📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 হিজাবের প্রতি র‍্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা ও মুসলিমদের দায়িত্ব

📄 হিজাবের প্রতি র‍্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা ও মুসলিমদের দায়িত্ব


ওপরের আলোচনা থেকে একটা বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায়, নারী-স্বাধীনতা একটি পশ্চিমা রাজনৈতিক পরিভাষা। যাকে পশ্চিমাদের স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবহার ও ব্যাখ্যা করা হয়। তারা যেটাকে স্বাধীনতা মনে করবে সেটাই স্বাধীনতা, যা দ্রুত নারীর ইচ্ছা ও আগ্রহের বিরুদ্ধে যায়। আবার তারা যেটাকে স্বাধীনতার বিরোধী মনে করবে, সেটাই স্বাধীনতার পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হবে। চাই নারীরা সেটা যত আগ্রহ ও সন্তুষ্টির সাথে কামনা করুক না কেন।
মূলত মুসলিম নারী সম্পর্কে র‍্যান্ড কর্পোরেশনের দৃষ্টিভঙ্গির নমুনা নতুন কোনো বিষয় নয়। এমন না যে, তারাই প্রথম মুসলিম নারীদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। উপনিবেশবাদীরা মুসলিম দেশগুলোতে দখলদারিত্ব ও লুটপাট চালানোর সময় মুসলিমদের ওপর তাদের উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার সিলসিলা তৈরি করে গেছে। যা বর্তমানে বিভিন্ন নামে ও স্লোগানে চলমান আছে।
মিশরে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ১৮৯৪ সালে সর্বপ্রথম একটি বই প্রকাশিত হয়। যার নাম ছিল আল মারআতু ফিশ শারকি তথা প্রাচ্যের নারী। বইটির লেখকের নাম মার্ক ফাহমি। লেখক বইটিতে ইসলামি শরিয়াহর ওপর নোংরা আক্রমণ চালায় এবং নারীদের ইসলামি শরিয়াহ থেকে মুক্ত হবার আহবান জানায়। এমনিভাবে উপনিবেশ আমলের কাসিম আমিন, হুদা শারাওয়িরাও এই একই ভূমিকা পালন করে। উপনিবেশ আমলের তৈরি করা সেই সিলসিলা আধুনিক বিভিন্ন কাঠামোতে আজও কাজ করে যাচ্ছে। বইয়ের শুরুতে আমরা বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরে ধরেছি।
ইসলামি শরিয়াহ গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষের মাঝে নৈতিক কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যা মূলত নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মানই রক্ষা করে। পাশাপাশি সমাজকে নৈতিক অধঃপতন ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বভাবজাত হায়াকে বজায় রাখা, হিজাবের পাবন্দ করা, দৃষ্টি অবনত রাখা, সাধারণত ঘরেই অবস্থান করা, ফ্রি-মিক্সিং-এ না জড়ানো, নিম্নস্বরে কথা বলা, মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর না করা, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া, হারাম রিলেশনে না জড়ানো-এই সবগুলো ব্যাপার নৈতিকতার রক্ষাকবচ। পশ্চিমারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এই সুরক্ষা কবচগুলো ভেঙে দিতে। যেন তারা মুসলিমদের ওপর সর্বদা নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্ট তৈরিকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন গবেষক হলো। শেরল বেনার্ড। যে একজন ইহুদি নারী। মুসলিম নারীর পর্দার বিরুদ্ধে ইহুদিদের শত্রুতা অনেক পুরনো। এই ইহুদিদের একজন বনু কাইনুকার বাজারে আমাদের এক বোনকে বেপর্দা করে সম্ভ্রমহানি করেছিল। এই সম্ভ্রমহানি আঘাত হেনেছিল একজন সাহাবির আত্মমর্যাদায়। অভিশপ্ত সেই ইহুদিকে রাসুলের সাহাবি সেখানেই হত্যা করে ছিলেন এবং তিনি নিজেও ইহুদিদের হাতে শাহাদাতবরণ করেছিলেন।
পর্দা ইসলামি শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কিতাবে এর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মোবারক হাদিসে এর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। রাসুলের যুগ থেকেই মুসলিম নারীরা পর্দার বিধান পালন করে আসছিলেন আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যস্বরূপ। বর্তমান সময়ে মুসলিম নারীদের জন্য জরুরি হলো, বিচ্ছিন্ন ও উদ্দেশ্যমূলক মতের ব্যাপারে সচেতন থাকা। পশ্চিমাদের কথায় কিংবা তাদের অনুসারীদের বক্তব্যে নিজের দীনের ব্যাপারে প্রতারিত না হওয়া, হীনম্মন্যতায় না ভোগা; বরং নিজের ভেতর এবং আশপাশের মুসলিম বোনদের ভেতর পর্দার গুরুত্ব রোপন করা। এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, হিজাব মহান রবের দেওয়া এক আবশ্যকীয় বিধান, যার পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ রয়েছে।
হিজাবের বন্ধন ও চেতনা থেকে ছিন্ন হওয়া অনেক বড় একটি গুনাহ। যা একই সাথে আরও অনেকগুলো বড় বড় পাপের দিকে নিয়ে যায়। যেমন শরীরের কোনো অঙ্গকে প্রকাশ করা, দেহে সাজ-সজ্জার মাধ্যমে কৃত্রিম সৌন্দর্য প্রকাশ করা, অন্যকে ফিতনায় ফেলা। নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন ও অবাধ চলাফেরা সামাজিক অধঃপতনকে তরান্বিত করে এবং আল্লাহর শাস্তিকে দুনিয়ায় নামিয়ে আনে। আর পরকালে এই ধরনের নারীরা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
হিজাব কেবল কোনো চয়েজের বিষয় নয়, এটি মহান আল্লাহর তাআলার দেওয়া আবশ্যকীয় বিধান। হিজাব কোনো প্রতীকী বিষয়ও নয়, এটি মহান আল্লাহর প্রতি আমাদের নিঃশর্ত আনুগত্য ও দাসত্বের নিদর্শন।
হিজাব আমাদের আকিদা ও ইবাদাহ। হিজাব যখন মুসলিম নারীদের আকিদা, তখন কেউ তাদের এই আকিদার বন্ধন থেকে ছিন্ন করতে পারে না। হিজাব যদি মুসলিম নারীর জন্য মহান রবের আনুগত্য হয়, তাহলে কেউ তাকে আনুগত্যের রশ্মির ব্যাপারে প্রতারিত করতে পারে না।

টিকাঃ
১৭৪. সিরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৪৮ পৃষ্ঠা, মুস্তাফা আস সাকা ও আব্দুল হাফিজ শিবলি এর তাহকিককৃত নুসখা।
১৭৫. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দুই শ্রেণির লোক জাহান্নামি, যাদের আমি আমার যুগে দেখে যাইনি। প্রথম শ্রেণি : তারা এমন এক সম্প্রদায়, তাদের সাথে থাকবে গরুর লেজের মতো একধরনের লাঠি, যা দিয়ে তারা মানুষকে পিটাবে। দ্বিতীয় শ্রেণি হলো, কাপড় পরিহিতা নারী, অথচ নগ্ন। তারা পুরুষদের আকৃষ্টকারী এবং নিজেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট। তাদের মাথা হবে উটের কুঁজের মতো বাঁকা। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও তারা পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ অনেক অনেক দূর থেকে পাওয়া যাবে। -সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৫৮৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00