📄 ঘর ও পরিবারের সদস্যদের খারাপ ও নোংরা স্বভাবগুলো সংশোধনের চেষ্টা করা
পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যেই কোনো না কোনো চারিত্রিক দোষ রয়েছে। যেমন মিথ্যা বলা, গীবত করা, চোগলখুরি করা ইত্যাদি। এ সকল চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি অবশ্যই সংশোধন করতে হবে।
কিছু মানুষ আছে, যারা মনে করে যে, এ সকল দোষ-ত্রুটি সংশোধন করার একমাত্র উপায় হলো শারীরিক শাস্তি প্রদান করা। শুধু যে শারীরিক শাস্তি প্রদানই এর একমাত্র সমাধান নয়, তা আমরা সামনের হাদীস থেকেই বুঝতে পারব।
সহীহ জামে সগীরে এসেছে-
عَنْ عَائِشَةَ أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ مَرْفُوْعًا : كَانَ إِذَا اطَّلَعَ عَلَى أَحَدٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ كَذَبَ كَذَّبَةٌ، لَمْ يَزَلْ مُعْرِضًا عَنْهُ حَتَّى يُحْدِثَ تَوْبَةٌ.
আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জানতে পারতেন যে, তাঁর পরিবারে কেউ মিথ্যা কথা বলেছে, তখন তাওবা করার আগ পর্যন্ত তাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলতেন।”⁹¹
এই হাদীস থেকে জানা গেল যে, কথা ছেড়ে দেওয়া, তার দিকে না তাকানো এই পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ শাস্তি। আবার কখনো কখনো এটা শরীরিক শাস্তির চেয়ে বেশি কার্যকর। সুতরাং বাড়ির দায়িত্বশীল ও কর্তাগণ ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে শাস্তি প্রদান করবে।
টিকাঃ
৯১. সহীহ জামে সগীর: ২/৮৫৫, হা. নং ৪৬৭৫ (প্র. আল মাকতাবুল ইসলামি, বৈরূত)
📄 ঘরের এমন একস্থানে বেত ঝুলিয়ে রাখা, যেখান থেকে বাড়ির লোকেরা তা দেখতে পায়
শাস্তির ইঙ্গিত করা আদব শিক্ষা দেওয়ার অনেক বড় একটি মাধ্যম। এ কারণেই ঘরে বেত অথবা লাঠি ঝুলিয়ে রাখার বর্ণনা এসেছে।
আল মু'জামুল কাবীরে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «عَلَّقُوا السَّوْطَ حَيْثُ يَرَاهُ أَهْلُ الْبَيْتِ؛ فَإِنَّهُ لَهُمْ أَدَبُ.
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা (ঘরের) এমন জায়গায় বেত ঝুলিয়ে রাখ, যেখান থেকে বাড়ির সকলে তা দেখতে পায়। কারণ, এটাই তাদের জন্য আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা।"⁹²
শাস্তি প্রদানের বস্তু বা মাধ্যম দেখলে অসৎ উদ্দেশ্যের লোকেরা এই ভয়ে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে যে, হয়তো কারও কাছে তার খারাপ বিষয়টা প্রকাশ পেয়ে যাবে আর এজন্য তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এটা তাদেরকে নৈতিকতা শিক্ষা ও উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার দিকে নিয়ে যাবে।
আল্লামা মুনাবী রহ. বলেন-
قال ابن الأنباري: لم يرد به الضرب به لأنه لم يأمر بذلك أحدا وإنما أراد لا ترفع أدبك عنهم.
ইবনে আম্বারী রহ. বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে প্রহার করা উদ্দেশ্য নেননি। কারণ, তিনি কাউকে এই আদেশ দেননি। তিনি এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য নিয়েছেন, যেন তাদের থেকে তোমার আদব ও সম্মান উঠে না যায়।”⁹³
প্রহার করাটা কখনো মূলনীতি হতে পারে না। কারণ, প্রহারের আশ্রয় তখনই গ্রহণ করতে হবে, যখন শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার এবং আবশ্যক মান্যতার সকল পথ অবলম্বন শেষ হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ﴾
"আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোনো পথ অনুসন্ধান কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুমহান ও শ্রেষ্ঠ।"⁹⁴
অর্থাৎ ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। যেমনটি আমরা আবু দাউদের এ হাদীস থেকে বিষয়টি বুঝতে পারি-
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا، وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرٍ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ.
আমর বিন শুআইব স্বীয় পিতা সূত্রে দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "তোমরা সাত বছর বয়সে তোমাদের সন্তানদের নামাজের আদেশ দাও। আর এর কারণে তাদেরকে দশ বছর বয়সে প্রহার কর এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।"⁹⁵
প্রয়োজন ছাড়া প্রহার করা তো এক ধরনের শত্রুতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক মহিলাকে এমন একজন পুরুষকে বিবাহ করতে নিষেধ করেছিলেন, যে তার কাঁধ থেকে লাঠি নামাতো না। অর্থাৎ সে তার স্ত্রীদের প্রহার করত।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّ أَبَا عَمْرِو بْنَ حَفْصٍ طَلَّقَهَا الْبَتَّةَ... قَالَتْ: فَلَمَّا حَلَلْتُ ذَكَرْتُ لَهُ أَنَّ مُعَاوِيَةَ بْنَ أَبِي سُفْيَانَ، وَأَبَا جَهْمٍ خَطَبَانِي، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَّا أَبُو جَهْمٍ، فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ عَنْ عَاتِقِهِ، وَأَمَّا مُعَاوِيَةُ فَصُعْلُوكَ لَا مَالَ لَهُ، انْكِحِي أُسَامَةَ بْنَ زَيْدٍ فَكَرِهْتُهُ، ثُمَّ قَالَ: انْكِحِي أُسَامَةَ، فَنَكَحْتُهُ، فَجَعَلَ اللهُ فِيهِ خَيْرًا، وَاغْتَبَطْتُ بِهِ.
"ফাতেমা বিনতে কায়েস রাযি. থেকে বর্ণিত যে, আবু আমর বিন হাফস রাযি. তাকে চূড়ান্ত তালাক দিয়েছিল। ... তিনি বলেন, অতঃপর আমি যখন (ইদ্দত পালন শেষে) হালাল হয়ে গেলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গিয়ে বললাম, মুআবিয়া বিন আবু সুফইয়ান রাযি. এবং আবু জাহম রাযি. আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আবু জাহম তো স্বীয় কাঁধ থেকে লাঠি নামায় না। আর মুআবিআ হলো নিঃস্ব, তার কোনো সম্পদ নেই। তুমি উসামা বিন যায়েদকে বিবাহ কর। আমি তা অপছন্দ করলাম। এরপর তিনি আবারও বললেন, উসামাকে বিবাহ কর। অতঃপর আমি তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। আল্লাহ তাআলা এ বিবাহে কল্যাণ দান করলেন এবং আমি ঈর্ষার পাত্রীতে পরিণত হলাম। ⁹⁶
আর যারা একেবারেই প্রহার করা যাবে না এমন মত পোষণ করে, তারা কাফেরদের দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে। তাদের এই সিদ্ধান্ত ভুল এবং এটা শরয়ী সিদ্ধান্তের পরিপন্থী।
টিকাঃ
৯২. আল মুজামুল কাবীর, তাবারানী: ১০/২৪৮, হা. নং ১০৬৭১ (প্র. মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়া, কায়রো)
৯৩. ফয়যুল কাদীর: ৪/৩২৫, হা. নং ৫৪৬৮ সংশ্লিষ্ট (প্র. আল মাকাতাবাতুত তিজারিয়্যাতুল কুবরা, মিশর)
৯৪. সূরা নিসা: ৩৪
৯৫. সুনানে আবু দাউদ: ১/১৩৩, হা. নং ৪৯৫ (প্র. আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
৯৬. সহীহ মুসলিম: ২/১১১৪, হা. নং ১৪৮০ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)