📄 মুখমণ্ডল সতরের অন্তর্ভুক্ত
পরিশিষ্ট : ১
এই পরিশিষ্টে আমরা শরয়ি পর্দার সীমারেখা ও ইখতিলাত তথা নারী-পুরুষের ফ্রি-মিক্সিং নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে মৌলিক কিছু কথা বলব。
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَابِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَابِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .
'মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের ওড়নার আঁচল নিজ বক্ষদেশে নামিয়ে দেয় এবং নিজেদের ভূষণ যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, আপন নারীগণ, যারা নিজ মালিকানাধীন যৌনকামনা জাগে না এমন খেদমতগার এবং নারীদের গোপনীয় অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া আর কারও সামনে প্রকাশ না করে। মুসলিম নারীদের উচিত ভূমিতে এভাবে পদক্ষেপ না করা, যাতে তাদের গুপ্ত সাজ জানা হয়ে যায়। হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো।'
এই আয়াতে 'স্বভাবতই যা প্রকাশিত থাকে তা ব্যতীত' দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে মূলত এটাকে কেন্দ্র করেই ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে ইখতিলাফের সৃষ্টি। কিন্তু এই মত-ভিন্নতার প্রকৃতিটা বোঝা আমাদের জন্য জরুরি। এটা সত্য যে, পূর্ববর্তী ইমামদের মাঝে মুখ পর্দার অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিয়ে ইখতিলাফ ছিল। কিন্তু তাদের সবার কাছে মুখ ঢাকাই উত্তম হিসেবে বিবেচিত হতো। এমনকি পরবর্তী অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম মুখ ঢাকাকে ওয়াজিব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এজন্য সালাফদের কিতাবসমূহে মুখ খোলার প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষ কোনো বিতর্ক বা আলোচনা পাওয়া যায় না। এমনকি এককভাবে ছোট কোনো রিসালাও পাওয়া যায় না। পূর্ববর্তী ফিকহের কিতাবে মতবিরোধের দেখা মিললেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জমানা থেকে আধুনিক ইতিহাসের সূচনা পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর তাওয়ারুসি তথা প্রজন্ম পরম্পরায় আমল ছিল মুখ ঢাকা। এটাই ছিল মুসলিম নারীসমাজের চিত্র। এজন্য অনেকে মুখ ঢাকার ওপর মুসলিম উম্মাহর ইজমায়ে আমালি দাবি করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুমিনদের নীতি ছিল স্বাধীন মহিলারা মুখসহ পুরো শরীর ঢেকে রাখত।'
ইমাম ইবনে আরসালান রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নারীরা চেহারা খুলে ঘর থেকে বের হবে না—এই ব্যাপারে মুসলিমরা একমত।'
ইমাম আবু হামিদ আল গাজালি রহিমাহুল্লাহ বলেন, সব যুগেই মুসলিম পুরুষরা চেহারা খোলা রাখত আর নারীরা ঢেকে রাখত।
ইমাম আবু হাইয়্যান আল আন্দালুসি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'স্পেনের মুসলিম নারীদের রীতি ছিল তারা এক চোখ ছাড়া পুরো শরীর ঢেকে রাখতেন।
ইমাম মাওযিয়ি আশ শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আগে পরে সব যুগে, সব দেশে এটাই ছিল মুসলিমদের আমল। তারা বৃদ্ধাদের মুখ খুলতে দিতেন এবং তরুণীদের মুখ খোলার অনুমতি দিতেন না; বরং এটাকে খারাপ কাজ মনে করতেন。
সালাফদের কিতাবে এমন অসংখ্য বক্তব্য ও ঘটনা আছে, যা থেকে এটা স্পষ্ট যে, নববি যুগ থেকে আধুনিক ইতিহাস পর্যন্ত মুখ ঢাকার ওপরই মুসলিম নারীদের আমল ছিল। প্রজন্ম পরম্পরায় মুসলিম উম্মাহর এই আমল থেকে স্পষ্ট যে, উম্মাহর ফকিহরা এই মাসআলায় কোন মতের ওপর উম্মাহকে নির্দেশনা দিয়েছেন এবং কোন মতকে তারা সমাজে বাস্তবায়িত রেখেছেন। তারা উম্মতকে সেই মতের ওপরই আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেই মত উম্মাহর পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করবে। তবে এই বিষয়টিও স্বীকৃত যে, চার মাযহাবের পরবর্তী ইমামরা আধুনিক যুগে মুখ ঢাকাকে ওয়াজিব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অল্প কিছু আলেম ব্যতিক্রম মত দিয়েছেন।
নববি যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত গাইরে মাহরামদের সামনে মুখ খোলা কখনোই মুসলিম নারীদের সংস্কৃতি ছিল না। মুখ খোলার ব্যাপারে দায়িত্বশীল পুরুষ ও মুখ আবৃতকারী নারীর মাঝে এতটাই আত্মমর্যাদাবোধ ছিল যে, তারা এটার কল্পনাই করতে পারত না। এই ব্যাপারে ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ খুব সুন্দর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ২৮৬ হিজরিতে কাজি মুসা ইবনে ইসহাকের দরবারে একজন নারী তার অভিভাবকসহ একটা মুকাদ্দামা নিয়ে আসল। তিনি মুকাদ্দামা পেশ করতে বললে নারীর পিতা বলল, তার মেয়ে স্বামীর কাছ থেকে মহর বাবদ ৫০০ দিনার পায়। স্বামী তা অস্বীকার করল। এরপর কাজি নারীপক্ষকে বলল, তোমাদের সাক্ষী আছে? মেয়ের অভিভাবক বলল, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী নিয়ে এসেছি। তখন কোনো এক সাক্ষী মেয়েটাকে দেখতে চাইল, যেন সে নিজের সাক্ষীর ব্যাপারে পরিষ্কার হতে পারে। এরপর ওই সাক্ষী মেয়েটাকে দাঁড়াতে বলল। তখন তার স্বামী দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, তোমরা এসব কী করছ? তখন উকিল বলল, তারা তোমার স্ত্রীকে মুখ খোলা অবস্থায় দেখতে চায়, যেন তারা তাকে চিনতে পারে। স্বামী বলল, আমি কাজি সাহেবকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমার স্ত্রী যেই মহর আমার ওপর দাবি করেছে, সে আমার থেকে তা প্রাপ্য। তার চেহারা খোলার কোনো প্রয়োজন নেই। স্বামীর এই গায়রতপূর্ণ আচরণ দেখে স্ত্রী বলে উঠল, আমিও কাজি সাহেবকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই মহর আমি তাকে হাদিয়া দিয়ে দিলাম এবং দুনিয়া ও আখেরাতে এর দায় থেকে তাকে মুক্ত করে দিলাম।
মূলত প্রজন্ম পরম্পরায় সতরের প্রতি এটাই ছিল মুসলিম উম্মাহর গাইরাত। মুখ খোলার প্রশ্ন কিংবা মুসলিম নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন ও ফ্রি-মিক্সিংয়ের যেই সংস্কৃতি, এটা শুরুই হয়েছে উনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম দেশগুলোতে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে। মুসলিম দেশগুলোতে উপনিবেশ আমলের শুরু পর্যায়ের প্রামাণ্যচিত্রগুলোও আমরা যদি ঘেঁটে দেখি, তখন আমাদের সামনে বিভিন্ন দেশের মুসলিম নারীদের আপাদমস্তক আবৃত চিত্রই নজরে আসবে। রাস্তাঘাট, বাজার সর্বত্র মুসলিম নারীদের আমরা এই পোশাকেই দেখতে পাব।
আমরা যদি মাকাসিদে শরিয়াহর আলোকে মুখ খোলা রাখা প্রসঙ্গটির দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখব বর্তমানে মুখ খোলা রাখা নিশ্চিতভাবে মাকাসিদে শরিয়ায় উত্তীর্ণ হয় না। ইসলামি শরিয়ায় পর্দার বিধানের উদ্দেশ্য হলো, নারীর সৌন্দর্যকে গাইরে মাহরাম পুরুষ থেকে আবৃত রাখা। যেন নারীর প্রতি পুরুষের স্বভাবজাত যেই আকর্ষণ সেটা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং কোনো অঘটন না ঘটে। আর একজন নারীকে পছন্দ হওয়া কিংবা তার প্রতি প্রাথমিক আকর্ষণ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে তার চেহারার দর্শনই প্রধান ভূমিকা রাখে। চেহারা ঢেকে রাখাই মাকাসিদে শরিয়াহর দাবি।
এখানে আরেকটা বিষয় হলো, আমরা যারা ইখতিলাফের দোহাই দিয়ে চেহারা খুলে রাখার সুবিধা গ্রহণ করতে চাই, তাদের অধিকাংশই আসলে এই মতটা এই জন্য গ্রহণ করছেন না যে, মতটা শরিয়াহর সার্বিক দলিলসমূহ দ্বারা প্রমাণিত; বরং নিজের অবস্থান কিংবা প্রবৃত্তিকে বহাল রাখার জন্য এই সুবিধাটা গ্রহণ করা হচ্ছে। আবার যারা মুখ খোলা রাখার মত বর্ণনা করেন, তাদের অনেকেই অত্যন্ত সাধারণভাবে বিষয়টাকে উপস্থাপন করেন। খোলা রাখার মত গ্রহণ করলেও যে এখানে অনেক শর্ত ও নীতিমালা আছে, সেটা তাদের বক্তব্যে উঠে আসে না। যেমন, চুল ও কান সতরের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু অনেক নারী মুখ খোলা রাখতে গিয়ে মাথার উপরিভাগের চুলকেও প্রকাশ করেন, আবার কানকেও খোলা রাখেন। যা সবার ঐকমত্যে হারাম। আবার যেই মতে মুখমণ্ডলকে স্বভাবতই প্রকাশিত থাকা হিসেবে মুখ খোলা রাখা বৈধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানেও যদি কোনো প্রকার কৃত্রিম সৌন্দর্য, মেকাপ বা অন্য যেকোনো প্রকার সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়, তাহলে তা প্রকাশ করা হারাম হয়ে যাবে। কারণ তাদের মতে তখন সেটা আর স্বাভাবিক সৌন্দর্য থাকবে না। এজন্য তাদের মতে অনুমোদিত অংশগুলোও কোনো প্রকার সাজসজ্জা ছাড়া প্রকাশ করতে হবে।
বর্তমানে যারা মাথা ঢেকে মুখ খুলে বের হয়, তাদের কেউই সৌন্দর্যবর্ধনকারী জিনিস ব্যবহার করা ছাড়া বের হয় বলে মনে হয় না। যদিও এরকম কাউকে পাওয়া যায়, তবে সেটা একদমই বিরল ঘটনা। সুতরাং জমহুর উলামায়ে কেরামের মতই নিরাপদ ও বাস্তবতার আলোকে উত্তীর্ণ। কিছু আলেমদের যেই মত, সেই মত অনুযায়ীও মুখ খোলা রাখা অবস্থায় সতরের শরয়ি বিধান পালিত হচ্ছে না।
এখানে আমরা উভয় পক্ষের দলিলসমূহ এনে পর্যালোচনা করে আলোচনা দীর্ঘ করতে চাচ্ছি না। এর উপযুক্ত স্থানও এটি নয়। তবে আমরা সংশ্লিষ্ট মাসআলায় উত্তম সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য মৌলিক কিছু বিষয় তুলে ধরলাম। নিষ্ঠার সাথে আমরা যদি বিবেচনা করি, তাহলে আমাদের সামনে মুখ ঢাকার মতটিকেই বিশুদ্ধ ও উম্মাহর জন্য কল্যাণকর মনে হবে। মাকাসিদে শরিয়াহ, উম্মাহর সুদীর্ঘকালের আমল ও বর্তমান সমাজের অবস্থা সর্বদিক বিবেচনায় মুখ ঢাকাই ইসলামি শরিয়াহর প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত এবং উসুলে ফিকহের দৃষ্টিতে মুখ ঢাকা ওয়াজিবের পর্যায়ভুক্ত। বৃদ্ধ নারী, যাদের দেখে আকর্ষিত হওয়ার সুযোগ নেই, তাদের জন্য কিংবা একান্ত প্রয়োজনের সময় মুখ খোলা রাখার মতের ওপর আমল করা যেতে পারে।
বর্তমানে মডার্নিস্ট কিছু মুসলিমের পক্ষ থেকে একটি অবান্তর দাবি করা হয়। সেটা হলো, নিকাব বা হিজাবের বিধান কেবল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের জন্য বিশেষ বিধান। বাকি মুসলিম মেয়েরা এই বিধানের আওতাভুক্ত নয়। মূলত এই ধরনের আপত্তি সাহাবাদের যুগ থেকে নিয়ে উপনিবেশ আমলের আগ পর্যন্ত মুসলিম-সমাজে প্রচলিত ছিল না। উপনিবেশের আমলে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু মুসলিম মুসলিম-সমাজের ভেতর এই আপত্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। এর মধ্যে কাসিম আমিনের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য, বইয়ের ভূমিকাতে যার আলোচনা আমরা করে এসেছি। কাসিম আমিন তার লিখিত তাহরিরুল মারআহ গ্রন্থে এই দাবি করে মুসলিম নারীদের পশ্চিমা নারীদের মতো সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
তখনকার সময়ের বিখ্যাত আলেমে দীন, উসমানি খিলাফার একজন বিচারক শাইখুল ইসলাম মুস্তফা আস সবারি তার বিশ্ববিখ্যাত কিতাব মাওকিফুল আকলি ওয়াল ইলমি ওয়াল আলামি এর ভেতর কাসিম আমিনের এই দাবির খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, 'কাসিম আমিন তার বইয়ে মুসলিম নারীদের হিজাব ও পুরুষদের থেকে তাদের দূরে থাকার যে বিধান, তার ওপর নগ্ন আক্রমণ চালিয়েছে। সে পশ্চিমা নারীদের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শনের পক্ষে প্রতিরোধকারী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেছে।'
তার মতে মুসলিম-সমাজে প্রচলিত যে হিজাব, সেটা উম্মাহাতুল মুমিনিনের সাথেই খাস। তার এই দাবির পক্ষে সে সুরা আহযাবের ৩২ এবং ৫৩ নং আয়াত দিয়ে দলিল পেশ করে। তার যুক্তি হলো, এই আয়াতে যে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের উদ্দেশ্য করে। এজন্য আয়াতে উল্লিখিত বিধিনিষেধ বিশেষভাবে তাদের জন্যই আরোপ হবে, অন্য কোনো মহিলার জন্য নয়।
আমরা বলব, সুরা আহযাবের ৩২ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'হে নবীপত্নীরা, তোমরা অন্যান্য মহিলাদের মতো নও।' এখানে উনাদের বিশেষত্ব আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রে নয়; বরং এই বিশেষত্বের সম্পর্ক তাদের পূণ্য ও পাপের বদলার সাথে। যা মহান আল্লাহ তাআলা সুরা আহযাবের ৩০ এবং ৩১ নং আয়াতে বলেছেন। ৩২ নং আয়াতের পর যেসব বিধিনিষেধ এসেছে, এর সাথে ৩২ নং আয়াতের প্রথম অংশের কোনো বিশেষত্ব নেই। আর সেই বিধিনিষেধগুলো হলো-
'হে নবী পত্নীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও, যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। সুতরাং তোমরা কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, পাছে অন্তরে ব্যাধি আছে এমন ব্যক্তি লালয়িত হয়ে পড়ে। আর তোমরা বলো ন্যায়সঙ্গত কথা।
নিজ গৃহে অবস্থান করো, (পর-পুরুষকে) সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না, যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হতো। নামাজ কায়েম করো, জাকাত আদায় করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। হে নবী পরিবার (আহলে বাইত)! আল্লাহ তো চান তোমাদের থেকে মলিনতা দূরে রাখতে এবং তোমাদেরকে এমন পবিত্রতা দান করতে, যা সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ হবে।'
যদি এই আয়াতের বিধানগুলো উম্মাহাতুল মুমিনিনের সাথে খাস হয়, তাহলে কি মুসলিম নারীদের পুরুষদের আকর্ষণ করার জন্য নম্র স্বরে কথা বলা, সৎ কথা না বলা, ঘরে অবস্থান না করা, জাহিলিয়াতের মতো নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, সালাত না পড়া, জাকাত না দেওয়া, এমনকি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য না করা-এ সবকিছু বৈধ হয়ে যাবে?
তারপর ৫৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ .
'নবীর স্ত্রীগণের কাছে তোমাদের কিছু চাওয়ার থাকলে পর্দার আড়াল থেকে চাবে। এ পন্থা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তর অধিকতর পবিত্র রাখার পক্ষে সহায়ক হবে।'
রাসুলের স্ত্রী, যারা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ নারী এবং রাসুলের সাথিবর্গ, যারা উম্মাহর শ্রেষ্ঠ অংশ হওয়া সত্ত্বেও অন্তরের পবিত্রতা কি কেবল তাদেরই প্রয়োজন, আর বাকি মুসলিম নারী-পুরুষের অন্তরের পবিত্রতার প্রয়োজন নেই?
সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল, সুরা আহযাবে হিজাবের সেই বিধান, সেটা উম্মাহাতুল মুমিনিনের জন্য বিশেষ বিধান নয়; বরং সমস্ত মুসলিম নারীদের জন্যই এই বিধান প্রযোজ্য। কিন্তু কাসিম আমিন নিজের প্রবৃত্তিকে প্রচারের জন্য আকল ও বুঝ-শক্তির ভুল ব্যবহার করেছে এবং আল্লাহর কালামে বিকৃতি সাধন করেছে।
সুরা আহযাবেই আরেকটি আয়াত আছে, যেটি কাসিম আমিনের দাবিকে খণ্ডন করে দেয়। সেই আয়াতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিজাব সকল মুসলিম নারীর জন্য আবশ্যক। নবীপত্নী ও অন্যান্য নারীর মাঝে এই বিধান প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا.
'হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের ও মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের (মুখের) ওপর নামিয়ে দেয়। এ পন্থায় তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু。
এর থেকে সুস্পষ্ট বিধান আর কী হতে পারে! 'জালাবিব' শব্দটি 'জিলবাব' এর বহুবচন। আর 'জিলবাব' ওই চাদরকে বলে, যার ভেতর নারীর পুরো শরীর আবৃত থাকে। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কেবল জিলবাবের কথা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং সেই চাদরকে মাথার ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দিতে বলেছেন। যেন চেহারাও চাদরে আবৃত হয়ে যায়。
টিকাঃ
২২৭. সুরা নূর, আয়াত ৩১
২২৮. আওনুল মাবুদ, ৪/১০৬ পৃষ্ঠা
২২৯. ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ১/৭৬৯ পৃষ্ঠা
২৩০. আল বাহরুল মুহিত, ৩/১৪৪ পৃষ্ঠা
২৩১. তাইসিরুল বয়ান লি আহকামিল কুরআন, ২/১০০১ পৃষ্ঠা
২৩২. আল মুস্তাজাম, পৃষ্ঠা ১২/৪০২, আল্লামা ইবনে কাসির আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতেও এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
২৩৩. এই লিংকে একটি ভিডিও আছে। ভিডিওটিতে উপনিবেশ আমলের আগে মুসলিম দেশগুলোতে নারীদের পোষাকের প্রামাণ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। https://www.facebook.com/106539387618516/posts/369454631326989/
২৩৪. কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পোশাক, পর্দা ও দেহ-সজ্জা, ২৬৮ পৃষ্ঠা। আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১২৫; আমালুল মারআতি ওয়া ইখতিলাতুহা, পৃষ্ঠা ৭৫
২৩৫. একান্ত বাধ্যগত অবস্থা কী কী এই বিষয়টি প্রায়োগিকভাবে বিশ্বস্ত কোনো আলেম থেকে জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
২৩৬. সুরা আহযাব, আয়াত ৩২-৩৩
২৩৭. সুরা আহযাব, আয়াত ৫৯
২৩৮. মাওকিফুল আকলি, ওয়াল ইলমি ওয়াল আলামি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১১-৪১২; ইসলাহি খুতুবাত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৭-১৭০
📄 ফ্রি-মিক্সিং
ফ্রি-মিক্সিং নিয়ে এখানে আমরা বিস্তারিত আলাপ করব না। আমরা কেবল এখানে সংক্ষিপ্তভাবে ফ্রি-মিক্সিং হারাম হওয়ার কিছু দলিল ও মডার্নিস্ট মুসলিমদের সংশয়ের জবাব তুলে ধরার চেষ্টা করব। তার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিচ্ছি।
আমরা অনেক সময় সতর আবৃত করার বিধানের সাথে আরও বেশ কিছু বিধানকে মিলিয়ে ফেলি। আর মিলিয়ে ফেলার এই ভাব থেকেই আমাদের মাঝে একটি ভয়াবহ চিন্তার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। সেটা হলো, সতর আবৃত করে সব করা যায়। কিন্তু আমরা ভুলে যাই সতর আবৃত করা পরিপূর্ণ পর্দা নয়। পর্দার বিধানের সাথে আরও অনেক বিধান জড়িত আছে। পুরো শরীর ও হাত-মুখ ঢাকা পৃথক একটি বিধান। ফ্রি-মিক্সিং, গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে নির্জনতা অবলম্বন, গান-বাদ্য, মডেলিং ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকা পৃথক বিধান। এজন্য যথারীতি সতর আবৃত করেও কোনো নারী গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে নির্জনতায় অবস্থান করতে পারবে না। কারণ সতর আবৃত করা ও নির্জনতা অবলম্বন না করা, দুটো পৃথক পৃথক বিধান। একটির জন্য অপরটি শিথিল হয়ে যাবে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে তার কোনো মাহরাম না থাকা অবস্থায় নির্জনতা অবলম্বন না করে। অন্য হাদিসে আছে, কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করলে সেখানে শয়তান থাকে তৃতীয় পক্ষ (অর্থাৎ শয়তান তখন তাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়)।
এমনিভাবে যথারীতি সতর আবৃত করেও কোনো নারী গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে কোনো অনুষ্ঠান, সম্মেলন, কর্মক্ষেত্র কিংবা শ্রেণিকক্ষ ইত্যাদিতে পুরুষদের সাথে ইখতিলাত তথা ফ্রি-মিক্সিং করতে পারবে না। এটা তার জন্য বৈধ নয়; বরং এসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। মোটকথা, সতর আবৃত করেও সব করা যায় না। সতর আবৃত করার কারণে শরীয়তের অন্যান্য বিধানে শিথিলতা আসে না। সতর আবৃত করা পৃথক একটি বিধান। শালীনতাবিরোধী ও ফাহেশা কাজ না করা আরেকটি বিধান। এজন্য হিজাব পরে সব করা যায় এই মানসিকতা আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে।
ইখতিলাত বা ফ্রি-মিক্সিং বলা হয়, গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষ শিক্ষাক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, আড্ডা, সম্মেলন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো ব্যবধান কিংবা আড়াল ছাড়া একই স্থানে একত্রিত হওয়া। যেই পরিবেশ থেকে তারা খুব সহজেই মেলামেশা, কথাবার্তা, আকার-ইঙ্গিত করতে পারে।
ইসলাম সাধারণভাবে ফ্রি-মিক্সিং হারাম করেছে। একান্ত বাধ্যগত পরিস্থিতি ছাড়া গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষের জন্য ফ্রি-মিক্সিং বৈধ নয়। ইখতিলাত হারাম হওয়ার বিস্তারিত দলিল পেশ করা এখানে সম্ভব না। এর জন্য পৃথক রচনার প্রয়োজন। আমি এখানে ইখতিলাত হারাম হওয়ার পক্ষে এমন কিছু দলিল পেশ করতে চাচ্ছি, যেগুলো ব্যবহার করে মডার্নিস্টরা স্বয়ং ইখতিলাতকেই বৈধ প্রমাণ করতে চায়। এতে একদিকে ইখতিলাত হারাম হওয়ার দলিলও প্রদান হয়ে যাবে, অন্যদিকে মডার্নিস্টদের খণ্ডনও হয়ে যাবে।
মুসা আলাইহিস সালাম মাদায়েনের দুইজন নারীকে পানি উত্তোলন করে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّى يُصْدِرَ الرِّعَاءُ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ ، فَسَقَى لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّى إِلَى الظِلِ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ.
'যখন সে মাদইয়ানের কুয়ার কাছে পৌঁছল, সেখানে একদল মানুষকে দেখল, যারা তাদের পশুদের পানি পান করাচ্ছে। আরও দেখল তাদের পেছনে দুজন নারী, যারা তাদের পশুগুলোকে আগলিয়ে রাখছে। মুসা তাদের বলল, তোমরা কী চাও? তারা বলল, আমরা আমাদের পশুগুলোকে ততক্ষণ পর্যন্ত পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ না সমস্ত রাখাল তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়ে চলে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ। তখন মুসা তাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছিলেন। তারপর একটি ছায়াস্থলে ফিরে আসলেন। তারপর বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ বর্ষণ করবে আমি তার ভিখারী。
এই আয়াত ফ্রি-মিক্সিং নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে সুস্পষ্ট একটি দলিল। আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দুই মেয়ে পুরুষদের ভিড় থেকে দূরে দাড়িয়েছিলেন এবং তাদের চলে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। যেন তারা মিক্সিং ছাড়া পানি তুলে আনতে পারেন। ইবনে জারির রহিমাহুল্লাহ ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণনা করে বলেন,
'আমরা দুজন নারী, আমরা পুরুষদের সাথে ভিড় জমাতে পারি না।'
ইমাম বাগাভি রহিমাহুল্লাহ বলেন, বাকিরা শেষ না করা পর্যন্ত আমরা পালিত পশুদের পানি পান করাতে পারি না। কারণ আমরা দুইজন মেয়ে। এই ধরনের ভিড়ের পরিবেশে আমরা আমাদের পশুদের পানি পান করাতে পারি না এবং আমাদের পক্ষে পুরুষদের সাথে মিলিত হওয়াও সম্ভব নয়。
সুতরাং এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নারীদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে পুরুষদের সাথে ইখতিলাত না করা। এই আয়াত থেকে আরেকটি বিষয় বোঝা যায়, সাধারণত ঘরের বাইরে নারীদের জন্য কাজ করা উচিত নয়; বরং ঘরের পুরুষরা এসব কাজ সম্পাদন করবে। একমাত্র অপারগতা কিংবা প্রয়োজনের সময় নারীরা ঘরের বাইরে শরিয়াতের অন্যান্য বিধিমালা মেনে কাজ করতে পারে। এজন্য হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দুই মেয়েকে তাদের দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করল, তারা দুটি কারণ দেখাল। একটি হলো, আমরা পুরুষদের সংস্পর্শে যাব না। এজন্য তাদের প্রস্থানের অপেক্ষায় আছি। অপর কারণটি হলো, আমাদের কোনো ভাই নেই এবং আমাদের বাবাও বৃদ্ধ মানুষ; কাজ করতে অক্ষম। এজন্য আমরা গবাদিপশুকে পানি পান করাতে এসেছি। অর্থাৎ অপারগ হয়ে এসেছিলেন এবং যেহেতু আসতেই হয়েছে, এজন্য বাইরের পরিবেশের আদব রক্ষার্থে ফ্রি-মিক্সিং এড়িয়ে চলছেন।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই আয়াতে ফ্রি-মিক্সিংয়ের বিরুদ্ধে এত সুস্পষ্ট বার্তা থাকার পরেও কিছু বিভ্রান্ত ব্যক্তি এই আয়াতকে ফ্রি-মিক্সিংয়ের পক্ষে দলিল হিসেবে ব্যবহার করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। যেমন বিখ্যাত মডার্নিস্ট আব্দুল হালিম আবু শুক্কাহ তার লিখিত গ্রন্থ তাহরিরুল মারআহ ফি আসরির রিসালাহ-এর ভেতর ফ্রি-মিক্সিংয়ের পক্ষে এই আয়াতটিকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছে। অথচ সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে উম্মাহর সকল মুফাসসির ও ফকিহরা এই আয়াতকে ঠিক সেভাবেই বুঝেছেন, যেমনটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মডার্নিস্টরা সালাফদের সকলের বুঝকে প্রত্যাখ্যান করে যুগের সাথে তাল মেলানোর নামে মনগড়া নিজস্ব ভ্রান্ত বুঝের আশ্রয় নেয়। ইসলামকে কথিত সংস্কারের নামে তাদের মূল ভূমিকাই হলো, সালাফে সালেহিনের আমল ও বুঝকে পেছনে ছুঁড়ে ফেলা।
ফ্রি-মিক্সিংয়ের বিপক্ষে আরেকটি দলিল হলো, নারীদের তালীম বা শিক্ষার জন্য আলাদা স্থান ও দিন নির্ধারণ করে দেওয়ার ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস। আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একজন নারী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল, আমাদের থেকে পুরুষরাই আপনার কাছে অধিকাংশ সময় থাকে। আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য আলাদা দিন নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের তালীম দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
আল্লামা আইনি রহিমাহুল্লাহ এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, অর্থাৎ পুরুষরাই প্রতিদিন আপনার পাশে থাকে এবং ইলম ও দীনি বিষয় শ্রবণ করে। আমরা নারীরা দুর্বল, তাদের ভিড়ে আমরা আসতে পারি না। আমাদের জন্য বিশেষ একটি দিন ধার্য করে দিন। যেদিন আমরা আপনার কাছ থেকে ইলম ও দীনি বিষয় শুনব。
আরেক হাদিসে এসেছে, একজন নারী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, 'পুরুষরা আপনার হাদিস আহরণ করে নিয়ে যায়। আমাদের জন্য নির্দিষ্টভাবে আলাদা স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দিন, যেদিন আমরা আপনার কাছে শিক্ষার জন্য আসব। আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন, আপনি আমাদের তা শেখাবেন।' তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'অমুক দিন অমুক স্থানে তোমরা একত্রিত হবে। এরপর থেকে নারীরা নির্ধারিত সময় ওই জায়গাতে একত্রিত হতো এবং তিনি তাদের আল্লাহ যা শিখিয়েছেন তার শিক্ষা দিতেন।'
উপরে উল্লেখিত দুটি হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসুলের যুগে নারী সাহাবিরাও পুরুষদের সাথে সাধারণ মেলামেশা থেকে দূরে থাকতেন। অথচ তারা ছিলেন এই উম্মতের মাঝে সবচেয়ে পবিত্র হৃদয় ও পরিচ্ছন্ন ঈমানের অধিকারী। যদি ফ্রি-মিক্সিং অনুমোদিতই হতো, তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের পুরুষদের সাথেই আসতে বলতেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে শিক্ষা, মসজিদ, রণক্ষেত্র কোথাও ফ্রি-মিক্সিং ছিল না। যেমনটা মডার্নিস্ট মুসলিমরা দাবি করে। মসজিদে নামাজের সময়ও নারীরা পুরুষদের থেকে আলাদা থাকতেন। এমনকি হাদিসে এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় যে, নারীরা অন্য কোনো পুরুষকে পাঠিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রশ্ন পৌঁছাতেন। স্বয়ং নারীরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করার যেসব বর্ণনা আছে, সেগুলো থেকেও ফ্রি-মিক্সিং সাব্যস্ত হয় না। কারণ তারা পুরুষদের থেকে আলাদা জায়গায় অবস্থান করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করতেন।
রাসুলের যুগে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নারীরা যুদ্ধের ময়দানে অংশগ্রহণ করত না। কারণ সাধারণত ময়দানের যুদ্ধ নারীদের ওপর আবশ্যক নয়। এজন্যই হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিহাদের সওয়াবের তামান্না প্রকাশ করলে তিনি তাকে বলেন, কবুল হজই হলো তোমাদের জিহাদ।
তবে প্রয়োজনের স্বার্থে বেশ কিছু যুদ্ধে নারীরা অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ লডাইয়ের জন্য ছিল না। ছিল আহতদের স্বাস্থ্য সেবা ও খাবার-পানীয় সরবরাহের জন্য। এই বিষয়টিকেও মডার্নিস্টরা ফ্রি-মিক্সিং বৈধ হওয়ার জন্য দলিল হিসেবে পেশ করে। অথচ এই ঘটনা থেকেও ফ্রি-মিক্সিং প্রমাণিত হয় না। কারণ তারা পুরুষদের থেকে পৃথক হয়ে কাফেলার সঙ্গী হতো। যেমনটা সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে এসেছে-উম্মে আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাতটি যুদ্ধে ছিলাম। সেগুলোতে আমি কাফেলার পেছনের থাকতাম। আর তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের দেখাশোনা করতাম।'
ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ আরও পরিষ্কার করে বলেছেন। যেসব নারীরা যুদ্ধে অংশ্রহণ করত, তারা সেনাদের পানি সরবরাহ করার ক্ষেত্রে পানির পাত্র পুরুষদের নিকটতম স্থানে রেখে দিয়ে আসত। আর পুরুষরা সেটা নিজেরা পান করে নিত। এমনিভাবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে তারা ক্ষতস্থানের জন্য ওষুধ প্রস্তুত করত। কিন্তু পুরুষদের অবৈধভাবে স্পর্শ করত না। আর তাদের মধ্যে বয়স্ক নারীদের জন্য মুখ খোলা রাখার বৈধতা ছিল। আর যুবতীরা মুখ ঢেকে রাখত।
এই প্রসঙ্গে ইমাম নববি রহিমাহুল্লাহ বলেন, নারীরা সাধারণত তাদের মাহরাম পুরুষ ও স্বামীদের চিকিৎসা করত। আর গাইরে মাহরাম পুরুষদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া স্পর্শ পর্যন্ত করতেন না।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, যুদ্ধের মতো প্রয়োজনের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করে স্বাভাবিক কোনো জিনিসের বৈধতা প্রমাণ করা যায় না। সালাফদের কেউই এসব বর্ণনা থেকে ইখতিলাতের বৈধতার কথা বলেননি। তারা নির্দিষ্ট কোনো ঘটনাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে দেখিয়ে ইখতিলাতকে ব্যাপকভাবে বৈধতা দেননি এবং উৎসাহও প্রদান করেননি; বরং কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। ফ্রি-মিক্সিংকে বৈধ করার জন্য মডার্নিস্টরা যেসব দলিল দেখাতে প্রচেষ্টা করে, তার সবগুলো দলিল এখানে খণ্ডন করা সম্ভব না এবং এটার প্রয়োজনও নেই। আমরা যদি তাদের এই সমস্ত দলিল উপস্থাপনের পেছনের মৌলিক সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পারি, তবেই তাদের দলিলগুলোর অসারতা বুঝতে পারব। আর সেই মৌলিক সমস্যাটা হলো, কুরআন-সুন্নাহর বিভিন্ন ঘটনাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করা এবং যুগ চাহিদা কিংবা ইজতিহাদ, তাজদিদ, মাকাসিদ, মাসালিহ ইত্যাদির নামে সালাফে সালেহিনের বুঝকে অগ্রাহ্য করে প্রবৃত্তি কিংবা পশ্চিমা সভ্যতার আদলে মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করা। এটাই তাদের মূল সমস্যা। কিন্তু এই কথা সব যুগের সব আলেমদের কাছে ঐকমত্যে স্বীকৃত যে, সালাফদের বুঝ ও আমলের বাইরে গিয়ে ইসলামকে বোঝা সম্ভব না। যারাই এই কাজ করতে গিয়েছে তারাই ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে নিয়ে ফ্রান্স ও ব্রিটিশদের উপনিবেশের আগে মুসলিম-সমাজে ফ্রি-মিক্সিংয়ের সংস্কৃতি ছিল না। প্রথমে উপনিবেশবাদীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে ফ্রি-মিক্সিংয়ের প্রচলন শুরু করে। আর সেটাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য পশ্চিমা সভ্যতায় প্রভাবিত একদল কথিত বুদ্ধিজীবি কুরআন-সুন্নাহকে বিকৃত করে। এর আগ পর্যন্ত ফুকাহায়ে কেরামের কোনো কিতাবে ইখতিলাত হারাম হওয়ার ব্যাপারে ন্যূনতম বিতর্ক দেখা যায় না। উপনিবেশের সাথে সাথে মুসলিম দেশগুলোতে এই বিতর্ক প্রবেশ করেছে কাসিম আমিনের মতো কিছু লোকের হাত ধরে। যারা ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় সাদা চামড়ার লোকদের সেবা করে গেছে এবং আজও কিছু মুসলিম বুঝে কিংবা না বুঝে নিষ্ঠার সাথে এই সেবা পালন করে যাচ্ছে। আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে এদের ভ্রান্তি থেকে নিরাপদ রাখুন এবং তাদেরও সঠিক বোধ ও বুঝ দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
২৩৯. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১২৫
২৪০. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৮৪৪
২৪১. জামে তিরমিযি, হাদিস ২১৬৫
২৪২. আল মারআतु বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১২৫
২৪৩. সুরা কাসাস, আয়াত ২৩-২৪
২৪৪. জামিউল বায়ান ফি তাওইলিল কুরআন
২৪৫. মাআলিমুত তানযিল
২৪৬. দুঃখজনক বিষয় হলো, বিখ্যাত দুজন ব্যক্তি বইটির শুরুতে প্রশংসাসুলভ অভিমত লিখে দিয়েছেন। একজন হলেন শায়খ মুহাম্মাদ আল গাজ্জালি, অন্যজন হলেন শায়খ ইউসুফ আল কারজাতি। শায়খ ইউসুফ আল কারজাভিও তার বিভিন্ন লেখায় ফ্রি-মিক্সিংকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেন এবং এটাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে নিয়ে এই পর্যন্ত ইসলামি সভ্যতার একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মূলত মুসলিমনের ভেতর আধুনিক সংস্কারবাদী যেই ধারাটি রয়েছে তাদের সকলের ভেতরই কমন কিছু বৈশিষ্ট আছে। এখানে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ নেই। আমরা ভিন্ন কোনো গ্রন্থে তাদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার ইরাদা রাখি। ইনশাআল্লাহ।
২৪৭. সহিহ বুখারি, হাদিস ১০১
২৪৮. উমদাতুল কারি, ২/২৩৪ পৃষ্ঠা
২৪৯. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬৬৯৯
২৫০. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪৪২২
২৫১. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৬৯০
২৫২. আল মুফহিম লিমা উশকিলা মিন তালখিসি মুসলিম, ৩/৫৪২ পৃষ্ঠা
২৫৩. শরহে নববি লিল মুসলিম, ৬/৪২৯ পৃষ্ঠা