📄 নারীর কাজের পরিবেশ
র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম নারীদের কাজের জন্য চাকরির বাজারে ঠেলে দিতে চায়, একই সাথে তারা এটাও কামনা করে যে, তাদের কর্মক্ষেত্র যেন ফ্রি-মিক্সিং তথা নারী-পুরুষ সংমিশ্রিত পরিবেশ হয়। বস্তুত নারীর কর্মের ক্ষেত্রে ফ্রি-মিক্সিং তাদের একটি কাঙ্ক্ষিত মৌলিক বিষয়। এজন্য র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের উইমেন এন্ড ন্যাশন বিল্ডিং রিপোর্টে আফগান নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও স্বনির্ভরতার সামনে পথের কাঁটা হিসেবে নারীর চলাফেলার ওপর শরিয়াহ কর্তৃক বিধিনিষেধ প্রদানকে দায়ী করেছে। সেই বিধিনিষেধগুলো হলো, মাহরাম ছাড়া চলাফেরা না করা, ফ্রি-মিক্সিং-এর পরিবেশ এড়িয়ে চলা, অভিভাবকদের সম্মতি নিয়ে বাইরে যাওয়া ইত্যাদি। ফলে কোনো নারী নিজে বিক্রিযোগ্য পণ্য উৎপাদন করে নিজে তা বিক্রি করতে পারে না; বরং একজন পুরুষকে বিক্রির দায়িত্ব দিতে হয়। পাশাপাশি রিপোর্টটিতে নারীদের বাজারে যাওয়া ও পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া নিজেই সব ধরনের কাজের ব্যাপারে স্বনির্ভর করার জন্য প্রচেষ্টা চালানোর কথাও বলা হয়েছে।
যদি কাজের পরিবেশের ব্যাপারে আফগানের সামাজিক কাঠামো নিয়ে আপত্তি তোলা হয়, তাহলে অত্যন্ত সচেতনতার সাথে সেখানে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবসায়িক মার্কেট তৈরি করে নারী-অধিকারকে বাস্তবায়ন করতে হবে। সাথে সাথে এ প্রচেষ্টাও থাকতে হবে, যেন ধীরে ধীরে এই পার্থক্য কমতে থাকে এবং নারী-পুরুষ একসাথে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পারে।
র্যান্ড কর্পোরেশন উপরোক্ত পলিসি বাস্তবায়নের জন্য আফগানিস্তানে ঘটা একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে। যেখানে ধীরে ধীরে ফ্রি-মিক্সিং-এর ব্যাপারটি গ্রহণীয় হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালে NSP (National solidarity programme) এর পক্ষ থেকে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় নারী-পুরুষ উভয়েই অংশগ্রহণ করে এবং প্রথম দুইদিন তাদের জন্য পৃথক পৃথক বসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তৃতীয় দিন নারী-পুরুষ সকল কর্মীদের একসাথে বসার নির্দেশনা প্রদান করা হয় এবং দায়িত্বশীল একজনের বক্তব্য উল্লেখ করা হয় যে, এই বিষয়টি বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। তবে এর মাধ্যমে সবাই শিখতে পারবে যে, নারী- পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কীভাবে একসাথে কাজ করতে পারে।
এ ঘটনা উল্লেখের পূর্বে র্যান্ড কর্পোরেশন রিপোর্টটিতে NSP এর একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছে। সেটা হলো, NSP এর কার্যক্রম থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, দীনি ও সামাজিক মাপকাঠিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই জেন্ডার ইকুয়ালিটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে এটি সুস্পষ্ট ভ্রান্তি ও অসম্ভব বিষয়। কারণ পশ্চিমা জেন্ডার ইকুয়ালিটি (নারী পুরুষের সমতা) নীতি ইসলামের নীতিমালার সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। শরয়ি কিছু ইবাদাত, আজর-আজাব ও মনুষ্যত্বের জায়গা ছাড়া ইসলাম সার্বিকভাবে নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করে না। ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম, সাধারণ সমতার নয়। কারণ সাধারণ সমতা অন্যায় ও জুলুমের অপর নাম মাত্র।
র্যান্ড কর্পোরেশন ফ্রি-মিক্সিংকে জেন্ডার ইকুয়ালিটির একটি প্রতীক হিসেবে দাবি করে। এটি ইসলাম ও বিভিন্ন মুসলিম দেশের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক বিষয়। ইসলাম সুস্পষ্টভাবে ফ্রি-মিক্সিংকে হারাম করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্রতম স্ত্রীদের ব্যাপারেই নির্দেশনা দিয়েছেন যে, যখন তোমরা তাদের কাছে কিছু চাইতে যাবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাবে। এটি তোমাদের ও তাদের সকলের অন্তরের জন্যই পবিত্রময়।
সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে অক্ষুণ্ণ রেখে কথিত জেন্ডার ইকুয়ালিটি বাস্তবায়নের দাবি সম্পূর্ণ অমূলক। মূলত তারা মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার জন্য প্রাথমিকভাবে এ ধরনের কথাবার্তা বলে। কিন্তু যখন তারা সমাজের গভীরে চলে যাবে এবং সমাজও তাদের আদর্শের গভীরে ডুবে যাবে, তখন তারা তাদের আসল চেহারা প্রকাশ করবে। সেটা হলো, জেন্ডার ইকুয়ালিটি পাশ্চাত্য সভ্যতা কিংবা ধর্মের একটি মৌলিক আকিদা বা বিশ্বাস। যা কিছু এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক হবে, তা কোনো প্রকার যুক্তিতর্ক ছাড়াই প্রত্যাখ্যাত হবে। সেটা ইসলামের অকাট্য বিধান কিংবা জনগণের ঐতিহ্যবাহী কোনো সংস্কৃতিই হোক না কেন।
র্যান্ড কর্পোরেশন নারীর চলাফেরার ওপর শরিয়াতের যেসব বিধিনিষেধের দিকে ইঙ্গিত করেছে, যেমন মাহরাম ছাড়া সফর না করা, ফ্রি-মিক্সিং না করা, এগুলো মোটেও নারীর অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য প্রতিবন্ধক নয়। ইসলাম এ বিধানগুলো নারীর নিরাপত্তা ও উপকারার্থেই প্রদান করেছে। অনেক পুরুষ তাদের সকল কাজ নিজে সম্পাদন করে না; বরং অনেক কাজ তারা দায়িত্বশীল কর্মী নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে করে। তা সত্ত্বেও তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের অর্থনৈতিক সকল কার্যক্রম ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালনা করছে। সুতরাং ফ্রি-মিক্সিং করতে না পারা, মাহরাম ছাড়া সফরে বের না হতে পারা, এগুলো কখনোই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রতিবন্ধক নয়। র্যান্ড কর্পোরেশনের এমন দুর্বল দাবির মধ্য দিয়ে তাদের আড়ালের উদ্দেশ্যটির আরও সুস্পষ্ট হয়। সেটা হলো, পশ্চিমা সভ্যতাকে মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। নারীর অধিকার আদায় কিংবা উন্নতি সাধনে তারা মোটেও সৎ নয়।
সামাজিক গঠন ও রাষ্ট্রীয় গঠন এবং দীনের জন্য ফ্রি-মিক্সিং খুবই ধ্বংসাত্মক একটি বিষয়। ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ফ্রি-মিক্সিংয়ের বিস্তার সমাজের সকল অনিষ্টের মূল। জমিনে আল্লাহর সাধারণ আজাব নেমে আসার অন্যতম কারণ ফ্রি-মিক্সিং। সাথে সাথে সমাজের সাধারণ থেকে বিশেষ সকল বিষয়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ারও একটি কারণ ফ্রি-মিক্সিং। এর মাধ্যমে সমাজে ব্যাপকহারে অশ্লীলতা ও যিনা ছড়িয়ে পড়ে। যদি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বুঝতে পারত যে, এটা দীনের পাশাপাশি সমাজ ও সমাজের লোকদের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তবে তারা কঠোরভাবে ফ্রি- মিক্সিংকে নিষিদ্ধ করত।'
ফ্রি-মিক্সিং ও নারীদের সৌন্দর্য প্রদর্শন সভ্যতার পতনেরও একটি মৌলিক কারণ। ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত যে, গ্রীক সভ্যতার পতনের অন্যতম একটি কারণ ছিল নারীদের খোলামেলা চলাফেরা, সৌন্দর্য প্রদর্শন ও ফ্রি-মিক্সিং। রোম সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে।
ডক্টর সুলাইমান আল ইদি খুব চমৎকার কথা বলেছেন। সামরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় উপনিবেশই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মুসলিম দেশগুলোতে ফ্রি-মিক্সিং ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছে। এর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামি সমাজের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করা, মুসলিম-সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করা এবং মুসলিম-সমাজকে নিজেদের অনুগত বানিয়ে তার ওপর ইসলামবিরোধী সকল চিন্তাধারা ও প্রথা চাপিয়ে দেওয়া। কারণ সমাজ, পরিবার ও মুসলিমদের ব্যক্তিত্ব নষ্ট করার ক্ষেত্রে ফ্রি-মিক্সিং ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
এমনকি ফ্রি-মিক্সিংয়ের দিকে আহবান ও ইহুদিবাদী জায়োনিস্ট আন্দোলনের মধ্যেও গভীর সম্পর্ক আছে। তাদের অন্যতম একটি পরিকল্পনা ছিল, যৌনতা, পর্নোগ্রাফি ও চারিত্রিক বিকৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইসলামি সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া। এজন্য ২০০২ সালে ইসরাইলি সৈন্যরা যুদ্ধ চলাকালে ফিলিস্তিনে রামাল্লার সকল মিডিয়া স্টেশন দখল করে নেয় এবং প্রত্যেক চ্যানেলে একযোগে পর্নোগ্রাফি প্রোগ্রাম সম্প্রচার করে।
পৃথিবীর ঐতিহাসিক ধারা, মুসলিম উলামায়ে কেরামের বক্তব্য ও পশ্চিমা কিছু গবেষকদের দাবি এই ব্যাপারে নিশ্চিত বার্তা দেয় যে, নারীদের অবাধ চলাফেরা ও ফ্রি-মিক্সিং রাষ্ট্রের অনেক সামাজিক সমস্যার জন্য দায়ী। এমনকি বিভিন্ন প্রকার শাস্তির সম্মুখীন হওয়া ও সভ্যতায় পঁচন ধরার ক্ষেত্রেও ফ্রি-মিক্সিং ভয়াবহ ভূমিকা রাখে। সুতরাং মুসলিমদের উচিত নয় প্রাচ্যবাদী কিংবা পশ্চিমা কিছু সংস্থার আহবানে সাড়া দিয়ে ফ্রি-মিক্সিংয়ে জড়ানো। এরা কখনো আমাদের কল্যাণ চায় না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَدَتْ طَائِفَةٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ لَوْ يُضِلُّوْنَكُمْ.
'আহলে কিতাবদের একদল চায় তোমাদের পথভ্রষ্ট করতে।
র্যান্ড কর্পোরেশনের পুরো রিপোর্ট থেকে এই কথা বারবার সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রকৃতপক্ষে নারী-অধিকারের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। 'নারী-অধিকার' এই কথাটিকে তারা কেবল একটি সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর এই সাইনবোর্ডের আড়াল থেকে তারা নারীদের উন্মুক্ত বাজারে ছেড়ে দিয়ে সমাজে যৌনতাকে উস্কে দিতে চায়। নারীদের ভোগ্যপণ্য বানিয়ে সমাজে যৌনবিপ্লবকে সফল করতে চায়। যেন নারী-পুরুষ উভয়কেই যৌনতায় উন্মাদ রেখে লিবারেলিজম, ফেমিনিজমের মতো পশ্চিমা ধর্মে খুব সহজেই দীক্ষিত করতে পারে। আমরা দেখেছি, তারা নারীদের জন্য এমন কোনো কর্মপদ্ধতির প্রস্তাব রাখেনি, যেটা তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের সাথে মানানসই হবে, যেই পদ্ধতি ও পরিবেশ তাদের দীন, সম্মান ও পবিত্রতাকে অক্ষুণ্ণ রাখবে।
টিকাঃ
৮৭. Women and nation building, p 89
৮৮. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০৩
৮৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩২
৯০. এটি বিশ্বব্যাংক ও অমুসলিম কিছু রাষ্ট্রের অর্থায়নে ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সংস্থা। যারা আফগান সমাজকে গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করার জন্য কাজ করত।
৯১. Women and nation building, p 112
৯২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১০৯
৯৩. সুরা আহযাব, আয়াত ৫৬
৯৪. আত তুরুকুল হিকমিয়্যাহ ফিস সিয়াসাতিশ শারইয়্যাহ, দারু আলামিল ফাওয়ায়িদ, ২/৭২৪
৯৫. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১৮৭
৯৬. দুয়াতুল ইখতিলাত ফিল মুজতামায়ী মিন মানজুরিল ফিকরিল ইসলামিয়্যিল মুয়াসিরি, ৫৬৬-৫৬৭
৯৭. https://bit.ly/3GnK5UV
৯৮. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৬৯
📄 নারীর কাজের ব্যাপারে র্যান্ডের অবস্থান ও তার পর্যালোচনা
র্যান্ড কর্পোরেশন নারীর চাকরি ও তার উপকারিতা-অপকারিতা নিয়ে দলিলভিত্তিক কোনো পর্যালোচনা দিতে পারেনি। (প্রতিটি সংস্থাই এরকম) বরং তাদের বক্তব্যগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে মিলে যায়। তারা চায়, তাদের পলিসিগুলো যেন রাজনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গ্রহণ করে নেয়। মুসলিম নারীদের কর্মের ব্যাপারে র্যান্ড কর্পোরেশনের দৃষ্টিভঙ্গি জাতিসংঘের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভিন্ন কিছু নয়। সূচনালগ্ন থেকেই জাতিসংঘ নারীদের অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করে আসছে।
কোনো প্রকার শর্ত ও বিধি ছাড়াই র্যান্ড নারীদের যেভাবে চাকরির বাজারে নেমে আসার জন্য আহবান জানিয়েছে, এটা কখনো বস্তুনিষ্ঠ কোনো রিপোর্ট ও গবেষণাধর্মী কাজ হতে পারে না। তারা তাদের গবেষণায় নারীর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্বের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ করেনি। একজন নারী সর্বপ্রথম ঘরে রাণী এবং শিশুদের কোমল পাঠশালা। এ দায়িত্বই তাদের স্বভাবজাত মৌলিক দায়িত্ব। এ বাস্তবতাকে ভুলে যাওয়ার ভান করে কোনো গবেষণাই একাডেমিক মানে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। সে গবেষণা নিশ্চিতভাবেই নারীর ওপর, শিশুদের ওপর ও পুরো সমাজের ওপর জুলুম চাপিয়ে দেবে।
র্যান্ড কর্পোরেশনের পুরো রিপোর্টে নারী-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে একাডেমিক কোনো পর্যালোচনা নেই, নেই বস্তুনিষ্ঠ কোনো আলোচনা। পুরো রিপোর্টে তারা নির্দিষ্ট কিছু সংশয়, দাবি ও পলিসি মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। আরও পরিষ্কার করে বললে, তারা সেই পুরোনো মদই নতুন বোতলে মুসলিমদের গিলাতে চেয়েছে। উপনিবেশ আমলে পশ্চিমা বিশ্ব যেসব সংশয় মুসলিম নারীদের উদ্দেশ্যে আমদানি করেছে, সেগুলোই র্যান্ড গবেষণার নামে বুদ্ধিজীবী ভাব নিয়ে পলিসি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। প্রাচীন সেই ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্যগুলোই তারা বর্তমান যুগের ভাষায় তুলে ধরেছে। পাশাপাশি সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা এবং সেটা দূরীকরণের পন্থাও বাতলে দিয়েছে।
মূলত আধুনিক প্রাচ্যবাদ তার পুরো কার্যক্রমে প্রাচীন অসৎ প্রাচ্যবিদদের ওপরই নির্ভরশীল। ইসলামি শরিয়তের বিরুদ্ধে পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল কেন্দ্রবিন্দু একই। কালের পরিক্রমায় প্রয়োজন অনুপাতে তারা কেবল সেই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পলিসি গ্রহণ করে।
নারীর কর্মের ব্যাপারে র্যান্ড কর্পোরেশন মোটাদাগে যেই দাবিগুলো যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সেগুলো হলো-
১. অর্থনৈতিকভাবে নারীসমাজকে এডিয়ে গেলে দেশের অর্ধেক জনসম্পদকে নষ্ট করা হয়।
গৃহস্থলের পরিবেশে নারীর কর্মের মাধ্যমে কখনোই অর্থনীতিতে নারীকে পশ্চাতে ফেলে রাখা হয় না এবং এর মাধ্যমে দেশের অর্ধেক জনশক্তি নষ্টও হয় না; বরং একজন নারী পারিবারিক পরিবেশে থেকে দেশের জনশক্তিকে প্রস্তুত ও শাণিত করে তোলে। নারীর এই ভূমিকা খুবই প্রাণবন্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দেশের পূর্ণ জনশক্তিকে উৎপাদনশীল ও গঠনমূলক করে তোলে। যদি কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মীকে উৎপাদন সেক্টরে কাজে লাগিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই কর্তৃপক্ষ এই নির্দেশনাকে তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি ছাড়া কিছুই মনে করবে না। এই নির্দেশনা মানতে গেলে প্রতিষ্ঠান নিমিষেই ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
কারণ উৎপাদনের জন্যও একটি অগ্রগামী টিম থাকতে হয়, যারা বিভিন্ন পরিচালনা পর্ষদকে দেখভাল করবে। যেমন: হিসাব বিভাগ, প্রচারণা বিভাগ, মার্কেটিং বিভাগ, কাঁচামাল বিভাগ, শ্রমিক বিভাগসহ অনেক সেক্টরে কাজ করতে হয় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে। আর পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকেও বেশি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে বস্তুগত সহায়তার পাশাপাশি মানসিক ও অনুভূতিগত প্রতিপালন ও সহায়তার প্রয়োজন হয়। যা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় নেই; বরং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও উক্ত সহায়তাগুলো পারিবারিক প্রতিষ্ঠান থেকেই আহরণ করে থাকে।
সুতরাং পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের পুরো জনশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর সকল নারীকে বস্তুগত উৎপাদনে নামিয়ে আনা মূলত পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার নামান্তর। একটি শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সমাজ ও সভ্যতার জন্য বেশি বিপজ্জনক। উপার্জন ও পরিবারের বস্তুগত প্রয়োজন পূরণ পুরুষের দায়িত্ব, আর ঘর ও পরিবারকে ভেতর থেকে প্রতিপালন করা নারীর দায়িত্ব। এই দায়িত্ব বণ্টননীতি যদি সংরক্ষিত রাখা যায়, তবে সমাজ আল্লাহর ইচ্ছায় একটি শক্তিশালী, উৎপাদনশীল ও গঠনমূলক প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে পারবে। এই সুষম দায়িত্ব বণ্টননীতি সমাজের বর্তমান ভারসাম্যকে বজায় রাখবে এবং ভবিষ্যতের উপার্জনকে নিশ্চিত করবে। আর যদি এই দায়িত্ব বণ্টননীতি লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে সমাজ ও সভ্যতার বিদ্যমান ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং তার ভবিষ্যতের ওপরও বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানকে তাদের বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের দায়িত্বের মাঝে অদলবদল করতে বলা হয় এভাবে যে, প্রত্যেক বিভাগই বিরতি দিয়ে দিয়ে একে অপরের বিভাগের দায়িত্ব পালন করবে। অর্থাৎ এ সপ্তাহে যারা উৎপাদন বিভাগে কাজ করেছে তারা আগামী সপ্তাহে মার্কেটিং সাইটে কাজ করবে। আবার যারা মার্কেটিং সাইটে ছিল তারা উৎপাদন বিভাগে চলে আসবে। এভাবে প্রতিটি সেক্টরের কর্মীরা দায়িত্ব অদলবদল করবে। এ ব্যবস্থাপনাকেও প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিকর ও হুমকি হিসেবে দেখবে। প্রত্যেক বিভাগের কর্মীদেরই নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতা আছে, যেটা স্ব স্ব বিভাগের জন্য উপযোগী। অন্য কোনো বিভাগের জন্য সেসব দক্ষতা উপযোগী নয়। ফলে কর্মীদের যখন তাদের উপযুক্ত কর্মস্থল থেকে বের করে ভিন্ন কোনো ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হবে, তখন প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দিনেই লস প্রজেক্টে পরিণত হবে।
কোনো বিবেকবান ব্যক্তি এই ধারণা করতে পারে না যে, নারীরা কর্মের জন্য ঘর থেকে বের হলেই দেশের পুরো জনশক্তি জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিতে একযোগে তৎপর থাকবে। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমান সময় অধিকাংশ যুবক ও পুরুষ বেকার ঘুরছে। তাদের কেউ কেউ পরিপূর্ণ বেকার, কেউ কেউ আবার তার যোগ্যতার সাথে উপযোগী কর্মক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছে না। এই বাস্তবতা বোঝার জন্য কোনো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই বিবেকবানরা এই সত্য প্রত্যক্ষ করতে পারবে। কর্মের ময়দানটা স্বভাবজাতভাবে পুরুষদের এক্টিভিটি প্লেস। যখন থেকেই এখানে নারীরা এসে ভিড় করছে, তখন থেকেই পুরুষদের মধ্যে বেকারত্ব অধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে সাথে পারিবারিক ও নারী-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
২. র্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, নারীর আয়ের অর্থ পরিবারের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় বেশি উপকারিতা সাধন করতে পারে।
প্রথমত, বিভিন্ন পরিসংখ্যান র্যান্ডের দাবির উল্টোটা প্রমাণিত করে। একাডেমিক কয়েকটি গবেষণা দাবি করেছে যে, নারীর কর্মের কষ্টের তুলনায় পরিবার তার আয় থেকে খুব কমই উপকৃত হয়। মিশরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আল মারকাযুল কওমিয়া লিল বহুসিল ইজতিমাইয়্যাহ তাদের এক গবেষণায় জোর দিয়ে বলেছে যে, নারীর আয়ের সর্বোচ্চ ১৮% অর্থ থেকে পরিবার উপকৃত হতে পারে। অবশিষ্ট আয় তার পোশাক, সাজসজ্জা, জুতা, পরিবহন খরচ ও কর্মজনিত নানান চাহিদাতেই ব্যয় হয়ে যায়।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিভাগের শিক্ষক ড. হাদী মুখতার তার এক গবেষণায় দেখিয়েছে যে, নারীর উপার্জনের বড় অংশই সামাজিক প্রদর্শনীতে চলে যায়।
দ্বিতীয়ত, ধরে নেওয়া হলো যে, নারীর আয়ে পরিবারের কিছুটা লাভ হয়। কিন্তু তার আয়ের উপকারিতার চেয়ে সে ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে সৃষ্ট ক্ষতিটা আরও বড় এবং মারাত্মক। সন্তানদের অবহেলা করা, মায়ের যথার্থ প্রতিপালন থেকে সন্তান বঞ্চিত হওয়া, সংসারের ব্যাপারে উদাসীনতা, পারিবারিক দায়িত্ব পালনে শিথিলতা, নিজে ফিতনার সম্মুখীন হওয়া ও অন্যকে ফিতনার সম্মুখীন করা সহ বিভিন্ন দীনি, রাজনৈতিক, মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলোর সামনে উল্লেখিত নগণ্য উপকার কিছুই না। তা ছাড়া ইসলামি ফিকহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো, অকল্যাণ দূরীভূত করা কল্যাণ লাভের ওপর প্রাধান্য পাবে।
এই পর্যন্ত প্রত্যক্ষ সমস্ত তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে যে, নারীদের ঘর থেকে বের হওয়া চরিত্র নষ্টের পাশাপাশি পরিবার বিরান হওয়া, পরিজন নষ্ট হওয়া, ভালোবাসা ও দয়া কমে যাওয়ার অপর নাম।
নারীরা ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে পশ্চিমা সমাজ যেই নরকীয় অবস্থায় পতিত হয়েছে, তা সম্পর্কে স্বয়ং অনেক পশ্চিমা গবেষকই মুখ খুলেছে।
ব্রিটিশ গবেষক স্যামুয়েল স্মেইল বলেন, 'যেই ব্যবস্থা নারীকে কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত রাখে, দেশের শিল্পবিপ্লবের জন্য আমাদের দেশে সেই ব্যবস্থার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এর ধ্বংসাত্মক এক পরিণতি হলো, পারিবারিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া। কারণ এই ব্যবস্থা পারিবারিক কাঠামোতে আঘাত হানে, এর ভিত্তিসমূহকে ভেঙে দেয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। বিশেষ করে এই ব্যবস্থার একমাত্র পরিণতি হলো, নারীর নৈতিকতা ও চরিত্রকে হীন করে দেওয়া। একজন নারীর প্রধান ও প্রকৃত দায়িত্ব হলো, পরিবারকে ঠিক রাখা।'
অর্থনীতিবিদ জাওল সিমন বলেন, 'নারীরা এখন অনেক কিছুই করছে। সরকার তাদেরক কারখানাতেও নিয়োগ দিয়েছে। এভাবে তারা সামান্য কটা পয়সা আয় করতে পারছে বটে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা পরিবারের ভিত্তি ধ্বসিয়ে দিয়েছে।'
নিশ্চয় ইসলামি শরিয়াহ নারী-পুরুষের অধিকার ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়ের মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত এক সমাজব্যবস্থা। নারী-পুরুষের সত্তা ও সমাজের কল্যাণ ইসলামের বিধিবিধানে পূর্ণ বিবেচনা পেয়েছে। দায়িত্বের এমন বণ্টন পরিবার ও সমাজের জন্য আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। এর মাধ্যমেই পরিবার ও সমাজ একটি ভারসাম্যপূর্ণ, শান্তিপূর্ণ জীবন লাভ করতে পারে।
৩. র্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, নারী সদস্যের উপস্থিতি পুলিশি শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বন্দী নারীদের পর্যবেক্ষণ, নারী অপরাধীদের অনুসন্ধানের মতো কাজের জন্য নারী-পুলিশ প্রয়োজন। র্যান্ড কর্পোরেশনের পরিতাপ হলো, আফগান নারীরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে কিংবা স্থানীয় পুলিশ বিভাগেও ব্যাপকভাবে সকল পদে জায়গা করে নিতে পারেনি। কারণ আফগান সরকার ও সমাজ এর বিরোধী।
র্যান্ডের এই বক্তব্য স্ববিরোধী। বক্তব্যের প্রথম অংশের সাথে দ্বিতীয় অংশের বিরোধ আছে। যদি নারীবিষয়ক নিরাপত্তার জন্যই নারী পুলিশের প্রয়োজন হয়, তাহলে ব্যাপকভাবে সকল সেকশনে তাদের অংশগ্রহণের দরকার কী? প্রয়োজনীয় সেক্টরে প্রয়োজন অনুপাতে নারী সদস্য থাকাই কি যথেষ্ট নয়?
ইসলামি শরিয়াতে নারীদের সাধারণভাবে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া আছে। এটা ইসলামি শরিয়াতের পক্ষ থেকে নারীদের প্রতি বিশেষ রহমত। এমনকি ইসলাম নারীদের জন্য জিহাদকেও ফরজ করেনি। কেবল জিহাদ যখন ফরজে আইন হয় তখন নারীদের ওপর দায়িত্ব আসে। নারীর শারিরীক, মানসিক ও স্বভাবজাত গঠন সামরিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। বিশেষত আধুনিক সেনাজীবনে তো নয়ই। এই সেনাজীবন ইসলামি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয় না। নারীদের মূল কর্তব্য হলো, তারা আড়ালে থাকবে এবং পুরুষদের সাথে মেলামেশা বর্জন করবে। আর যুদ্ধের ময়দান কিংবা আধুনিক সমর কাঠামোতে এটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান যুগে নারীসেনার যেই কাঠামো-ইসলাম এর অনুমোদন দেয় না। কেননা এই কাঠামো ফ্রি-মিক্সিংকে আবশ্যক করে। তা ছাড়া সালাফদের ইতিহাসে ব্যাপকভাবে নারী বাহিনী গঠনের কোনো নজিরও পাওয়া যাবে না। এটি সম্পূর্ণ নব্য আবিষ্কৃত বিষয়।
নারী বন্দিদের পর্যবেক্ষণ, নারী অপরাধীদের অনুসন্ধানসহ নারী সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ নারী টিম গঠন করার বৈধতা আছে। তবে সেটা অবশ্যই শরিয়াতের অন্যসব নীতিমালা মেনে এবং প্রকৃত প্রয়োজন অনুপাতে হতে হবে।
৪. র্যান্ড কর্পোরেশনের আরেকটি হাস্যকর দাবি হলো, পুলিশ বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসহ যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নারী সদস্যদের উপস্থিতি পরিচালনাগত নৈরাজ্যকে কমিয়ে আনে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী সদস্যদের উপস্থিতি ও তার অবস্থা সম্পর্কে যার ন্যূনতম জ্ঞান আছে, সে বুঝতে পারবে এই দাবি কতটা হাস্যকর ও অবাস্তব। পরিচালনাগত নৈরাজ্য সাধারণত অন্যান্য কিছু বিষয়ের কারণে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর সাথে নারীর অনুপস্থিতির তেমন সম্পর্ক নেই; বরং দেখা যায়, নারীর উপস্থিতির কারণেই অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনাগত নৈরাজ্য দেখা যায়। বিশেষত পুলিশ বিভাগে এই নৈরাজ্যের সংখ্যা আরও বেশি। যেখানে উপরস্থ কর্মকর্তারা নিম্নস্তরের কর্মকর্তাদের ওপর কর্তৃত্ব খাটায়।
সেই ১৯৭৫ সালেই ওয়াশিংটন পোস্ট কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, স্বয়ং জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রকরা পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত নারীদের যৌন নির্যাতন করে। যদিও নারী-পুলিশ সদস্য একদিনের জন্য তাদের যৌন লিপ্সায় অসম্মতি জানায়। মহিলা পুলিশদের একটি সমিতির কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা জানায়, তারা প্রায় সকলেই তাদের উচ্চপদস্থ নেতাদের পক্ষ থেকে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছে।
যদিও র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের দাবির পক্ষে কিছু অসৎ ও মেকি রিপোর্ট দেখিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ একাডেমিক রিপোর্টই তাদের বিরুদ্ধে। যেই রিপোর্টগুলো প্রমাণ করে যে, নারীর উপস্থিতির কারণে পরিচালনাগত নৈরাজ্য কমে না; বরং কখনো কখনো বৃদ্ধি পায়।
মূলত নারীর কর্মের ব্যাপারে র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের উইমেন এন্ড ন্যাশন বিল্ডিং নামক রিপোর্টে যেসব দাবি করেছে, তার সবগুলোই অত্যন্ত দুর্বল ও অবাস্তব; বরং প্রতিটি দাবিই ঔপনিবেশিক পলিসি বাস্তবায়ন ও মুসলিম- সমাজকে পাশ্চাত্যকরণের জন্য উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের রিপোর্টকে কখনো বস্তুনিষ্ঠ ও একাডেমিক বলা যায় না; বরং এটি বিষাক্ত প্রাচ্যবাদী গবেষণার দৃষ্টান্ত।
উপরন্তু নারীর কর্মের ব্যাপারে এমন কিছু বাস্তবতা আছে যেগুলো র্যান্ড এড়িয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমা কিছু সংস্থাই সেসব বাস্তবতার কথা স্বীকার করেছে। এর মধ্যে একটি বাস্তবতা হলো, ব্যাপকভাবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও কমিয়ে আনার একটি মাধ্যম। জাতিসংঘের অধীনে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম (NIP) দাবি করেছে যে, কাজের জন্য নারীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সাথে জনসংখ্যার হার কমার সম্পর্ক আছে। যখনই কর্মশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে তখনই জনসংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এর কারণ হলো, নারীদের পরিবার থেকে অমনোযোগী করে চাকরি ও বাইরের ক্যারিয়ারমুখী করে দেওয়ার কারণে তারা সংসার গঠন ও বিয়ে করতে বিলম্ব করছে। দেখা গেছে বর্তমানে দেশে শিক্ষিত ও কর্মজীবি নারীদের বিয়ের গড় বয়স ২৮-৩০। বিয়ের পরও সন্তান গ্রহণের প্রতি এক প্রকার অনীহা কাজ করছে এসব কর্মজীবি নারীদের ভেতর। ফলে একদিকে বয়স বাড়ার সাথে তাদের সন্তান জন্মদানক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে চাকরি ও সংসারের ঝামেলা থেকে বাচতে সন্তান নিতেও অনীহাবোধ করছে। যা আশংকাজনকভাবে জনসংখ্যার হারে নিম্নমুখী প্রভাব ফেলছে।
টিকাঃ
৯৯. আর মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, দারুস সালাম, পৃষ্ঠা ৩০
১০০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩২
১০১. আর মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, ১১২-১২৪ পৃষ্ঠা
১০২. Women and nation building, p 5; afganistan: state and society, p 50
১০৩. মাজাল্লাতুল উসরাহ, সফর ১৪২৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ১৮-২০
১০৪. আল আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, পৃষ্ঠা ৮৬
১০৫. নিহায়াতুল মারআতিল গরবিয়্যাহ বিদায়াতুল মারআতিল আরাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৫
১০৬. আর মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১৭০
১০৭. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১১৮
১০৮. Women and nation building, p 31
১০৯. আত তামাইযুল আদিলু বাইনার রজুলি ওয়াল মারআতি ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৩৬১
১১০. Women and nation building, p 5
১১১. আমালুল মারআতি ফিল মিযান, ১৮৪
১১২. সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টের যৌন হয়রানি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। রিপোর্টির নাম 'সেট দ্যা স্ট্যান্ডার্ড'। এতে বলা হয়েছে, নারী কর্মচারীদের ৫১% নারীই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। (https://bbc.in/3DGuPRn)
২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২০৫০০ টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে আমেরিকান মিলিটারি ফোর্সে। এর মধ্যে ১৩০০০ হাজার নারী এবং ৭৫০০ জন হলো পুরুষ। (https://bit.ly/32Z3CMR)
বাংলাদেশেও ৪০% নারী-পুলিশ কর্মকর্তা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়। (https://bit.ly/3GgM1OU)
পুরো বিশ্বেই কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার মারাত্মক রূপ লাভ করেছে। বাড়ছে অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া, ধর্ষণ, পরিবার ভাঙন ও হত্যার ঘটনা। নারীদেরকে পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে টেনে আনার এটাই আবশ্যিক ফল।
১১৩. বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী-পুলিশ যৌন হয়রানির শিকার। সূত্র: https://bit.ly/3vxrYaQ
ইউরোপীয় দেশগুলোতে এই হার আরও বেশি। তা ছাড়া কর্মক্ষেত্রের অধিকাংশ নারীই কোনো-না-কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। কিন্তু নারীরা বিভিন্ন ভয় কিংবা আশায় এই হয়রানিগুলোর কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। এবং পাবলিক প্লেস ও কর্মক্ষেত্রগুলোতে যৌন হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড একটি ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। আর ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশের নিশ্চিত ফলাফল হলো, সমাজে যৌনতাকেন্দ্রিক অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়া ও চরিত্র ধ্বংস হওয়া।