📄 মুসলিম নারীদের পশ্চিমাদের কাতারে নেওয়ার জন্য আকর্ষণ করা
পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম-সমাজের এমন একটি উপাদান তালাশ করে, যা খুব দ্রুত তাদের দ্বারা প্রভাবিত হবে এবং তাদের বন্ধুত্বকে গ্রহণ করে নেবে। তারা দেখতে পেল, নারীরাই হলো সেই সহজ ও দ্রুতগামী উপাদান। এজন্য তারা মুসলিম দেশগুলোর নারীসমাজকে টার্গেট করল। যেন তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা তাদের সহযোগী হতে পারে।
র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের পুরোনো এক রিপোর্টে আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের উপনিবেশ নিয়ে আলোচনা করেছে। রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছিল ডেভিড গ্যালোলা। সে ফ্রান্স উপনিবেশের একজন দায়িত্বশীল ছিল। আলজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নারী এবং আলজেরিয়ার অধিবাসীদের মাঝে থাকা তাদের মিত্র সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সে বলে, 'আমি বিশ্বাস করি, আলজেরিয়ার নারীরা যেই অনুগত জীবনযাপন করছে, আমরা যদি তাদের সেই জায়গা থেকে মুক্ত করতে পারি, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তারা আমাদের পক্ষে কাজ করবে। আমি সেনাবাহিনীর কমান্ডের কাছে একটি চিঠি লিখেছি। সেখানে আমি তাকে বলেছি, আলজেরিয়ান নারীরাই আমাদের সবচেয়ে প্রত্যাশিত সহযোগী।'
নারীদের সহযোগিতা লাভের ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন পলিসি দেখিয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, নারীদের পুরুষদের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া এবং নারী ও পুরুষের মাঝে মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা। পরস্পরের প্রতি এই বিরোধী মনোভাব তৈরি করতে পারলে খুব সহজেই নারীদের তারা নিজেদের দিকে ঝোঁকাতে পারবে।
ঠিক এই পরিস্থিতিটাই আজকে আমরা সমাজে প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি। নারী-পুরুষ একে অপরের সহযোগী ও পরিপূরক না ভেবে একটা প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। সমাজ থেকে এই ঘৃণ্য মনোভাবকে দূর করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়কেই ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ একদিকে কিছু পুরুষদের ব্রাহ্মণীবাদী আচরণ নারীদের জুলুমানা মানসিকতায় ভোগাচ্ছে। আর অন্যদিকে তাদের এই বিষন্নতার সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা নারীবাদী ও লিবারেল গ্রুপগুলো নারীদের দীনবিরোধী আদর্শের শিকার বানাচ্ছে।
নারীদের সহযোগী বানানোর ক্ষেত্রে উপনিবেশবাদীদের আরেকটি পলিসি হলো, নারীদের বিভিন্ন সামাজিক ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক সেবা প্রদান করা। এই ব্যাপারে ডেভিড গ্যালোলার অভিমত হলো, ফ্রান্সের একজন সেনাবাহিনী আলজেরিয়ার কোনো এক গ্রামের একজন বিধবা মহিলাকে খাবার দেয়। যার ফলে ওই নারী উক্ত গ্রামে আমাদের গুপ্ত সহযোগী হয়ে যায় এবং সে অনেক গুরুপূর্ণ তথ্য প্রদান ও গোপনীয় অনেক কাজ আমাদের করে দেয়।
র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের নারী-সংক্রান্ত রিপোর্টটিতে বলেছে, আফগানিস্তানে নারীদের কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান আঞ্চলিকভাবে আমেরিকার জন্য বিভিন্ন সহায়তা লাভের ক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। একাধিকবার সেবা গ্রহণকারী নারীরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছে এবং আমেরিকান শক্তিকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে তারা নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। তাদের কেউ কেউ আমাদের কাছে বিভিন্ন কৌশলগত তথ্যও শেয়ার করেছে।
ওপরের আলোচনা থেকে আমাদের সামনে যেই বিষয়টি ফুটে ওঠে সেটা হলো, বর্তমানে পুরো মুসলিম-সমাজ (এবং আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে) বিশেষত নারীসমাজের মাঝে ওয়ালা-বারা তথা আল্লাহর জন্য সম্পর্ক এবং আল্লাহর জন্যই সম্পর্কচ্ছেদ-এর বিশ্বাস অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছে। আমরা যদি মুসলিম-সমাজে আকিদার এই পাঠকে শক্তিশালী করতে পারতাম, তবে পশ্চিমারা মুসলিমদের মাঝে প্রবেশের জন্য সহজ কোনো দরজা খুঁজে পেত না এবং মুসলিমদের মাঝে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাসাদ ছড়ানোর সুযোগও পেত না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنْتُمْ وَمَنْ يَفْعَلُهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ .
'হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমার পথে জিহাদের জন্য (ঘর থেকে) বের হয়ে থাকো, তবে আমার শত্রুকে এবং তোমাদের নিজেদের শত্রুকে এমন বন্ধু বানিও না যে, তাদের কাছে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছাতে শুরু করবে। অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে, তারা তা এমনই প্রত্যাখ্যান করেছে যে, রাসুলকে এবং তোমাদেরকেও কেবল এই কারণে (মক্কা হতে) বের করে দিচ্ছে যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ। তোমরা গোপনে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো! অথচ তোমরা যা কিছু গোপনে করো এবং যা কিছু প্রকাশ্যে করো, আমি তা ভালোভাবে জানি। তোমাদের মধ্যে কেউ এমন করলে সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হলো।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ. 'হে মুমিনগণ! ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা নিজেরাই একে অন্যের বন্ধু! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদেরকে বন্ধু বানাবে, সে তাদেরই মধ্যে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের হিদায়াত দান করেন না।'
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ . 'আল্লাহ তোমাদের কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন, যারা দীনের ব্যাপারে তাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদের বের করার কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা জালিম। '
আল্লাহর জন্যই আন্তরিক সম্পর্ক এবং আল্লাহর জন্যই সেই সম্পর্কচ্ছেদের বিশ্বাস মুসলিম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পশ্চিমাদের সর্বপ্রকার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্য এক শক্তিশালী প্রাচীর হতে পারে। কারণ যে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দীনের কল্যাণের ভিত্তিতেই সম্পর্ক করবে, সে কখনো ইসলামের শত্রুকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহায়তা করার মতো জঘন্য খেয়ানত করতে পারে না। যে কাফের, মুশরিক ও দীনের শত্রুদের প্রতি আন্তরিক সম্পর্ক রাখবে না, সে কখনো এমন কোনো বিষয় ও ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করবে না, যেটা ইসলাম * মুসলিমদের ক্ষতির কারণ হবে। বারাআতের বিশ্বাস তাকে এই কাজ করতে সাহায্য দেবে।
টিকাঃ
১২৫. ড্যাভিড গ্যালোলা ১৯১৯ সালে তিউনিসিয়ায় এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। এই লোক তখনকার সময় বেশ কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। চীনে ফ্রান্স দূতাবাসে সামরিক এটাচি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এক সেনাদলের নেতৃত্ব ছিল তার হাতে। তাকে বিদ্রোহ দমনবিষয়ক গবেষক হিসবে গণ্য করা হয়। আলজেরিয়ার যুদ্ধের পর সে তার গবেষণা শেষ করার জন্য জাতিসংঘে সফর করে। র্যান্ড তাকে যুদ্ধ-সংক্রান্ত কিছু পলিসি গবেষনাকারে লিখে দিতে বলে এবং সে র্যান্ড কর্পোরেশনের বেশ কিছু সেমিনারেও অংশগ্রহণ করে। ১৯৬৭ সালে সে মৃত্যুবরণ করে।
১২৬. Pacification in Algeria, 1956-1958, rand 2006, p 105, 166
১২৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮০
১২৮. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৯০-১৯১
১২৯. Women and nation building, p 13
১৩০. সুরা মুমতাহিনা, আয়াত ১
১৩১. সূরা মায়েদা, আয়াত ৫১
১৩২. সূরা মুমতাহিনা, আয়াত ৯
📄 বৈশ্বিক বিভিন্ন উদ্যোগ ও সংস্থা কর্তৃক সহায়তা
র্যান্ড কর্পোরেশন চেষ্টা করেছে মুসলিম বিশ্বে নারী বিষয়ে জাতিসংঘের কার্যক্রম যেন একটি স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিতে চলমান থাকে। হোঁচট খেয়ে যেন সেটা হুট করেই পরিবর্তন কিংবা বন্ধ না হয়ে যায়। তাদের নারীবিষয়ক প্রকল্প যেন রাজনৈতিক পরিধি পেরিয়ে একটি সামজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। সাথে সাথে এই প্রকল্প যেন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত না হয়ে আপন গতিতে চলমান থাকে। এতে করে তাদের এই প্রকল্প কোনো প্রকার সংবেদনশীলনতার শিকার না হয়েই মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়নে সফল হবে।
র্যান্ড কর্পোরেশনের সেই স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো, নারীবিষয়ক প্রকল্পকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উদ্যোগের অধীনস্থ করে দেওয়া।
র্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্টের ভাষায়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উদ্যোগগুলোর প্রধান মিশন হলো, তারা একটি বহুমুখী আগ্রাসনে তাদের একক প্রচেষ্টা ব্যয় করবে। ইসলামি বিশ্বে পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে কোল্ড ওয়ারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর প্রসঙ্গে বিল্ডিং মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক নামক রিপোর্টে র্যান্ড কর্পোরেশন বিস্তারিত আলোচনা করেছে। সেখানে তারা বলেছে, জাতিসংঘ তাদের অধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে তাদের উদ্দেশ্য ঠিক করে দেবে এবং বাহ্যিক প্রেক্ষাপট হতে দূরে থেকে তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে যাবে। এবং সংস্থাগুলোকে এমন অবস্থানে ছেড়ে দেবে, যেন জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া সংস্থাগুলো নিজেই পরিচালিত হবে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে যাবে। র্যান্ড কর্পোরেশন এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছে যে, যদি জাতিসংঘ তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত বন্ধুপ্রতিম সংস্থাগুলো থেকে দৃশ্যমান দূরত্ব বজায় রাখে, তবে তাদের তৎপরতা ও সফলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
আন্তর্জাতিক এসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভয়াবহতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়, যখন এরা কোনো প্রকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই মুসলিম দেশগুলোতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। মুসলিম দেশগুলোতে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনকে তারা অত্যন্ত অভিনব ও সহনীয়ভাবে সরাসরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। জাতিসংঘ এই ক্ষেত্রে সরাসরি সাহায্য প্রদান থেকে বিরত থাকে; বরং তাদের সাহায্যপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো নানান চুক্তির অধীনে কিংবা সরাসরি অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে সেসব স্থানীয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করে থাকে, যারা নারীর ক্ষমতায়নসহ এই ধরনের মিশনগুলো নিয়ে কাজ করে। যেই মিশনগুলো মূলত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এজেন্ডারও অন্তর্ভুক্ত।
আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক গবেষণায় ২০০৬ সালে র্যান্ড কর্পোরেশন উল্লেখ করে যে, অতি শীঘ্রই আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইউএসএআইডি দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
বিল্ডিং মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক নামক রিপোর্টে র্যান্ড কর্পোরেশন জানিয়েছে, MEPI নামক সংস্থাটির মৌলিক চারটি ভিত্তির একটি হলো উইমেন এম্পাওয়ারমেন্ট (নারীর ক্ষমতায়ন)। আরব নারীদের নিয়ে ইতিমধ্যে তারা বেশ কিছু প্রজেক্ট বাস্তবায়নও করেছে। এর মধ্যে কিছু প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল মিশরে নারীদের জন্য বিশেষ বেসরকারি সংস্থাসমূহের নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করা, আর কিছু প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও সম্ভাবনাকে উন্নত করা।
রিপোর্টটিতে তারা কানতারা নামক একটি সাইটের দিকেও ইঙ্গিত করে, যেটি জার্মান সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। সাইটটিকে নারী সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচকদের সমাবেশস্থল বলা যায়। ২০০৬ সালে বাহরাইন ইন্সটিটিউট ফর পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্টও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট-এর মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এর কারণ ছিল, এনডিআই নামক আমেরিকান সংস্থাটি ডেমোক্রেসি প্রচার ও সদস্যদের প্রশিক্ষিত করার নামে বাহরাইনের কিছু সিভিল সোসাইটি সংস্থাকে অর্থায়ন ও পরিচালনা করছিল। এর মাঝে দুটি নারীবাদী সংস্থাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
একটি আরবি গবেষণার বর্ণনানুসারে, বেসরকারি সংস্থাগুলো যেসব মিশন বাস্তবায়নে কাজ করছে, সেগুলো আরও বিস্তৃত করার জন্য ১৯৬৭ সালে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি হয়। নির্দেশনাটি নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের বিশেষ ঘোষণা হিসেবে জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত হয়। জাতিসংঘ সেখানে বেসরকারি সংস্থাসমূহের অনুদানপ্রাপ্ত মিশনগুলো আরও বৃদ্ধি করার জন্য আহবান করে। তারা এ-ও উল্লেখ করেছে যে, বেসরকারি নারীবাদী সংস্থাগুলোই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধনে সক্ষম। তারা সামাজিক প্রথা, দীনি মূল্যবোধ, স্থানীয় সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মাধ্যমে এই পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
পশ্চিমা উপনিবেশের সময় আমেরিকান বাহিনী, ন্যাটোর মতো সামরিক সংস্থাগুলো এসব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। যেন সামরিক উপনিবেশের পর সংস্থাগুলো মুসলিম নারীদের জন্য মিশন নিয়ে বেসামরিকভাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি সামরিক সংস্থাগুলোও এই মিশন নিয়ে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত মুসলিম বিশ্বের ওপর সামরিক, রাজনৈতিক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ কায়েম রাখছে।
পশ্চিমা বিশ্বের মদদপুষ্ট ও তাদের সংস্কৃতি ধারণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মুসলিম ও আরব বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও তার শাখা সংস্থাগুলো ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ তৈরি করে যাচ্ছে। মানুষের খাদ্য, ওষুধ ইত্যাদি নিত্যকার প্রয়োজনীয়তার যেই সুযোগ তারা নিচ্ছে, নিশ্চয় সেটা প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক সহমর্মিতা ছাড়া কিছুই না। মানুষের প্রয়োজনীয়তার সুযোগ নিয়ে তারা নতুন এক জীবনপদ্ধতি চাপিয়ে দিচ্ছে। যেই উদ্দেশ্য পশ্চিমা ও উপনিবেশবাদী স্বার্থ কায়েম রাখে। ইসলামের প্রায় সকল বিবেচনায় আঘাত করে। সেই সাথে মানুষের সকল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রথাকেও জখম করে দেয়।
মুসলিম উম্মাহর উচিত, তাদের সেবাসংস্থাগুলোর ঐতিহ্যগত অবস্থানকে ফিরিয়ে আনা; যার মাধ্যমে তারা মানুষকে সাহায্য ও সমাজকে উন্নত করতে পারে। মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো, আন্তর্জাতিক এসব সংস্থা ও তাদের ইসলামি শরিয়াহবিরোধী এজেন্ডাগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা।
টিকাঃ
১৩৩. কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রসমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রসমূহের মধ্যকার টানাপোড়েনের নাম। ১৯৪০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল।
১৩৪. তাকউইনু শাবাকাতিন মিনাল মুসলিমিনাল মুতাদিলিন, (আল মুলাখখাস) পৃষ্ঠা ৩
১৩৫. Building moderate muslim networks, p 57-58
১৩৬. US agency for international development | এটি আমেরিকান একটি এজেন্সি, বহির্বিশ্বে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা প্রদান করে থাকে। পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি স্বতন্ত্র, তবে এর পৃষ্ঠপোষকতায় আছে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ১৯৬১ সালে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে এজেন্সিটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই এজেন্সিকে বহির্বিশ্বে আমেরিকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রভাবশালী ও সহযোগী মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশসহ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই তাদের কার্যক্রম আছে।
১৩৭. War and escalation in south asia, rand 2006, p 4
১৩৮. Middle east partnership initiative। সংস্থাটি ২০০২ সালে আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডেমোক্রেটিক, ইকোনেমিক ও এডুকেশনাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য এটি একটি আমেরিকান উদ্যোগ। সংস্থাটি বহুত্ববাদী সমাজ গঠনের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশগ্রহণমূলকভাবে কাজ করে এবং সেসমস্ত প্রজেক্টকে অর্থায়ন করে, যা গণতান্ত্রিক সংশোধনের জন্য গৃহীত হয়। স্থানীয় অংশীদারদের সাথে সরাসরি কাজ করার স্বার্থে সংস্থাটি দুটি প্রাদেশিক শাখাও খুলেছে। একটি আবুধাবিতে, অপরটি তিউনিসিয়ায়। প্রথম সাত বছরে তারা ১৭ টি দেশে দুইশরও বেশি প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে।
১৩৯. www.qantara.de সাইটটি আরবি, ইংরেজি, জার্মান এই তিন ভাষাতেই রয়েছে এবং এতে দৈনিক সংবাদ, বিভিন্ন প্রবন্ধ ও পর্যালোচনা আছে।
১৪০. এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুভ ফাউন্ডেশনের কথা উল্লেখ করা যায়। এটি জার্মান খ্রিষ্টান মিশনারি পরিচালিত তরুণদের নিয়ে চালিত বিশ্বব্যাপী একটি সামাজিক সংস্থা। যা বিশ্বের বেশ কিছু দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই সামাজিক সংস্থা। বাংলাদেশে তারা ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করার নামে দীনি স্বকীয়তা ও বিবেচনাবোধ থেকে বের করে আনা এবং তাদের ব্যবহার করে দেশে পশ্চিমা মতাদর্শের ইসলামাইজেশন করা। তাদের সাইটের লিংক: https://www. move-foundation.com/
১৪১. Building moderate muslim networks, p 57, 59, 132
১৪২. ২০০৫ সালে বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংস্থাটিকে মাজলিসে শুরার সাথে যুক্ত করা হয়। সংস্থাটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিস্তার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করা।
১৪৩. এটি একটি বেসামরিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৩ সালে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটনে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গণতান্ত্রিক সংস্থাসমূহকে শক্তিশালী করার জন্য এটি কাজ করে। ১২৫ টির মতো দেশে সংস্থাটির কার্যক্রম আছে।
১৪৪. আল বাহরাইন: হাল আখতয়াত ফি ইগলাকিল মা'হাদিল আমরিকিয়্যি, ৮৩ পৃষ্ঠা
১৪৫. উলামাতু কাওয়ানিনিল আহওয়ালিশ শাখসিয়্যাহ ফি মিশর, পৃষ্ঠা ৩৮
১৪৬. Women and nation building, p 28