📄 ঘরের গোপন বিষয়গুলো বাইরে প্রকাশ না করা
এর সাথে কয়েকটি বিষয় জড়িত।
• ঘরের কোনো গোপন কথা বাইরে প্রকাশ না করা।
• স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার কথা বাইরে না ছড়ানো।
• ঘরের এমন কোনো বিষয় বাইরে প্রকাশ না করা, যা প্রকাশ করলে গোটা পরিবারের অথবা পরিবারের কোনো এক সদস্যের ক্ষতির কারণ হয়।
প্রথম বিষয়টি হারাম হওয়ার দলীল-
حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَعْدٍ، قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا.
আবু সাঈদ খুদরী রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট ঐ লোকের অবস্থান সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে, যে তার স্ত্রীর নিকট যায় আর তার স্ত্রী তার কাছে আসে, (অর্থাৎ উভয়ের মাঝে মিলন হয়) অতঃপর সে তার গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়। ⁷²
يفضي এর অর্থ স্বামী-স্ত্রীর মিলন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন-
( وَقَدْ أَفْضَى بَعْضُكُمْ إِلَى بَعْضٍ )
"অথচ তোমাদের একজন অন্যজনের কাছে গমন করেছে। "⁷³
এটা হারাম হওয়ার আরেকটি দলীল হলো, আসমা বিনতে ইয়াযীদ রাযি. এর হাদীস। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
حَدَّثَتْنِي أَسْمَاءُ بِنْتُ يَزِيدَ، أَنَّهَا كَانَتْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ قُعُودُ عِنْدَهُ فَقَالَ: لَعَلَّ رَجُلًا يَقُولُ: مَا يَفْعَلُ بِأَهْلِهِ، وَلَعَلَّ امْرَأَةً تُخْبِرُ بِمَا فَعَلَتْ مَعَ زَوْجِهَا فَأَرَمَّ الْقَوْمُ. فَقُلْتُ: إِي وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّهُنَّ لَيَقُلْنَ وَإِنَّهُمْ لَيَفْعَلُونَ قَالَ: فَلَا تَفْعَلُوا فَإِنَّمَا مِثْلُ ذَلِكَ مِثْلُ الشَّيْطَانُ لَقِيَ شَيْطَانَةٌ فِي طَرِيقٍ فَغَشِيَهَا وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ.
আসমা বিনতে ইয়াযীদ রাযি. বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিসে ছিলেন এবং তাঁর পাশে পুরুষ ও নারী সাহাবীগণ বসা ছিলেন। তখন তিনি বললেন, “সম্ভবত কোনো পুরুষ এমন আছে, যে তার স্ত্রীর সাথে যা করে তা বলে বেড়ায়? আর কোনো মহিলা এমন আছে, যে তার স্বামীর সাথে যা হয় তা বলে বেড়ায়?" তখন সকলেই চুপ হয়ে গেল। তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর শপথ! মহিলারা এমনটি বলে এবং তারাও (পুরুষরা) এমনটি করে। তিনি বললেন, “তোমরা এমনটি কোরো না। কারণ, এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ পুরুষ শয়তানের মতো, যে রাস্তায় নারী শয়তানের সাথে দেখা হলে সেখানেই তারা অপকর্ম করে আর মানুষ তা দেখতে থাকে। "⁷⁴
সুনানে আবু দাউদের রেওয়ায়েতে এসেছে-
عَنْ أَبِي نَضْرَةَ، حَدَّثَنِي شَيْخٌ مِنْ طُفَاوَةً قَالَ: تَثَوَيْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ بِالْمَدِينَةِ... فَقَالَ: أَلَا أُحَدِّثُكَ عَنِّي وَعَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قُلْتُ: بَلَى... فَقَالَ: هَلْ مِنْكُمُ الرَّجُلُ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ فَأَغْلَقَ عَلَيْهِ بَابَهُ وَأَلْقَى عَلَيْهِ سِتْرَهُ وَاسْتَتَرَ بِسِتْرِ اللَّهِ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: ثُمَّ يَجْلِسُ بَعْدَ ذَلِكَ فَيَقُولُ فَعَلْتُ كَذَا فَعَلْتُ كَذَا. قَالَ: فَسَكَتُوا، قَالَ فَأَقْبَلَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ: هَلْ مِنْكُنَّ مَنْ تُحَدِّثُ؟ فَسَكَتْنَ فَجَتَتْ فَتَاةً قَالَ مُؤَمَّلُ، فِي حَدِيثِهِ فَتَاةٌ كَعَابُ عَلَى إِحْدَى رُكْبَتَيْهَا وَتَطَاوَلَتْ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِيَرَاهَا وَيَسْمَعَ كَلَامَهَا فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّهُمْ لَيَتَحَدَّثُونَ وَإِنَّهُنَّ لَيَتَحَدَّثْنَهُ، فَقَالَ: هَلْ تَدْرُونَ مَا مَثَلُ ذَلِكَ؟ فَقَالَ: إِنَّمَا مَثَلُ ذَلِكَ مَثَلُ شَيْطَانَةٍ، لَقِيَتْ شَيْطَانًا فِي السِّكَّةِ فَقَضَى مِنْهَا حَاجَتَهُ وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ إِلَيْهِ.
আবু নাযরা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "তোফাওয়াত নামক স্থানের একজন বৃদ্ধ আমাকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি একদা মদীনায় আবু হুরাইরা রাযি. এর মেহমান হিসেবে অবস্থান করি।.... আবু হুরাইরা রাযি. বললেন, আমি কি তোমাকে আমার ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘটনা বর্ণনা করব না? আমি বললাম, হ্যাঁ। ....অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কি এমন পুরুষ আছে, যে তার স্ত্রীর নিকট আসে, অতঃপর দরজা বন্ধ করে দেয় এবং তার ওপর পর্দা টেনে দেয়, আল্লাহর গোপন করার মাধ্যমে নিজেদের গোপন করে'? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, 'এরপর সে লোকদের মাঝে বসে এবং বলে, আমি এমন করেছি, আমি এমন করেছি'? তখন লোকেরা চুপ করে থাকল। তখন তিনি মহিলাদের দিকে ফিরে বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে এমনটি বলে'? তারা সকলে চুপ রইলেন। তখন এক তরুণী এক হাঁটুর ওপর ভর করে মাথা উঁচু করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে তাকাচ্ছিলেন, যেন তিনি তাকে দেখতে পান এবং তার কথা শুনতে পান। অতঃপর সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয় তারা (পুরুষরা) এমনটি বলে এবং তারাও (মহিলারা) এমনটি বলে। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা কি জান যে, তার উপমা কেমন? এর উপমা হলো, নারী শয়তান যে গলির মধ্যে পুরুষ শয়তানের সাথে দেখা করে এবং সেখানে মানুষের দৃষ্টির সামনে তাদের চাহিদা পূরণ করে'।”⁷⁵
আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্বের বিষয়টা ঘরের বাইরে নিয়ে আসা। আর এ কারণে অনেক সময়ই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে। পারিবারিক ছোটখাটো সমস্যার মধ্যে তৃতীয় পক্ষকে টেনে এনে বেশির ভাগ সময়ই সমস্যাকে আরও গুরুতর করা হয়।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বন্দ্বের সমাধান নিজেরাই করার চেষ্টা করবে। নিজেদের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে তাদের কোনো নিকটাত্মীয়ের সাহায্য নিয়ে সমস্যার সমাধান করবে। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا إِن يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا
"যদি তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হওয়ার মতো পরিস্থিতিরই আশঙ্কা কর, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ের মীমাংসা চাইলে আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছু অবহিত।”⁷⁶
আর তৃতীয় বিষয়টি হলো, ঘরের খবর বাইরে প্রচার করা, যে কারণে পরিবার অথবা পরিবারের কোনো সদস্যের ক্ষতি হয়। এটা জায়েয নেই। কারণ, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই হাদীসের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَار.
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কেউ কারও ক্ষতি করবে না এবং ক্ষতিগ্রস্তও হবে না।"⁷⁷
নিম্নে বর্ণিত আয়াতে কারীমার তাফসীরে বিষয়টির উপমা রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
﴿ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ كَفَرُوا امْرَأَتَ نُوحٍ وَامْرَأَتَ لُوطٍ كَانَتَا تَحْتَ عَبْدَيْنِ مِنْ عِبَادِنَا صَالِحِيْنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمْ يُغْنِيَا عَنْهُمَا مِنَ اللهِ شَيْئًا وَقِيلَ ادْخُلَا النَّارَ مَعَ الدَّاخِلِينَ ﴾
“আল্লাহ তাআলা কাফেরদের জন্য নূহপত্নী ও লূতপত্নীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। তারা ছিল আমার দুই ধর্মপরায়ণ বান্দার গৃহে। অতঃপর তারা তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহ তাআলার কবল থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হলো, জাহান্নামিদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও।"⁷⁸
সুলাইমান ইবনে কাত্তাহ রহ. বলেন, আমি ইবনে আব্বাস রাযি.-কে فَخَانَتَاهُمَا এর ব্যাখ্যায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তারা যিনা করেনি। নূহ আ. এর স্ত্রীর খেয়ানত ছিল, সে মানুষের কাছে বলে বেড়াতো যে, নূহ আ. পাগল হয়ে গেছে। আর লূত আ. এর স্ত্রীর খেয়ানত ছিল, তাঁর মেহমানদের কথা তাঁর গোত্রের লোকদের বলে দিত।
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
وَقَالَ الْعَوْفِيُّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: كانت خيانتهما أنهما كانتا على غير دينهما، فَكَانَتِ امْرَأَةُ نُوحٍ تَطَّلِعُ عَلَى سِرِّ نُوحٍ فَإِذَا آمَنَ مَعَ نُوحٍ أَحَدُ أَخْبَرَتِ الْجَبَابِرَةَ مَنْ قَوْمِ نُوحٍ بِهِ، وَأَمَّا امْرَأَةُ لُوطٍ فَكَانَتْ إِذَا أَضَافَ لُوطُ أَحَدًا أَخْبَرَتْ بِهِ أهل المدينة ممن يعمل السوء.
"আওফী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করে বলেন, তাদের খেয়ানতটা ছিল, তারা এদের (নূহ ও লূত আ. এর) ধর্মের অনুসারী ছিল না। নূহ আ. এর স্ত্রী নূহ আ. এর গোপন বিষয়গুলো জানতেন আর যখন কোনো লোক নূহ আ. এর প্রতি ঈমান আনত, তখন সে কওমের প্রভাবশালী লোকদেরকে বিষয়টা জানিয়ে দিত। আর লূত আ. এর স্ত্রীর বিষয়টা ছিল, যখন লূত আ. এর নিকট কোনো মেহমান আসত, তখন সে শহরের ঐ সকল লোককে বিষয়টা জানিয়ে দিত, যারা খারাপ কাজ করত।"⁷⁹
টিকাঃ
৭২. সহীহ মুসলিম: ২/১০৬০, হা. নং ১৪৩৭ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়ি্য, বৈরূত)
৭৩. সূরা নিসা: ২১
৭৪. মুসনাদে আহমাদ: ৪৫/৫৬৪-৫৬৫, হা. নং ২৭৫৮৩ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৭৫. সুনানে আবু দাউদ: ২/২৫২, হা. নং ২১৭৪ (প্র. আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
৭৬. সূরা নিসা: ৩৫
৭৭. মুসনাদে আহমাদ: ৫/৫৫, হা. নং ২৮৬৫ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৭৮. সূরা তাহরীম: ১০
৭৯. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/১৯২ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)