📄 নারী-শিক্ষা
পরিশিষ্ট : ২
এই পরিশিষ্টে আমরা নারীর শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু কথা বলব। ফিকহি ইখতিলাফ ও তার পক্ষে বিপক্ষের দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে আলোচনা করব না। এখানে আমরা ফিকহি আলোচনার বাইরে গিয়ে এগুলোর প্রতি ইসলামের মৌলিক চাহিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্টা করব।
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দেয় এবং উৎসাহ প্রদান করে। কুরআন-হাদিসে এমন কোনো উক্তি নেই যা নারীর শিক্ষা গ্রহণকে নিষিদ্ধ করে কিংবা নিরুৎসাহিত করে। ইসলামের ইতিহাসে অনেক আলিমা, মুহাদ্দিসা, ফকিহা ও খ্যাতনামা নারীদের দৃষ্টান্ত আছে। যেই সাতজন মহান ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের প্রজ্ঞা গণমানুষের কাছে পৌঁছেছে, তাদের একজন হলেন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহ আনহা। এমনকি ইসলামি ইতিহাসে নারীরা ফতোয়া প্রদানের খেদমতও আঞ্জাম দিয়েছেন।
ইসলামে নারীর শিক্ষা কোনো গৌণ বিষয় নয়; বরং এটি একটি আবশ্যকীয় বিষয়। এজন্য কেউ নারীর শিক্ষাকে নিষিদ্ধ করতে পারে না। এমনকি কোনো নারী যদি উচ্চশিক্ষাও অর্জন করতে চায়, তবে তাকে বাধা দেওয়া বৈধ হবে না।
তবে সেই শিক্ষা, তার পরিবেশ ও উদ্দেশ্য অবশ্যই নারীর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া যাবে না। ইসলামি শরিয়াহর নীতিমালা ও চাহিদার পরিপন্থি হওয়া যাবে না। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ত্রুটি এটাই যে, নারী-पुरुष নির্বিশেষে কাউকেই এই শিক্ষা তাদের প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে সচেতন করে না। তাদের আদর্শ পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা এখানে নেই।
বিশেষ করে সমাজে নারীশিক্ষার যেই আস্ফালন, তার পুরো প্রজেক্টই পশ্চিমাবান্ধব। এই শিক্ষা প্রজেক্টের অন্যতম এজেন্ডা হলো, নারীকে কেবল একজন উৎপাদক যন্ত্র হিসেবে আমদানি করা। প্রচলিত নারীশিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো, নারীকে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত করা, নারীকে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান হওয়ার এক অপ্রাকৃতিক ও ঘৃণ্য প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দেওয়া।
উপনিবেশ আমলে যখন মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন শায়খ মুস্তফা আস সবারি রহিমাহুল্লাহ কওলি ফিল মারআহ ওয়া মুকারানাতুহু বি আকওয়ালি মুকাল্লিদাতিল গারবি নামক গ্রন্থ লেখেন। এই বইয়ে তিনি বলেন, আমি মনে করি নারীদের শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিত তাদের প্রধান ও স্বভাবজাত দায়িত্ব পালন। অর্থাৎ পরিবার পরিচালনা, সন্তান প্রতিপালন ও তাদের চরিত্র গঠন। এবং তাদের শিক্ষার ভিত্তি হওয়া উচিত পারিবারিক ব্যবস্থাপনা, সুস্থতা ও অর্থনীতির ওপর। সব কাজে ও সর্বক্ষেত্রে পুরুষদের সমান হওয়ার জন্য তাদের শিক্ষা কর্মসূচি হওয়া উচিত নয়। কারণ এটা সম্ভবও না, কল্যাণকরও না। আর নারী-পুরুষের সমতার যেই দাবি, এটা কখনোই সম্ভব নয়। একজন পুরুষের জন্য যেসব বিষয় উপযুক্ত, তার সবগুলো একজন নারীর জন্য উপযুক্ত হবে না। একই কথা বিপরীত ক্ষেত্রেও।
এজন্য নারী-পুরুষের শিক্ষা কর্মসূচি এক হওয়া মারাত্মক ক্ষতিকর। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, সমাজের সদস্যদের স্ব স্ব দায়িত্বে দায়িত্ববান করে তোলা। দীনের বুনিয়াদি শিক্ষার পর স্ত্রী ও মা হিসেবে একজন নারীর শিক্ষায় প্রথম অগ্রাধিকার পাবে এই সংক্রান্ত শিক্ষা অর্জন করা। এজন্য শায়খ মুস্তফা আস সিবায়ি রহিমাহুল্লাহ মনে করতেন, বিশেষভাবে পরিবার পরিচালনা-সংক্রান্ত বিদ্যা মেয়েদের পাঠ্যসূচিতে বেশি পরিমাণ থাকা উচিত। যাতে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে সফলতা অর্জন সহজ হয়।
পাশাপাশি মেধা অনুপাতে এবং দীন, উম্মাহ ও সমাজের প্রয়োজনে তার ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন শাস্ত্রেও একজন নারী ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে পারে। নারীর শিক্ষা কর্মসূচি এমন হতে হবে, যা তাকে আদর্শ স্ত্রী ও মা হিসেবে গড়ে তুলবে। তাকে পুরুষের সমকক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার বাসনায় উন্মাদ করবে না। তাকে পরিবার থেকে বিমুখ করে বহির্মুখী করে তুলবে না। তাকে এমন কোনো পেশা কিংবা পরিবেশে ঠেলে দেবে না, যেখানে তার নারীত্ব ও মর্যাদা মারাত্মকভাবে শোষিত হয়, কিন্তু সেটা সে অনুভবও করতে পারে না। তাকে মাতৃত্বের পরিচয় ছাপিয়ে কেবলই একটা উৎপাদক যন্ত্র হওয়ার লিপ্সায় অন্ধ করে তুলবে না।
ইসলামে নারীশিক্ষা কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এই কর্মসূচি প্রথমে তাকে আল্লাহর আবদিয়্যাত বাস্তবায়নের চেতনায় উজ্জীবিত করবে। তারপর তাকে একজন আদর্শ পরিবার পরিচালক ও প্রজন্ম তৈরির কারিগর হিসেবে গড়ে তুলবে। সবশেষে তার ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে সেবা দেওয়ার জন্য তাকে যোগ্য করে তুলবে।
টিকাঃ
২৫৪. কওলি ফিল মারআহ, পৃষ্ঠা ৮১
২৫৫. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১১১
📄 নারীর চাকরি
নারীর চাকরির কথা বলতে গেলে যেই বিষয়টি বুঝতে হবে, আধুনিক যুগের চাকরি কাঠামো সম্পূর্ণই নতুন। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘরের বাইরে থাকাসহ আরও বিভিন্ন নিয়মনীতি ও বাধ্যবাধকতা পালনের যেই কাঠামো আমরা দেখতে পাই, সেটার সাথে ইসলামের প্রথম যুগের কিছু দৃষ্টান্ত এনে তুলনা করলে ভুল হব। এবং এটা নিজের ও সমাজের সাথে বিশাল প্রতারণা হবে। তখন হয়তো বিচ্ছিন্ন দলিল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারব, কিন্তু এর খারাপ ফলটাকে অনুধাবন করতে পারব না এবং ইসলামের চাহিদাটাও বাস্তবায়ন করতে পারব না।
ইসলাম কখনোই নারীদের ব্যাপকভাবে ঘরের বাইরে কর্মসংস্থানের দিকে ছোটার জন্য উৎসাহিত করে না। আবার নিঃশর্তভাবে তার চাকরির পথকে রুদ্ধও করে দেয়নি। যেন সে প্রয়োজনের মুহূর্তে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে। ইসলামের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে কর্মের প্রতি নারীদের ঝোঁক পরিলক্ষিত হয় না। মূলত এই ঝোঁক এসেছে পশ্চিমা সমাজ থেকে। কারণ পশ্চিমা সমাজে একটা বয়স পার করার পর পুরুষ নারীর অর্থনৈতিক দায় দায়িত্বের বোঝা বহন করতে চায় না। শায়খ মুস্তফা আস সিবায়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার মতে নারীদের কর্মজীবি হওয়ার মাত্রারিক্ত বাসনা নিছক পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ ছাড়া কিছুই না। এই পথ অবলম্বন করার পর নারীকে সেসব কষ্টকর দায়দায়িত্ব বহন করতেই হবে, যা পাশ্চাত্যের নারীকে করতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য দর্শনের সকল অনিবার্য কুফলগুলোও তাকে ভোগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে。
আমরা অনেক সময় হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর ব্যবসাকে নারীদের চাকরির পক্ষে দলিল হিসেবে দেখাতে চাই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলাম গ্রহণের আগেও নিজে ব্যবসায় সক্রিয় ছিলেন না। সভ্রান্ত ও ধনী ফ্যামিলির হওয়ায় তিনি উত্তরাধিকারী সূত্রে অঢেল সম্পদ লাভ করেন। সেই সম্পদ গোলাম ও কাজের লোকের মাধ্যমে ব্যবসায় খাটান। এটা ছিল ইসলাম গ্রহণ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বের কথা।
রাসুলের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি সকল দায়িত্ব রাসুলের কাছে ন্যস্ত করে দেন। রাসুল দীনের স্বার্থে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সম্পদকে কল্যাণকরভাবে ব্যবহার করেন। আর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তার সমস্ত মনোযোগ ও আকর্ষণ রাসুলের প্রতি নিবিষ্ট করেন। হাদিস কিংবা ইতিহাসে এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যাবে না, যার মাধ্যমে বিবাহের পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যবসায়িক ব্যস্ততা ও আলাপের কোনো চিত্র প্রমাণ করা যাবে। তা ছাড়া খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যবসার ঘটনা ছিল নবুয়তের পূর্বের ঘটনা। তখনো ইসলামি শরিয়ার বিধান অবতরণ ও তার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। এই ঘটনা শরয়ি বিধানের দলিল হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। সুতরাং হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার দৃষ্টান্ত দিয়ে নারীদের ব্যাপকহারে ব্যবসা বা চাকরির দিকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা ইসলামি শরিয়াহর সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক।
হ্যাঁ, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এমন আছে, যা মহিলাদের দ্বারা খুবই উপকৃত হতে পারে। যেমন হাসপাতাল, শিশুবিদ্যালয়, মহিলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এমন সামাজিক কর্মকাণ্ড যেখানে নারীরাই অধিকতর সফলতা লাভ করতে পারে।
আবার নারীদের ভেতর এমন কোনো বিরল প্রতিভাধারী মানুষও থাকতে পারে, যাদের মেধা উম্মাহর কল্যাণে বৃহৎ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নারীর চাকরি করাটা কেবল চাকরিজীবি নারীদেরই প্রয়োজন পূরণ করে না, এর পাশাপাশি তার এই চাকরিটা সামাজিক প্রয়োজন ও দাবি পূরণেও ভূমিকা রাখে। ৮৭ এইজন্য উলামায়ে কেরাম এসব ক্ষেত্রে কিছু নারীর অংশগ্রহণকে ফরজে কিফায়া হিসেবে মত প্রদান করেছেন। ফলে আমাদের উচিত নারীবান্ধব এসব ক্ষেত্রকে নারীদের জন্য উন্মুক্ত করা। এগুলো বিশাল এক ক্ষেত্র, যেখানে আমরা নারীদের আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিভা, যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্যকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে পারি।
নিজেকে প্রমাণ করার জন্য, কথিত স্বাধীনতার দৃষ্টান্ত তৈরির জন্য, উইমেন এম্পাওয়ারের (নারীর ক্ষমতায়নের) জন্য কিংবা পুরুষের সাথে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য চাকরির প্রতি বর্তমান নারীসমাজের যেই অবাধ ঝোঁক তৈরি হয়েছে, এর সাথে শরিয়াহর কোন সম্পর্ক নেই। উম্মাহর বৃহৎ কল্যাণ ও সত্যিকার অর্থেই নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নারী কর্মসংস্থানে আসতে পারে এবং সেটাও ইসলামের অন্য সব বিধিবিধানকে অক্ষুণ্ণ রেখে। কিন্তু মুসলিম নারীদের প্রধান জায়গা তার পরিবার। পরিবারকে ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য দূর্গ হিসেবে প্রস্তুত করার যেই মহান দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা নারী-पुरुष উভয়কেই দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব পালনে পরিবারই তার আসল ক্যারিয়ার, মূল কর্মক্ষেত্র। এখানে অবহেলা ও ত্রুটি করে এবং আল্লাহর শরিয়াহকে লঙ্ঘন করে মুসলিম নারীদের কোনো ক্যারিয়ার থাকতে পারে না। তৈরি হতে পারে না তাদের সফলতা ও উন্নতির কোনো গল্প।
টিকাঃ
২৫৬. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১১৬
২৫৭. কর্মক্ষেত্রে নারী, পৃষ্ঠা ২৭, আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১১৩
📄 নারী-নেতৃত্ব
যদিও ইসলাম নারীকে দীন প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তথাপি ইসলামের প্রথম যুগ থেকে রাজনীতির সাথে তাদের কোনো সংস্রব ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর বনু সায়িদা গোত্রের মুক্তাঙ্গনে মুসলমানদের খলিফা নির্বাচন-সংক্রান্ত সলাপরামর্শের জন্য সাহাবিদের যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে কোনো নারী সদস্য যোগদান করেছিল বলে আমাদের জানা নেই। শাসন-সংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ডে পুরুষদের সাথে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি আমাদের জানা নেই।
খুলাফায়ে রাশেদিন রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য পুরুষদের যেমন বৈঠক আহবান করতেন, তেমনি নারীদেরও বৈঠক অনুষ্ঠিত করতেন—এমন কোনো তথ্য আমাদের গোচরে আসেনি। ইসলামের সমগ্র ইতিহাসেও আমরা এমন কোনো নজির দেখতে পাই না যে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে, রাজনৈতিক তৎপরতায় ও যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনায় নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি অবস্থান করত। হ্যাঁ, কোনো কোনো সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যোগ্য নারী আপত্তি জানাত। সেই সুযোগ এখনো আছে। কিন্তু এর দ্বারা কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক তৎপরতা প্রমাণিত হয় না।
ইতিহাসে আমরা যেটুকু পাই তা হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের হাতে হাত না রেখেই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তারা কখনো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, সন্তান হত্যা করবে না, কারও নামে মিথ্যা অপবাদ রটাবে না এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ লঙ্ঘন করবে না। কিন্তু এই সব অঙ্গীকারগ্রহণের ঘটনাকে কেউ যদি মুসলিম নারীর রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে গণ্য করে, তবে সে ভুল করবে এবং একে ইতিহাসের অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না।
আমরা জানি যে, কোনো কোনো সাহাবির স্ত্রী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচালিত যুদ্ধবিগ্রহে আহতদের সেবা-শুশ্রূষা ও পিপাসার্তদের পানি পান করানোর জন্য পুরুষদের সাথে রণাঙ্গনে যেতেন। তারা আহতদের চিকিৎসা ও সেবার জন্য নির্ধারিত শিবিরে থাকতেন এবং কোনো মুসলমান যুদ্ধে আহত হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ওই শিবিরে নিয়ে যেতেন। যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। এই তথ্যটাও নারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ বহন করে না।
ইতিহাসের এক বিখ্যাত যুদ্ধ জঙ্গে জামালে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি উঠের পিঠে বসে পর্দার অন্তরাল থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, পরবর্তী সময়ে হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজের এই কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ করেছিলেন এবং অন্যান্য উম্মুল মুমিনিনগণ এ জন্য তাকে ভর্ৎসনাও করেছিলেন। কাজেই হযরত আয়েশার এই পদক্ষেপ দ্বারা মুসলিম নারীর রাজনৈতিক তৎপরতায় লিপ্ত হওয়ার বৈধতা প্রমাণ হয় না। কেননা প্রথমত এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, দ্বিতীয়ত এটা যে ভুল ছিল ব্যাপারটা স্বয়ং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাই উপলদ্ধি করেছিলেন।
ইতিহাসের কোনো কোনো যুগে কোনো কোনো নারী দেশের শাসক ও সম্রাজ্ঞী হয়েছিলেন। কেউ বা নিজ স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে পরোক্ষভাবে শাসনকার্যে অংশীদার হয়েছিলেন। সবই ব্যতিক্রমী ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা, যা দলিল প্রদানের জন্য উপযুক্ত না। কারণ ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি কখনো শরিয়াহর ব্যাপারে দলিল হয় না。
সুতরাং এ কথা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, মুসলিম নারীরা অতীতে রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ করত না এবং মুসলমানদের মধ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক ঘটনাবলিতেও তারা প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা রাখত না। হ্যাঁ, সমাজ সংস্কার, ইসলামি দাওয়াহ ও শিক্ষা প্রচারের ক্ষেত্রে তারা সামাজিকভাবে অনেক ভূমিকা পালন করেছেন। নারীদের মাঝে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক তৎপরতা তারা পরিচালনা করেছেন এবং এই সুযোগ তাদের এখনো আছে; বরং বলতে হবে মুসলিম নারীদের এসব দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ইসলাম কখনোই অনুমোদন করে না। এটা তার যোগ্যতাকে অস্বীকৃতি দানের জন্য নয়; বরং পরিবার ও সমাজ গঠনের দায়িত্বে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আত্মনিয়োগ, সার্বিক পর্দারক্ষা, ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে চলা, মাহরাম ছাড়া সফর না করাসহ ইসলাম তাকে যেসব মূল্যবান বিধিনিষেধ দিয়েছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি নিশ্চিতভাবে তার এসব বিধান পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। এজন্য যুগে যুগে মুসলিম নারীরা রাজনৈতিক হাঙ্গামা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন।
আর এটা নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন কিংবা নারীর অধিকার লঙ্ঘন করাও নয়; বরং ইসলাম এর মাধ্যমে নারীর ওপর অনুগ্রহ করেছে এবং তাকে বাহ্যমান রাজনীতির দৃশ্য থেকে আড়ালে রেখে যোগ্য ব্যক্তিত্ব গঠন করে নিজের ক্ষমতা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছে। তাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে তার মৌলিক দায়িত্ব পালনের নিরাপদ ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
পরিশেষে মুসলিম নারীদের তাদের রবের প্রতি বিশ্বাস মজবুত করতে হবে। মহান আল্লাহ তাআলা কারও ওপর জুলুম করেন না। তিনি নারীদের ওপরও জুলুম করেননি। আমাদের অধিকারের কনসেপ্ট বিদেশি কোনো সংস্থা কিংবা দেশীয় কোনো এনজিওর কাছ থেকে গ্রহণ করতে হবে না। আমাদের অধিকারের উৎস মহান রবের দেওয়া পবিত্র শরিয়াহ, যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন। সেই উৎস থেকেই আমরা আমাদের অধিকারের কনসেপ্ট গ্রহণ করব। কোনো সংস্থা কিংবা প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নয়; বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের মানসিকতা নিয়ে।
টিকাঃ
২৫৮. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/১৭৭ পৃষ্ঠা। জঙ্গে জামালের জন্য হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহ আনহার এত আফসোেস ছিল যে, যখন কুরআনে কারিম তিলাওয়াত করতে করতে সুরায়ে আহযাবের নিম্নোক্ত আয়াতে পৌঁছতেন, যেখানে মহান আল্লাহ তাআলা নারীদের এ হুকুম দিয়েছেন, তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো, তখন তিনি এত কাঁদতেন যে, তার ওড়না পর্যন্ত ভিজে যেত।
২৫৯. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪