📄 করণীয়
করণীয় :
মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকেই ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুশরিকরা ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে আসছে। আমাদেরকে তাদের মতো কাফের বানানোর জন্য তাদের এই শত্রুতা কেয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। এটি আল্লাহর কুরআনের সুস্পষ্ট বাণী। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ قُلْ إِنَّ هُدَى اللَّهِ هُوَ الْهُدَى وَلَبِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ بَعْدَ الَّذِي جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَكَ مِنْ اللَّهِ مِنْ وَلِي وَلَا نَصِيرٍ.
'ইহুদি ও নাসারা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশি হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে। বলে দাও, প্রকৃত হিদায়াত তো আল্লাহরই হিদায়াত। তোমার কাছে (ওহির মাধ্যমে) যে জ্ঞান এসেছে, তারপরও যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো, তবে আল্লাহর থেকে রক্ষা করার জন্য তোমার কোনো অভিভাবক থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না।'
আমরা যদি আধুনিক ইতিহাসের প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিধি-নিয়মের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। এগুলো কোন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নয়; বরং ওপেন সিক্রেট। স্বয়ং পশ্চিমারাও এই বিষয়গুলো অস্বীকার করবে না।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা নতুন কিছু নয়; বরং পবিত্র কুরআনেও আমরা এর উপস্থিতি দেখতে পাই। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَى قَالَ يَا مُوسَى إِنَّ الْمَلَا يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ .
'(তারপরের বৃত্তান্ত এই যে) নগরের বিলকুল দূর প্রান্ত হতে এক ব্যক্তি ছুটে আসল ও বলল, হে মুসা! নেতৃবর্গ তোমাকে হত্যা করার জন্য পরামর্শ করছে। সুতরাং তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। বিশ্বাস করো, আমি তোমার কল্যাণকামীদের একজন।'
কিন্তু বর্তমান সময়ে সেকুলার, লিবারেল ও মডার্নিস্টদের অনেকে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে উপহাসের অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা এই বলে তিরস্কার করে যে, মুসলিমরা সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র খোঁজে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কিছু লোক ষড়যন্ত্র নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের বিষয়টিকে একেবারেই নাকচ করে দেওয়া বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ছাড়া কিছুই না। যারা ষড়যন্ত্রকে অস্বীকার করে, দেখা যাবে তাদের অধিকাংশই হয়তো পশ্চিমাদের এজেন্ট ও তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী কিংবা তারা পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধ ও অনুরাগী। ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া সবাইকে আপনি এই ক্যাটাগরিতে খুঁজে পাবেন।
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য হলো, সাধারণভাবে ষড়যন্ত্রকে অস্বীকার করা ষড়যন্ত্রের অংশ। আর ষড়যন্ত্র নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হলো ষড়যন্ত্রে সহায়তা করা। এজন্য যারা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে মুসলিমদের নিয়ে উপহাস করে তাদের অধিকাংশ নিজেরাই এই ষড়যন্ত্রের অংশ (জেনে কিংবা না জেনে, বুঝে কিংবা না বুঝে)। আর র্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্টগুলো থেকে এই বাস্তবতা আরও সুস্পষ্ট হয়ে যায় আমাদের সামনে।
আর যারা ষড়যন্ত্র নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে শত্রুদের ব্যাপারে মুমিনদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে এবং সেই ষড়যন্ত্রগুলোকে অজেয় ও অধরা বানিয়ে মুসলিমদের সামনে উপস্থাপন করে, তারা হলো ষড়যন্ত্রের সহায়তাকারী (বুঝে কিংবা না বুঝে)।
আমরা বিশ্বাস করি কাফেররা প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে যাচ্ছে। কিন্তু আল্লাহ হলেন সেসব চক্রান্তের উত্তম প্রত্যুত্তরদাতা। ফলে তাদের ষড়যন্ত্র হলো মাকড়সার জালের মতো দুর্বল। আমাদের দায়িত্ব হলো, সচেতনতার সাথে সেগুলোর মোকাবিলা করে যাওয়া। আল্লাহ তাআলাই তাদের সকল পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেবেন।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এখানে মুসলিম-সমাজ, বিশেষত মুসলিম নারীদের জন্য করণীয় কিছু বিষয় তুলে ধরব-
১. বিকৃত নারীবাদী আন্দোলন ও ইসলামি শরিয়াহবিরোধী নারী-অধিকারের দাবি উত্তোলনকারী প্রত্যেক প্রচেষ্টা, স্লোগান ও সংস্থার বিরুদ্ধে আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব পালন করা।
২. কর্মের প্রতি মুখাপেক্ষী নারীদের জন্য শরিয়াহবান্ধব পরিবেশ ও সেক্টরের ব্যবস্থা এবং তার দাবিকে জোরদার করা। পাশাপাশি এমন বোনদের বৈধ সেক্টরগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং ইসলামি শরিয়াহ কর্তৃক নিষিদ্ধ সেক্টরগুলো থেকে বিমুখ করে তোলা।
৩. নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অনলাইন ও অফলাইনভিত্তিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা এবং এই ক্ষেত্রে দুটি পর্যায়ে কাজ করা। প্রথমত, ইসলামি শরিয়াহর প্রতি নারীর সম্মান ও গর্বকে ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, নারীবিষয়ক সেকুলার, লিবারেল ও ফেমিনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর অসারতা ও ভ্রান্তিকে সুস্পষ্ট করা।
৪. মুসলিম নারীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু বোনদের তৎপর হওয়া উচিত, যারা আদর্শ ও ইলমি যোগ্যতায় উত্তীর্ণ। এ সমস্ত বোনেরা মুসলিম তরুণীদের মাঝে ইসলামি শরিয়াহর বিধানগুলো আপসহীনভাবে হৃদয়ঙ্গম করে বোনদের সামনে তুলে ধরবেন। তারা প্রভাব বিস্তারকারী হবেন, প্রভাবিত হবেন না। তাদের বক্তব্য হবে সুস্পষ্ট, যেখানে থাকবে না পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে নতি স্বীকার। এর জন্য তারা সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করবেন। নারীদের জন্য বিশেষ একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে তার আওতায় নারী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স ও কর্মশালার আয়োজন করবেন।
৫. বিদ্যমান সমাজে নারীরা যেসব অন্যায় ও জুলুমমূলক আচরণের শিকার হয়, তার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং ইসলামি শরিয়াহর বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং ইসলামি শরিয়াহর আলোকেই তার সমাধান বাস্তবসম্মতভাবে পেশ করা। বিশেষত নির্দিষ্টভাবে যেসব নারী এমন পরিস্থিতির শিকার, কল্যাণ ও সংশোধনের মানসিকতা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি হওয়া জুলুমকে নির্মূল করে তাদের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করা।
৬. নারীদের অন্তরে ওয়ালা-বারার আকিদাকে গেঁথে দেওয়া।
৭. দলবদ্ধভাবে কিংবা সংস্থারূপে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ইসলামবিরোধী স্বার্থসমূহের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মুসলিম বিশ্বের ভেতরগত বিষয়ে সেসব সংস্থার অনুপ্রবেশকে না বলা।
৮. মুসলিম তরুণীদের হায়া, তহারাত ও পর্দার ওপর প্রতিপালন করা। নারীত্ব ও মাতৃত্ব বিষয়ে ইলমি ও তরবিয়তি তৎপরতা বৃদ্ধি করা, যার মাধ্যমে নারীত্ব ও মাতৃত্বে তার ইবাদাত ও স্বভাবজাত দিকগুলো ফুটে উঠবে। বিশেষত মুসলিম নারীদের মাঝে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ও আনুগত্যকে গভীর করে তোলা।
৯. প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।
১০. মুসলিম নারীদের জন্য জরুরি হলো, উপনিবেশবাদী ও প্রাচ্যবাদী সংস্থাগুলো তাদের ওয়েস্টার্নাইজেশন তথা পশ্চিমায়নের জন্য যত চক্রান্ত আবিষ্কার করেছে, সেগুলো ভালোভাবে চিনে নেওয়া এবং তাদের এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে না দেওয়া।
১১. জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যেই অসৎ উদ্দেশ্য, সেটাকে অনুধাবন করা। মুসলিম উম্মাহর জনশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের হুমকি- ধমকিতে প্রতারিত না হয়ে, বরং আল্লাহর রাসুলের গর্বের ব্যবস্থা করা। নিজের সন্তানদের সৎ ও সাহসী মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং সেজন্য বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।
১২. নারীবাদী আন্দোলনগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে জানা এবং এগুলোর ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলা।
১৩. নারীদের নিয়ে প্রাচ্যবাদী গবেষণাসমূহের বিরুদ্ধে মুসলিমদের গবেষণা ও পর্যালোচনা তৈরি করা এবং সেগুলো মুসলিম নারীদের ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া।
১৪. মুসলিম দেশগুলোতে কেবল নারীদের জন্য বিভিন্ন সংঘ, ইন্সটিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। যারা মুসলিম নারীদের পশ্চিমায়নের হাত থেকে বাঁচাতে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ইলমি প্রাচীর তৈরি করবে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে প্রভাবিত মুসলিম বোনদের নীড়ে ফেরানোর জন্য পলিসি প্রস্তুত করবে এবং আধুনিক নারীবাদী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নারীদের ভেতর জাগরণ সৃষ্টি করবে।
১৫. প্রত্যেক নারীকে তার সামাজিক দায়িত্ব পালনের যোগ্য করে তোলা। যাতে সে পরিবার গঠনে এবং পরিবারের ও সন্তানদের লালনপালনে উত্তম অবদান রাখতে পারে। পাশাপাশি তাদের সমাজের নৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের কাজের যোগ্য করে তুলতে হবে। কেননা আমাদের পরিবারগুলোকে, মায়েদের ও নারীদের তাদের প্রকৃত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের পন্থা শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আর এই মহান সংস্কারমূলক কাজে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই অধিকতর উপযোগী ও সক্ষম।
১৬. বিশেষভাবে সমাজের পুরুষদের একটি দায়িত্ব হলো, নারীর পারিবারিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। নারীকে পশ্চিমা ভোগবাদী দর্শনের মতো নিছক উৎপাদক যন্ত্র হিসেবে না দেখা। বর্তমান সময়ে নারীদের পরিবার থেকে বের করার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হলো, পরিবারে তার অবদান খাটো করা। অর্থনৈতিকভাবে কিংবা উপার্জনের দিক থেকে তার অবদানকে মূল্যায়ন না করা। পুরুষদের এই জঘন্য মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেওয়া পুরুষকর্তৃক নারীর ওপর কোনো প্রকার অনুগ্রহ নয়; বরং এটা তার আবশ্যিক দায়িত্ব। যা মহান আল্লাহ তাআলা তার ওপর ধার্য করেছেন।
বড় দুঃখজনক ব্যাপার হলো, প্রকৃতি নারীকে সর্বাধিক মূল্যবান যে জিনিসটি দিয়েছে সেটাই সে হারাতে বসেছে। সে জিনিসটি হচ্ছে তার নারীত্ব। এটা হারিয়ে সে সমস্ত সুখ-শান্তিও হারাচ্ছে। পরিবার হচ্ছে নারী-পুরুষ উভয়ের স্বাভাবিক সুখের নীড়। মাতা ও গৃহিণীর তদারকি ছাড়া এই সুখের নীড় টিকে থাকতে পারে না। পরিবারই সমাজের ও ব্যক্তির সুখের উৎস। পরিবারই কল্যাণ, মেধা ও প্রজ্ঞার সুতিকাগার।
আমাদের দুটো দর্শনের মধ্য থেকে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে। একদিকে রয়েছে ইসলামের দর্শন, যা নারীর মর্যাদা ও সম্ভ্রমের উৎকৃষ্টতম রক্ষক, এবং যা তাকে স্ত্রী ও মা হিসেবে তার সামাজিক দায়িত্ব একাগ্রভাবে পালন করার সুযোগ দেয়। আর এরই বিনিময়ে সমাজকে তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণে ও তার সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে বাধ্য করে। এজন্য ইসলাম স্বামীর ওপর কিংবা স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের ওপর স্ত্রীর ও তার সন্তানদের ভরণপোষণের ভার অর্পণ করে। এতে নারীর অবমাননা কিংবা অবমূল্যায়নের প্রশ্নই ওঠে না। কেননা নারী সেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বটা পালন করে, যা মানব জাতির সুখ-শান্তি ও উন্নয়নের একমাত্র রক্ষাকবচ।
অন্যদিকে আছে পাশ্চাত্য সভ্যতার বস্তুবাদী ও ভোগবাদী দর্শন। এই দর্শন নারীর জৈবিক দাবির ব্যাপারে তার ওপর কঠোর নিষ্পেষণ, নিপীড়ন চালায়। স্ত্রী ও মা হিসেবে তার স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার নিজের জীবিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রমে তাকে বাধ্য করে। তার নারীত্ব নষ্ট করে তাকে পণ্য কিংবা যন্ত্রে রূপান্তর করে। এভাবে নারী নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার সন্তানরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিকভাবে সমাজে পারিবারিক জীবনের স্থিতিশীলতা, সংহতি ও বন্ধন নিদারুণভাবে ব্যাহত হয়।
আমরা যারা মুসলিম, তাদের পক্ষে তো ইসলাম ও তার জীবন বিধানের চেয়ে অন্য কিছুকে অধিকতর কল্যাণকর মনে করা সম্ভবই না। কারণ মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'ওরা কি তবে জাহিলিয়াতের বিধিবিধান চায়? মুমিনদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা আর কে হতে পারে!'
শত্রুরা আমাদের ওপর যেই কৌশল বারবার অবলম্বন করে সফল হতে চাচ্ছে, আমাদের উচিত নয় তার মাধ্যমে প্রতারিত হওয়া। যেমনটা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'মুমিন কখনো একই ফাঁদে দ্বিতীয়বার ধোঁকা খেতে পারে না।' এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদিসে উদাসীন না থাকা এবং নিজেদের মেধা ব্যবহার করার নির্দেশনা আছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُمْ مَا نِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِنَ اللَّهِ فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ.
'আর তিনিই কিতাবিদের মধ্যে যারা কাফের, তাদের প্রথম সমাবেশেই তাদের ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন। (হে মুসলিমগণ!) তোমরা কল্পনাও করোনি তারা বের হয়ে যাবে। তারাও মনে করেছিল, তাদের দুর্গগুলি তাদের আল্লাহ হতে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহ তাদের কাছে এমন দিক থেকে আসলেন, যা তারা ধারণাও করতে পারেনি। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতিসঞ্চার করলেন। ফলে তারা নিজেদের হাতে নিজেদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে ফেলেছিল এবং মুসলিমদের হাতেও। সুতরাং হে চক্ষুষ্মানেরা, তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো!'
বর্তমানে মুসলিমরা যেসব আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে, তার সবগুলোর সূত্র আমরা আধুনিক ইতিহাসের সূচনালগ্নেই খুঁজে পাব। উনবিংশ শতাব্দীর সেসব আগ্রাসন আজও বহাল আছে। বদলেছে ভাষা, পাল্টিয়েছে নাম। আগে যেটা হতো প্রাচ্যবিদের নামে, এখন সেটা চলছে গবেষকের নামে। এখন উপনিবেশের নাম হয়েছে ওয়ার অন টেরর। আমরা যদি তাদের কর্মকৌশলগুলোর বাস্তবতা বুঝতে পারি, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের আগ্রাসনকে আমরা খুব সহজেই প্রতিরোধ করতে পারব। এজন্য এসব বিষয়ে আমাদের দায়ীদের মাঝে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং তাদের সমস্ত প্রকার আগ্রাসন নিয়ে নিজেদের মধ্যে গবেষণা চালু রাখতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ মুসলিম উম্মাহর মাঝে আমরা সচেতনার এক জোয়ার দেখতে পাচ্ছি। এই জোয়ারকে আরও বেগবান ও মজবুত করতে হবে। যেন উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সর্বপ্রকার বহিরাগত আগ্রাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দীনের ছায়ায় জীবনযাপন করতে পারে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর দাসত্বে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
১১৮. সুরা বাকারা, আয়াত ১২০
২১৯. সুরা কাসাস, আয়াত ২০
২২০ বক্তব্যটি ড. সালেহ আব্দুল্লাহ আল গামেদি র্যান্ড কর্পোরেশন নিয়ে তার প্রসিদ্ধ একটি গ্রন্থে ড. রুকাবি থেকে উদ্ধৃত করেছেন। হাফিজাহুমাল্লাহ!
২২১. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১৩৫
২২২. সুরা মায়েদা, আয়াত ৫০
২২৩. আল মারআतु বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১২৩-১২৪
২২৪. মুসলিম, হাদিস ৭৪৮৮
২২৫. ফাতহুল বারি, দারুর রাইয়্যান, ১০/ ৫৪৭ পৃষ্ঠা
২২৬. সুরা হাশর, আয়াত ২
📄 পরিশিষ্ট : ৩
এই পরিশিষ্টটি জাতিসংঘ কর্তৃক পরিবার পরিকল্পনা প্রজেক্টের প্রকৃত চেহারা তুলে ধরার জন্য যুক্ত করা হচ্ছে। পূর্বেও বলেছি এবং আমরা এখানেও শুরুতে বলে নিচ্ছি, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার পেছনে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেসব যুক্তি পেশ করে, তার সবগুলোই অবান্তর। জনসংখ্যা থেকে সৃষ্ট হিসেবে যেসব সমস্যাকে তারা সামনে আনছে, সেগুলো আসলে জনসংখ্যা থেকে সৃষ্ট না; বরং এগুলোর সম্পর্ক তাদেরই কৃতকর্মের সাথে। পৃথিবীর সম্পদের ওপর পুঁজিবাদীদের অবৈধ ও কুক্ষিগত নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজে সম্পদের অসম বণ্টনের ফলে জনগোষ্ঠী তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারের ফলে নারীরা অনেক সময় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় পড়ছে। এমনকি এগুলো নারীর মানসিক ও যৌন স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।
জনসংখ্যা কম হলেই যে একটা দেশের মানুষ সুখে থাকবে তা মোটেও সত্য নয়। বর্তমান দুর্ভিক্ষকবলিত এলাকাগুলোর তালিকা করলে সোমালিয়ার নাম প্রথম দিকেই থাকবে। অথচ সোমালিয়ার আয়তন ৬ লাখ ৩৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার, যা বাংলাদেশের ৪ গুণেরও বেশি। আর জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি, যা বাংলাদেশের ১৬ ভাগের ১ ভাগ। তথাপি সোমালিয়া অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা নিম্নগামী।
মহান আল্লাহ তাআলা এই জগতের কারিগর। তিনি মানুষের সাধারণ জন্মদানক্ষমতার হারেই প্রকৃতিকে প্রস্তুত করে তোলেন। আগের থেকে পৃথিবীর উৎপাদন বেড়েছে, অনাবাদি ও পরিত্যক্ত জায়গা আবাদ হচ্ছে, এমনকি পৃথিবীতে নতুন আবাসস্থলেরও আবিষ্কার হয়েছে। আমেরিকা আবিষ্কারের আগে কে জানত যে, এরকম একটি ভূমি মানুষের বসবাসে ভরপুর হয়ে উঠবে। সুতরাং এই সবকিছুই আল্লাহর পরিচালনাধীন। তিনি বলেন, 'আমার কাছে প্রতিটি বস্তুর ভান্ডার আছে। আমি এর থেকে প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুসারে রিজিক অবতীর্ণ করি।'
এজন্য মানুষের জন্ম ঠেকানোর আন্তর্জাতিক আয়োজন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর জগৎ পরিচালনায় হস্তক্ষেপের নামান্তর। আমাদের দায়িত্ব প্রকৃতির সম্পদকে সুষম বণ্টন ও যথাযথভাবে ব্যবহার করা। আল্লামা তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ এই বিষয়ে খুব সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। মনে করুন আপনি একটি ছোট ঘর বানিয়েছেন। ঘরটি এত নিচু যে, আপনি ঘরের ভেতর সোজা হয়ে ঢুকলে আপনার মাথা ঘরের চাল কিংবা ছাদে গিয়ে ঠেকে। এমতাবস্থায় আপনি ঘরের ভেতর সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুবিধার্থে আপনার পা দুটি কেটে নিজেকে ছোট করে ফেলা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে? নাকি ঘরের চালটা আরেকটু উঁচু করতে হবে? কোনো বিবেকবান ব্যক্তিই কিন্তু পা কাটার পক্ষে সায় দেবেন না। তেমনি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রবক্তারাও সীমিত সম্পদের সুষম উৎপাদন ও বণ্টনের ব্যবস্থা না করে আল্লাহর সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ মানব সন্তানের জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করে সাম্যতার বিধান করতে চায়। এটি কত বড় নির্বুদ্ধিতা ও হাস্যকর বিষয়।
মূলত বিগত শতাব্দীতে পরিবার পরিকল্পনা নামে যেই প্রজেক্ট বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে, এটির সাথে পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমা রাজনীতির উদ্দেশ্যমূলক সম্পর্ক আছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ১৮ শ শতাব্দীতেও টমাস ম্যালথাস জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য আওয়াজ তুলেছিল। তবে তার প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপটের ধরন আজকের জন্মনিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। বলা যায় ১৯৭৪ সালে হেনরি কেসিঞ্জার এই প্রকল্পের মাঝে একটি নতুন রূপদান করে এবং বিশ্বব্যাপী একটি পলিসি হিসেবে পরিবার পরিকল্পনাকে ছড়ানোর ব্যবস্থা করে। ১৯৭৪ সালে তার নির্দেশনায় USNSC এর অধীনে একটি পলিসি হিসেবে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়। রিপোর্টির নাম হচ্ছে, National security study memorandum ২০০ (NSSM ২০০)। আমেরিকান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পলিসি হিসেবে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে এবং পুরো রিপোর্টে আমেরিকার স্বার্থকেই সামনে রাখা হয়েছে।
এই রিপোর্টে তারা আলোকপাত করেছে, কীভাবে অনুন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের জনশক্তিকে দমিয়ে রাখা যায় এবং সেই সুযোগে তাদের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ থেকে কীভাবে আমেরিকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায়। এবং এইজন্য তারা ইউনাইটেড ন্যাশন, ইউএসএআইডি, ইউএসআইএ এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি সেসব দেশের সরকারকেও এই ব্যাপারে নিজ থেকে উদ্যোগী করে তোলার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য দারিদ্রের ভীতি তৈরির পাশাপাশি তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিসমূহের বিস্তার, গর্ভপাতকে স্বাভাবিককরণ এবং নারীদের বিয়েকে বিলম্বকরণসহ তাদের শিক্ষাকার্যক্রমকে দীর্ঘায়িত করে কর্মসংস্থানে নিয়ে আসাকে পলিসি হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ এতে প্রথমত নারীদের মাঝে নিজ থেকেই পরিবার ও সন্তান গ্রহণের ব্যাপারে অনীহা তৈরি হবে, দ্বিতীয়ত বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের বাচ্চাদান ক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকবে। যদিও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মেয়েদের উপযুক্ত বয়সে বাচ্চা না নেওয়ার একটি মিথ উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সত্য হলো, ৩০ বছরের আগ পর্যন্ত সন্তান জন্মদানের সবচেয়ে সফল ও কার্যকর সময় থাকে। ৩০ এর পর মা হওয়ার জটিলতা বাড়তে থাকে। এই সময় থেকে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগতমান হ্রাস পেতে থাকে। অথচ শিক্ষা, ক্যারিয়ারের পেছনে পড়ে বর্তমান সমাজের অধিকাংশ মেয়ে বিয়েই করছে ৩০ এর কাছাকাছি গিয়ে। যার দরুন বর্তমান অধিকাংশ নারীদের বাচ্চাদান ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে ১৯৫০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একজন নারীর সন্তান জন্মদানের হার সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৬৮ সালে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই হার কমতে থাকে। ক্রমাগত এই হ্রাস ২০২১ সালে এসে জনপ্রতি ১.৯৭৯ এসে দাঁড়ায়, যা ২০২০ এ ২.০০৩ এ ছিল。
পাশের দেশ ভারতে জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রকল্প একরোখাভাবে মুসলিমদের ওপর দমননীতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরএসএস, বজরং ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো দলগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জিগির তুলেছে। তারা সেটাকে 'পপুলেশন জিহাদ' বলে আখ্যায়িত করছে। এজন্য তারা মুসলিম এলাকাগুলোতে দুই সন্তানের অধিক সন্তান নেওয়া যাবে না মর্মে আইন প্রণয়ন করছে। কিন্তু হিন্দুদের বেশি বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। যারা জনসংখ্যা বিস্ফোরণের দোহাই দিয়ে মুসলিম জনসংখ্যাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তৎপর, সেসব হিন্দুত্ববাদী নেতাদের কারও কারও তিন থেকে পাঁচ এর অধিক সন্তান আছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ইসলামাইজেশন করার জন্য মুসলিমদের ভেতর একটি দল প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। তাদের কাছে যখন সন্তান হত্যা নিষেধাজ্ঞা সংবলিত আয়াত পড়া হয়, তখন তারা সন্তান হত্যা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের মাঝে পার্থক্য তুলে ধরেন। তারা বলেন, আয়াতে তো সন্তান হত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে, জন্মনিয়ন্ত্রণকে নয়। অথচ এটি মারাত্মক ভুল। কুরআনুল কারীমে 'তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না'-এর ওপর কথা সমাপ্ত করেনি; বরং এই অংশের পরেও আরও কথা আছে। সেটা হলো দরিদ্রতার ভয়ে, এরপর সামনে গিয়ে তিনি এর কারণও উল্লেখ করে দিয়েছেন যে, আমি (আল্লাহ) তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করি এবং তোমাদের রিযিকের ব্যবস্থাও করি。
যারা এই আয়াত থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণের নিষেধাজ্ঞা খুঁজে পান না, তাদের অবস্থা মূলত ওই ব্যক্তিদের মতো, যারা সুরা নিসার ৪৩ নং আয়াত দিয়ে নামাজ থেকে দূরে থাকার কথা বলেন। এই আয়াতের প্রথম অংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তোমরা নামাজের কাছে যেয়ো না'। এখন কেউ যদি পরবর্তী অংশ খেয়াল না করে বলে যে, আল্লাহ তাআলা সর্বাবস্থায় নামাজের কাছে না যেতে বলেছেন, তখন কি তার দাবি ঠিক হবে? অথচ আয়াতের পরের অংশেই আল্লাহ বলে দিয়েছেন যে, অচেতন-মাতাল অবস্থায় যেন আমরা নামাজে না দাঁড়াই।
এ ছাড়াও আযল করার অনুমতি-সংক্রান্ত কিছু হাদিস দিয়ে বর্তমান জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টকে তারা বৈধ করতে চায়। অথচ এর বিপরীত হাদিসও আছে। দুই প্রকার হাদিস থেকে ফুকাহায়ে কেরাম বিশ্লেষণ করে যেই গবেষণালব্ধ ফলাফল বের করেছেন, সেটা জন্মনিয়ন্ত্রণ অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। যার থেকে স্পষ্ট যে, নির্দিষ্ট ওজর ও সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি জায়েয আছে। তবে সেটাও হতে হবে অসৎ উদ্দেশ্যবিহীন। তাই বলে এই পদ্ধতির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রসার ঘটানো ইসলাম-পরিপন্থি কাজ। আর এই পদ্ধতি অবলম্বন করাকে দেশ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতির সোপান আখ্যায়িত করা, যেটাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকারক ও অপছন্দ করেছেন, তা কিছুতেই জায়েয হতে পারে না।
বর্তমান জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টকে এককভাবে দেখলে ভুল হবে। এই প্রজেক্টের ভেতর একই সাথে নারীর কর্মজীবি হওয়ার বাসনা, পরিবার ও সন্তান জন্মদানের প্রতি অনাগ্রহ এবং তার বিয়েকে ক্যারিয়ারের পেছনে পড়ে বিলম্বকরণের মতো সমাজ বিধ্বংসী আরও অনেক ফ্যাক্ট জড়িত। মূলত মুসলিম নারীদের নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও আধুনিক প্রাচ্যবাদের যেই পরিকল্পনা রয়েছে, সেই পরিকল্পনার প্রতিটি অংশ একে অপরের সাথে জড়িত।
আমরা যদি সৃষ্টিগতভাবে নারীদেহের গঠন ও তার ভাবাবেগ ইত্যাদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে দেখব মাতৃত্ব একজন নারীর স্বভাবজাত কামনা-বাসনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার ফিতরাত নষ্ট না হয়ে গেলে কখনো সে এর প্রতি অনাগ্রহী হতে পারে না। তার শরীরের সকল আয়োজন যেন মানব সভ্যতাকে বিকাশপূর্বক টিকিয়ে রাখার জন্য। তার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই মহান দায়িত্বভারের জন্য ব্যাকুল থাকে। আমাদের নারীদের এই ব্যাকুলতাকে গভীর মমতার সাথে অনুভব করতে হবে। বহির্গত কোনো কিছু যেন তার এই ব্যাকুলতাকে নষ্ট করতে না পারে।
এই ব্যাকুলতাকে লালনপালন করে পুরো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, এই ব্যাকুলতা তার মহান রবের দেওয়া আমানত। এটাকে পবিত্র রাখতে হবে। রবের দেওয়া দায়িত্ব অনুযায়ীই এই ব্যাকুলতাকে কাজে লাগাতে হবে।
টিকাঃ
২৬০. ইসলাম ও যুক্তির কষ্টিপাথরে জন্মনিয়ন্ত্রণ, ৬৩ পৃষ্ঠা
২৬১. সুরা হিজর, আয়াত ২১
২৬২. ইসলাম ও যুক্তির কষ্টিপাথরে জনানি
২৬৩. www.macrotrends.net/countries/BGD/bangladesh/fertility-rate
২৬৪. https://www.thehindu.com/news/national/other-states/Produce-more- children-RSS-tells-Hindu-couples/article14582028.ece
২৬৫. https://www.ndtv.com/india-news/population-control-madhya-pradesh-bjp- leaders-want-up-like-population-control-law-2490093
২৬৬. সুরা ইসরা, আয়াত ৩১
২৬৭. আযল বলা হয়, স্বামী-স্ত্রী যৌন মিলনের পর চরম উত্তেজনার সময় বীর্য নারীর লজ্জাস্থানের বাইরে নির্গত করা。
২৬৮ ইসলাম ও যুক্তির কষ্টিপাথরে জন্মনিয়ন্ত্রণ, পৃষ্ঠা ২৪; জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মৌলিকভাবে ইসলাম ও বাস্তবতার অবস্থান জানতে বাংলা ভাষায় এই বইটি একটি চমৎকার কাজ। মূল লেখক আল্লামা তাকি উসমানي হাফিজাহুল্লাহ, অনুবাদক মাওলানা ফাহিম সিদ্দিকি, প্রকাশনায় আহবান শাশনী। এ ছাড়াও মুফতি দেলোয়ার হুসাইন হাফিজাহুল্লাহ তাঁর ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিষয়ে ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন এবং বৈধতাদাতাদের কাজ। আন সে বইটিও দেখতে পারেন।