📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 বাড়ি নির্মাণের পূর্বে প্রতিবেশী নির্বাচন করা

📄 বাড়ি নির্মাণের পূর্বে প্রতিবেশী নির্বাচন করা


এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে।

বর্তমান সময়ে বাসস্থান ও অবস্থানটা খুব কাছাকাছি হয়ে থাকে। একই বিল্ডিংয়ে, একই গলিতে বা একই মহল্লায় কাছাকাছি অনেক মানুষ একত্রে বাস করে। ফলে প্রতিবেশীর প্রভাব প্রতিবেশীর ওপর খুব ভালোভাবেই পড়ে।

একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চারটি সৌভাগ্যের বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো উত্তম প্রতিবেশী। আর চারটি দুর্ভাগ্যের বিষয়ের কথা বলেছেন। তার মধ্যে একটি হলো খারাপ প্রতিবেশী।

সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ إِسْمَاعِيلَ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَرْبَعُ مِنَ السَّعَادَةِ الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ، وَالْمَسْكَنُ الْوَاسِعُ، وَالْجَارُ الصَّالِحُ، وَالْمَرْكَبُ الْهَنِيءُ، وَأَرْبَعُ مِنَ الشَّقَاوَةِ الْجَارُ السُّوءُ، وَالْمَرْأَةُ السُّوءُ، وَالْمَسْكَنُ الضَّيقُ، وَالْمَرْكَبُ السُّوءُ.
সা'দ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “চারটি বিষয় সৌভাগ্যের- নেককার স্ত্রী, প্রশস্ত ঘর, নেককার প্রতিবেশী ও দ্রুতগামী বাহন। আর হতভাগ্যের বিষয় চারটি- অসৎ প্রতিবেশী, খারাপ স্ত্রী, সংকীর্ণ ঘর ও দুর্বল বাহন।"⁹⁹

খারাপ প্রতিবেশীর ভয়াবহতা এতটাই যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআর মধ্যে এর থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাইতেন। যেমন মুস্তাদরাকে হাকিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ فِي دُعَائِهِ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ جَارِ السُّوءِ فِي دَارِ الْمُقَامَةِ، فَإِنَّ جَارَ الْبَادِيَةِ يَتَحَوَّلُ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় দুআর মধ্যে বলতেন, "হে আল্লাহ, আমি স্থায়ী নিবাসের মধ্যে খারাপ প্রতিবেশী থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই। আর উপত্যকার প্রতিবেশী তো এমনিতেই পরিবর্তন হবে।"¹⁰⁰

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে খারাপ প্রতিবেশী থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাইতে বলেছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ، مِنْ جَارِ السُّوءِ فِي دَارِ الْمُقَامِ، فَإِنَّ جَارَ الْبَادِيَةِ يَتَحَوَّلُ عَنْكَ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তোমরা স্থায়ী নিবাসে খারাপ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাও। আর উপত্যকার প্রতিবেশী তো তোমার থেকে এমনিতেই চলে যাবে।"¹⁰¹

স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-সন্তানদের ওপর খারাপ প্রতিবেশীর প্রভাব, তাদের বিভিন্ন কষ্টদায়ক আচরণ ও তাদের পাশে বসবাস করার দুর্গতি নিয়ে আর বেশি কথা বলার এখানে সুযোগ নেই। অবশ্য শিক্ষাগ্রহণের জন্য পূর্ববর্তী আলোচনা অনুসারে তার যথাযথ প্রয়োগই যথেষ্ট। সম্ভবত এর একটি যৌক্তিক সমাধান, যা কিছু ভালো লোকেরা করছে, এটা হতে পারে যে, প্রতিবেশীর সমস্যা সমাধানের জন্য নিজের পরিবারের লোকদের কাছে বাসা ভাড়া দেবে। যদিও এতে কিছু অর্থ খরচ হবে, তারপরও অর্থ দ্বারা তো তুমি সৎ প্রতিবেশী পাবে না।

টিকাঃ
৯৯. সহীহ ইবনে হিব্বান: ৯/৩৪০, হা. নং ৪০৩২ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
১০০. মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৭১৪, হা. নং ১৯৫১ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
১০১. সুনানে নাসায়ী: ৮/২৭৪, হা. নং ৫৫০২ (প্র. মাকতাবুল মাতবৃআতিল ইসলামিয়্যা, হালব)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজ এবং প্রয়োজনীয় ও আরামের জিনিসগুলো পর্যন্ত পরিমাণে রাখা

📄 প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজ এবং প্রয়োজনীয় ও আরামের জিনিসগুলো পর্যন্ত পরিমাণে রাখা


বর্তমান সময়ে আমাদের ওপর আল্লাহ তাআলার অনেক বড় একটা নেয়ামত এই যে, তিনি আমাদের জীবনযাপনে শান্তি ও সুবিধার জন্য অনেক উপায়-উপকরণ দান করেছেন। যেমন ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি। বুদ্ধিমানের কাজ হলো, (সামর্থ্য থাকলে) ঘরে এ সকল জিনিসের পর্যাপ্ত মজুদ রাখা। যাতে কষ্ট ব্যতীত স্বস্তির সাথে কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া যায়। তবে লক্ষ রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপচয় না হয়। প্রয়োজনীয় সুন্দর জিনিস দিয়ে ঘর সাজাবে, অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে নয়। সুতরাং প্রয়োজনীয় সুন্দর জিনিস এবং অপ্রয়োজনীয় সুন্দর জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের কোনো জিনিস নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলো মেরামতের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা এই বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয় না। তাদের স্ত্রীরা বারবার তাগিদ দিতে থাকে, কিন্তু তারা সেদিকে খেয়ালই করে না। ঘরের বিভিন্ন জিনিসের ওপর ধুলোবালির স্তর পড়ে থাকে, ঘরে তেলাপোকাসহ বিভিন্ন পোকামাকড় বাসা বাঁধে, এখানে সেখানে এটা ওটার ভাঙা অংশ পড়ে থাকে, ঘর থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধ ছড়ায়।

নিঃসন্দেহে এ সকল বিষয়ের কারণে ঘরে শান্তি থাকে না, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। এর কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও ভালো থাকে না। সুতরাং জ্ঞানীরা এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ রাখবে।

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 ঘরের প্রতিটি সদস্যের শারীরিক সুস্থতার প্রতি লক্ষ রাখা

📄 ঘরের প্রতিটি সদস্যের শারীরিক সুস্থতার প্রতি লক্ষ রাখা


নবী পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন দুআ পড়ে তার শরীরে ফুঁক দিতেন।

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا مَرِضَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِهِ نَفَثَ عَلَيْهِ بِالْمُعَوَّذَاتِ.
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে তার শরীরে ফুঁক দিতেন। "¹⁰²

সুনানে তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أَخَذَ أَهْلَهُ الوَعَكُ أَمَرَ بِالحِسَاءِ فَصُنِعَ ثُمَّ أَمَرَهُمْ فَحَسَوْا مِنْهُ، وَكَانَ يَقُولُ: إِنَّهُ لَيَرْتُقُ فُؤَادَ الحَزِينِ، وَيَسْرُو عَنْ فُؤَادِ السَّقِيمِ كَمَا تَسْرُو إِحْدَاكُنَّ الوَسَخَ بِالمَاءِ عَنْ وَجْهِهَا.
“আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হতো, তখন তিনি হাসা নামক এক প্রকার হালুয়া তৈরি করতে বলতেন। হালুয়া তৈরি হলে তাদেরকে তা থেকে খাওয়ার নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেন, নিশ্চয় এটা অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং অন্তর থেকে চিন্তা পেরেশানি দূর করে। যেমনিভাবে তোমরা পানি দিয়ে তোমাদের চেহারা থেকে ময়লা দূর কর।"¹⁰³

কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: إِذَا اسْتَجْنَحَ اللَّيْلُ، أَوْ قَالَ: جُنْحُ اللَّيْلِ، فَكُفُوا صِبْيَانَكُمْ، فَإِنَّ الشَّيَاطِينَ تَنْتَشِرُ حِينَئِذٍ، فَإِذَا ذَهَبَ سَاعَةً مِنَ العِشَاءِ فَخَلُّوهُمْ، وَأَغْلِقُ بَابَكَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللهِ، وَأَطْفِئُ مِصْبَاحَكَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ، وَأَوْكِ سِقَاءَكَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ، وَخَمْرُ إِنَاءَكَ وَاذْكُرِ اسْمَ اللَّهِ، وَلَوْ تَعْرِضُ عَلَيْهِ شَيْئًا.
জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "রাত্রি যখন ডানা মেলে (অর্থাৎ যখন রাত হয়) তখন তোমরা তোমাদের ছোট শিশুদের আটকে রাখ। কারণ, তখন শয়তান ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর যখন রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়, তখন তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা বন্ধ কর এবং আল্লাহর নাম নিয়ে বাতি নিভিয়ে দাও। আল্লাহর নাম নিয়ে পানির পাত্র ঢেকে রাখ এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খাবারের পাত্র ঢেকে রাখ; যদিও তার ওপর কোনো কিছু দিয়ে রাখ।"¹⁰⁴
সহীহ মুসলিমে এসেছে-
عَنْ جَابِرٍ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: غَطُّوا الْإِنَاءَ، وَأَوْكُوا السَّقَاءَ، وَأَغْلِقُوا الْبَابَ، وَأَطْفِئُوا الصِّرَاجَ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَحُلُّ سِقَاءٌ، وَلَا يَفْتَحُ بَابًا، وَلَا يَكْشِفُ إِنَاءً، فَإِنْ لَمْ يَجِدْ أَحَدُكُمْ إِلَّا أَنْ يَعْرِضَ عَلَى إِنَائِهِ عُودًا، وَيَذْكُرَ اسْمَ اللهِ، فَلْيَفْعَلْ، فَإِنَّ الْفُوَيْسِقَةَ تُضْرِمُ عَلَى أَهْلِ الْبَيْتِ بَيْتَهُمْ.
জাবের রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "তোমরা পাত্র ঢেকে রাখ, পানির পাত্রের মুখ বন্ধ কর এবং দরজা বন্ধ করে বাতি নিভাও। কারণ, শয়তান বন্ধ পাত্রে মুখ দিতে পারে না ও দরজা খুলতে পারে না এবং পাত্রের মুখ খুলতে পারে না। যদি তোমরা কোনো ঢাকনা না পাও, তাহলে বিসমল্লাহ বলে একটা কাঠের টুকরা পাত্রের ওপর রাখ। কেননা, (বাতি না নিভালে হতে পারে) ইঁদুর মানুষের বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে।"¹⁰⁵

عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا تَتْرُكُوا النَّارَ فِي بُيُوتِكُمْ حِينَ تَنَامُونَ.
ইবনে উমার রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, "তোমরা আগুন জ্বালিয়ে রেখে ঘুমিও না।”¹⁰⁶

والله أعلم، وصلى الله على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه وسلم

টিকাঃ
১০২. সহীহ মুসলিম: ৪/১৭২৩, হা. নং ২১৯২ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
১০৩. সুনানে তিরমিযী: ৩/৪৫১, হা. নং ২০৩৯ (প্র. দারুল গারবিল ইসলামি, বৈরূত)
১০৪. সহীহ বুখারী: ৪/১২৩, হা. নং ৩২৮০ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
১০৫. সহীহ মুসলিম: ৩/১৫৯৪, হা. নং ২০১২ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
১০৬. সহীহ বুখারী: ৮/৬৫, হা. নং ৬২৯৩ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00