📄 নফল রোজা রাখে
সচেতন ও মুত্তাকি মুসলমান রমজানের রোজা ছাড়া অন্যান্য নফল রোজাও গুরুত্ব সহকারে রাখে। যেমন: আরাফাত দিবসের রোজা, আশুরার (মুহাররমের দশম তারিখের) রোজা, তাসুআর (মুহাররমের নবম তারিখের) রোজা ইত্যাদি। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী এ রোজাগুলো রাখলে গুনাহ ক্ষমা করা হয়।
আবু কাতাদা ﷴ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে আরাফাত দিবসের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন :
يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ وَالْبَاقِيَةَ
'এটি বিগত ও চলমান বছরের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়।'৫০
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ﷴ বর্ণনা করেন :
صَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَاشُورَاءَ، وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
'নবিজি ﷺ আশুরার দিনে রোজা রেখেছেন এবং (সাহাবিদেরও) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।'৫১
আবু কাতাদা ﷴ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمٍ عَاشُورَاءَ؟ فَقَالَ: يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ
'রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এটি বিগত বছরের গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়।'৫২
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ﷴ বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَئِنْ بَقِيتُ إِلَى قَابِلٍ لَأَصُومَنَّ التَّاسِعَ
'আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে (আশুরার রোজার সাথে) মুহাররমের নবম তারিখেও রোজা রাখব।'৫৩
নফল রোজার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোজা হলো, শাওয়ালের ছয় রোজা। এ রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ
'যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল।'৫৪
এ ছাড়াও প্রতিমাসে তিনটি রোজা রাখা মুসতাহাব।
আবু হুরাইরা বলেন :
أَوْصَانِي خَلِيلِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ: صِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَيِ الضُّحَى، وَأَنْ أُوتِرَ قَبْلَ أَنْ أَنَامَ
'আমার বন্ধু রাসুলুল্লাহ আমাকে তিনটি বিষয়ের অসিয়ত করেছেন। এক. প্রতিমাসে তিনটি রোজা রাখা, দুই. চাশতের সময় দুই রাকআত নামাজ পড়া, তিন. ঘুমানোর পূর্বে বিতর পড়ে নেওয়া।'৫৫
আবু দারদা বলেন:
أَوْصَانِي حَبِيبِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ، لَنْ أَدَعَهُنَّ مَا عِشْتُ: بِصِيَامِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَصَلَاةِ الضُّحَى، وَبِأَنْ لَا أَنَامَ حَتَّى أُوتِرَ
'আমার বন্ধু রাসুলুল্লাহ আমাকে তিনটি বিষয়ের অসিয়ত করেছেন, যা আমি জীবনেও ছাড়িনি। সেগুলো হলো, প্রতিমাসে তিনটি রোজা রাখা, চাশতের সময় নামাজ পড়া এবং বিতর পড়ার পূর্বে না ঘুমানো।'৫৬
আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : صَوْمُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ صَوْمُ الدَّهْرِ كُلِّهِ 'প্রতিমাসে তিনটি রোজা রাখা সারা বছর রোজা রাখার সমান। '৫৭
মাসের কোন তিনদিন রোজা রাখবে, এ সম্পর্কে বিভিন্ন হাদিসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের কথা উল্লেখ আছে। এ দিনগুলোকে আইয়ামে বিজ বা উজ্জ্বল দিনসমূহ বলা হয়।
আবার বিভিন্ন হাদিস থেকে বুঝা যায়, রাসুলুল্লাহ অনির্দিষ্টভাবে মাসের যেকোনো তিনদিন রোজা রাখতেন।
যেমন মুআজা থেকে বর্ণিত, তিনি আয়িশা-কে জিজ্ঞেস করলেন :
أَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ؟ قَالَتْ: نَعَمْ، فَقُلْتُ لَهَا مِنْ أَيِّ أَيَّامِ الشَّهْرِ كَانَ يَصُومُ؟ قَالَتْ: لَمْ يَكُنْ يُبَالِي مِنْ أَيِّ أَيَّامِ الشَّهْرِ يَصُومُ
'রাসুলুল্লাহ কি প্রতিমাসে তিনদিন রোজা রাখতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন মুআজা প্রশ্ন করলেন, মাসের কোন তিনদিন তিনি রোজা রাখতেন? আয়িশা উত্তর দিলেন, মাসের কোন দিনে রোজা রাখছেন, তার কোনো পরোয়া করতেন না (অর্থাৎ যেকোনো তিন দিন রোজা রাখতেন)। '৫৮
📄 হজ আদায় করে
প্রকৃত মুসলমান সামর্থ্য থাকলে হজ আদায় করে। হজে যাওয়ার পূর্বে হজের ছোট বড় সকল বিধান জেনে নেয়। হজের মর্যাদা ও তাৎপর্য অনুধাবন করে হজ পালন করে। ফলে তার হজ পূর্ণাঙ্গ ও সহিহ-শুদ্ধ হয় এবং সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরে আসে। হজ জাতি-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মিলনমেলা। মুসলিম উম্মাহর সমস্বরে তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা), তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা), তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা), তাহমিদ (আল-হামদুলিল্লাহ বলা) এবং তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...) এর মধুময় ধ্বনিতে মুখরিত থাকে এ ধর্মীয় সম্মেলন। তাই সত্যিকারের মুসলমান হজ করে যখন ফেরে, তখন তার অন্তর মুসলিম উম্মাহর প্রতি ইমানি ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যে টইটম্বুর থাকে।
📄 উমরা পালন করে
আনুগত্যশীল মুসলমান সামর্থ্য থাকলে হজের সময় ব্যতীত অন্য সময়ে, বিশেষ করে রমজান মাসে উমরা পালন করে। কেননা, রমজান মাসে উমরা করলে রাসুলুল্লাহ -এর সাথে হজ করার সাওয়াব পাওয়া যায়। সহিহ বুখারিতে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন :
لَمَّا رَجَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ حَجَّتِهِ قَالَ لِأُمِّ سِنَانٍ الأَنْصَارِيَّةِ: مَا مَنَعَكِ مِنَ الحَجِّ؟ قَالَتْ: أَبُو فُلَانٍ، تَعْنِي زَوْجَهَا، كَانَ لَهُ نَاضِحَانِ حَجَّ عَلَى أَحَدِهِمَا، وَالْآخَرُ يَسْقِي أَرْضًا لَنَا، قَالَ: فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً أَوْ حَجَّةً مَعِي
'যখন নবিজি হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন উম্মে সিনান আনসারি -কে বললেন, তুমি হজে যাওনি যে? তিনি বললেন, অমুকের আব্বুর (স্বামীর প্রতি ইঙ্গিত করে) দুটা উট ছিল। একটাতে সওয়ার হয়ে তিনি হজে গেলেন, আরেকটা জমি সিঞ্চনের কাজে জড়িত ছিল। (এজন্য আমি হজে যেতে পারিনি।) তখন নবিজি বললেন, রমজান মাসে উমরা করা একটি হজ করার সমান অথবা বলেছেন, আমার সাথে হজ আদায় করার সমান।'৫৯
📄 আল্লাহর দাসত্বের বাস্তবায়ন করে
প্রকৃত মুসলমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তাকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে: وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি।'৬০
মানুষের সকল কর্মতৎপরতা ইবাদত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হয়। প্রকৃত মুসলমান সেটাই করে থাকে। সে তার সকল কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে। তাই তার সকল কাজ ইবাদতে পরিণত হয়।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম ও ব্যাপক উপকারী আমল হলো, জমিনে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের সংগ্রাম করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা।
আপনি যদি প্রকৃত মুসলমান হওয়ার দাবি করেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনার ইবাদতে ঘাটতি আছে। কেননা, আপনি আপনার সৃষ্টির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সংগ্রাম করছেন না। আপনাকেসহ সকল জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর পরিপূর্ণ ইবাদত কায়েম করা। আর তা তখনই পূর্ণতা লাভ করবে, যখন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর শরিয়ত বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
এখান থেকে বুঝা গেল, প্রকৃত মুসলমান হতে হলে জীবনের প্রতিটি শাখায় ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আল্লাহ তাআলা যে মানবজাতিকে অন্যান্য মাখলুকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তার কারণও এটাই।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
'নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদের স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি। তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।'৬১
প্রকৃত মুসলমান হওয়ার দাবি করলে এ আয়াতের অর্থ ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে। আমাদের কেন এ শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত দান করেছেন, তার সঠিক কারণ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে হবে।