📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 ভালো ও নেককার স্ত্রী নির্বাচন করা

📄 ভালো ও নেককার স্ত্রী নির্বাচন করা


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
“আর তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”¹⁰

প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত স্ত্রী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি ভালোভাবে খেয়াল করে সৎ ও নেককার স্ত্রী নির্বাচন করা। যেমনটি হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: تُنْكَحُ المَرْأَةُ لِأَرْبَعِ: لِمَالِهَا وَلِحِسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ، تَرِبَتْ يَدَاكَ.
আবু হুরাইরা রাযি. সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি ইরশাদ করেছেন, “চারটি বিষয় দেখে নারীকে বিবাহ করা হয়। তার সম্পদের কারণে, তার বংশ মর্যাদার কারণে, তার সৌন্দর্যের কারণে, তার দীনদারিতার কারণে। অতএব তুমি দীনদার মেয়ে বিবাহ করে সুখী ও সফল হও, অন্যথায় তুমি ধ্বংস হও।”¹¹

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: الدُّنْيَا مَتَاعُ، وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ.
“আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দুনিয়া একটি সম্পদ। আর দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ট সম্পদ হচ্ছে নেককার সতী নারী।”¹²

عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ: لَمَّا نَزَلَ فِي الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ مَا نَزَلَ قَالُوا: فَأَيَّ الْمَالِ نَتَّخِذُ؟ قَالَ عُمَرُ: أَنَا أَعْلَمُ ذَلِكَ لَكُمْ. قَالَ: فَأَوْضَعَ عَلَى بَعِيرٍ فَأَدْرَكَهُ، وَأَنَا فِي أَثَرِهِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَيَّ الْمَالِ نَتَّخِذُ؟ قَالَ: لِيَتَّخِذُ أَحَدُكُمْ قَلْبًا شَاكِرًا، وَلِسَانًا ذَاكِرًا، وَزَوْجَةً تُعِينُهُ عَلَى أَمْرِ الْآخِرَةِ.
সাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন স্বর্ণ-রৌপ্যের ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হলো, তখন সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বললেন, তাহলে আমরা কোন সম্পদ গ্রহণ করব? উমার রাযি. বললেন, আমি তোমাদের পক্ষ থেকে তা জেনে আসছি। অতঃপর তিনি উটে উঠে রওয়ানা হলেন এবং আমি তাঁর পেছনে চললাম। তিনি গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কোন সম্পদ গ্রহণ করব? তিনি বললেন, "তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার হৃদয়কে বানায় কৃতজ্ঞতা আদায়কারী, জিহ্বাকে যিকিরকারী এবং এমন স্ত্রী নির্বাচন করে, যে তাকে আখিরাতের বিষয়ে সাহায্য করবে। "¹³

অন্য বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمُعَاذِ بْنِ جَبَلِ: يَا مُعَاذُ ، قَلْبٌ شَاكِرٌ ، وَلِسَانُ ذَاكِرُ، وَزَوْجَةً صَالِحَةً تُعِينُكَ عَلَى أَمْرٍ دُنْيَاكَ، وَدِينِكَ خَيْرُ مَا اكْتَنَزَ النَّاسُ.
আবু উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআয বিন জাবাল রাযি.-কে বললেন, “হে মুআয, কৃতজ্ঞতা আদায়কারী হৃদয়, যিকিরকারী জিহ্বা এবং নেককার স্ত্রী, যে তোমাকে তোমার পার্থিব ও দীনি কাজে সাহায্য করবে- এগুলো মানুষের উপার্জিত সম্পদের মধ্য হতে সবচেয়ে উত্তম। "¹⁴

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُ بِالْبَاءَةِ، وَيَنْهَى عَنِ التَّبَتُلِ نَهْيًا شَدِيدًا، وَيَقُولُ: تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ، إِنِّي مُكَاثِرُ الْأَنْبِيَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
আনাস বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিবাহ করতে নির্দেশ দিতেন এবং সন্ন্যাসী হওয়া থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা সোহাগিনী ও অধিক সন্তান জন্মদানকারিণী নারীদের বিবাহ কর। নিশ্চয় আমি কিয়ামতের দিন অন্যান্য নবী থেকে বেশি উম্মতের অধিকারী হবো।”¹⁵

عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ سَالِمِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ عُوَيْمِ بْنِ سَاعِدَةَ الْأَنْصَارِيُّ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ، فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهَا، وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا، وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ.
উতবা বিন উআইম রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "তোমরা কুমারী নারীদের বিবাহ করবে। কেননা তারা মিষ্টভাষী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট।"¹⁶

অন্য বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ، فَإِنَّهُنَّ أَنْتَقُ أَرْحَامًا، وَأَعْذَبُ أَفْوَاهَا، وَأَقَلُ خِبًا، وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ.
জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তোমরা কুমারী নারীদের বিবাহ করবে। কেননা, তারা নির্মল জরায়ুধারী, মিষ্টভাষী, কম প্রতারণাকারী এবং অল্পতেই তুষ্ট।”¹⁷

অনুরূপভাবে নেককার সতী নারী হলো, মানুষের জীবনের তিনটি সৌভাগ্যের একটি এবং বদকার খারাপ নারী তিনটি দুর্ভাগ্যের একটি। যেমনটি সহীহ হাদীসের বর্ণনায় এসেছে-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سَعْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثُ مِنَ السَّعَادَةِ، وَثَلَاثُ مِنَ الشَّقَاوَةِ، فَمِنَ السَّعَادَةِ: الْمَرْأَةُ تَرَاهَا تُعْجِبُكَ، وَتَغِيبُ فَتَأْمَنُهَا عَلَى نَفْسِهَا، وَمَالِكَ .... وَمِنَ الشَّقَاوَةِ الْمَرْأَةُ تَرَاهَا فَتَسُوءُكَ، وَتَحْمِلُ لِسَانَهَا عَلَيْكَ، وَإِنْ غِبْتَ عَنْهَا لَمْ تَأْمَنُهَا عَلَى نَفْسِهَا، وَمَالِكَ.
সা'দ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "তিনটি জিনিস সৌভাগ্যের এবং তিনটি জিনিস দুর্ভাগ্যের। সৌভাগ্যের একটি হলো, এমন স্ত্রী, যার দর্শন তোমাকে মুগ্ধ করে আর তোমার অনুপস্থিতিতে তুমি তার ব্যাপারে এবং তোমার সম্পদের ব্যাপারে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত থাকবে....। আর দুর্ভাগ্যের একটি হলো, এমন স্ত্রী, যাকে দেখে তোমার মেজাজ খারাপ হয়, সে তোমার উপরে কথা বলে এবং তুমি তার থেকে দূরে গেলে তার ব্যাপারে এবং তোমার সম্পদের ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ কর না।”¹⁸

অনুরূপভাবে যখন কোনো ছেলে কোনো মুসলিম নারীকে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, তখন তাকে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করবে এবং নিম্নের বিষয়গুলো তার মধ্যে মিলিয়ে দেখে বিবাহ দেবে।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوَّجُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ عَرِيضُ.
আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “যখন তোমাদের নিকট এমন কোনো ছেলে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার চরিত্র ও দীনদারিতার ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তোমরা তার কাছে বিবাহ দাও। আর যদি এটি না কর, তাহলে পৃথিবীতে ফেতনা ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।”¹⁹

অবশ্যই উল্লিখিত বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করবে। এগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেবে। সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান করে নেবে এবং খুবই নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সকল তথ্য সংগ্রহ করবে। যাতে করে পরিবারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় এবং পরবর্তী সময়ে সংসার না ভাঙে।

একজন নেককার স্বামী ও নেককার স্ত্রী মিলেই গঠিত হয় একটি নেককার সুখী পরিবার। কারণ ভালো ও উত্তম মাটি থেকেই উৎপন্ন হয় ভালো ও উন্নতমানের উত্তম ফসল। আর খারাপ ও নিম্নমানের মাটি থেকে উৎপন্ন হয় নিম্ন ও অনুন্নত ফসল।

টিকাঃ
১০. সূরা নূর: ৩২
১১. সহীহ বুখারী: ৭/৭, হা. নং ৫০৯০ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)
১২. সহীহ মুসলিম: ২/১০৯০, হা. নং ১৪৬৭ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)
১৩. মুসনাদে আহমাদ: ৩৭/১১০, হা. নং ২২৪৩৭ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
১৪. শুআবুল ঈমান: ৬/২৪৭, হা. নং ৪১১৬ (প্র. মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)
১৫. মুসনাদে আহমাদ: ২০/৬৩, হা. নং ১২৬১৩ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
১৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: ১/৫৯৮, হা. নং ১৮৬১ (প্র. দারু ইহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা, বৈরূত)
১৭. আল মু'জামুল আওসাত: ৭/৩৪৪, হা. নং ৭৬৭৭ (প্র. দারুল হারামাইন, কায়রো)
১৮. মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/১৭৫, হা. নং ২৬৮৪ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
১৯. সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১/৬৩২, হা. নং ১৯৬৭ (প্র. দারু ইহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়‍্যা, বৈরূত)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 স্ত্রীকে সংশোধনের চেষ্টা করা

📄 স্ত্রীকে সংশোধনের চেষ্টা করা


স্ত্রী যদি নেককার হয়, তাহলে তো খুবই ভালো। এটা আল্লাহর অনেক বড় রহমত ও অনুগ্রহ। আর যদি সে নেককার ও পরহেজগার না হয়, তাহলে বাড়ির কর্তার কর্তব্য হলো, তাকে সংশোধনের চেষ্টা করা। আর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে কয়েকটি কারণে। যথা-
কোনো পুরুষ এমন একজন মেয়েকে বিবাহ করল, যে দীনদার নয়। কারণ সে দীনদারিতার বিষয়টি প্রাধান্য দেয়নি। হয়তো সে দীনদারিতার ক্ষেত্রে প্রাথমিক হওয়ার কারণে অথবা সে এটা ভেবে তাকে বিবাহ করেছে যে, বিবাহের পরে তাকে সংশোধন করে নেবে। অথবা তার পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের চাপে পড়ে তাকে বিবাহ করেছে। সুতরাং যে কারণেই হোক অবশ্যই তাকে সংশোধন ও ইসলাহের কাজে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পুরুষকে অবশ্যই জানতে হবে যে, হিদায়াত একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসে থাকে এবং তিনিই ইসলাহ ও সংশোধনের মালিক।

যেমন আল্লাহ তাআলা যাকারিয়া আ. এর ওপর অনুগ্রহ করেছিলেন। ইরশাদ হয়েছে-
﴿ وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ ﴾
"আর আমি তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে সংশোধন করে দিয়েছি।”²⁰

এখানে তার শারীরিক ও দীনি উভয় বিষয়ের সংশোধন ও সুস্থতা উদ্দেশ্য।
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ وَمُجَاهِدٌ وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ: كَانَتْ عَاقِرًا لَا تَلِدُ فَوَلَدَتْ. وَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيَّ عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَمْرٍو عَنْ عَطَاءٍ : كَانَ فِي لِسَانِهَا طُولُ، فَأَصْلَحَهَا اللَّهُ
ইবনে আব্বাস রাযি., মুজাহিদ রহ. ও সাঈদ বিন জুবাইর রাযি. বলেন, “তিনি ছিলেন বন্ধ্যা, সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম। অতঃপর আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা দান করেছেন আর তিনি সন্তান জন্ম দিয়েছেন।” আব্দুর রহমান বিন মাহদী রহ. তালহা বিন আমর সূত্রে আতা রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, “তার জিহ্বা লম্বা ছিল। (অর্থাৎ তিনি উঁচু আওয়াজে কথা বলতেন।) অতঃপর আল্লাহ তাআলা তার এ ত্রুটি সংশোধন করে দিয়েছেন।”²¹

স্ত্রীকে সংশোধনের অনেকগুলো মাধ্যম রয়েছে। যেমন-
প্রতিটি আমল ও ইবাদত সঠিকভাবে করানোর ব্যাপারে ভালোভাবে গুরুত্ব দেবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।

তার ঈমান বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করবে। যেমন-
১. তাকে কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদের জন্য উৎসাহিত করবে।
২. কুরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে যত্ন নেওয়ার তাগিদ দেবে।
৩. প্রতিটি কাজের মাসনূন দুআ, সকাল-সন্ধ্যা ও নামাজের পরের আযকারগুলো আদায়ের ব্যাপারে যত্ন নেওয়ার তাগিদ দেবে।
৪. তাকে সদাকা করার প্রতি উৎসাহিত করবে।
৫. বিভিন্ন উপকারী দীনি ও ইসলামি বই পড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে।
৬. ঈমান ও আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদানকারী বিভিন্ন লেকচার ও আলোচনা শুনাবে ও তা শুনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে।
৭. তাকে নেককার ও উত্তম সঙ্গী নির্বাচন করে দিতে হবে, যার সাথে সে বসবে, অবসর সময়ে উত্তম উত্তম কথা বলবে এবং একসাথে হাঁটতে বের হবে।
৮. তাকে খারাপ ও অকল্যাণকর বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখবে এবং এগুলো আসার সকল পথ বন্ধ করে দেবে। তাকে খারাপ মানুষের সাথে মিশতে দেবে না, খারাপ জায়গায় যেতে দেবে না।

টিকাঃ
২০. সূরা আম্বিয়া: ৯০
২১. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৫/৩২৫ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 ঘরে ঈমানি পরিবেশ তৈরি করা

📄 ঘরে ঈমানি পরিবেশ তৈরি করা


ঘরকে আল্লাহর যিকিরের স্থানে পরিণত করা।
عَنْ أَبِي مُوسَى، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: مَثَلُ الْبَيْتِ الَّذِي يُذْكَرُ اللهُ فِيهِ، وَالْبَيْتِ الَّذِي لَا يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ، مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ.
আবু মূসা রাযি. সূত্রে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, “যে ঘরে আল্লাহর যিকির হয় আর যে ঘরে আল্লাহর যিকির হয় না, এই দুই ঘরের উপমা হলো, জীবিত এবং মৃতের মতো।”²²

সুতরাং অবশ্যই ঘরকে আল্লাহ তাআলার যিকিরের স্থানে পরিণত করতে হবে। হতে পারে এই যিকির মনে মনে বা মুখে উচ্চারণ করে, জোরে জোরে নামাজের মাধ্যমে অথবা কুরআনে কারীম তিলাওয়াতের মাধ্যমে এবং হতে পারে ইলমি আলোচনার মাধ্যমে কিংবা বিভিন্ন ইসলামি বই তা'লীমের মাধ্যমে।

উল্লিখিত হাদীস মতে আল্লাহর যিকির না থাকার কারণে বর্তমানে কত মুসলিম ঘর যে মৃত তার কোনো হিসেব নেই! আর ঐ সকল ঘরের কী অবস্থা- যেখানে আল্লাহর যিকির না হয়ে শয়তানের বাঁশি বাজে, গান-বাজনা হয়, যেখানে গীবত-শেকায়াত, অপবাদ-চোগলখুরি হতে থাকে!
ঐ ঘরের কী অবস্থা, যা গুনাহ ও খারাপ কাজে পূর্ণ থাকে? যেখানে হারাম মেলামেশা হয়? বেপর্দার সাথে নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশী গায়রে মাহরামদের অবাধ যাতায়াত হয়? যে ঘরের অবস্থা এমন, তাতে ফেরেশতা কীভাবে প্রবেশ করবে! সুতরাং তোমরা আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে তোমাদের ঘরকে জীবিত করে তুলো।

টিকাঃ
২২. সহীহ মুসলিম: ১/৫৩৯, হা. নং ৭৭৯ (প্র. দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরূত)

📘 আদর্শ পরিবার গঠনে ৪০ টি উপদেশ > 📄 তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কিবলামুখী ও ইবাদতের স্থান বানাও

📄 তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কিবলামুখী ও ইবাদতের স্থান বানাও


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
﴿ وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى وَأَخِيهِ أَن تَبَوَّأَ لِقَوْمِكُمَا بِمِصْرَ بُيُوتًا وَاجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ ﴾
"আর আমি নির্দেশ পাঠালাম মূসা এবং তাঁর ভাইয়ের প্রতি যে, তোমরা তোমাদের জাতির জন্য মিসরের মাটিতে বাসস্থান নির্ধারণ কর। আর তোমাদের ঘরগুলো কিবলামুখী করে বানাও এবং নামাজ কায়েম কর। আর যারা ঈমানদার তাদেরকে সুসংবাদ দান কর।”²³

ইমাম তাবারী রহ. বর্ণনা করেন-
حَدَّثَنِي الْمُثَنَّى، قَالَ: ثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ: ثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ خُصَيْفٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَوْلُهُ: ﴿ وَاجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قِبْلَةً ﴾ [يونس: ۸۷] قَالَ: أُمِرُوا أَنْ يَتَّخِذُوهَا مَسَاجِدَ.
"ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা যেন তাদের ঘরগুলোকে মসজিদে পরিণত করে।"²⁴

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
وَكَأَنَّ هَذَا وَاللَّهُ أَعْلَمُ لَمَّا اشْتَدَّ بِهِمُ الْبَلَاءُ مِنْ قِبَلِ فِرْعَوْنَ وَقَوْمِهِ وَضَيَّقُوا عليهم أمروا بكثرة الصلاة كقوله تَعَالَى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ [الْبَقَرَةِ: ١٥٣] . وَفِي الْحَدِيثِ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا حَزَبَهُ أَمْرُ صَلَّى، أَخْرَجَهُ أَبُو دَاوُدَ.
"আর সম্ভবত এটা তখনকার কথা-আল্লাহ-ই ভালো জানেন-যখন ফেরাউন ও তার কওমের পক্ষ থেকে নির্যাতনের পরিমাণ বেড়ে গেল এবং এরা তাদেরকে কোণঠাসা করে ফেলল, তখন তাদেরকে বেশি বেশি নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। [সূরা বাকারা: ১৫৩] সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় হুযাইফা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে কোনো সমস্যা দেখা দিত, তখন তিনি নামাজ আদায় করতেন।”²⁵

এর মাধ্যমেই ঘরে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব বুঝা যায়। বিশেষভাবে দুর্বলতার সময় এবং যখন পরিস্থিতি এমন তৈরি হয়ে যায় যে, মুসলমানগণ কাফেরদের সামনে প্রকাশ্যে নামাজ আদায় করতে পারে না, তখন ঘরে নামাজ আদায় করতে হবে। আমরা এখানে মারইয়াম আ. এর মেহরাবের কথাও আলোচনা করব, যেটা ছিল তাঁর ইবাদতের স্থান। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন-
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا )
“যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তাঁর কাছে আসতেন, তখনই তাঁর সামনে খাবার দেখতে পেতেন। "²⁶

সাহাবায়ে কেরাম রাযি. ফরয নামাজ ব্যতীত অন্যান্য নামাজ ঘরে আদায় করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, এ ব্যাপারে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা রয়েছে। সহীহ বুখারীর বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে-
عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: أَخْبَرَنِي مَحْمُودُ بْنُ الرَّبِيعِ الْأَنْصَارِيُّ، أَنَّ عِتْبَانَ بْنَ مَالِكٍ وَهُوَ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِمَّنْ شَهِدَ بَدْرًا مِنَ الأَنْصَارِ أَنَّهُ أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ أَنْكَرْتُ بَصَرِي، وَأَنَا أُصَلِّي لِقَوْمِي فَإِذَا كَانَتِ الأَمْطَارُ سَالَ الوَادِي الَّذِي بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ، لَمْ أَسْتَطِعْ أَنْ آتِيَ مَسْجِدَهُمْ فَأُصَلِّي بِهِمْ، وَوَدِدْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَّكَ تَأْتِينِي فَتُصَلِّي فِي بَيْتِي، فَأَتَّخِذَهُ مُصَلَّى، قَالَ: فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: سَأَفْعَلُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ. قَالَ عِتْبَانُ: فَغَدَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبُو بَكْرٍ حِينَ ارْتَفَعَ النَّهَارُ، فَاسْتَأْذَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَذِنْتُ لَهُ، فَلَمْ يَجْلِسُ حَتَّى دَخَلَ البَيْتَ، ثُمَّ قَالَ: أَيْنَ تُحِبُّ أَنْ أُصَلِّي مِنْ بَيْتِكَ؟ قَالَ: فَأَشَرْتُ لَهُ إِلَى نَاحِيَةٍ مِنَ البَيْتِ، فَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَبَّرَ، فَقُمْنَا فَصَفَّنَا فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ سَلَّمَ.
মাহমুদ বিন রবী আনসারী রহ. বলেন, “বদরী সাহাবী আতবান বিন মালেক রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি চোখে কম দেখি এবং আমি আমার কওমের সাথে নামাজ আদায় করি। কিন্তু যখন বৃষ্টি আসে এবং আমার ও তাদের মধ্যে অবস্থিত উপত্যকা প্লাবিত হয়, তখন আমি তাদের মসজিদে এসে তাদের সাথে নামাজ আদায় করতে পারি না। হে আল্লাহর রাসূল, তাই আমি আশা করি, আপনি আমার বাড়িতে আসবেন এবং আমার ঘরে নামাজ আদায় করবেন। তাহলে আমি সেই জায়গাকে নামাজের স্থান বানাব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমি অচিরেই এটা করব।' আতবান রাযি. বলেন, পরদিন সকালে যখন সূর্য একটু ওপরে উঠল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাযি. আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে আমি তাঁকে অনুমতি দিলাম। তিনি ঘরে প্রবেশের আগে কোথাও বসলেন না। অতঃপর তিনি বললেন, 'আমি তোমার ঘরের কোন জায়গায় নামাজ আদায় করলে তুমি খুশি হবে?' তিনি বলেন, আমি আমার ঘরের এক কোণের দিকে ইশারা করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে দাঁড়ালেন এবং তাকবীর দিলেন। অতঃপর আমরাও তাঁর পেছনে কাতার করে দাঁড়ালাম এবং তিনি দুই রাকআত নামাজ আদায় করে সালাম ফিরালেন।”²⁷

টিকাঃ
২৩. সূরা ইউনূস: ৮৭
২৪. তাফসীরে তাবারী: ১৫/১৭২, হা. নং ১৭৭৯৪ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
২৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/২৫২ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
২৬. সূরা আলে ইমরান: ৩৭
২৭. সহীহ বুখারী: ১/৯২, হা. নং ৪২৫ (প্র. দারু তাওকিন নাজাত, বৈরূত)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00