📄 সচেতন মুমিন
একজন মুসলমানের প্রতি ইসলামের প্রথম দাবি হলো, সে আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ ইমান রাখবে, তাঁর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক রাখবে, সর্বদা তাঁর জিকির করবে এবং তাঁর ওপরই ভরসা করবে। উপায় ও উপকরণ অবলম্বনের পাশাপাশি আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকবে। আর অন্তরে এ ধারণা বদ্ধমূল রাখবে যে, সে যতই চেষ্টা করুক এবং যতই উপায়- উপকরণ অবলম্বন করুক না কেন, সব সময় সে আল্লাহর কুদরত, সাহায্য ও সহযোগিতার মুখাপেক্ষী।
প্রকৃত মুসলমানের হৃদয় জাগ্রত এবং তার চোখ খোলা থাকে। বিশাল সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কুদরতি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন থাকে সে। সে বিশ্বাস করে, সৃষ্টিজগতের সকল ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সকল বিষয় আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। ফলে সে সর্বদা আল্লাহর জিকির করে এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে ও সৃষ্টিজগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন দেখতে পায়। এতে আল্লাহর প্রতি তার ইমান ও তাওয়াক্কুল বৃদ্ধি পায় এবং সে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতে থাকে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ - الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
'নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্যে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে। (তারা বলে) হে আমাদের রব, এসব আপনি অনর্থক সৃষ্টি করেননি। সকল পবিত্রতা আপনারই। অতএব, আমাদের আপনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।'২
📄 আল্লাহর একান্ত আনুগত্যশীল
সত্যিকারের মুসলমানের জন্য সকল বিষয়ে আল্লাহর আনুগত্যশীল হওয়া, তাঁর ভয়ে ভীত হওয়া, তাঁর সকল আহকাম মেনে চলা একান্ত আবশ্যক; যদিও এ ক্ষেত্রে মন তার বিরোধিতা করুক। আপন স্বভাবের বিরোধী হলেও আল্লাহর সকল আদেশ মান্য করতে হবে। ছোট বড় সকল বিষয়ে কোনোরূপ বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি ব্যতীত আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ -এর নিরঙ্কুশ আনুগত্যই হলো মুসলমানের ইমানের মানদণ্ড।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন : لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَّا جِئْتُ بِهِ 'তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণাঙ্গ) ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনীত শরিয়তের অনুগত হবে।'৩
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا 'অতএব, আপনার পালনকর্তার কসম, তারা ইমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তারা আপনাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে করে, অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।'৪
এটাই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। এটাকে আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ -এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যও বলে। এটা ছাড়া ইমান পূর্ণ হয় না এবং ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয় না। এজন্যই প্রকৃত মুসলমানের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের কোনো বিষয়ে আল্লাহর বিধান ও রাসুলুল্লাহ -এর আদর্শকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
📄 অধীনস্থদের জিম্মাদারি অনুভবকারী
মুসলমানের পরিবারের কোনো সদস্য বা অধীনস্থ কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসুল -এর বিধানে কোনো অবহেলা বা শিথিলতা করে, তাহলে ওই মুসলমানকে জবাবদিহি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
'তোমাদের প্রত্যেকই জিম্মাদার এবং প্রত্যেকই নিজের অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।'
সত্যিকারের মুসলমান এ জিম্মাদারি ও জবাবদিহি সম্পর্কে সচেতন থাকে। তাই অধীনস্থদের মধ্যে কেউ যদি দ্বীনের ব্যাপারে কোনোরূপ শিথিলতা দেখায়, তখন সে ধৈর্য ধরতে পারে না; বরং খুব দ্রুতই তা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সুতরাং কেউ যদি এ জিম্মাদারি ও দায়িত্ব আদায় করার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করে, বুঝতে হবে তার ইমান, দ্বীন এমনকি তার পুরুষত্বেও দুর্বলতা আছে।
📄 আল্লাহর ফয়সালা ও ব্যবস্থাপনার প্রতি সন্তুষ্ট
প্রকৃত মুসলমান আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকে। তার দৃষ্টিভঙ্গি এমনই হয়, যেমনটি রাসুলুল্লাহ হাদিসে ইরশাদ করেছেন।
তিনি বলেন :
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ، صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
'মুমিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক! তার সকল বিষয়ই কল্যাণকর। যদি তার সুসময় আসে, তখন শুকরিয়া আদায় করে; এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি তার খারাপ সময় আসে, তখন সবর করে; এটাও তার জন্য কল্যাণকর।'৬
এর কারণ হলো, সত্যিকার মুসলমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ইমানের অন্যতম রুকন বা আবশ্যকীয় বিষয়। সে বিশ্বাস করে, তাকদিরে যা লেখা আছে, তা ঘটবেই ঘটবে, তাকে বাধা দেওয়ার বা প্রতিহত করার সাধ্য কারও নেই। সে এটাও বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় সাওয়াব অর্জিত হয় এবং আনুগত্যশীল ও সফলকাম বান্দাদের তালিকাভুক্ত হওয়া যায়।
এই বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার সকল বিষয় কল্যাণকর হয়ে ওঠে। যখন তার সুসময় চলে, তখন সে মহান নিয়ামতদাতা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে থাকে। আর যখন দুর্দিন চলে, তখন আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। এভাবে উভয় অবস্থা তার জন্য কল্যাণকর হয়ে ওঠে।