৫
কুরআনের তিলাওয়াত-সম্পর্কিত এতসব ফজিলতের হাদিস থাকার পর সত্যিকারের মুসলমান কুরআনের তিলাওয়াত ও তার অর্থ নিয়ে গবেষণা না করে কি থাকতে পারে!?
সারকথা হলো, আল্লাহর সাথে প্রকৃত মুসলমানের সম্পর্ক হলো, সে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ইমান রাখে, নিয়মিত সৎকর্ম করে, সবকিছুতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। সর্বোপরি, আল্লাহর দাসত্ব ও বন্দেগিতে নিজেকে সঁপে দেয়, যে দাসত্বের জন্য জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।'