📄 হিজাবের বিস্তার লাভ ও র্যান্ডের পর্যবেক্ষণ
র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের এক রিপোর্টে হিজাব বিস্তার লাভের প্রসঙ্গে বলে, মুসলিম তরুণীদের মাঝে হিজাব ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে। তুরস্ক, মরক্কো, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া সব জায়গাতেই মুসলিম তরুণীদের মাঝে হিজাবের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান। তাদের মতে, হিজাবের এই বিস্তার লাভ ইসলামি আন্দোলনের অগ্রগতির নিদর্শন, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৭০ সালে।
পাশাপাশি র্যান্ড কর্পোরেশন এর কারণ অনুসন্ধানেরও চেষ্টা করে। মুসলিম নারীদের মাঝে হিজাবের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া দীনদারিতা না-কি কেবল সামাজিক ট্রেন্ড? ইরানি নারীদের ক্ষেত্রে তারা দ্বিতীয় কারণকে প্রাধান্য দিয়েছে।
একই সাথে তারা মুসলিম নারীদের হিজাব ছাড়ার বিষয়টিকেও পর্যবেক্ষণে রেখেছে। চাই সেই হিজাব ছাড়াটা আংশিকভাবে হোক অথবা বাহ্যিকভাবে হোক; কিংবা সৌন্দর্য প্রকাশ করে পরিপূর্ণরূপেই হোক। এবং তারা এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকেও ইঙ্গিত করেছে, যারা মুসলিম নারীদের হিজাব ছাড়ানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করছে।
র্যান্ড কর্পোরেশন আরেক রিপোর্টে তুরস্কে হিজাবের প্রসঙ্গ নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ পেশ করে। সেখানে তারা হিজাবের প্রতি তুরস্কসমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে হিজাবের নিষিদ্ধতা ওঠানোর ক্ষেত্রে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির অগ্রগতিমূলক প্রচেষ্টা কী, তা নিয়ে আলোচনা করে। সেই রিপোর্টে একটি বিষয় ফুটে উঠেছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির যেই আগ্রহ, সেটাকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে এবং জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির বিভিন্ন ইসলামি সংশোধনমূলক কাজের ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করছে। ২০০৪ সালে ইউরোপীয় আদালত তুরস্কে হিজাব নিষিদ্ধ থাকার সমর্থনে হিউম্যান রাইটস চাটার প্রকাশ করে।
আমেরিকান ও ইউরোপীয় কিছু সংবাদমাধ্যমে হিজাব পরিহিত নারীর ছবি প্রচার এবং পশ্চিমা বিশ্বে এর সমালোচনা। শেরল বেনার্ড ইউরোপীয় মুসলিমদের মাঝে জনপ্রিয়তা পাওয়া কিছু বইয়ের সমালোচনা করেছে। যেই বইগুলো ইউরোপীয় মুসলিম নারীদের গুণাবলি প্রসঙ্গে বলেছে যে, তারা অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির, মাথা ঢেকে রাখে, কেউ কেউ লম্বা নিকাবও পরে। এবং বইগুলো এই বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রতি নারীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। বেনার্ড এই গুণগুলোর নোংরা সমালোচনা করতে গিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, মিলিয়ন মিলিয়ন সেসব মুসলিম নারীদের ব্যাপারে তাহলে কী বলা হবে, যারা এসবের সরাসরি বিরোধিতা করে?
এর পাশাপাশি বেনার্ড আমেরিকার কিছু সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদেরও সমালোচনা করেছে। শুধু এই কারণে যে, তারা হিজাব পরিহিত নারীর ছবি প্রকাশ করেছে, অথবা হিজাব পরিহিত নারীর সাথে তাদের ছবি প্রকাশ পেয়েছে। আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অফিসিয়াল সাইটের বিশ্ব তথ্যকোষে আমেরিকান মুসলিমদের জীবনাচার তুলে ধরতে গিয়ে হিজাব পরিহিত ও মুখ ঢাকা নিকাব পরিহিত ৩২ জন মুসলিম নারীর ছবি প্রকাশ করেছে। আর মাত্র ১৩ জন বেপর্দা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীর ছবি প্রকাশ করেছে। এজন্য বেনার্ড এই সাইটেরও সমালোচনা করেছে। বেনার্ডের মতে, হিজাব পরিহিত নারীদের ছবি আমেরিকান মুসলিম নারীদের মূল অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং হিজাব পরিহিত নারীরা আমেরিকান মুসলিম কমিউনিটির পার্শটীকার অবস্থানে আছে। অর্থাৎ হিজাব পরিহিত নারীরা আমেরিকায় এতই অল্প যে, তাদের গণনায় ধরা যায় না।
বার্নার্ড তার রিপোর্টের শেষ পরিশিষ্টে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এক পার্লামেন্ট সদস্যের পক্ষ থেকে ২০০২ সালে প্রেরিত একটি চিঠিকেও যুক্ত করে দিয়েছে। সেই চিঠিতে উক্ত সদস্য কিছু বিষয়ের সমালোচনা করেছে। এর মধ্যে কিছুক্ষণ আগে আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইটে বেপর্দার চেয়ে হিজাব ও নিকাব পরিহিত নারীদের ছবি প্রকাশের ঘটনা অন্যতম। এই ঘটনার সমালোচনা করতে গিয়ে উক্ত সদস্য বলে, আমেরিকান মুসলিমদের জীবনাচারের ভিন্নতা তুলে ধরতে গিয়ে এই ধরনের প্রচেষ্টা মূলত কট্টর মুসলিমদের সীমিত পর্যায়ে হলেও হাইলাইট করেছে। এবং আমেরিকাকে এমনভাবে চিত্রায়িত করেছে, যেন এটাই সেই ভূমি যেখানে প্রায় সকল মুসলিম নারী হিজাব পরে। এটি একদিকে যেমন বাস্তবতাবিরোধী, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবেও ফলপ্রসূ নয়।
জাতিসংঘ কি আফগানে বোরকা ও হিজাব ত্যাগকারী নারীদের কাছে এই বার্তাই পাঠাতে চায়? তারা কি পোশাকের স্বাধীনতার জন্য (অর্থাৎ বেপর্দা পোশাকের জন্য) লড়াইকারী ইরানি নারীদের এই ম্যাসেজই দিতে চায়? তারা কি তুর্কি নারীদের কাছে এই বার্তাই পৌঁছাতে চায়? যারা তুরস্কে ইসলামি রাষ্ট্রের আদলে একটি গণতান্ত্রিক সেকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়? আমি এটা কখনোই বিশ্বাস করি না।
চিঠিতে ওই পার্লামেন্ট সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে আরও বলে, এই ব্যাপারগুলো উগ্রবাদ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলো মোটেও তুচ্ছ কোনো বিষয় নয়। চিন্তাদর্শন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার মাধ্যমে আমরা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে বিজয়লাভ করতে পারি। মস্তিষ্ক ও মননের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান উপাদান।
এভাবেই হিজাব র্যান্ড কর্পোরেশনের গবেষক ও আমেরিকান পলিসিতে প্রভাব বিস্তারকারী লোকদের কাছে ওয়ার অন টেররের একটি শব্দে পরিণত হয়েছে। যার দরুন মিডিয়াগুলোও হিজাব কিংবা নিকাব পরিহিত নারীদের ইতিবাচকতার পরিবর্তে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে বেশি আগ্রহী। অধিকাংশ পশ্চিমারাই হিজাবকে পশ্চিমা স্বার্থের দৃষ্টিতে দেখে। ন্যায়, সত্য, বাস্তবতা কিংবা বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ তাদের নেই। এজন্য জার্মানিতে যখন একজন মুসলিম বোনকে অন্য কোনো কারণে নয়, কেবল হিজাব পরার কারণে শহিদ করা হয়েছিল, তখন ইউরোপের মিডিয়াগুলোতে ওই বোনকে নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু হত্যাকারীকে সন্ত্রাসী কিংবা উগ্রবাদী এই ধরনের কোনো ট্যাগ পেতে হয়নি।
যখন সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থলে হিজাবকে নিষিদ্ধ করে, যখন হিজাব পরিহিত মুসলিম নারীরা ইউরোপের পাব্লিক প্লেসে উত্ত্যক্তের শিকার হয়, তখন র্যান্ডের দৃষ্টিতে অভিযুক্তরা অপরাধী নন; বরং হিজাব পরার অধিকার নিয়ে যারা দাবি তোলে, তারাই উগ্রবাদী!
টিকাঃ
১৬১. the muslim world after 9/11-40, 162, 191
১৬২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২০৯
১৬৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৩, ১৫৯, ২৩১
১৬৪. এটি তুরস্কের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ২০০১ সালে দলটিকে প্রতিষ্ঠা করে এবং তার নেতৃত্বে দলটি ২০০২, ২০০৭ ও ২০১১ সালের সংসদ নির্বাচনে জয় লাভ করে। ২০১৪ সালে এরদোয়ান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যান। ২০১৭ সালে সংবিধানের গণভোটের পর তিনি আবার দলের নেতৃত্বে ফিরে আসেন।
১৬৫. The rise of political islam in turkey, p 60-63
১৬৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৭
১৬৭. সিভিল ডেমোক্রেটিক ইসলাম, ৫৪-৫৬ পৃষ্ঠা; পরিশিষ্ট-২, পৃষ্ঠা ৬৭-৬৯
১৬৮. একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সেটা হলো, মূলত ইসলামে হিজাব কিংবা পর্দার বিধান মাথায় এক টুকরো কাপড় ফেলে রাখার নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করে।
বর্তমানে মুসলিম নারীদের জনপ্রিয় একটি মনোভাব হলো, হিজাব পরে সব করা যায়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। এজন্য দেখা যায়, হিজাব পরিধান করে কোন নারী মডেল হলে কিংবা শরিয়াহ কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলে আমরা এই কারণে আনন্দ প্রকাশ করছি যে, মেয়েটি হিজাব পড়েছে। হিজাব নারীদের উন্নতি-অগ্রগতির পথে বাধা কি-না এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের আগে উন্নতি ও অগ্রগতি সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করে নিতে হবে। যদি আমরা উন্নতি-অগ্রগতিকে পশ্চিমা কনসেপ্টে গ্রহণ করি, তবে অবশ্যই শরয়ি হিজাব এর পথে পরিপূর্ণ বাধা সৃষ্টিকারী। আর যদি আমরা উন্নতিকে তার শরয়ি কনসেপ্টে গ্রহণ করি, তবে কখনোই তা নারীর উন্নতি-অগ্রগতির জন্য বাধা নয়; বরং পরিপূর্ণ সহায়ক। এই বিষয়টি মাথায় রাখলে আমাদের জন্য সমাজে হিজাবের বাস্তবতা ও করণীয় সম্পর্কে অনেক বিষয়ই পরিষ্কার হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
১৬৯. সিভিল ডেমোক্রেটিক ইসলাম, পরিশিষ্ট-৩ পষ্ঠা ৭৫
১৭০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৪-৭৫
১৭১. কোনো হিজাব পরিহিত নারীকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলেও সেটার পিছনে থাকে ভিন্ন উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সেই হিজাব পরিহিত নারীকে তারা এই কারণেই ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করছে যে, সে হিজাব পরিধান করেও পশ্চিমা মানদণ্ড অনুযায়ী উইমেন এম্পাওয়ারমেন্টের (নারীর ক্ষমতায়নের) কাজ করে যাচ্ছে, কিংবা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষাকারী কোন বিষয়ে সে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে।
১৭২. https://bit.ly/3ottusH
১৭৩. the muslim word after 9/11, p 391
📄 হিজাবের প্রতি র্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গির পর্যালোচনা ও মুসলিমদের দায়িত্ব
ওপরের আলোচনা থেকে একটা বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায়, নারী-স্বাধীনতা একটি পশ্চিমা রাজনৈতিক পরিভাষা। যাকে পশ্চিমাদের স্বার্থ অনুযায়ী ব্যবহার ও ব্যাখ্যা করা হয়। তারা যেটাকে স্বাধীনতা মনে করবে সেটাই স্বাধীনতা, যা দ্রুত নারীর ইচ্ছা ও আগ্রহের বিরুদ্ধে যায়। আবার তারা যেটাকে স্বাধীনতার বিরোধী মনে করবে, সেটাই স্বাধীনতার পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হবে। চাই নারীরা সেটা যত আগ্রহ ও সন্তুষ্টির সাথে কামনা করুক না কেন।
মূলত মুসলিম নারী সম্পর্কে র্যান্ড কর্পোরেশনের দৃষ্টিভঙ্গির নমুনা নতুন কোনো বিষয় নয়। এমন না যে, তারাই প্রথম মুসলিম নারীদের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে। উপনিবেশবাদীরা মুসলিম দেশগুলোতে দখলদারিত্ব ও লুটপাট চালানোর সময় মুসলিমদের ওপর তাদের উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার সিলসিলা তৈরি করে গেছে। যা বর্তমানে বিভিন্ন নামে ও স্লোগানে চলমান আছে।
মিশরে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে ১৮৯৪ সালে সর্বপ্রথম একটি বই প্রকাশিত হয়। যার নাম ছিল আল মারআতু ফিশ শারকি তথা প্রাচ্যের নারী। বইটির লেখকের নাম মার্ক ফাহমি। লেখক বইটিতে ইসলামি শরিয়াহর ওপর নোংরা আক্রমণ চালায় এবং নারীদের ইসলামি শরিয়াহ থেকে মুক্ত হবার আহবান জানায়। এমনিভাবে উপনিবেশ আমলের কাসিম আমিন, হুদা শারাওয়িরাও এই একই ভূমিকা পালন করে। উপনিবেশ আমলের তৈরি করা সেই সিলসিলা আধুনিক বিভিন্ন কাঠামোতে আজও কাজ করে যাচ্ছে। বইয়ের শুরুতে আমরা বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরে ধরেছি।
ইসলামি শরিয়াহ গাইরে মাহরাম নারী-পুরুষের মাঝে নৈতিক কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যা মূলত নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মানই রক্ষা করে। পাশাপাশি সমাজকে নৈতিক অধঃপতন ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। স্বভাবজাত হায়াকে বজায় রাখা, হিজাবের পাবন্দ করা, দৃষ্টি অবনত রাখা, সাধারণত ঘরেই অবস্থান করা, ফ্রি-মিক্সিং-এ না জড়ানো, নিম্নস্বরে কথা বলা, মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর না করা, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া, হারাম রিলেশনে না জড়ানো-এই সবগুলো ব্যাপার নৈতিকতার রক্ষাকবচ। পশ্চিমারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এই সুরক্ষা কবচগুলো ভেঙে দিতে। যেন তারা মুসলিমদের ওপর সর্বদা নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।
র্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্ট তৈরিকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন গবেষক হলো। শেরল বেনার্ড। যে একজন ইহুদি নারী। মুসলিম নারীর পর্দার বিরুদ্ধে ইহুদিদের শত্রুতা অনেক পুরনো। এই ইহুদিদের একজন বনু কাইনুকার বাজারে আমাদের এক বোনকে বেপর্দা করে সম্ভ্রমহানি করেছিল। এই সম্ভ্রমহানি আঘাত হেনেছিল একজন সাহাবির আত্মমর্যাদায়। অভিশপ্ত সেই ইহুদিকে রাসুলের সাহাবি সেখানেই হত্যা করে ছিলেন এবং তিনি নিজেও ইহুদিদের হাতে শাহাদাতবরণ করেছিলেন।
পর্দা ইসলামি শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কিতাবে এর প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মোবারক হাদিসে এর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। রাসুলের যুগ থেকেই মুসলিম নারীরা পর্দার বিধান পালন করে আসছিলেন আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যস্বরূপ। বর্তমান সময়ে মুসলিম নারীদের জন্য জরুরি হলো, বিচ্ছিন্ন ও উদ্দেশ্যমূলক মতের ব্যাপারে সচেতন থাকা। পশ্চিমাদের কথায় কিংবা তাদের অনুসারীদের বক্তব্যে নিজের দীনের ব্যাপারে প্রতারিত না হওয়া, হীনম্মন্যতায় না ভোগা; বরং নিজের ভেতর এবং আশপাশের মুসলিম বোনদের ভেতর পর্দার গুরুত্ব রোপন করা। এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে, হিজাব মহান রবের দেওয়া এক আবশ্যকীয় বিধান, যার পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণ রয়েছে।
হিজাবের বন্ধন ও চেতনা থেকে ছিন্ন হওয়া অনেক বড় একটি গুনাহ। যা একই সাথে আরও অনেকগুলো বড় বড় পাপের দিকে নিয়ে যায়। যেমন শরীরের কোনো অঙ্গকে প্রকাশ করা, দেহে সাজ-সজ্জার মাধ্যমে কৃত্রিম সৌন্দর্য প্রকাশ করা, অন্যকে ফিতনায় ফেলা। নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন ও অবাধ চলাফেরা সামাজিক অধঃপতনকে তরান্বিত করে এবং আল্লাহর শাস্তিকে দুনিয়ায় নামিয়ে আনে। আর পরকালে এই ধরনের নারীরা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।
হিজাব কেবল কোনো চয়েজের বিষয় নয়, এটি মহান আল্লাহর তাআলার দেওয়া আবশ্যকীয় বিধান। হিজাব কোনো প্রতীকী বিষয়ও নয়, এটি মহান আল্লাহর প্রতি আমাদের নিঃশর্ত আনুগত্য ও দাসত্বের নিদর্শন।
হিজাব আমাদের আকিদা ও ইবাদাহ। হিজাব যখন মুসলিম নারীদের আকিদা, তখন কেউ তাদের এই আকিদার বন্ধন থেকে ছিন্ন করতে পারে না। হিজাব যদি মুসলিম নারীর জন্য মহান রবের আনুগত্য হয়, তাহলে কেউ তাকে আনুগত্যের রশ্মির ব্যাপারে প্রতারিত করতে পারে না।
টিকাঃ
১৭৪. সিরাতে ইবনে হিশাম, ৩/৪৮ পৃষ্ঠা, মুস্তাফা আস সাকা ও আব্দুল হাফিজ শিবলি এর তাহকিককৃত নুসখা।
১৭৫. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'দুই শ্রেণির লোক জাহান্নামি, যাদের আমি আমার যুগে দেখে যাইনি। প্রথম শ্রেণি : তারা এমন এক সম্প্রদায়, তাদের সাথে থাকবে গরুর লেজের মতো একধরনের লাঠি, যা দিয়ে তারা মানুষকে পিটাবে। দ্বিতীয় শ্রেণি হলো, কাপড় পরিহিতা নারী, অথচ নগ্ন। তারা পুরুষদের আকৃষ্টকারী এবং নিজেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট। তাদের মাথা হবে উটের কুঁজের মতো বাঁকা। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও তারা পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ অনেক অনেক দূর থেকে পাওয়া যাবে। -সহিহ মুসলিম, হাদিস ৫৫৮৩