📄 ঘরে অডিও লাইব্রেরি তৈরি করা
বাড়িতে টেপরেকর্ডারের মাধ্যমে ভালো কাজও করা সম্ভব আবার খারাপ কাজও করা সম্ভব। সুতরাং আমরা কীভাবে তার ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি?
এই বিষয়টা বাস্তবায়ন করার মাধ্যম হলো, ঘরে একটি অডিও লাইব্রেরি তৈরি করা। যাতে ভালো ভালো ইসলামি বিষয়; যেমন উলামায়ে কেরামের ওয়ায-নসীহত, আলোচকদের বয়ান-বক্তৃতা, কারীদের কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির ক্যাসেট সংগ্রহ করবে।
বিভিন্ন কারীদের তিলাওয়াত বিশেষভাবে কারও কারও তারাবীহ'র চমৎকার তিলাওয়াত শুনলে দিল ঠাণ্ডা হয়ে যায়, হৃদয় পুলকিত হয় এবং আল্লাহর স্মরণে মন প্লাবিত হয়। আর এ সকল তিলাওয়াত পরিবারে অনেক প্রভাব ফেলে। তিলাওয়াত শোনার সময় অর্থের দিকে লক্ষ করলে মন প্রভাবিত হয়। শুধু তিলাওয়াত শোনার মধ্যেও অনেক ফায়দা রয়েছে। বারবার শোনার মাধ্যমে কুরআন মুখস্তও হয়ে যাবে এবং কুরআন তিলাওয়াত শুনতে শুনতে একসময় গান-বাজনা ও হারাম জিনিস শোনার প্রতি মন আর আগ্রহ দেখাবে না। কারণ, কুরআন হলো নূর। আর এই নূর যখন অন্তরে প্রবেশ করবে, তখন সে আর শয়তানের বাঁশিকে গ্রহণ করবে না।
ঘরে পরিবারে চলতে গেলে দৈনিক বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য মাসআলা-মাসায়েলের প্রয়োজন হয়। সুতরাং সেগুলো জানার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়ার রেকর্ড শুনবে।
ফতোয়া গ্রহণের ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবশ্যই লক্ষ করতে হবে যে, সে কোথা থেকে তা গ্রহণ করছে? কারণ, এটা হলো দীন। সুতরাং তোমরা কার কাছ থেকে দীন গ্রহণ করছ, তার প্রতি লক্ষ কর। তোমার দীন গ্রহণটা যেন হয় মুত্তাকি পরহেযগার হক্কানি আলেম থেকে, যিনি সহীহ হাদীস ও কুরআনের ওপর নির্ভর করে কথা বলেন। যার মধ্যে মাযহাবি গোঁড়ামি নেই; বরং তিনি মধ্যমপন্থী মাযহাব গ্রহণ করেন। কোনো ধরনের কঠোরতাও করেন না আবার একেবারে ছাড়ও দেন না। যিনি দলীলভিত্তিক কথা বলেন।
আর এমন লেকচারারদের লেকচার শুনবে, যারা উম্মাহর চেতনাকে জাগ্রত করার কাজ করেন, দলীলভিত্তিক কথা বলেন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করেন এবং মুসলিম পরিবারে আদর্শ ব্যক্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাজারে ক্যাসেট অনেক এবং লেকচারারও অনেক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুসলমানকে কিছু নিদর্শন জানতে হবে, যার মাধ্যমে সে সহীহ লেকচারারকে চিনতে পারবে। তার ক্যাসেট শুনতে আগ্রহী হবে এবং তা শুনে প্রশান্তি লাভ করবে। নিদর্শনগুলো হলো-
* লেকচারারকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'র অনুসারী হতে হবে। বিদআতমুক্ত সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে। বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়িমুক্ত মধ্যমপন্থী হতে হবে।
* যিনি দুর্বল হাদীস বর্ণনা করেন না; বরং সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে কথা বলেন।
* যিনি মানুষের অবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। উম্মাহর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। সঠিক রোগ নির্ণয় করে সঠিক ঔষধটি প্রয়োগ করেন এবং মানুষের প্রয়োজনকে মানুষের সামনে তুলে ধরেন।
* যিনি সর্বদা হক কথা বলেন। মানুষের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর প্রাধান্য দেন না। হক কথা বলতে কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারের পরোয়া করেন না।
ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সুন্দর সুন্দর তিলাওয়াত, ইসলামি সঙ্গীত, সকাল-সন্ধ্যার আযকার এবং ইসলামি শিষ্টাচার নিয়ে তৈরি অনেক ক্যাসেট আছে, যা অন্তরে অনেক প্রভাব ফেলে।
ক্যাসেটগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখবে, যাতে করে খুব সহজেই খুঁজে বের করা যায়। ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে তা নষ্ট না হয়। এবং তা বাচ্চা শিশুদের থেকে দূরে রাখতে হবে, যাতে তারা তার নাগাল না পায়। আমরা ক্যাসেটগুলো শুনে অন্যকেও শোনার জন্য হাদিয়া দেবো।
রান্নাঘরে, শোয়ার ঘরে এবং মেহমানখানায় একটি করে টেপরেকর্ডার রাখা যেতে পারে, যাতে করে রান্নার সময় মহিলারা শুনতে পারে, ঘুমের আগে শুনে শুনে ঘুমাতে পারে, যাতে একটি মুহূর্তও নষ্ট না হয়; বরং প্রতিটি মুহূর্ত থেকেই উপকৃত হওয়া যায়।
📄 মাঝে মাঝে নেককার আলেম ও তালিবুল ইলমদের দাওয়াত করে বাড়িতে নিয়ে আসা
আল্লাহ তাআলা বলেন-
رَّبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلَا تَزِدِ الظَّالِمِينَ إِلَّا تَبَارًا ﴾
“হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মুমিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে- তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে ক্ষমা করুন। আর জালিমদের ধ্বংস কেবল বৃদ্ধিই করুন।"⁴⁴
ঘরে ঈমানদারদের প্রবেশের মাধ্যমে ঘরের নূর বৃদ্ধি পায়। তাদের কথা শোনা এবং তাদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার মাধ্যমে অনেক ফায়দা হয়। যেমন সুগন্ধি বিক্রেতা তোমাকে একটু সুগন্ধি দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে কিছু সুগন্ধি কিনে নেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে উত্তম ঘ্রাণ নিতে পারবে। সন্তানাদি, ভাই ও বাপ-দাদাদের এবং পর্দার ভেতরে মহিলাদের একত্র করে বয়ান শুনালে সকলেরই অনেক ফায়দা হবে। এ ছাড়া যখন তুমি ঘরে ভালো ও উত্তম লোকদের প্রবেশ করাবে, তখন মন্দ ও খারাপ লোকদের প্রবেশ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
টিকাঃ
৪৪. সূরা নূহ: ২৮
📄 ঘর ও পরিবারের শরয়ী বিধি বিধানগুলো শিক্ষা করা
যেমন-
ক. ঘরে নামাজ আদায় করা।
পুরুষের জন্য ঘরে নামাজের বিধান। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ زَيْدِ بْنِ ثَابِتٍ... فَقَالَ: قَدْ عَرَفْتُ الَّذِي رَأَيْتُ مِنْ صَنِيعِكُمْ، فَصَلُّوا أَيُّهَا النَّاسُ فِي بُيُوتِكُمْ، فَإِنَّ أَفْضَلَ الصَّلَاةِ صَلَاةُ المَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلَّا المَكْتُوبَةَ.
যায়েদ বিন সাবেত রাযি. থেকে বর্ণিত.... অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "আমি তোমাদের কর্মের ব্যাপারে অবগত আছি। অতএব হে লোকসকল, তোমরা তোমাদের ঘরে নামাজ আদায় কর। কেননা, পুরুষের সর্বোত্তম নামাজ হলো, ফরয নামাজ ব্যতীত অন্যান্য নামাজ ঘরে আদায় করা।"⁴⁵
ফরয নামাজ মসজিদে আদায় করা ওয়াজিব। তবে ওযরবশত ঘরে আদায় করতে পারবে।
মহিলার নামাজের হুকুম। তার নামাজের স্থান যত নির্জন ও ঘরের গোপন কামরায় হবে তত উত্তম। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أُمَّ سَلَمَةَ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: خَيْرُ مَسَاجِدِ النِّسَاءِ قَعْرُ بُيُوتِهِنَّ.
উম্মে সালামা রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মহিলাদের সর্বোত্তম মসজিদ হলো তাদের ঘরের অভ্যন্তর। "⁴⁶
অনুমতি ব্যতীত কেউ অন্যের ঘরে নামাজের ইমামতি করবে না এবং গৃহকর্তার নির্দিষ্ট আসনে বসবে না। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ .... وَلَا يَؤُمَّنَّ الرَّجُلُ الرَّجُلَ فِي سُلْطَانِهِ، وَلَا يَقْعُدُ فِي بَيْتِهِ عَلَى تَكْرِمَتِهِ إِلَّا بِإِذْنِهِ.
আবু মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন..... "অনুমতি ব্যতীত কারও কর্তৃত্বের স্থানে যেন অন্য কেউ ইমামতি না করে এবং তার সম্মানের আসনে না বসে। "⁴⁷
অর্থাৎ অন্যের মালিকানাধীন বা কর্তৃত্বাধীন স্থানে কেউ তার চেয়ে বড় কারী হলেও অনুমতি ব্যতীত ইমামতির জন্য সামনে যাবে না। যেমন বাড়ির মালিকের সামনে তার বাড়িতে এবং মসজিদের নির্দিষ্ট ইমামের সামনে মসজিদে। অনুরূপভাবে কারও নির্দিষ্ট আসনে বা খাটে তার অনুমতি ব্যতীত বসা জায়েয নেই।
খ. অনুমতি চাওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ )
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত না আলাপ-পরিচয় কর এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখ। যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তাহলে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ কোরো না। যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও, তাহলে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা কর, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন। "⁴⁸
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا ﴾
"আর তোমরা ঘরে প্রবেশ কর দরজা দিয়ে। "⁴⁹
• খালি ঘরে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করা জায়েয আছে। যদি তাতে প্রবেশকারীর কোনো আসবাবপত্র থাকে। যেমন মেহমানের জন্য নির্ধারিত ঘর। আল্লাহ তাআলা বলেন-
لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ مَسْكُونَةٍ فِيهَا مَتَاعٌ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ ﴾
“যে গৃহে কেউ বাস করে না, যাতে তোমাদের সামগ্রী আছে এমন গৃহে প্রবেশ করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই। আর আল্লাহ জানেন তোমরা যা প্রকাশ কর এবং যা গোপন কর।"⁵⁰
বন্ধুবান্ধব ও নিকটাত্মীয় যদি কিছু মনে না করে এবং তাদের ঘরের চাবি যদি তার কাছে থাকে, তাহলে অনুমতি ব্যতীত তাদের ঘর থেকে খাওয়া-দাওয়া জায়েয আছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ﴿لَّيْسَ عَلَى الْأَعْمَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى أَنفُسِكُمْ أَن تَأْكُلُوا مِن بُيُوتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ آبَائِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أُمَّهَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ إِخْوَانِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخَوَاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَعْمَامِكُمْ أَوْ بُيُوتِ عَمَّاتِكُمْ أَوْ بُيُوتِ أَخْوَالِكُمْ أَوْ بُيُوتِ خَالَاتِكُمْ أَوْ مَا مَلَكْتُم مَّفَاتِحَهُ أَوْ صَدِيقِكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَن تَأْكُلُوا جَمِيعًا أَوْ أَشْتَاتًا فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةٌ مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ ﴾
"অন্ধের জন্য দোষ নেই, খঞ্জের জন্য দোষ নেই, রোগীর জন্য দোষ নেই এবং দোষ নেই তোমাদের নিজেদের জন্যও যে, তোমরা আহার করবে তোমাদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতাদের গৃহে অথবা তোমাদের মাতাদের গৃহে অথবা তোমাদের ভ্রাতাদের গৃহে অথবা তোমাদের ভগ্নীদের গৃহে অথবা তোমাদের পিতৃ ব্যদের গৃহে অথবা তোমাদের ফুফুদের গৃহে অথবা তোমাদের মামাদের গৃহে অথবা তোমাদের খালাদের গৃহে অথবা সেই গৃহে, যার চাবি আছে তোমাদের হাতে অথবা তোমাদের বন্ধুদের গৃহে। তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথকভাবে আহার কর, তাতে তোমাদের কোনো দোষ নেই। অতঃপর যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা উপলদ্ধি করতে পার। "⁵¹
পিতা-মাতার ঘরে সন্তানদের জন্য এবং মনিবের ঘরে খাদেম বা দাস-দাসীর জন্য নির্দিষ্ট ঘুমের সময় যেমন ইশার পর, ফজরের আগে, দুপুরে বিশ্রামের সময়; এ ছাড়াও যদি নির্দিষ্ট কোনো ঘুমের সময় থাকে, সে সময় অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ। কারণ, এতে অনাকাঙ্খিতভাবে দৃষ্টিকটু কিছুর দিকে দৃষ্টি পড়ে যেতে পারে। এসময় ছাড়া অন্যান্য সময়ে অনুমতি ব্যতীত তাদের প্রবেশ জায়েয আছে। কারণ, সেখানে তাদের বারবার প্রবেশ করতে হয়। আর প্রত্যেকবারে নতুন করে অনুমতি নেওয়া কঠিন। আর এই সময়ে যদি তাদের কোনো অনাকাঙ্খিত বিষয়ের দিকে দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে তা ক্ষমা করা হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَالَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنكُمْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ مِّن قَبْلِ صَلَاةِ الْفَجْرِ وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُم مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَمِن بَعْدِ صَلَاةِ الْعِشَاءِ ثَلَاثُ عَوْرَاتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ bَعْدَهُنَّ طَوَّافُونَ عَلَيْكُم بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴾
“হে মুমিনগণ, তোমাদের দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে। ফজরের নামাজের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখ এবং ইশার নামাজের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্য কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অন্যের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।"⁵²
অনুমতি ব্যতীত কারও ঘরের ভেতরে উঁকি দেওয়া হারাম।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنِ اطَّلَعَ فِي بَيْتِ قَوْمٍ بِغَيْرِ إِذْنِهِمْ، فَفَقَتُوا عَيْنَهُ، فَلَا دِيَةً لَهُ، وَلَا قِصَاصَ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কেউ যদি অনুমতি ব্যতীত কোনো সম্প্রদায়ের লোকদের ঘরে উঁকি দেয়, আর তারা তার চোখ উপড়ে ফেলে, তাহলে তার কোনো দিয়ত ও কিসাস নেই। "⁵³
রজয়ী তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতের সময়ে তার ঘর থেকে বের হবে না এবং তাকে বের করে দেওয়াও যাবে না। সাথে তার ভরণপোষণও বহন করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا
“হে নবী, তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে ইদ্দতের প্রতি লক্ষ রেখে তালাক দিও এবং ইদ্দত গণনা কর। তোমরা তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় কর। তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিষ্কার কোরো না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা কোনো সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে সে নিজেরই অনিষ্ট করে। সে জানে না, হয়তো আল্লাহ এই তালাকের পর নতুন কোনো উপায় করে দেবেন।"⁵⁴
অবাধ্য স্ত্রীকে ঘরের ভেতরে শয্যাত্যাগ এবং ঘরের বাইরে পরিত্যাগ করে রাখা যাবে। তাকে ঘরের ভেতরে পরিত্যাগ করার দলীল, আল্লাহ তাআলার বাণী-
وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ )
"তাদের শয্যা ত্যাগ কর।"⁵⁵
আর ঘরের বাইরে পরিত্যাগ করে রাখার দলীল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে ঘরে রেখে তাদের ঘরের বাইরে ওপরের কামরায় একাকী অবস্থান করেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: آلَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ نِسَائِهِ، وَكَانَتْ انْفَكَّتْ رِجْلُهُ، فَأَقَامَ فِي مَشْرُبَةٍ تِسْعًا وَعِشْرِينَ لَيْلَةً، ثُمَّ نَزَلَ فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ آلَيْتَ شَهْرًا، فَقَالَ: إِنَّ الشَّهْرَ يَكُونُ تِسْعًا وَعِشْرِينَ.
আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের সাথে ঈলা করলেন। এ সময় তাঁর পা মচকে গিয়েছিল। তখন তিনি ওপরের কামরায় ঊনত্রিশ রাত অবস্থান করেন। এরপর তিনি নেমে আসলে সাহাবায়ে কেরাম রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো একমাসের জন্য ঈলা করেছিলেন! তিনি বললেন, 'মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়ে থাকে'।"⁵⁶
বাড়িতে কখনো একাকী ঘুমাবে না।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْوَحْدَةِ، أَنْ يَبِيتَ الرَّجُلُ وَحْدَهُ أَوْ يُسَافِرَ وَحْدَهُ.
ইবনে উমার রাযি. থেকে বর্ণিত, "নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে একাকী বাড়িতে রাত কাটাতে এবং একাকী সফরে যেতে নিষেধ করেছেন।"⁵⁷
একাকিত্ব নিষেধ হওয়ার কারণ হলো, তার ওপর শত্রু বা চোর আক্রমণ করতে পারে এবং সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। তখন তার সাথে একজন সঙ্গী থাকলে শত্রু ও চোরের হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারবে এবং অসুস্থতার সময় তার সেবা-যত্ন করতে পারবে।
পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় রেলিংবিহীন ছাদের ওপর রাতে ঘুমাবে না।
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَلِيَّ يَعْنِي ابْنَ شَيْبَانَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ بَاتَ عَلَى ظَهْرِ بَيْتٍ لَيْسَ لَهُ حِجَارُ، فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ الذِّمَّةُ.
আলী বিন শাইবান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে রেলিংবিহীন ছাদে ঘুমায় তার থেকে নিরাপত্তা উঠে যায়।"⁵⁸
এর কারণ হলো, মানুষ ঘুমের মধ্যে পার্শ্ব পরিবর্তন করে। যখন ছাদে কোনো রেলিং অথবা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্য প্রতিবন্ধক অন্য কিছু না থাকে আর সে ছাদ থেকে পড়ে মরে যায়, তখন তার মৃত্যুর জন্য কেউই দায়ী থাকবে না। সে সময় তার নিরাপত্তা উঠে যায়। কারণ, সে আসবাব গ্রহণ করার ব্যাপারে অবহেলা করার কারণে তার মৃত্যুর জন্য সে নিজেই দায়ী।
ঘরের বিড়াল যখন কোনো পাত্রে মুখ দেবে অথবা পাত্র থেকে কিছু পান করবে, তখন পাত্র ও পাত্রে থাকা খাবার অপবিত্র হবে না।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي قَتَادَةَ، عَنْ أَبِيهِ أَنَّهُ: وُضِعَ لَهُ وَضُوءُ فَوَلَغَ فِيهِ السَّنَّوْرُ، فَأَخَذَ يَتَوَضَّأُ فَقَالُوا: يَا أَبَا قَتَادَةَ قَدْ وَلَغَ فِيهِ السِّنَّوْرُ فَقَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: السِّنَّوْرُ مِنْ أَهْلِ الْبَيْتِ، وَإِنَّهُ مِنَ الطَّوَّافِينَ، أَوِ الطَّوَّافَاتِ، عَلَيْكُمْ.
আব্দুল্লাহ বিন আবু কাতাদা রহ. তার পিতার ব্যাপারে বর্ণনা করে বলেন, "তার পিতার জন্য একবার ওযুর পানি রাখা হলে তাতে বিড়াল মুখ দেয়। অতঃপর তিনি তা দিয়ে ওযু করা শুরু করেন। লোকেরা তাকে বলল, হে আবু কাতাদা, এর মধ্যে বিড়াল মুখ দিয়েছে। তখন তিনি বললেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, বিড়াল ঘরে বসবাসকারী প্রাণীর অর্ন্তভুক্ত। সে বারবার তোমাদের নিকট যাওয়া-আসা করে'।"⁵⁹
অন্য বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ كَبْشَةَ قَالَتْ: رَأَيْتُ أَبَا قَتَادَةَ أَصْغَى الْإِنَاءَ لِلْهِرَّةِ فَشَرِبَتْ فَقَالَ: أَتَعْجَبِينَ إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخْبَرَنَا: أَنَّهَا لَيْسَتْ بِنَجَسٍ إِنَّهَا مِنَ الطَّوَّافِينَ عَلَيْكُمْ وَالطَّوَّافَاتِ.
কাবশা রহ. বলেন, “আমি আবু কাতাদা রাযি.-কে দেখলাম, তিনি বিড়ালের সামনে পাত্র ধরলে বিড়াল তা থেকে পানি পান করল। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা এটা দেখে আশ্চর্য হচ্ছ? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, 'বিড়াল নাপাক নয়। সে তোমাদের নিকট বারবার আসা-যাওয়া করতে থাকে'।"⁶⁰
টিকাঃ
৪৫. সহীহ বুখারী: ১/১৪৭, হা. নং ৭৩১ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৪৬. মুসনাদে আহমাদ: ৪৪/১৬৪, হা. নং ২৬৫৪২ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৪৭. সহীহ মুসলিম: ১/৪৬৫, হা. নং ৬৭৩ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
৪৮. সূরা নূর: ২৭-২৮
৪৯. সূরা বাকারা: ১৮৯
৫০. সূরা নূর: ২৯
৫১. সূরা নূর: ৬১
৫২. সূরা নূর: ৫৮
৫৩. মুসনাদে আহমাদ: ১৪/৫৪৫, হা. নং ৮৯৯৭, (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৫৪. সূরা তালাক: ০১
৫৫. সূরা নিসা: ৩৪
৫৬. সহীহ বুখারী: ৩/২৭, হা. নং ১৯১১ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
৫৭. মুসনাদে আহমাদ: ৯/৪৬৬, হা. নং ৫৬৫০ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৫৮. সুনানে আবু দাউদ: ৪/৩১০, হা. নং ৫০৪১ (প্র. আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত)
৫৯. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/৩১৬, হা. নং ২২৬৩৭ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৬০. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/৩১৬, হা. নং ২২৬৩৬ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)