📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 দাম্পত্য কলহের বিষয়গুলো সন্তানদের সামনে প্রকাশ না করা

📄 দাম্পত্য কলহের বিষয়গুলো সন্তানদের সামনে প্রকাশ না করা


এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যাদের মধ্যে কম-বেশি মনোমালিন্য ও ঝগড়া-বিবাদ হয় না। তবে ছোটখাটো বিষয়ে মনোমালিন্য হলে পরস্পর সংশোধন করে নেওয়াই উত্তম এবং সত্যের দিকে ফিরে যাওয়াই কল্যাণ ও ফযীলতের কাজ। কিন্তু যেই জিনিসটা পুরো পরিবারকেই উলট-পালট করে দেয় এবং পারিবারিক সম্পর্ক ও সুখ-শান্তি নষ্ট করে, সেটা হলো- পরস্পরের দ্বন্দ্বের বিষয়টা অন্যদের সামনে প্রকাশ করা। এর ফলে কখনো কখনো পরিবার কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং পারিবারিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। বিশেষভাবে এটা পরিবারের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে তারা আর সুস্থ ও সুন্দর মন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। ঐ পরিবারের অবস্থা নিয়ে একবার চিন্তা করে দেখ, যেখানে পিতা তার ছেলেকে বলে, তুমি তোমার মায়ের সাথে কথা বলবে না। আর মা তাকে বলে, তুমি তোমার বাবার সাথে কথা বলবে না। আর সন্তান থাকে ঘোর ও আত্মিক অশান্তির মধ্যে। তারা সকলেই একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে বসবাস করতে থাকে।

সুতরাং আমাদের উচিত, আমরা ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলব। কখনো পরস্পরের মধ্যে মনোমালিন্য হয়ে গেলে দ্রুত নিজেরাই সংশোধন করে নেব। আল্লাহ তাআলার কাছে এই প্রার্থনা করি যে, তিনি প্রতিটি হৃদয়ের মধ্যে মিল-মহব্বত ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 বদদ্বীন লোকদের ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া

📄 বদদ্বীন লোকদের ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া


সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ..... وَمَثَلُ جليس السُّوءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْكِيرِ، إِنْ لَمْ يُصِبْكَ مِنْ سَوَادِهِ أَصَابَكَ مِنْ دُخَانِهِ.
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “খারাপ সঙ্গীর উপমা হলো কামারের মতো। কালি ও ময়লা যদি নাও লাগে, তথাপি ধোঁয়া অবশ্যই লাগবে।"⁶²

সহীহ বুখারীতে এসেছে-
أَبُو بُرْدَةَ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا بُرْدَةَ بْنَ أَبِي مُوسَى، عَنْ أَبِيهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَثَلُ الجليس الصَّالِحِ وَالجَلِيسِ السَّوْءِ، كَمَثَلِ صَاحِبِ المِسْكِ وَكِيرِ الحدادِ ، لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ المِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ، أَوْ تَجِدُ رِيحَهُ، وَكِيرُ الحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ، أَوْ ثَوْبَكَ، أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةٌ.
আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা মেশক বিক্রেতা ও কামারের হাপরের ন্যায়। মেশক বিক্রেতা থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি মেশক ক্রয় করবে, না হয় তার ঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাপর তোমার শরীর বা কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।"⁶³

আল্লাহর শপথ করে বলছি, সে তোমার ঘরকে অশান্তি ও ফেতনা-ফাসাদের মাধ্যমে একেবারে জ্বালিয়ে দেবে। এ সকল ফেতনাবাজ, সন্দেহ সৃষ্টিকারী ও নিচু জাতের মানুষের কারণে কত মানুষের ঘর যে ভেঙেছে! কত পরিবারের মাঝে যে শত্রুতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে! কত স্বামী-স্ত্রীর সংসার যে শেষ হয়ে গেছে! এর কোনো হিসেব নেই। আল্লাহর লা'নত ঐ ব্যক্তির ওপর, যে স্ত্রীকে স্বামীর ওপর সন্দেহপ্রবণ করে তোলে এবং স্বামীকে স্ত্রীর ওপর সন্দেহপ্রবণ করে তোলে এবং বাবা ও সন্তানদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করে।

ঘরের মধ্যে জাদু-টোনা, চুরি-চামারি, তাবীজ-কবজ ইত্যাদির মূল কারণ হলো, বদদীন লোকদের ঘরে প্রবেশ করা। এ সকল খারাপ লোকদের ঘরে প্রবেশের কারণে ঘর ও পরিবারের লোকদের চরিত্র নষ্ট হয়। সুতরাং এ সকল বদদীন ও দুশ্চরিত্র মানুষদের কখনোই ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। হোক সে তোমার প্রতিবেশী অথবা বাহ্যিকভাবে তোমার কল্যাণকামী কোনো নারী-পুরুষ। কিছু মানুষ আছে, যারা সমস্যা হতে দেখেও চুপ থাকে। দরজার সামনে বদদীন, ফেতনাবাজ লোক দেখেও তাকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

ঘরে ফেতনা-ফাসাদ নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে মহিলারা। সুনানে তিরমিযীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْأَحْوَصِ قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، أَنَّهُ شَهِدَ حَجَّةَ الوَدَاعِ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَحَمِدَ اللهَ، وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَذَكَرَ، وَوَعَظَ، فَذَكَرَ فِي الحَدِيثِ قِصَّةٌ، فَقَالَ: ....
أَلَا إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا، وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا، فَأَمَّا حَقَّكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ فَلَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ، وَلَا يَأْذَنَّ فِي بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ، أَلَا وَحَقَّهُنَّ عَلَيْكُمْ أَنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ فِي كِسْوَتِهِنَّ وَطَعَامِهِنَّ.
আমর বিন আহওয়াস রাযি. বর্ণনা করেন যে, তিনি বিদায় হজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন, আলোচনা ও নসীহত করলেন। এ হাদীসের মধ্যে বর্ণনাকারী একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন..... জেনে রেখ, "তোমাদের যেমন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি অধিকার রয়েছে, তাদেরও তোমাদের প্রতি ঠিক সেরকমই অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি তোমাদের অধিকার এই যে, তোমরা যাদেরকে অপছন্দ কর, তাদেরকে তারা যেন তোমাদের বিছানা ব্যবহারের অনুমতি না দেয় এবং যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর, তাদেরকে তারা যেন তোমাদের ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়। জেনে রেখ, তোমাদের প্রতি তাদের অধিকার এই যে, তোমরা তাদের উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে। "⁶⁴

সুতরাং হে মুসলিম নারী, তোমার বাবা বা তোমার স্বামী যখন কোনো প্রতিবেশী নারীকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেবে, তখন তুমি মন খারাপ কোরো না। কারণ, তিনি ঐ মহিলার আচরণের মধ্যে ফেতনা ছড়ানোর প্রভাব দেখতে পেয়েছেন। আর কোনো মহিলা যখন তোমার স্বামী এবং তার স্বামীর মধ্যে তুলনা করে এবং তোমার মনে তোমার স্বামীর ব্যাপারে কোনো খারাপ ধারণা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করবে, তখন তুমি বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দাও। আর তুমি যখন বুঝতে পারবে যে, তোমার স্বামী এমন বন্ধুবান্ধবদের ঘরে নিয়ে আসে, যারা খারাপকে ভালো হিসেবে তার সামনে পেশ করে, তাহলে তুমি তাকে এ সকল বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেবে।

তুমি যথাসম্ভব বাড়িতে অবস্থানের চেষ্টা করবে। কারণ, ঘরে একজন অভিভাবকের উপস্থিতি সবকিছু ঠিকঠাক রাখার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে এবং পরিবারের অনেক বিষয় কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। কিছু মানুষ আছে বাড়ির বাইরে থাকাই যাদের প্রধান কাজ। তাদের যখন যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকে, তখন তারা বাড়িতে ফিরে আসে। এটা খুবই খারাপ একটি অভ্যাস। কোনো প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু কোনো প্রয়োজন ছাড়া শুধু শুধু সময় নষ্ট করা, কোনো গুনাহের কাজ করা অথবা দুনিয়া নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকার কারণে বাড়ির বাইরে যাওয়া ঠিক নয়। অবশ্যই এই অবস্থা থেকে ফিরে আসা এবং তাওবা করা উচিত। বাইরের ব্যস্ততা কমিয়ে ঘরে সময় দিতে হবে এবং অযথা বাইরে আড্ডা দেওয়া বাদ দিতে হবে। ঐ সকল লোক কতই না খারাপ, যারা পরিবারকে সময় না দিয়ে বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে গিয়ে রাত কাটায়!

আমরা কিছুতেই শত্রুদের পরিকল্পনার ফাঁদে পা দিতে চাই না। ১৯২৩ সালে ফ্রান্সের প্রধান ধর্মপ্রচারক মাসূনী এক প্রবন্ধে বলেছিল, 'ব্যক্তির মাঝে এবং তার পারিবারের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে চাইলে তোমাদেরকে অবশ্যই চরিত্রকে তার মূলভিত্তি থেকে সরিয়ে আনতে হবে। কারণ, মন সর্বদা পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে হারাম কাজের দিকে ধাবিত হতে চায়। পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার চাইতে ক্যাফেতে গিয়ে গল্পগুজব ও আড্ডা দেওয়াকে পছন্দ করে।'

টিকাঃ
৬২. সুনানে আবু দাউদ: ৪/২৫৯, হা. নং ৪৮২৯ (প্র. আল মাকতাবাতুল আসরিয়‍্যা, বৈরূত)
৬৩. সহীহ বুখারী: ৩/৬৩, হা. নং ২১০১ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৬৪. সুনানে তিরমিযী: ২/৪৫৮, হা. নং ১১৬৩ (প্র. দারুল গারবিল ইসলামী, বৈরূত)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 পরিবারের সদস্যদের অবস্থা ও প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা

📄 পরিবারের সদস্যদের অবস্থা ও প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা


যেমন, আপনার সন্তানের বন্ধুবান্ধব কারা? আপনার অগোচরে আপনার সন্তান কোথায় যায় এবং কী করে? আপনার সন্তান বাহির থেকে ঘরে কী নিয়ে আসে? আপনার মেয়ে কোথায় যায়? কার সাথে যায়?

অনেক পিতা আছে, যারা জানেই না যে, তার সন্তানের চরিত্র অনেক খারাপ হয়ে গেছে। সে গোপনে অশ্লীল ছবি ও ফিল্ম দেখে, ধূমপান করে; এমনকি অনেক পিতা এটা খবরও রাখে না যে, তার কন্যা কাজের মেয়েটির সাথে মার্কেটে যায় এবং কাজের মেয়েকে ড্রাইভারের সাথে অথবা কোথাও দাঁড়িয়ে করিয়ে রেখে সে কোনো এক শয়তানের সাথে ডেটিং করে। আবার কোনো কোনো মেয়ে তার খারাপ বান্ধবীর সাথে গিয়ে সিগারেট খায় বা নেশা করে। এ সকল লোক তাদের সন্তানদের খোঁজখবর রাখার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন। তারা একবারও সেই ভয়াবহ দিনের কথা চিন্তা করে না, যেদিন থেকে পলায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। যেদিন প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ الْحَسَنِ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الله سائل كل راع عما استرعاه: أحفظ أَمْ ضَيَّعَ، حَتَّى يَسْأَلَ الرَّجُلَ عَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ.
হাসান রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক দায়িত্বশীলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। সে কি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছে, না তাতে অবহেলা করেছে? এমনকি মানুষকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"⁶⁵

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়:
* গোপনে আপনি আপনার সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করুন।
* সন্তানের মধ্যে কখনো ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করবেন না।
* আপনার সন্তান যেন আস্থাহীন না হয়ে পড়ে।
* সন্তানকে নসীহত অথবা শাস্তিপ্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই তার বয়স, বুদ্ধি ও ভুলের পরিমাণের দিকে লক্ষ রাখুন।

সাবধান, কখনোই নেতিবাচকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ করবেন না। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসাব নিতে যাবেন না।

আমাকে এক লোক বলেছে, কোনো এক পিতা তার সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য ক্যামেরা ও কম্পিউটার ফিট করেছে, যাতে তার ছেলের ভুলত্রুটিগুলোর তালিকা সংরক্ষণ থাকে। অতঃপর সন্তান যখনই কোনো ভুল করে, তখন সকল তথ্য-প্রমাণসহকারে সন্তানকে একটি নির্ধারিত কামরায় নিয়ে যায় এবং বর্তমান অপরাধসহ পূর্বের সকল অপরাধ তার সামনে তুলে ধরে।

আমি বলব, আমরা কোনো কোম্পানির ঠিকাদার নই। আর পিতাকেও সেখানের সন্তানের সকল দোষ-ত্রুটি লিখে রাখার দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। অবশ্যই এই পিতার ইসলামি তরীকায় সন্তান লালন-পালনের মূলনীতির বই পড়া উচিত।
এর বিপরীতে আমি এটাও জানি যে, অনেক মানুষ আছে, যারা তার সন্তানের কোনো বিষয়ের খোঁজ-খবর নেয় না; বরং ছেলেমেয়েদেরকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়। তারা যা ইচ্ছে তাই করুক না কেন, তার কোনো খবর নেয় না। তাদের অজুহাত হলো, তাদের সন্তানেরা ভুলকে ভুল এবং অপরাধকে অপরাধ বলে কখনো বিশ্বাস করবে না; যতক্ষণ না তারা কোনো একটি অপরাধ ঘটিয়ে বসে। আর এরপরই তাদের নিজেদের ভুলের ব্যাপারে উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। এটা একটি বিকৃত চিন্তা, যা পশ্চিমা দর্শনের দুধপানের দরুন সৃষ্ট এবং অবাধ স্বাধীনতার নিকৃষ্ট ফসল। কত নিকৃষ্ট এমন চিন্তা লালনকারী ও ধারণকারী!

অনেক মানুষ আছে, যারা নিয়ন্ত্রণ ছেলের হাতে ছেড়ে দেয় এই ভয়ে যে, সে তার ধারণানুপাতে তাকে অপছন্দ করবে। সে বলে, সে যাই করুক না কেন, আমি তাকে ভালোবাসব। আর কেউ কেউ স্বীয় সন্তানকে মুক্ত করে দেয় এজন্য যে, পূর্বে তার পিতা (অর্থাৎ সন্তানের দাদা) তার সাথে অতিরিক্ত কঠোরতা আরোপ করেছিল; যার ফলে সে ভাবছে যে, স্বীয় সন্তানের সাথে ঠিক তার বিপরীত আচরণ করবে। আর কেউ তো এত নিচে নেমে যায় যে, এভাবে বলে, ছেলে-মেয়েকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দাও। ওরা ওদের যৌবনকে ইচ্ছেমতো ভোগ করুক।

এ সকল পিতারা কি কখনো ভেবে দেখেছে যে, কিয়ামতের দিন তাদের সন্তানেরাই তাদের কলার চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করবে, হে আমার পিতা, আপনি কেন আমাকে গুনাহর কাজে ছেড়ে দিয়েছিলেন?

টিকাঃ
৬৫. সহীহ ইবনে হিব্বان: ১০/৩৪৫, হা. নং ৪৪৯৩ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 ঘরে শিশুদের যত্ন নেওয়া

📄 ঘরে শিশুদের যত্ন নেওয়া


শিশুদের প্রতি যত্ন নেওয়ার অনেকগুলো দিক রয়েছে।

কুরআনুল কারীম ও ইসলামি ঘটনাগুলো মুখস্ত করানো। পিতা-মাতার জন্য সন্তানকে কুরআনুল কারীম পড়ানোর চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। কুরআন মুখস্ত করার প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করবে। বাচ্চা বয়সেই সে প্রতি জুমাবার মা-বাবার কাছ থেকে শুনে শুনে সূরা কাহফ মুখস্ত করবে। এ ছাড়াও ফযীলতপূর্ণ ছোট ছোট সূরাগুলো বাবা-মার কাছ থেকে শুনে শুনে ছোট বয়সেই মুখস্ত করবে। বাচ্চাদেরকে ইসলামি আকীদার মূলনীতিগুলো শিক্ষা দেবে। যেমন মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ حَدَّثَهُ: أَنَّهُ رَكِبَ خَلْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " يَا غُلامُ، إِنِّي مُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ: احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظُكَ..
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে আরোহণ করেছিলেন। তখন তিনি বললেন, “হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখাচ্ছি। তুমি আল্লাহ তাআলার হক রক্ষা কর, তাহলে আল্লাহ তাআলাও তোমাকে রক্ষা করবেন।"⁶⁶
তাকে আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে, যেমন বড়দের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে। দুআ ও অযীফাগুলো মুখস্ত করাবে এবং সেগুলোর ওপর আমলে অভ্যস্ত করে তুলবে। যেমন খানা খাওয়ার দুআ, ঘুমের দুআ, হাঁচির দুআ, সালাম ও অনুমতি নেওয়া শিখাবে।

বাচ্চাদের মনে ইসলামি ঘটনাগুলো অনেক প্রভাব ফেলে।

এ সকল ঘটনা তাদের শুনানো যেতে পারে। যেমন নূহ আ. ও তাঁর প্লাবনের ঘটনা। ইবরাহীম আ. এর মূর্তি ভাঙা ও তাঁকে আগুনে নিক্ষেপের ঘটনা। মূসা আ. এর ফেরাউনের হাত থেকে নাজাতের ঘটনা এবং ফেরাউনের ডুবে যাওয়ার ঘটনা। ইউনুস আ. এর মাছের পেটে যাওয়া ও তা থেকে উদ্ধারের ঘটনা। সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনী বর্ণনা করা; যেমন তাঁর নবুওয়াতপ্রাপ্তি, হিজরত এবং কিছু কিছু যুদ্ধের ঘটনা; যেমন বদর, খন্দক ও অন্যান্য যুদ্ধের ঘটনা, তাঁর জীবনের বিভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয়; যেমন একলোক ও তার উটের ঘটনা, যে তার উটকে কম খাবার দিত আর বেশি পরিশ্রম করাতো। এভাবে সালাফে সালেহীনের ঘটনা; যেমন উমার রাযি. কর্তৃক তাঁবুর ভেতরে থাকা মহিলা ও তার ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য খাবার বহন করার ঘটনা, আসহাবে কাহফের যুবকদের ঘটনা। এ ছাড়াও অসংখ্য ইসলামি ঘটনা রয়েছে, যেগুলো বাচ্চাদের শুনাবে। তাদেরকে আকীদা বিধ্বংসী কোনো কল্প-কাহিনী, জিন-ভূতের ভয়ের কাহিনী শোনাবে না, যা বাচ্চাদের আকীদা-বিশ্বাস নষ্ট করে দেয় এবং তাদের মধ্যে ভয় ও ভীতি প্রবেশ করায়।

* সতর্ক থাকতে হবে, তারা যেন রাস্তার ছেলে-মেয়েদের সাথে মিশতে না পারে। তাহলে তাদের মুখের ভাষা খারাপ হবে এবং তাদের চরিত্র নষ্ট হবে; বরং তাদের সাথে খেলাধুলা করার জন্য প্রতিবেশী পাশের বাসার ভদ্র ছেলেমেয়েদের বাসার ভেতরে ডেকে আনতে হবে। তারা বাসার ভেতরে খেলাধুলা করবে।
* বাচ্চাদেরকে শিক্ষামূলক খেলনা দিতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট ঘরে তারা খেলবে এবং সেখানে বাচ্চারা তাদের খেলনা সাজিয়ে রাখবে।
শরীয়ত পরিপন্থী কোনো খেলনা তাদের কিনে দেওয়া যাবে না। যেমন বাদ্যযন্ত্র অথবা মূর্তি ও ক্রুশবিশিষ্ট খেলনা ইত্যাদি।

বালকদের শখের ভালো কিছু জিনিস সরবরাহ করে দেওয়া উত্তম। যেমন কাঠের বা ইলেকট্রিকের খেলনা এবং কম্পিউটারের কিছু বৈধ গেম। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কম্পিউটারের কিছু প্রোগ্রাম ও গেমের ব্যাপারে সতর্ক করছি, যেথায় পরিকল্পিতভাবে নারীদের ছবি অত্যন্ত অশ্লীলতার সহিত স্ক্রীনে প্রকাশ করা হয় কিংবা এমন গেম, যাতে ক্রুশ ব্যবহার করা হয়েছে। আমাকে একজন বলেছে, একটি গেম এমন আছে, যেখানে কম্পিউটারের সাথে জুয়া খেলতে হয়। গেমার স্ক্রীনে অংশবিশেষ দৃশ্যমান চারজন যুবতীর ছবি হতে একটি বেছে নেয়। খেলায় সে বিজয়ী হলে পুরস্কার হিসেবে যুবতীটির ছবি অত্যন্ত অশ্লীলভাবে ভেসে ওঠে।

শোয়ার সময় ছেলে এবং মেয়েদের বিছানা আলাদা করা। এটাই দীনদার এবং দীনের ব্যাপারে উদাসীন অন্যান্য মানুষের ঘরের সিস্টেমের মাঝে পার্থক্য।

তাদের সাথে মজা করা হাসি-ঠাট্টা করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাদের সাথে রসিকতা করতেন, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তাদেরকে ডাকার সময় কোমলভাবে ডাকতেন। বাচ্চাদের মধ্যে যে সবচেয়ে ছোট, তাকে খাবার বা ফলের প্রথম অংশটা দিতেন। কখনো কখনো কাউকে নিয়ে হাঁটতে যেতেন। নিম্নে আমরা বাচ্চাদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোমলতা ও হাসি-ঠাট্টা করা সংক্রান্ত দুটি হাদীস পেশ করছি।

আখলাকুন নাবী ওয়া আদাবুহু গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيُدْلِعُ لِسَانَهُ لِلْحَسَنِ بْنِ عَلِيَّ، فَيَرَى الصَّبِيُّ حُمْرَةَ لِسَانِهِ فَيَبْهَشُ إِلَيْهِ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান বিন আলী রাযি. এর জন্য জিহ্বা বের করতেন। শিশুটি তাঁর জিহ্বার লাল অংশ দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে তাঁর কাছে ছুটে আসত।"⁶⁷

আল আদাবুল মুফরাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ يَعْلَى بْنِ مُرَّةَ أَنَّهُ قَالَ: خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَدُعِينَا إِلَى طَعَامٍ فَإِذَا حُسَيْنُ يَلْعَبُ فِي الطَّرِيقِ، فَأَسْرَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَامَ الْقَوْمِ، ثُمَّ بَسَطَ يَدَيْهِ، فَجَعَلَ يَمُرُّ مَرَّةً هَا هُنَا وَمَرَّةً هَا هُنَا، يُضَاحِكُهُ حَتَّى أَخَذَهُ، فَجَعَلَ إِحْدَى يَدَيْهِ فِي ذَقْنِهِ وَالْأُخْرَى فِي رَأْسِهِ، ثُمَّ اعْتَنَقَهُ فَقَبَّلَهُ.
ইয়ালা বিন মুররা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে এক খাবারের দাওয়াতে যাচ্ছিলাম। তখন পথে হুসাইন রাযি. খেলছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্রুত সবার সামনে গিয়ে তার দিকে দুই হাত প্রসারিত করে ধরলেন। তিনি একবার হাত এদিকে ঘুরালেন এবং একবার ওদিকে। তিনি তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন। এরপর তাকে ধরলেন এবং এক হাত তার থুতনিতে ও অপর হাত মাথায় রেখে বুকে টেনে নিয়ে চুমু খেলেন।"⁶⁸

টিকাঃ
৬৬. মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪০৯-৪১০, হা. নং ২৬৬৯ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৬৭. আখলাকুন নাবী ওয়া আদাবুহু: ১/৪৯১, হা. নং ১৮৪ (প্র. দারুল মুসলিম, রিয়াদ)
৬৮. আল আদাবুল মুফরাদ: পৃ. নং ১৩৩, হা. নং ৩৬৪ (প্র. দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যা, বৈরূত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00