📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 ইসলামি শরিয়াহ ও নারী-অধিকারের ব্যাপারে র‍্যান্ড কর্পোরেশনের অবস্থান ও মুসলিমদের দায়িত্ব

📄 ইসলামি শরিয়াহ ও নারী-অধিকারের ব্যাপারে র‍্যান্ড কর্পোরেশনের অবস্থান ও মুসলিমদের দায়িত্ব


প্রথমত, র‍্যান্ড কর্পোরেশন নারী-অধিকারের কোনো গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক সংজ্ঞা উপস্থাপন করতে পারেনি। চাই সেটা নারীর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হোক কিংবা সমাজের উন্নতি-অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট হোক। নারী-অধিকার সংশ্লিষ্ট স্লোগানগুলোর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার একমাত্র কারণ হলো পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়ন করা। ফলে তাদের মুখে এই কথা মানায় না যে, ইসলামি শরিয়াহ নারীর অধিকার খর্ব করেছে কিংবা ইসলামি শরিয়াহ নারীকে পিছিয়ে রাখছে। কারণ নারীর প্রকৃত অধিকার তারা কখনোই বাস্তবায়ন করতে চায় না; বরং নারীর প্রতি তাদের ব্যাপক আগ্রহের একমাত্র কারণ হলো, মুসলিমদের ভেতর পশ্চিমা স্বার্থ পাকাপোক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, র‍্যান্ড কর্পোরেশনের (জাতিসংঘসহ এই ধরনের বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর চরিত্রও এক) আলোচনার প্রধান চরিত্র হলো পলিসি মেকিং, অর্থাৎ নারী-অধিকার, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব নিয়ে তুলনামূলক কোনো আলোচনা তাদের নেই। তারা কেবল কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কিছু পলিসি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নারীর ব্যাপারে ইসলামি শরিয়াহর অবস্থান ও তার ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কোনো বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা তাদের আলোচনায় পাওয়া যায় না। ইসলামি শরিয়াহর এই বিধানটা কেন অন্যায় আর তাদের প্রস্তাবনাটা কেন ন্যায়—এসব প্রশ্নের কোনো সমাধান তারা দিতে পারবে না; বরং তারা যেটা করে সেটা হলো, ইসলামি শরিয়াহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য মুসলিম তরুণীদের পলিসি ঠিক করে দেওয়া। সুতরাং র‍্যান্ড কর্পোরেশনসহ নারীবাদী সংস্থাগুলো কখনো বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা উপস্থাপন করে না; বরং তারা পূর্বনির্ধারিত কিছু উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিমদের ওপর বিভিন্ন পলিসি চাপিয়ে দেয় কিংবা মুখরোচক কিছু স্লোগানের আড়ালে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের লক্ষ্যটা হাতে ধরিয়ে দেয়। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী মুসলিমরা যা করে, সেটা সঠিক নাকি বেঠিক—র‍্যান্ড কর্পোরেশনের মতো আধুনিক প্রাচ্যবাদী সংস্থাগুলোর কাছে এর পর্যালোচনা নেই। তাদের কথিত গবেষকদের মূল আগ্রহ হলো, তাদের চাহিদা মুসলিমরা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেই আলোচনা করা।
র‍্যান্ড কর্পোরেশন হলো আমেরিকার পলিসি মেকার থিঙ্কট্যাঙ্ক। যারা নারী অধিকারকে একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে মুসলিম-সমাজে তাদের উপনিবেশবাদী স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য। আর সেই স্বার্থগুলো হলো, মুসলিম নারীদের বিভ্রান্ত করা, তাদের মাধ্যমে সমাজকে নষ্ট করা, ইসলামি শরিয়াহকে বিলুপ্ত ও বিকৃত করা এবং সেসব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা, যেগুলো সমাজের নৈতিক স্থিতিশীলতা ও নারীর সম্মান-মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারে। র‍্যান্ড কর্পোরেশনও জানে যে, নারী-অধিকারের দাবির আড়ালে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, আমেরিকান পলিসি বাস্তবায়ন করা। এজন্য তারা আশঙ্কা করছে যে, মানুষ তাদের আসল রূপ জেনে যেতে পারে। যেমন আফগানে আমেরিকান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভের পর তারা নারী-অধিকারের নামে যেসব কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করে আসছিল, তার ব্যাপারে আশঙ্কা করে র‍্যান্ড কর্পোরেশন বলে, অবশ্যই আফগানের অধিকাংশ নারী-পুরুষ আমাদের কার্যক্রমের বিরোধিতা করবে। কারণ তারা নারী-অধিকারের ব্যাপারটিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার মনে করবে। অথচ এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার।"
নারী-অধিকার ও নারী-স্বাধীনতার নামে পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের ওপর যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, এটা একই সাথে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই যুদ্ধে আমাদের পবিত্র শরিয়াহকে সংরক্ষিত রাখতে চাইলে এবং পুরো পৃথিবীকে আন্তর্জাতিক মানবরচিত জাহালাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের মহৎ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষত প্রত্যেক এমন স্লোগান ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যেগুলো বিকৃত নারী-অধিকার আন্দোলন, নারীবাদী সংস্থাকে ও নারী সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ-অসম্মত দাবিকে জোরদার করতে পারে। কারণ আমরা যদি এসব স্লোগান ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে দিনশেষে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।
এবং তারা আল্লাহর শরিয়াহকে অপসারিত করবে। এজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ شَهِيدٌ عَلَى مَا تَعْمَلُونَ. قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ تَبْغُونَهَا عِوَجًا وَأَنْتُمْ شُهَدَاءُ وَمَا اللهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّ وكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ .
'বলে দাও, হে কিতাবিগণ! আল্লাহর পথে বক্রতা সৃষ্টির চেষ্টা করে মুমিনদের জন্য তাতে অন্তরায় সৃষ্টি করছ কেন, অথচ তোমরা নিজেরাই প্রকৃত অবস্থার সাক্ষী? তোমরা যা কিছু করছ, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। হে মুমিনগণ! তোমরা যদি কিতাবিদের একটি দলের কথা মেনে নাও, তবে তারা তোমাদের তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় কাফির বানিয়ে ছাড়বে। '
নিশ্চয় বান্দার জন্য ভয়াবহতার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো নারী-সংক্রান্ত ফিতনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আমার পর পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।
অন্য হাদিসে তিনি নারীদের থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। কারণ পুরুষদের অন্তর নারীদের প্রতি ধাবিত থাকে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্য উদগ্রীব থাকে।
মুসলিমদের জন্য উচিত হবে না, ফিকহের দুর্বলতম কিংবা অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুসরণের মাধ্যমে কিংবা জমহুর উলামায়ে কেরামের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়ন করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ.
'হে মুমিনগণ! যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তোমরা যদি তাদের কথা মানো, তবে তারা তোমাদেরকে তোমাদের পেছন দিকে (কুফরের দিকে) ফিরিয়ে দেবে। ফলে তোমরা উল্টে গিয়ে কঠিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
মুসলিম নারীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু বোনদের তৎপর হওয়া উচিত, যারা ইলমি ও আদর্শিক যোগ্যতায় উত্তীর্ণ। এ সমস্ত বোনেরা মুসলিম তরুণীদের মাঝে ইসলামি শরিয়াহর বিধানগুলো আপসহীনভাবে হৃদয়ঙ্গম করে বোনদের সামনে তুলে ধরবেন। তারা প্রভাব বিস্তারকারী হবেন, প্রভাবিত হবেন না। তাদের বক্তব্য হবে সুস্পষ্ট, যেখানে থাকবে না পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে নতি স্বীকার। এর জন্য তারা পরিমিত পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করবেন। নারীদের জন্য বিশেষ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে তার আওতায় নারী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স ও কর্মশালার আয়োজন করবেন।

টিকাঃ
৬১. Women and nation building, p 132
৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৯৯-১০০
৬৩. বুখারি, হাদিস ৫০৯৬
৬৪. তিনি বলেন, তোমরা দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকো এবং নারীদের থেকেও বেঁচে থাকো। মুসলিম, হাদিস ২৭৪২
৬৫. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00