📄 পরিবারের সদস্যদের অবস্থা ও প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা
যেমন, আপনার সন্তানের বন্ধুবান্ধব কারা? আপনার অগোচরে আপনার সন্তান কোথায় যায় এবং কী করে? আপনার সন্তান বাহির থেকে ঘরে কী নিয়ে আসে? আপনার মেয়ে কোথায় যায়? কার সাথে যায়?
অনেক পিতা আছে, যারা জানেই না যে, তার সন্তানের চরিত্র অনেক খারাপ হয়ে গেছে। সে গোপনে অশ্লীল ছবি ও ফিল্ম দেখে, ধূমপান করে; এমনকি অনেক পিতা এটা খবরও রাখে না যে, তার কন্যা কাজের মেয়েটির সাথে মার্কেটে যায় এবং কাজের মেয়েকে ড্রাইভারের সাথে অথবা কোথাও দাঁড়িয়ে করিয়ে রেখে সে কোনো এক শয়তানের সাথে ডেটিং করে। আবার কোনো কোনো মেয়ে তার খারাপ বান্ধবীর সাথে গিয়ে সিগারেট খায় বা নেশা করে। এ সকল লোক তাদের সন্তানদের খোঁজখবর রাখার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন। তারা একবারও সেই ভয়াবহ দিনের কথা চিন্তা করে না, যেদিন থেকে পলায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। যেদিন প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ الْحَسَنِ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الله سائل كل راع عما استرعاه: أحفظ أَمْ ضَيَّعَ، حَتَّى يَسْأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ.
হাসান রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক দায়িত্বশীলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। সে কি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে, না তাতে অবহেলা করেছে? এমনকি মানুষকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"⁶⁵
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়:
* গোপনে আপনি আপনার সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করুন।
* সন্তানের মধ্যে কখনো ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করবেন না।
* আপনার সন্তান যেন আস্থাহীন না হয়ে পড়ে।
* সন্তানকে নসীহত অথবা শাস্তিপ্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই তার বয়স, বুদ্ধি ও ভুলের পরিমাণের দিকে লক্ষ রাখুন।
সাবধান, কখনোই নেতিবাচকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ করবেন না। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসাব নিতে যাবেন না।
আমাকে এক লোক বলেছে, কোনো এক পিতা তার সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য ক্যামেরা ও কম্পিউটার ফিট করেছে, যাতে তার ছেলের ভুলত্রুটিগুলোর তালিকা সংরক্ষণ থাকে। অতঃপর সন্তান যখনই কোনো ভুল করে, তখন সকল তথ্য-প্রমাণসহকারে সন্তানকে একটি নির্ধারিত কামরায় নিয়ে যায় এবং বর্তমান অপরাধসহ পূর্বের সকল অপরাধ তার সামনে তুলে ধরে।
আমি বলব, আমরা কোনো কোম্পানির ঠিকাদার নই। আর পিতাকেও সেখানের সন্তানের সকল দোষ-ত্রুটি লিখে রাখার দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। অবশ্যই এই পিতার ইসলামি তরীকায় সন্তান লালন-পালনের মূলনীতির বই পড়া উচিত।
এর বিপরীতে আমি এটাও জানি যে, অনেক মানুষ আছে, যারা তার সন্তানের কোনো বিষয়ের খোঁজ-খবর নেয় না; বরং ছেলেমেয়েদেরকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়। তারা যা ইচ্ছে তাই করুক না কেন, তার কোনো খবর নেয় না। তাদের অজুহাত হলো, তাদের সন্তানেরা ভুলকে ভুল এবং অপরাধকে অপরাধ বলে কখনো বিশ্বাস করবে না; যতক্ষণ না তারা কোনো একটি অপরাধ ঘটিয়ে বসে। আর এরপরই তাদের নিজেদের ভুলের ব্যাপারে উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। এটা একটি বিকৃত চিন্তা, যা পশ্চিমা দর্শনের দুধপানের দরুন সৃষ্ট এবং অবাধ স্বাধীনতার নিকৃষ্ট ফসল। কত নিকৃষ্ট এমন চিন্তা লালনকারী ও ধারণকারী!
অনেক মানুষ আছে, যারা নিয়ন্ত্রণ ছেলের হাতে ছেড়ে দেয় এই ভয়ে যে, সে তার ধারণানুপাতে তাকে অপছন্দ করবে। সে বলে, সে যাই করুক না কেন, আমি তাকে ভালোবাসব। আর কেউ কেউ স্বীয় সন্তানকে মুক্ত করে দেয় এজন্য যে, পূর্বে তার পিতা (অর্থাৎ সন্তানের দাদা) তার সাথে অতিরিক্ত কঠোরতা আরোপ করেছিল; যার ফলে সে ভাবছে যে, স্বীয় সন্তানের সাথে ঠিক তার বিপরীত আচরণ করবে। আর কেউ তো এত নিচে নেমে যায় যে, এভাবে বলে, ছেলে-মেয়েকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও। ওরা ওদের যৌবনকে ইচ্ছেমতো ভোগ করুক।
এ সকল পিতারা কি কখনো ভেবে দেখেছে যে, কিয়ামতের দিন তাদের সন্তানেরাই তাদের কলার চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করবে, হে আমার পিতা, আপনি কেন আমাকে গুনাহর কাজে ছেড়ে দিয়েছিলেন?
টিকাঃ
৬৫. সহীহ ইবনে হিব্বان: ১০/৩৪৫, হা. নং ৪৪৯৩ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
📄 ঘরে শিশুদের যত্ন নেওয়া
শিশুদের প্রতি যত্ন নেওয়ার অনেকগুলো দিক রয়েছে।
কুরআনুল কারীম ও ইসলামি ঘটনাগুলো মুখস্ত করানো। পিতা-মাতার জন্য সন্তানকে কুরআনুল কারীম পড়ানোর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। কুরআন মুখস্ত করার প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করবে। বাচ্চা বয়সেই সে প্রতি জুমাবার মা-বাবার কাছ থেকে শুনে শুনে সূরা কাহফ মুখস্ত করবে। এ ছাড়াও ফযীলতপূর্ণ ছোট ছোট সূরাগুলো বাবা-মার কাছ থেকে শুনে শুনে ছোট বয়সেই মুখস্ত করবে। বাচ্চাদেরকে ইসলামি আকীদার মূলনীতিগুলো শিক্ষা দেবে। যেমন মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ حَدَّثَهُ: أَنَّهُ رَكِبَ خَلْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " يَا غُلامُ، إِنِّي مُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ: احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظُكَ..
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে আরোহণ করেছিলেন। তখন তিনি বললেন, “হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখাচ্ছি। তুমি আল্লাহ তাআলার হক রক্ষা কর, তাহলে আল্লাহ তাআলাও তোমাকে রক্ষা করবেন।"⁶⁶
তাকে আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে, যেমন বড়দের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে। দুআ ও অযীফাগুলো মুখস্ত করাবে এবং সেগুলোর ওপর আমলে অভ্যস্ত করে তুলবে। যেমন খানা খাওয়ার দুআ, ঘুমের দুআ, হাঁচির দুআ, সালাম ও অনুমতি নেওয়া শিখাবে।
বাচ্চাদের মনে ইসলামি ঘটনাগুলো অনেক প্রভাব ফেলে।
এ সকল ঘটনা তাদের শুনানো যেতে পারে। যেমন নূহ আ. ও তাঁর প্লাবনের ঘটনা। ইবরাহীম আ. এর মূর্তি ভাঙা ও তাঁকে আগুনে নিক্ষেপের ঘটনা। মূসা আ. এর ফেরাউনের হাত থেকে নাজাতের ঘটনা এবং ফেরাউনের ডুবে যাওয়ার ঘটনা। ইউনুস আ. এর মাছের পেটে যাওয়া ও তা থেকে উদ্ধারের ঘটনা। সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনী বর্ণনা করা; যেমন তাঁর নবুওয়াতপ্রাপ্তি, হিজরত এবং কিছু কিছু যুদ্ধের ঘটনা; যেমন বদর, খন্দক ও অন্যান্য যুদ্ধের ঘটনা, তাঁর জীবনের বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয়; যেমন একলোক ও তার উটের ঘটনা, যে তার উটকে কম খাবার দিত আর বেশি পরিশ্রম করাতো। এভাবে সালাফে সালেহীনের ঘটনা; যেমন উমার রাযি. কর্তৃক তাঁবুর ভেতরে থাকা মহিলা ও তার ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য খাবার বহন করার ঘটনা, আসহাবে কাহফের যুবকদের ঘটনা। এ ছাড়াও অসংখ্য ইসলামি ঘটনা রয়েছে, যেগুলো বাচ্চাদের শুনাবে। তাদেরকে আকীদা বিধ্বংসী কোনো কল্প-কাহিনী, জিন-ভূতের ভয়ের কাহিনী শোনাবে না, যা বাচ্চাদের আকীদা-বিশ্বাস নষ্ট করে দেয় এবং তাদের মধ্যে ভয় ও ভীতি প্রবেশ করায়।
* সতর্ক থাকতে হবে, তারা যেন রাস্তার ছেলে-মেয়েদের সাথে মিশতে না পারে। তাহলে তাদের মুখের ভাষা খারাপ হবে এবং তাদের চরিত্র নষ্ট হবে; বরং তাদের সাথে খেলাধুলা করার জন্য প্রতিবেশী পাশের বাসার ভদ্র ছেলেমেয়েদের বাসার ভেতরে ডেকে আনতে হবে। তারা বাসার ভেতরে খেলাধুলা করবে।
* বাচ্চাদেরকে শিক্ষামূলক খেলনা দিতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট ঘরে তারা খেলবে এবং সেখানে বাচ্চারা তাদের খেলনা সাজিয়ে রাখবে।
শরীয়ত পরিপন্থী কোনো খেলনা তাদের কিনে দেওয়া যাবে না। যেমন বাদ্যযন্ত্র অথবা মূর্তি ও ক্রুশবিশিষ্ট খেলনা ইত্যাদি।
বালকদের শখের ভালো কিছু জিনিস সরবরাহ করে দেওয়া উত্তম। যেমন কাঠের বা ইলেকট্রিকের খেলনা এবং কম্পিউটারের কিছু বৈধ গেম। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কম্পিউটারের কিছু প্রোগ্রাম ও গেমের ব্যাপারে সতর্ক করছি, যেথায় পরিকল্পিতভাবে নারীদের ছবি অত্যন্ত অশ্লীলতার সহিত স্ক্রীনে প্রকাশ করা হয় কিংবা এমন গেম, যাতে ক্রুশ ব্যবহার করা হয়েছে। আমাকে একজন বলেছে, একটি গেম এমন আছে, যেখানে কম্পিউটারের সাথে জুয়া খেলতে হয়। গেমার স্ক্রীনে অংশবিশেষ দৃশ্যমান চারজন যুবতীর ছবি হতে একটি বেছে নেয়। খেলায় সে বিজয়ী হলে পুরস্কার হিসেবে যুবতীটির ছবি অত্যন্ত অশ্লীলভাবে ভেসে ওঠে।
শোয়ার সময় ছেলে এবং মেয়েদের বিছানা আলাদা করা। এটাই দীনদার এবং দীনের ব্যাপারে উদাসীন অন্যান্য মানুষের ঘরের সিস্টেমের মাঝে পার্থক্য।
তাদের সাথে মজা করা হাসি-ঠাট্টা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাদের সাথে রসিকতা করতেন, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তাদেরকে ডাকার সময় কোমলভাবে ডাকতেন। বাচ্চাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোট, তাকে খাবার বা ফলের প্রথম অংশটা দিতেন। কখনো কখনো কাউকে নিয়ে হাঁটতে যেতেন। নিম্নে আমরা বাচ্চাদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোমলতা ও হাসি-ঠাট্টা করা সংক্রান্ত দুটি হাদীস পেশ করছি।
আখলাকুন নাবী ওয়া আদাবুহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُدْلِعُ لِسَانَهُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيَّ، فَيَرَى الصَّبِيُّ حُمْرَةَ لِسَانِهِ فَيَبْهَشُ إِلَيْهِ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান বিন আলী রাযি. এর জন্য জিহ্বা বের করতেন। শিশুটি তাঁর জিহ্বার লাল অংশ দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসত।"⁶⁷
আল আদাবুল মুফরাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ يَعْلَى بْنِ مُرَّةَ أَنَّهُ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَدُعِينَا إِلَى طَعَامٍ فَإِذَا حُسَيْنُ يَلْعَبُ فِي الطَّرِيقِ، فَأَسْرَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَامَ الْقَوْمِ، ثُمَّ بَسَطَ يَدَيْهِ، فَجَعَلَ يَمُرُّ مَرَّةً هَا هُنَا وَمَرَّةً هَا هُنَا، يُضَاحِكُهُ حَتَّى أَخَذَهُ، فَجَعَلَ إِحْدَى يَدَيْهِ فِي ذَقْنِهِ وَالْأُخْرَى فِي رَأْسِهِ، ثُمَّ اعْتَنَقَهُ فَقَبَّلَهُ.
ইয়ালা বিন মুররা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এক খাবারের দাওয়াতে যাচ্ছিলাম। তখন পথে হুসাইন রাযি. খেলছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত সবার সামনে গিয়ে তার দিকে দুই হাত প্রসারিত করে ধরলেন। তিনি একবার হাত এদিকে ঘুরালেন এবং একবার ওদিকে। তিনি তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন। এরপর তাকে ধরলেন এবং এক হাত তার থুতনিতে ও অপর হাত মাথায় রেখে বুকে টেনে নিয়ে চুমু খেলেন।"⁶⁸
টিকাঃ
৬৬. মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪০৯-৪১০, হা. নং ২৬৬৯ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৬৭. আখলাকুন নাবী ওয়া আদাবুহু: ১/৪৯১, হা. নং ১৮৪ (প্র. দারুল মুসলিম, রিয়াদ)
৬৮. আল আদাবুল মুফরাদ: পৃ. নং ১৩৩, হা. নং ৩৬৪ (প্র. দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যা, বৈরূত)
📄 ঘুম, খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য কাজের জন্য সময় নির্দিষ্ট করা
কিছু কিছু ঘরের অবস্থা হলো আবাসিক হোটেলের মতো। পরিবারের সদস্যরা যেন একে অপরকে চেনেই না এবং তাদের পরস্পরে খুব কমই সাক্ষাৎ হয়।
অনেক ছেলে আছে, যারা যখন ইচ্ছা তখন খায় এবং যখন ইচ্ছা তখন ঘুমাতে যায়। এর কারণে রাত্রি জাগরণ ও সময় নষ্ট হয়। এই বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে অলসতা, পরিশ্রম না করা ও ব্যাপক সময় নষ্ট হয়। এটা মানুষকে বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল করে তোলে।
কেউ কেউ এই অভিযোগ করতে পারে যে, ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় ভিন্ন ভিন্ন। আর চাকরিজীবী, শ্রমিক ও এলাকার লোকদের কেউই সমান নয়।
আমি বলব, এই অবস্থা তো সকলের ক্ষেত্রে নেই। পরিবারের সকলে যদি একই সময়ে একসাথে খাবার খেতো, তাহলে কতই না মজা হতো! প্রত্যেকের অবস্থা জানা যেত। কোনো উপকারী বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। সুতরাং পরিবারের কর্তার উচিত হলো, তিনি সকলের বাড়িতে ফিরার একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেবেন এবং বাড়ির বাইরে যেতে হলে প্রত্যেকে তার কাছ থেকে অনুমতি নেবে; বিশেষ করে ছোটদের জন্য এটা আবশ্যক।
📄 মহিলাদের বাড়ির বাইরের কাজ সুবিধামতভাবে করা
ইসলামের বিধানগুলো একটি অপরটির মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। ইসলাম যখন নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দিল; যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ )
“তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে।"⁶⁹
তখন তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব অর্পণ করা হলো পুরুষদের কাঁধে; যেমন তার বাবা বা স্বামী।
এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, মহিলারা প্রয়োজন ব্যতীত বাড়ির বাইরে কাজ করবে না। যেমনিভাবে মূসা আ. একজন নেককার ব্যক্তির দুই মেয়েকে পানির কূপের পাশে দাঁড়িয়ে বকরিকে পানি পান করানোর জন্য অপেক্ষা করতে দেখলেন, তখন তাদের প্রশ্ন করলেন; কুরআনের ভাষায়-
قَالَ مَا خَطْبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخُ كَبِيرٌ )
"তিনি বললেন, তোমাদের কী ব্যাপার? তারা বলল, আমরা আমাদের জন্তুদেরকে পানি পান করাতে পারি না, যে পর্যন্ত না রাখালরা তাদের জন্তুদেরকে নিয়ে সরে যায়। আর আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ।”⁷⁰
তখন তারা পশুগুলোকে পানি পান করাতে আসার জন্য ওযর পেশ করলেন এ বলে যে, তাদের অভিভাবক বয়সের কারণে কাজ করতে সক্ষম নয়।
আর এ কারণেই যখন তারা সুযোগ পেলেন, তখন বাড়ির বাইরে কাজ না করার ইচ্ছা পোষণ করলেন। ইরশাদ হয়েছে-
قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرُهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ )
"বালিকাদ্বয়ের একজন বলল, হে শ্রদ্ধেয় পিতা, তাকে কর্মচারী নিযুক্ত করুন। কেননা, আপনার কর্মচারী হিসেবে সে-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।" ⁷¹
এই মেয়েটি তার কথার মাধ্যমে বাড়ির বাইরে না যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। যাতে বাড়ির বাইরে কাজ করার কারণে যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, সেগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
সাম্রাজ্যবাদী কুফরীশক্তির মাধ্যমে পরিচালিত পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে যখন অসংখ্য পুরুষ নিহত হলো, অতঃপর যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিল আর এর জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু যুদ্ধে পুরুষ শ্রমিক নিহত হওয়ার কারণে নারী শ্রমিকদের প্রয়োজন পড়ল, তখন তারা ইহুদিদের সাথে মিলে নারীদের ঘরের বাইরে বের করার জন্য তাদের স্বাধীনতার কথা ও তাদের অধিকারের কথা বলতে লাগল। এর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য ছিল নারীদেরকে ঘর থেকে বের করা, তাদেরকে নষ্ট করা এবং পরিবার ও সমাজব্যবস্থা ধ্বংস করা। এভাবেই কাজের নামে নারীদের বাইরে বের হওয়ার বিষয়টি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
যদিও আমাদের রক্ষণশীলতা আর তাদের রক্ষণশীলতা এক নয়, আমাদের এখানে মুসলিম পুরুষই তার অন্তঃপুরবাসিনীদের রক্ষা করবে, তাদের ভরণপোষণ দেবে, এতদসত্ত্বেও নারী স্বাধীনতার আন্দোলন বেগবান হয়েছে এবং কাজের জন্য তাদের বাইরে বের হওয়ার দাবিটা আরও জোরালো হয়েছে। এ ছাড়া তাদের পড়াশোনা ও সার্টিফিকেট যেন বৃথা না যায়, এ সকল বিভিন্ন কারণে তারাও বাইরে বের হচ্ছে।
এটা না হলে মুসলিম সমাজ কখনোই নারীদের বাইরে বের প্রয়োজন অনুভব করে না। এর প্রমাণ হলো, একদিকে অসংখ্য পুরুষ কাজহীন বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে নারীদের জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান মেনে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে। যেমন শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে।
আমরা এত বড় ভূমিকা এজন্যই টেনে আনলাম যে, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক নারী কোনো প্রয়োজন ছাড়াই চাকরির জন্য বের হচ্ছে। শুধুমাত্র বেশি বেতনের লোভে। যদিও তার চাকরির কোনো প্রয়োজন নেই এবং এই চাকরির কারণে তাকে এমন স্থানে কাজ করতে হয়, যা তার জন্য উপযোগী নয়, এতে তাকে ফেতনার সম্মুখীন হতে হয়।
আমাদের মাঝে এবং ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শীদের মাঝে পার্থক্য হলো, আমাদের নিকট নারী মৌলিকভাবে ঘরে অবস্থান করবে এবং কখনো প্রয়োজন হলে বের হবে। আর ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শীদের নিকট নারীর মূল হচ্ছে তারা বাইরে থাকবে।
নারীর কাজটা কখনো কখনো সত্যিই প্রয়োজন হয়ে যায়। কোনো কোনো পরিবারে নারীকেই উপার্জন করতে হয়। যেমন তার স্বামী মারা যাওয়ার কারণে অথবা তার পিতা অতি বৃদ্ধ ও অক্ষম হওয়ার কারণে; এরকম কিছু কিছু পরিস্থিতির কারণে। এ ছাড়াও অনেক দেশে ইসলামি মূল্যবোধ না থাকার কারণে সেখানে নারীদের বাধ্যতামূলকভাবেই কাজ করতে হয়। যেন সেও পরিবারের খরচ বহনের ক্ষেত্রে স্বামীর সহযোগী হতে পারে। সেখানে কোনো কোনো লোক তো এমনও আছে যে, বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার সময়ই এই শর্তারোপ করে যে, তাকে কাজ করতে হবে!
সারকথা হলো, মহিলারা বাইরে কাজ করবে হয়তো তার প্রয়োজনের কারণে অথবা ইসলামি টার্গেট পূরণ করার জন্যে; যেমন শিক্ষাঙ্গনে দাওয়াত ও তা'লীমের কাজের জন্য।
বাইরে কাজে গেলে মহিলারা যে সকল খারাপ সমস্যার সম্মুখীন হয়:
* শরয়ী অনেক নিষিদ্ধ বিষয়ের সম্মুখীন হতে হয়। যেমন নারী-পুরুষের একত্রে অবস্থান, নির্জন স্থানে পরপুরুষের সাথে পরিচয়, পরপুরুষকে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শন। আর সবকিছুর শেষ পরিণতি হচ্ছে অশ্লীল কাজ ও পরকিয়া।
* স্বামীকে তার প্রাপ্য হক দেওয়া হয় না, বাড়ির কাজে অবহেলা, সন্তানদের দেখাশোনায় ঘাটতি। (এই বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ)
* পুরুষ শক্তিশালী এবং আশ্রয়স্থল, এ কথার মর্ম নারীর মন থেকে মুছে যাওয়া। একবার চিন্তা করে দেখ, এক নারী সে তার স্বামীর সমপর্যায়ের শিক্ষিতা বা তার চেয়েও বেশি শিক্ষিতা এবং তার স্বামীর চেয়ে বেশি বেতনের চাকরি করে; এখন এই নারী কি কখনো তার স্বামীর প্রয়োজন ভালোভাবে অনুভব করবে? এবং সে পূর্ণভাবে তার স্বামীর আনুগত্য করবে? না, তার এই অমুখাপেক্ষিভাব তাদের বৈবাহিক জীবনে অনেক অশান্তি নিয়ে আসবে এবং এই সমস্যাটা তাদের পরিবারের ভিতসহ নাড়িয়ে দেবে? তবে আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান তার কথা ভিন্ন।
* শারীরিক অনেক কষ্ট, এক ধরনের মানসিক চাপ এবং একগুঁয়েমিভাব, যা নারীর তবিয়তের সাথে মিল হয় না।
এই দীর্ঘ আলোচনার পর বলব, অবশ্যই আমাদেরকে তাকওয়া অর্জন করতে হবে। সব সমস্যাকে শরীয়তের পাল্লায় মাপতে হবে এবং ঐ অবস্থাগুলো ভালোভাবে জানতে হবে, কখন মহিলাদের বাইরে কাজের জন্য বের হওয়া জায়েয আছে এবং কখন জায়েয নেই। আমরা যেন দুনিয়ার কিছু উপার্জনের জন্য সত্যের পথ থেকে অন্ধ না হয়ে যাই।
পুরুষদের অবশ্যই অত্যাচার ও প্রতিশোধের মানসিকতা পরিহার করতে হবে এবং কখনো অন্যায়ভাবে স্ত্রীর মাল-সম্পদ ভক্ষণ করবে না।
টিকাঃ
৬৯. সূরা আহযাব: ৩৩
৭০. সূরা কাসাস: ২৩
৭১. সূরা কাসাস: ২৬