📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 ফরজ, ওয়াজিব ও নফলসমূহ যত্ন সহকারে আদায় করে

📄 ফরজ, ওয়াজিব ও নফলসমূহ যত্ন সহকারে আদায় করে


প্রকৃত মুসলমান ইসলামের সকল ফরজ বিধান ও রুকনসমূহ পরিপূর্ণরূপে সুন্দরভাবে আদায় করে। এ ক্ষেত্রে কোনোরূপ শিথিলতা ও গড়িমসি করে না।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে

📄 পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে


সে সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। 'কেননা, নামাজ হলো দ্বীনের খুঁটি। যে সেটাকে কায়েম রাখে, সে দ্বীনকে কায়েম রাখে। আর যে তা পরিত্যাগ করে, সে দ্বীনকে পরিত্যাগ করে।' তা ছাড়া নামাজ হলো সবচেয়ে মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ আমল। হাদিস শরিফে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসুলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল সর্বোত্তম?' রাসুলুল্লাহ বললেন, 'সময়মতো নামাজ আদায় করা।' আমি বললাম, 'তারপর কোন আমল?' তিনি বললেন, 'মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা।' আমি বললাম, 'তারপর কোন আমল?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।'১০
নামাজ সর্বোত্তম আমল হওয়ার কারণ হলো, এটি আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে। জীবনের বিভিন্ন ব্যস্ততা থেকে মানুষকে মুক্ত রেখে পূর্ণ মনোযোগ আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ করে। এর মাধ্যমে আল্লাহর হিদায়াত ও সহযোগিতা লাভ করা যায় এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকা যায়। এ ছাড়াও নামাজের মধ্যে সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর অটল থাকার প্রার্থনা করা হয়।
নামাজ যে সবচেয়ে উত্তম ও সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ আমল, এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সন্দেহ নেই। কেননা, নামাজ এমন এক জলপূর্ণ ঘাট, যেখান থেকে মুসলমান সহজেই তার পাথেয় তথা তাকওয়া অর্জন করে নিতে পারে। এমন এক স্বচ্ছ পানির ঝরনা, যার প্রবাহে গুনাহসমূহ ভাসিয়ে দেওয়া যায়।
এ সম্পর্কে আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهْرًا بِبَابٍ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ مِنْهُ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسَ مَرَّاتٍ هَلْ يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ؟ قَالُوا : لَا يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ. قَالَ: فَذَلِكَ مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الخَمْسِ يَمْحُو اللَّهُ بِهِنَّ الخَطَايَا.
'যদি তোমাদের কারও দরজার সামনে একটি নদী থাকে আর সে ওই নদীতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তার শরীরে কি কোনো ময়লা থাকবে?' সাহাবায়ে কিরাম বললেন, 'না, কোনো ময়লা থাকবে না।' রাসুলুল্লাহ বললেন, 'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণ এমনই। এগুলো দ্বারা আল্লাহ তাআলা (বান্দার) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।'১১
জাবির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন : مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ كَمَثَلِ نَهْرٍ جَارٍ، غَمْرٍ عَلَى بَابٍ أَحَدِكُمْ، يَغْتَسِلُ مِنْهُ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسَ مَرَّاتٍ
'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের দৃষ্টান্ত তোমাদের কারও দরজার সামনে অবস্থিত প্রবহমান নদীর ন্যায়, যাতে সে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে।'১২
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَنَّ رَجُلًا أَصَابَ مِنَ امْرَأَةٍ قُبْلَةً، فَأَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَأَخْبَرَهُ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: {أَقِمِ الصَّلَاةَ [ص:١١٢] طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ} [هود: ١١٤] فَقَالَ الرَّجُلُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ أَلِي هَذَا؟ قَالَ: لِجَمِيعِ أُمَّتِي كُلِّهِمْ
'এক ব্যক্তি একটি মেয়েকে চুমু খেয়ে বসল। তখন সে নবিজি -এর নিকট এসে এ ব্যাপারে অবহিত করল। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ আয়াতটি অবতীর্ণ করলেন, وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ (অর্থ : আর দিনের দুই প্রান্তেই নামাজ কায়েম করো এবং রাতের প্রান্তভাগে। নিশ্চয় পুণ্য কাজ পাপসমূহ দূর করে দেয়। [সুরা হুদ: ১১৪]) লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আয়াতের বিধান কি আমার জন্যও প্রযোজ্য হবে? রাসুলুল্লাহ বললেন, সকল উম্মতের জন্য প্রযোজ্য হবে।'১৩
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‎الصَّلَاةُ الْخَمْسُ، وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمْعَةِ، كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ، مَا لَمْ تُغْشَ ‎الْكَبَائِرُ
'পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এক ওয়াক্ত থেকে অপর ওয়াক্তের মাঝের গুনাহসমূহের জন্য এবং এক জুমআর নামাজ থেকে অপর জুমআর নামাজের মাঝখানের গুনাহসমূহের জন্য কাফফারা, যতক্ষণ না সে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। '১৪
উসমান বিন আফফান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি :
‎مَا مِنَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ تَحْضُرُهُ صَلَاةُ مَكْتُوبَةً فَيُحْسِنُ وُضُوءَهَا وَخُشُوعَهَا ‎وَرُكُوعَهَا، إِلَّا كَانَتْ كَفَّارَةً لِمَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ مَا لَمْ يُؤْتِ كَبِيرَةً وَذَلِكَ ‎الدَّهْرَ كُلَّهُ
'কোনো ফরজ নামাজের সময় আসার পর যে মুসলিম উত্তমরূপে অজু করে, আল্লাহভীরুতার সহিত উত্তমরূপে রুকু আদায় করে (নামাজ আদায় করবে), ওই নামাজ তার পূর্ববর্তী সময়ের কবিরা গুনাহ ব্যতীত সকল গুনাহের জন্য কাফফারা হবে। এভাবে সারাজীবন হতে থাকবে।'১৫
নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে এগুলো ছাড়াও আরও অসংখ্য হাদিস রয়েছে। সীমিত কলেবরে সবগুলো একত্র করা সম্ভবপর নয়।

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 মসজিদে নামাজের জামাআতে হাজির হয়

📄 মসজিদে নামাজের জামাআতে হাজির হয়


প্রকৃত পরহেজগার মুসলমান যথাসম্ভব মসজিদের প্রথম জামাতে হাজির থাকার জন্য লালায়িত থাকে। কেননা, রাসূলুল্লাহ ﷺ হাদিস শরিফে ইরশাদ করেছেন:
صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ أَفْضَلُ مِنْ صَلَاةِ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِيْنَ دَرَجَةً
‘জামাত সহকারে নামাজ একাকী নামাজের চেয়ে সাতাশগুণ বেশি উত্তম।’ ১৫
অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন:
إِذَا تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الْمَسْجِدِ، لَا يُخْرِجُهُ إِلَّا الصَّلَاةُ، لَمْ يَخْطُ خُطْوَةً، إِلَّا رُفِعَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةً، وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ، فَإِذَا صَلَّى، لَمْ تَزَلِ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّيْ عَلَيْهِ، مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَيْهِ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ، وَلَا يَزَالُ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاةِ مَا انْتَظَرَ الصَّلَاةَ
‘মুসলমান যখন উত্তমরূপে অজু করে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদের উদ্দেশে বের হয়, তখন প্রতি কদমে একটি করে দরজা বুলন্দ হয় এবং একটি করে গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ১৬ নামাজ শেষ করার পর যতক্ষণ পর্যন্ত নামাজের জায়গায় অবস্থান করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতারা এ বলে দোয়া করতে থাকেন, “হে আল্লাহ, এ ব্যক্তির ওপর রহমত বর্ষণ করুন, তার প্রতি দয়া করুন।” আর (মসজিদে প্রবেশ করার পর) যতক্ষণ পর্যন্ত নামাজের অপেক্ষায় থাকবে, সে সময়টাও নামাজের অন্তর্ভুক্ত ধরা হবে।’ ১৭
জামাত সহকারে নামাজ পড়তে আগ্রহী ব্যক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন :
مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ، أَوْ رَاحَ، أَعَدَّ اللَّهُ لَهُ فِي الْجَنَّةِ نُزُلاً، كُلَّمَا غَدَا، أَوْ رَاحَ
‘যে ব্যক্তি (জামা'আত সহকারে নামায পড়ার জন্য) সকাল বা সন্ধ্যায় মসজিদে গমন করে, যে যতবারই গমন করে, প্রতিবারেই আল্লাহ তা'আলা তার জন্য জান্নাতে একটি করে বিশ্রামাগার নির্মাণ করেন।’
এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম জামা'আত সহকারে নামায পড়ার প্রতি বেশি আগ্রহী ও লালায়িত ছিলেন।
এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন :
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَلْقَى اللَّهَ غَدًا مُسْلِمًا، فَلْيُحَافِظْ عَلَى هَؤُلَاءِ الصَّلَوَاتِ حَيْثُ يُنَادَى بِهِنَّ، فَإِنَّ اللَّهَ شَرَعَ لِنَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُنَنَ الْهُدَى، وَإِنَّهُنَّ مِنْ سُنَنَ الْهُدَى، وَلَوْ أَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّي هَذَا الْمُتَخَلِّفُ فِي بَيْتِهِ، لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ، وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ... وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا إِلَّا مُنَافِقٌ مَعْلُومُ النِّفَاقِ، وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتَى بِهِ يُهَادَى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتَّى يُقَامَ فِي الصَّفِّ
‘যে ব্যক্তি চায় যে, সে আগামীকাল মুসলিম অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সে যেন আযানের পরপরই (মসজিদে) নামাযের প্রতি স্থাপিত হয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবি -এর জন্য সুন্নাতে হুদা° প্রবর্তন করেছেন। আর আযানের পর (মসজিদে) নামাজের প্রতি ধাবিত হওয়া সেই সুন্নাহর গুণের অন্তর্ভুক্ত। তোমরা যদি ঘরে একাকী নামাজ পড়, এই ব্যক্তির ন্যায় ঘরের মধ্যে একাকী নামাজ পড়ো, তাহলে তোমরা নবি ﷺ-এর আদর্শ ত্যাগকারী হবে। আর যদি তোমরা তোমাদের নবি ﷺ-এর আদর্শ পরিত্যাগ করো, তাহলে তোমরা গুমরাহ হয়ে যাবে। ... জামাআতে নামাজ পড়া থেকে যারা দূরে থাকে, তাদের আমি পরিষ্কার মুনাফিক মনে করি। রাসুলুল্লাহ ﷺ (দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পরেও) দুজন ব্যক্তির কাঁধে ভর করে জামাআতের কাতারে দাঁড়িয়ে যেতেন।'
এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ ﷺ জামাআত পরিত্যাগকারী লোকদের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন।
তিনি ইরশাদ করেছেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِحَطَبٍ، فَيُحْطَبَ، ثُمَّ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَيُؤَذَّنُ لَهَا، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا فَيَؤُمُّ النَّاسَ، ثُمَّ أُخَالِفُ إِلَى رِجَالٍ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوْتَهُمْ
‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমার ইচ্ছে হয় যে, আমি লাকড়ি একত্র করার নির্দেশ দিই। তারপর নামাজের জন্য আজান দিতে বলি। তারপর একজনকে লোকজন নিয়ে (জামাআত সহকারে) নামাজ পড়াতে বলি। তারপর যেসব লোক জামাআতে শরিক হয়নি, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিই।'
জামাআতের প্রতি এত গুরুত্বারোপের কারণেই তো সাঈদ বিন মুসাইয়িব ﷺ-এর মতো ব্যক্তি ত্রিশ বছর পর্যন্ত আজানের পূর্বে মসজিদে উপস্থিত হয়ে প্রথম কাতারে জামাআত সহকারে নামাজ আদায় করেছেন! ইসলামের ইতিহাসে সাঈদ বিন মুসাইয়িব ﷺ-এর মতো লোক আরও অনেক আছেন।
ঘর থেকে মসজিদের দূরত্ব সাহাবায়ে কিরাম-কে জামাআতে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা দিতে পারত না। দূরত্ব বেশি হলে তাঁরা বরং খুশিই হতেন। কেননা, তখন মসজিদ অভিমুখে কদম বেশি হওয়ার কারণে আমলনামায় সাওয়াবও বেশি হয়।
উবাই বিন কাব বলেন:
كَانَ رَجُلٌ لَا أَعْلَمُ رَجُلًا أَبْعَدَ مِنَ الْمَسْجِدِ مِنْهُ، وَكَانَ لَا تُخْطِئُهُ صَلَاةُ، قَالَ: فَقِيلَ لَهُ: أَوْ قُلْتُ لَهُ: لَوْ اشْتَرَيْتَ حِمَارًا تَرْكَبُهُ فِي الظُّلْمَاءِ، وَفِي الرَّمْضَاءِ، قَالَ: مَا يَسُرُّنِي أَنَّ مَنْزِلِي إِلَى جَنْبِ الْمَسْجِدِ، إِنِّي أُرِيدُ أَنْ يُكْتَبَ لِي مَمْشَايَ إِلَى الْمَسْجِدِ، وَرُجُوعِي إِذَا رَجَعْتُ إِلَى أَهْلِي، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَدْ جَمَعَ اللَّهُ لَكَ ذَلِكَ كُلَّهُ
'জনৈক আনসারি সাহাবি-আমার জানামতে তার ঘর মসজিদ থেকে সবচেয়ে দূরে ছিল-তিনি কখনো জামাআত পরিত্যাগ করতেন না। তিনি বলেন, তাকে বলা হলো, অথবা (উবাই নাকি অন্য কেউ, সে ব্যাপারে পরবর্তী একজন বর্ণনাকারীর সন্দেহ) আমি বললাম, আপনি একটা গাধা কিনছেন না কেন? যাতে অন্ধকার রাতে এবং প্রখর রোদের সময় তার ওপর সওয়ার হওয়া যেত। তিনি উত্তর দিলেন, আমার ঘর মসজিদের পাশে হোক, তা আমি চাই না। আমি চাই, মসজিদ অভিমুখে এবং মসজিদ থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে ফেরার পথে আমার কদম বেশি লিপিবদ্ধ করা হোক। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন, আল্লাহ তোমার জন্য সবকিছু একত্র করে দিয়েছেন। ' ২৩
সাহাবিদের মধ্যে যাদের বাড়ি মসজিদ থেকে দূরে ছিল, তাদেরকে রাসুলুল্লাহ মসজিদের নিকট ঘর স্থানান্তর না করার পরামর্শ দিতেন। মসজিদের পথ দূরে হওয়ায় তাদের আমলনামায় মসজিদ অভিমুখে কদমের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এগুলো বিনষ্ট হবে না-এ কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতেন।
জাবির বর্ণনা করেন :
خَلَتِ الْبِقَاعُ حَوْلَ الْمَسْجِدِ، فَأَرَادَ بَنُو سَلِمَةَ أَنْ يَنْتَقِلُوا إِلَى قُرْبِ الْمَسْجِدِ، فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ لَهُمْ: إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّكُمْ تُرِيدُونَ أَنْ تَنْتَقِلُوا قُرْبَ الْمَسْجِدِ»، قَالُوا: نَعَمْ، يَا رَسُولَ اللهِ قَدْ أَرَدْنَا ذَلِكَ، فَقَالَ: يَا بَنِي سَلِمَةَ دِيَارَكُمْ تُكْتَبْ آثَارُكُمْ، دِيَارَكُمْ تُكْتَبْ آثَارُكُمْ. وفي رواية بعدها : فَقَالُوا: مَا كَانَ يَسُرُّنَا أَنَّا كُنَّا تَحَوَّلْنَا.
'মসজিদের আশপাশের কিছু জমি যখন খালি হলে বনি সালামা গোত্রের লোকেরা মসজিদের নিকট চলে আসার ইচ্ছা করলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি বললেন, আমি খবর পেয়েছি যে, তোমরা নাকি মসজিদের নিকট চলে আসতে চাও? তারা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা তাই ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেন, হে বনি সালামা গোত্রের লোকেরা, তোমরা তোমাদের বর্তমান স্থানেই থাকো; (মসজিদের দিকে) তোমাদের কদমের চিহ্নগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়। তোমরা তোমাদের বর্তমান স্থানেই থাকো; (মসজিদের দিকে) তোমাদের কদমের চিহ্নগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়।'২৪ এরপরের বর্ণনায় আছে, তখন তারা বললেন, (রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ কথায় যে আনন্দ আমরা পেয়েছি) এ আনন্দ জায়গা পরিবর্তন করলে পেতাম না।'২৫
আবু মুসা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ أَجْرًا فِي الصَّلَاةِ أَبْعَدُهُمْ إِلَيْهَا مَمْشَى، فَأَبْعَدُهُمْ، وَالَّذِي يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ حَتَّى يُصَلِّيَهَا مَعَ الْإِمَامِ أَعْظَمَ أَجْرًا مِنَ الَّذِي يُصَلِّيَهَا ثُمَّ يَنَامُ
'যার হাঁটার পথ মসজিদ থেকে বেশি দূরে সে নামাজের অধিক সাওয়াব লাভের হকদার। আর যে ব্যক্তি নামাজের জন্য অপেক্ষা করে ইমামের সাথে (জামাআত সহকারে) নামাজ পড়ে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে বেশি সাওয়াবের হকদার, যে একাকী নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে। '২৬
ফজর ও ইশার জামাআতে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে একাধিক হাদিসে আলাদাভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এ দুই নামাজের জামাআতে যারা শরিক হয়, তাদের জন্য বড় সাওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে। এখানে দুটি হাদিস উল্লেখ করা হলো:
এক. উসমান বিন আফফান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি :
مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ، وَمَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُ
'যে ব্যক্তি জামাআতের সাথে ইশার নামাজ পড়ল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত নামাজ পড়ল। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে পড়ল, সে যেন সারারাত নামাজ পড়ল। '২৭
দুই. আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন:
لَيْسَ صَلَاةُ أَثْقَلَ عَلَى المُنَافِقِينَ مِنَ الفَجْرِ وَالعِشَاءِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْرًا
'ইশা ও ফজরের নামাজ মুনাফিকদের জন্য সর্বাপেক্ষা কঠিন। তারা যদি জানত যে, এ দুটি নামাজের পুরস্কার বা সাওয়াব কত বেশি, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে বা বুক হেঁচড়ে হলেও তারা এ দুই ওয়াক্তে জামাআতে হাজির হতো। '২৮

টিকাঃ
১৭. এজনাই আব্দুল্লাহ বিন উমর মসজিদ গমন করার সময় ছোট ছোট কদম ফেলতেন, যেন কদম বেশি হয়ে সাওয়াবও বৃদ্ধি পায়। (অনুবাদক)
২০. সুন্নাতে হুদা অর্থ, রাসূলুল্লাহ্ যেসব কাজ ইবাদত হিসাবে পালন করেছেন এবং উম্মতের জন্যেও তা পালনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। এটাকে আমাদের পরিভাষায় সুন্নাতে মুআক্কাদাও বলে, যা ওয়াজিবের নিকটবর্তী স্তর। (অনুবাদক)

📘 আদর্শ মুসলিম > 📄 সুন্নাতে মুআক্কাদা ও নফলসমূহ গুরুত্ব সহকারে পড়ে

📄 সুন্নাতে মুআক্কাদা ও নফলসমূহ গুরুত্ব সহকারে পড়ে


আখিরাতের সফলতা-প্রত্যাশী প্রকৃত মুসলমান কখনো সুন্নাতে মুআক্কাদাসমূহ ছেড়ে দেয় না। রাতে ও দিনে যতটুকু সম্ভব নফল নামাজ পড়ার চেষ্টা করে। কেননা, অধিক নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যশীল করে দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার স্তরে নিয়ে যায়। বান্দা যখন সে মাকাম বা স্তরে উন্নীত হয়, তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং বিশেষ শক্তি দান করেন। তখন আল্লাহ তার কান হয়ে যান, যা দিয়ে সে শোনে; তার চোখ হয়ে যান, যা দিয়ে সে দেখে; তার হাত হয়ে যান, যার সাহায্যে সে স্পর্শ করে। নিম্নের হাদিসে কুদসিতে এটাই বর্ণিত হয়েছে :
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ، فَإِذَا أَحْبَبْتُهُ: كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِي يَسْمَعُ بِهِ، وَبَصَرَهُ الَّذِي يُبْصِرُ بِهِ، وَيَدَهُ الَّتِي يَبْطِشُ بِهَا، وَرِجْلَهُ الَّتِي يَمْشِي بِهَا، وَإِنْ سَأَلَنِي لَأُعْطِيَنَّهُ، وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِي لَأُعِيدَنَّهُ
'বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, এমনকি একসময় তাকে আমি ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শ্রবণ করে; তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দর্শন করে; তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে স্পর্শ করে এবং তার পা হয়ে যাই যার সাহায্যে সে পথ চলে। যখন সে আমার কাছ থেকে কিছু চায়, আমি তা প্রদান করি। আর যখন আমার নিকট (শয়তান থেকে) পানাহ চায়, আমি তাকে পানাহ দান করি।' ২৯
আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন আসমান ও জমিনের সকল মাখলুকও তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। এর প্রমাণ হলো, আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَقَالَ: إِنِّي أُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ، قَالَ: فَيُحِبُّهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي فِي السَّمَاءِ فَيَقُولُ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحَبَّهُ، فَيُحِبُّهُ أَهْلُ السَّمَاءِ، قَالَ ثُمَّ يُوضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي الْأَرْضِ، وَإِذَا أَبْغَضَ عَبْدًا دَعَا جِبْرِيلَ فَيَقُولُ: إِنِّي أَبْغَضُ فُلَانًا فَأَبْغِضْهُ، قَالَ فَيُبْغِضُهُ جِبْرِيلُ، ثُمَّ يُنَادِي فِي أَهْلِ السَّمَاءِ إِنَّ اللَّهَ يُبْغِضُ فُلَانًا فَأَبْغِضُوهُ، قَالَ: فَيُبْغِضُونَهُ، ثُمَّ تُوضَعُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِي الْأَرْضِ
‘আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাঈল -কে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তখন জিবরাঈল -ও তাকে ভালোবাসতে শুরু করেন। তারপর তিনি আসমানে ঘোষণা দেন যে, আল্লাহ তাআলা অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আসমানবাসীরা তাকে ভালোবাসতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তারপর তার এ গ্রহণযোগ্যতা জমিনেও নেমে আসে। আর যখন কোনো বান্দাকে আল্লাহ অপছন্দ করেন, তখন জিবরাঈল -কে ডেকে বলেন, অমুককে আমি অপছন্দ করি, তুমিও তাকে অপছন্দ করো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তখন জিবরাঈল -ও তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। তারপর তিনি আসমানে ঘোষণা দেন যে, অমুককে আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন, তোমরাও তাকে অপছন্দ করো। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তখন আসমানবাসীরাও তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। তারপর তার প্রতি এ ঘৃণাবোধ জমিনেও নেমে আসে।’
এজন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে এত বেশি নফল নামাজ পড়তেন যে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তাঁর পা ফুলে যেত। একদিন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. বললেন, ‘আপনি এমন কেন করেন? আপনার তো আগে-পরের সব গুনাহই ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে! প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00