📄 ঘর একটি নেয়ামত
আল্লাহ তাআলা বলেন- ﴿وَاللهُ جَعَلَ لَكُم مِّن بُيُوتِكُمْ سَكَنًا ﴾ “আল্লাহ তোমাদের গৃহকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল বানিয়েছেন।”¹
ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন-
يَذْكُرُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى تَمَامَ نِعَمِهِ عَلَى عَبِيدِهِ بِمَا جَعَلَ لَهُمْ مِنَ الْبُيُوتِ الَّتِي هِيَ سَكَنُ لَهُمْ، يأوون إليها، ويستترون بها، وينتفعون بها بسائر وُجُوهِ الانْتِفَاع.
“মহান আল্লাহ বান্দার ওপর তাঁর নেয়ামতরাজির পূর্ণতার আলোচনায় বলছেন, তিনি তাদেরকে বাসস্থান হিসেবে ঘর দান করেছেন, যেখানে তারা আশ্রয় গ্রহণ করে ও অন্যের থেকে নিজেকে আড়াল করে এবং তার মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের উপকার লাভ করে।”²
ঘরের অনুরূপ আমাদের কারও কিছু আছে? ঘর কি আমাদের খানাপিনা, বিবাহশাদি, ঘুম ও আরাম-আয়েশের জায়গা নয়? নির্জনতা ও পরিবার- পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার স্থান নয়? এ ঘর কি নারীর সংরক্ষণ ও হেফাজতের স্থান নয়?
আল্লাহ তাআলা নারীজাতির উদ্দেশ্যে বলেন- ﴿وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى﴾ "তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান কর। মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন কোরো না।" ³
যখন তুমি সেসব লোকের অবস্থা ভেবে দেখবে, যাদের কোনো ঘর নেই; তাদের কেউ বাস করে আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউবা মহাসড়কের ফুটপাতে আর কেউ বাস্তুচ্যুত হয়ে অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে, তখন তুমি বুঝতে পারবে ঘর নামক নেয়ামতের মর্যাদা। আর যখন কোনো অস্থির ব্যক্তিকে বলতে শুনবে- আমার কোনো ঠাঁই নেই, স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। কখনো অমুকের বাড়িতে ঘুমাই, কখনো কফির দোকানে, কখনো বা নদীর তীরে, আমার জামা-কাপড় আমার কাফেলার কাছে জমা থাকে; তখন তুমি জানতে পারবে, ঘর নামক নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্টের বাস্তবতা।
আল্লাহ তাআলা যখন বিশ্বাসঘাতক ইহুদি গোত্র বনু নযীর থেকে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন, তখন তাদের থেকে এই নেয়ামত ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাদেরকে করেছিলেন গৃহহীন।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ﴿هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِن دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنتُمْ أَن يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُم مَّانِعَتُهُمْ حُصُونُهُم مِّنَ اللَّهِ فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ﴾ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُم بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ.
“তিনিই কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে প্রথমবার একত্র করে তাদের বাড়ি-ঘর থেকে বহিষ্কার করেছেন। তোমরা ধারণাও করতে পারনি যে, তারা বের হবে। তারা মনে করেছিল, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর কবল থেকে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহর শাস্তি তাদের ওপর এমন দিক থেকে আসলো, যার কল্পনাও তারা করেনি। আল্লাহ তাদের অন্তরে ত্রাস সঞ্চার করে দিলেন। তারা তাদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং مسلمانوں হাতে ধ্বংস করছিল। অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।”⁴
মুমিনের কাছে তার ঘর সংশোধনে মনোযোগী হবার একাধিক চালিকাশক্তি রয়েছে:
এক. নিজ সত্তা ও পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলার বাণী-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةُ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার- পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তাআলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করেন না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই পালন করেন।”⁵
দুই. কিয়ামত দিবসে আল্লাহর সামনে ঘরের দায়িত্বশীলদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহিতার গুরুত্ব। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ اللَّهَ سَائِلُ كُلَّ رَاعٍ عَمَّا اسْتَرْعَاهُ، أَحَفِظَ ذَلِكَ أَمْ ضَيَّعَ؟ حَتَّى يُسْأَلَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ.
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন, সে তা যথাযথভাবে পালন করেছে নাকি অবহেলা করেছে? একপর্যায়ে ব্যক্তিকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।"⁶
তিন. ঘর যেকোনো অনিষ্টতা থেকে নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষার স্থান এবং মানুষের থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখার স্থান। ফেতনার সময় ঘরই শরীয়াহসম্মত আশ্রয়স্থল। হাদীসে এসেছে-
عَنْ ثَوْبَانَ، مَوْلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : طُوبَى لِمَنْ مَلَكَ لِسَانَهُ، وَوَسِعَهُ بَيْتُهُ، وَبَكَى عَلَى خَطِيئَتِهِ.
সাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সুসংবাদ ঐ ব্যক্তির জন্য, (ফেতনার সময়) যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে, নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং স্বীয় পাপের কারণে ক্রন্দন করবে।"⁷
বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ مُعَادٍ قَالَ: عَهِدَ إِلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي خَمْسٍ مَنْ فَعَلَ مِنْهُنَّ كَانَ ضَامِنًا عَلَى اللهِ: مَنْ عَادَ مَرِيضًا، أَوْ خَرَجَ مَعَ جَنَازَةٍ، أَوْ خَرَجَ غَازِيًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَوْ دَخَلَ عَلَى إِمَامٍ يُرِيدُ بِذَلِكَ تَعْزِيرَهُ وَتَوْقِيرَهُ، أَوْ قَعَدَ فِي بَيْتِهِ فَيَسْلَمُ النَّاسُ مِنْهُ وَيَسْلَمُ.
মুআয রাযি. বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট থেকে পাঁচটি বিষয়ে ওয়াদা নিয়েছেন। যে ব্যক্তি ঐ পাঁচটির কোনো একটি পালন করবে (ঐ সময়ে) সে আল্লাহর জিম্মায় থাকবে। (এক.) যে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাবে। (দুই.) অথবা জানাযার সাথে চলবে। (তিন.) অথবা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে বের হবে। (চার.) অথবা কোনো খলীফার কাছে যাবে, তাকে শক্তিশালী ও সম্মান করার জন্য। (পাঁচ.) অথবা নিজ ঘরে অবস্থান করবে, ফলে মানুষ তার থেকে নিরাপদ থাকবে এবং সেও মানুষ থেকে নিরাপদ থাকবে।”⁸
হাদীসে এসেছে-
سَلَامَةُ الرَّجُلِ فِي الفِتْنَةِ أَنْ يَلْزَمَ بَيْتَهُ
“ঘরে অবস্থান করাই ব্যক্তির জন্য ফেতনা থেকে নিরাপত্তা।"⁹
আর মুসলিম এ বিষয়ের উপকার লাভে সক্ষম হবে একাকিত্ব ও নির্জনতা অবলম্বনের মাঝে। যখন সে অনেক মন্দ বিষয়কে পরিবর্তন করতে অপারগ হবে, তখন ঘরই হবে তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সে ঘরে প্রবেশ করলে নিজে মন্দ কাজ ও হারাম দৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারবে, পরিবারকে রক্ষা করতে পারবে পর্দাহীনতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন থেকে এবং সন্তানাদিকে নিরাপদ রাখতে পারবে খারাপ সঙ্গী-সাথী থেকে।
চার. মানুষ তার অধিকাংশ সময় ঘরের অভ্যন্তরে কাটায়। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরম ও শীতে, বৃষ্টি নামলে, দিনের শুরু ও শেষভাগে, কাজকর্ম ও পড়ালেখা থেকে অবসর হলে। আর সময়কে অবশ্যই ইবাদত বন্দেগিতে ব্যয় করবে, অন্যথায় হারাম কাজে সময় নষ্ট হবে।
পাঁচ. আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘর সংশোধনে মনোযোগ ও গুরুত্বদানই হলো মুসলিম সমাজ বিনির্মাণের বড় মাধ্যম। কারণ, ঘর দিয়েই সমাজ গঠিত হয়। ঘর সমাজের ইট। অর্থাৎ কয়েকটি ঘর মিলে পাড়া আর কয়েকটি পাড়া মিলে একটি সমাজ। অতএব ইট যদি ভালো হয়, তাহলে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ এমন শক্তিশালী এবং দুশমনের সামনে এমন অপ্রতিরোধ্য হবে যে, সমাজে শুধু কল্যাণ আর কল্যাণই বিস্তার লাভ করবে। তাতে কোনো অকল্যাণ আসতে পারবে না।
যার ফলে মুসলিম ঘর থেকে সমাজের জন্য তৈরি হবে ঘর সংশোধনের স্তম্ভগুলো তথা অনুসরণীয় দাঈ, জ্ঞানপিপাসু ছাত্র, খাঁটি মুজাহিদ, সৎ স্ত্রী, আদর্শ মা ও অন্যান্য সংশোধনকারী ব্যক্তিবর্গ।
আলোচনা যখন এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, অথচ আমাদের ঘরগুলোতে আছে অনেক মন্দ বিষয়, বড় ধরনের ত্রুটি, অবহেলা ও শিথিলতা, তখন তো এক বড় প্রশ্ন আসবেই।
কী সেই ঘর সংশোধনের উপায়-উপকরণগুলি?
প্রিয় পাঠক, এই নিন উত্তর। এ ব্যাপারে কিছু উপদেশ। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে আল্লাহ উপকৃত করবেন। মুসলিম ঘরের প্রতি নতুন করে বার্তা প্রেরণের জন্য ইসলামি ব্যক্তিদের প্রচেষ্টাকে সেদিকে ঘুরিয়ে দেবেন।
আর এই উপদেশগুলো দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে। এক. সৎ কর্ম সম্পাদন করার মাধ্যমে কিছু কল্যাণকর বিষয় অর্জন করা। দুই. মন্দ কাজ প্রতিহত করে অকল্যাণকর বিষয়গুলো দূরীভূত করা। এটাই আমাদের আলোচনার প্রারম্ভিকা।
টিকাঃ
১. সূরা নাহল: ৮০
২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/৫০৭ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
৩. সূরা আহযাব: ৩৩
৪. সূরা হাশর: ২
৫. সূরা তাহরীম: ৬
৬. আস সুনানুল কুবরা, নাসায়ী: ৮/২৬৭, হা. নং ৯১২৯ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরূত)
৭. আল মু'জামুল আওসাত, তাবারানী: ৩/২১, হা. নং ২৩৪০ (প্র. দারুল হারামাইন, কায়রো)
৮. মুসনাদে আহমাদ: ৩৬/৪১২, হা. নং ২২০৯৩ (প্র. মুআসসাসাতুর রিসালা)
৯. আল জামেউস সগীর: পৃ. নং ২৯০, হা. নং ৪৭৩২ (প্র. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরূত)
📄 উপদেশ
ছাব্বিশ: খুবই সতর্ক থাকতে হবে, যেন স্বামীর অনুপস্থিতিতে গায়রে মাহরাম কোনো পুরুষ ঘরে প্রবেশ করতে না পারে।
সাতাশ: পারিবারিক সাক্ষাতের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা-সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করবে।
আটাশ: বাড়ির কাজের লোক ও গাড়ির ড্রাইভারদের থেকে খুব সাবধান থাকতে হবে।
উনত্রিশ: মেয়েলি স্বভাবের পুরুষদেরকে ঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
ত্রিশ: বাড়ি থেকে মনিটর তথা টেলিভিশন অপসারণ করতে হবে।
একত্রিশ: টেলিফোন-মোবাইলের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বত্রিশ: কাফের ও কুফরি ধর্মের যেকোনো প্রতীক ও মূর্তি ঘর থেকে অপসারণ করতে হবে।
তেত্রিশ: যেকোনো প্রাণীর ছবি ঘর থেকে সরাতে হবে।
চৌত্রিশ: ঘরে ধূমপান নিষিদ্ধ করতে হবে।
পঁয়ত্রিশ: ঘরে কুকুর আনা যাবে না এবং কুকুরপ্রীতি ছাড়তে হবে।
ছত্রিশ: বাড়ির ভেতর ও বাহির উভয় দিক থেকেই কারুকাজ করা থেকে দূরে থাকবে।