📄 র্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক মুসলিম দেশগুলোতে নারী-অধিকারের সাংবিধানিক অগ্রগতির পর্যবেক্ষণ
জাতিসংঘ পুরো বিশ্বে নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারটিকে তাদের একটি মৌলিক মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছে। তা সত্ত্বেও র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম দেশগুলোতে সাংবিধানিক ও আইনি জায়গায় নারী-অধিকারের অবস্থাকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে র্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি Woodrow Wilson international center for scholars এর সাথে যৌথ উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়। যার নাম ছিল, best practices : progressive family laws in muslim countries, অর্থাৎ সর্বোত্তম অনুশীলন : প্রসঙ্গ মুসলিম দেশসমূহে প্রগতিশীল পারিবারিক আইন।
উভয় পক্ষের যৌথ অংশগ্রহণে প্রকল্পটি তৈরি করা হয় এবং সেন্টারটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে তা আরবি ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় আপলোড করা হয়। প্রকল্পটির রিপোর্টে বলা হয়, আমাদের প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংক্ষিপ্তভাবে এমন কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা, যা মুসলিম দেশগুলোতে প্রগতিশীল পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম অনুশীলনের নির্দেশনা দেবে। এর মাধ্যমে আমরা আশা করি, কিছু কিছু মুসলিম দেশে বিচার-বিষয়ক ও আইন-বিষয়ক ক্ষেত্রে যেসব ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন হয়েছে, সেগুলোর দিকে আরও বেশি দৃষ্টিপাত করতে পারব এবং অন্যান্য দেশ ও কর্মী-যারা এই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে—তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারব।
জাযায়ের, মিশর, জর্ডান, লেবানন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তান, সিরিয়া, তুরস্কসহ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশকেই এই প্রকল্পের আওতায় উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টের সবশেষে তারা নারী ও পরিবার সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বেশ কিছু ধারা ও আইন উল্লেখ করেছে। যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আইনি ক্ষেত্রে মুসলিমরা যেন কুরআন-সুন্নাহকে অপসারণ করে পশ্চিমা আদর্শকে গ্রহণ করে নেয়। প্রকল্পটিতে যেসব প্রস্তাবনা এসেছে তার কিছু নমুনা নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে—
১. বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ। প্রস্তাবনাটিতে বিভিন্ন দেশের সর্বনিম্ন বয়সের মাঝে তুলনাপূর্বক আলজেরিয়ার আইনের প্রশংসা করা হয়েছে। আলজেরিয়া ১৮ বছর বয়সকে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স হিসেবে আইন পাশ করেছে। তবে র্যান্ড ও তাদের সাথে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানটি কেবল সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণই নয়; বরং যারা এই বয়স সীমালঙ্ঘন করবে, তাদের দণ্ডনীয় শাস্তির দাবিও করেছে।
২. দ্বিতীয় বিয়ে। এই ক্ষেত্রে তারা তিউনিসিয়াকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দেশটি দ্বিতীয় বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং কেউ একের অধিক বিয়ে করলে তার জন্য নির্ধারিত মেয়াদে জেল অথবা জরিমানার কিংবা উভয়টিরই আইন পাশ করেছে। পাশাপাশি তুরস্ক ও লেবাননসহ আরও কিছু দৃষ্টান্ত তারা দেখিয়েছে। যেখানে একাধিক বিয়ের ওপর নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
৩. অভিভাবকের অনুমতি। এই প্রস্তাবনায় তারা নারীর ওপর পিতা, ভাই ও অন্যান্য পুরুষদের অভিভাবকত্ব (পবিত্র কুরআনে যাকে কাওয়ামাহ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে) এবং নেতৃত্বের সমালোচনা করেছে।
৪. কর্মের অধিকার। এই ক্ষেত্রে তারা ২০০৪ সালে মরক্কোর আইনে যে সংস্কার সাধিত হয়েছে, সেটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আইনটি হলো, নারী তার কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন। স্বামী কিংবা পিতা কেউই তাকে কর্মক্ষেত্র থেকে বারণ করতে পারবে না। উপরন্তু তাদের আনুগত্যও নারীর জন্য আবশ্যক নয়।
র্যান্ড কর্পোরেশনের অন্য রিপোর্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফুটে উঠেছে। সেখানে তারা দাবি করছে যে, মরক্কোতে এই ধরনের পরিবর্তন সাধন সফল হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, রাজনৈতিক ও সংসদীয় কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়া।
বর্তমান সময়ে নারীদের অধিক হারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ পশ্চিমা আগ্রাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। নারী-অধিকার কিংবা সমতার সাথে অধিক হারে রাজনীতিতে নারীদের পদচারণার কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এর পরিপূর্ণ সম্পর্ক পশ্চিমা স্বার্থের সাথে। নারীদের ব্যবহার করে তারা মুসলিম বিশ্বে এমন কিছু পরিবর্তন সাধন করতে চায়, যা ইসলামি শরিয়াহর বিধিবিধানকে বিলুপ্ত করবে কিংবা বিকৃত করে ফেলবে। এর এক জঘন্য দৃষ্টান্ত হলো, 'হুদা শারাওয়ী'। এই নারী ছিল মিশরে ওয়েস্টার্নাইজেশন মুভমেন্টের (পাশ্চাত্যকরণ আন্দোলনের) অন্যতম একজন নেত্রী। ১৯২৩ সালে হুদা শারাওয়ী মিশরে একটি নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সংগঠনটি তালাকের বিধানে পরিবর্তন, ব্যাপকভাবে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রদান ও একাধিক বিয়েকে নিষিদ্ধ করাসহ এই ধরনের বেশ কিছু শরিয়াহবিরোধী দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আফগানিস্তানে যিনার শাস্তিসহ নারী-সংক্রান্ত শরয়ি বিধানগুলোর ব্যাপারে র্যান্ড কর্পোরেশনের দাবি হলো, এগুলো পরিবর্তন করা উচিত। কারণ নারী- অধিকারের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন এই বিধানগুলো নাকচ করে। বিশেষ করে হুদুদ তথা দণ্ডবিধি-সংক্রান্ত বিধানগুলো। এজন্য আফগানের নারীসমাজের প্রতি তাদের পরামর্শ ছিল, তারা যেন দণ্ডবিধিসহ এমন যেকোনো আচরণ ও চর্চা বাতিল এবং সংশোধন করার জন্য কাজ করে, যা পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে নারীর প্রতি বৈষম্য তৈরি করে।
এতে সুস্পষ্ট হয়ে যায়, নারীদের অধিকার প্রশ্নে র্যান্ড কর্পোরেশনসহ পশ্চিমা মদদপুষ্ট সংস্থাগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্বয়ং মুসলিম নারীদের ব্যবহার করেই ইসলামি শরিয়াহর বিধানকে অকার্যকর কিংবা বিকৃত করা। আর এজন্য তারা সুস্পষ্টভাবে কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে কিছু ধারণা মুসলিম মেয়েদের ভেতর বদ্ধমূল করে দিচ্ছে। সেগুলো হলো-
১. ইসলামি শরিয়াহ তাকে বস্তাবন্দি করে রাখে এবং তার উন্নতির পথকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. ইসলামি শরিয়াহ পুরুষদের পক্ষ নিয়ে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে।
৩. নারীদের দায়িত্ব হলো, ইসলামি শরিয়াহর এসব প্রথা, বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব ও বন্দিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
৪. নারীদের আরও দায়িত্ব হলো, অধিক হারে রাজনৈতিক ও বিচার-বিষয়ক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের জন্য বেশি বেশি দৃষ্টান্ত তৈরি করা।
পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামি শরিয়াহকে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে নারীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার অহরহ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় উপনিবেশ আমলে। যেমন সিরিয়াতে ফ্রান্সের উপনিবেশ আমলের কথা আলোচনা করতে গিয়ে শায়খ আব্দুর রহমান বিন হাসান আল মাইদানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ফ্রান্স যখন শামে পুরো ইসলামি শরিয়াহর বিরোধী ব্যক্তিগত আইনি কাঠামো পাশ করে, তখন তার পিতা শায়খ হাসান রহিমাহুল্লাহ একদল মানুষ নিয়ে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান, ফলে ফ্রান্স এই আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই আইনি কাঠামো বাতিল করলেও তারা আরও জঘন্য কাজ করে। তারা মুসলিমদের ভেতর থেকেই নতুনভাবে একটি প্রজন্মকে প্রতিপালন করতে থাকে। যাদের ভেতর নেই ইসলামের কোনো বৈশিষ্ট্য, ইসলামি শরিয়াহর প্রতি যাদের নেই বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ। তারা মুসলিম দেশের জন্য ফ্রান্সের চেয়েও আরও জঘন্য বিধান ও সংবিধান প্রণয়ন করে। এভাবেই ইসলামের শত্রুরা মুসলিমদের দ্বারা চাহিদাগুলো বাস্তবায়ন করে। তারা নিজেদের হাতকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে দূরে রেখে মুসলিমদের ভেতর তাদের উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করে আসছে।'
সুতরাং মুসলিম দেশগুলোতে বিভিন্ন ইউথ (যুব) ও নারীবাদী সংস্থাগুলোর প্রভাব সম্পর্কে বেখবর থাকা সম্ভব না। এই সংস্থাগুলো বিভিন্ন তদবির চালিয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রণালীতে প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের সংস্থাগুলো দেশে পশ্চিমা মূল্যবোধ বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টিকারী দল হিসেবে কাজ করছে।
র্যান্ডের রিপোর্টগুলোতে আমরা দেখতে পাই, তারা মুসলিম দেশের বিভিন্ন নারীর কার্যক্রমকে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। যেমন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমানের স্ত্রীর কথা র্যান্ডের রিপোর্টে উঠে এসেছে। যে নারী কুরআনের নারীবাদী ব্যাখ্যার দাবি তুলে একাধিক বিয়ের বিরোধিতা করেছে। এ ছাড়াও পুরো বিশ্বের মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন নারীকে তারা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যারা কুরআন-সুন্নাহকে পাশ্চাত্যের স্বার্থ অনুযায়ী বিকৃত ও পরিবর্তন করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নারীবাদী সংস্থাগুলো নারীদের ব্যাপকহারে রাজনৈতিক ময়দানে টেনে আনার অধিকার দাবি করার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম পরিবার কাঠামোতে পরিবর্তন সাধন এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুষঙ্গকে বিলুপ্তিকরণ, যেগুলো এখনো পর্যন্ত মুসলিম পরিবারগুলোর কাঠামো ও পবিত্রতাকে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
উপনিবেশবাদী দেশগুলোর সাথে এসব নারীবাদী সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। এরা সেসব দেশের দূতাবাস থেকে প্রতিনিয়ত মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিমদেশগুলোতে ক্রমান্বয়ে আন্তর্জাতিক নারীবাদী ইউথ সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমনকি কিছু কিছু নারীবাদী সংস্থা প্রতিষ্ঠাই হয়েছে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ Women living under muslim laws নামক সংস্থাটির কথা বলা যায়। এটি ১৯৮৪ সালে মরক্কো, সুদান, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, মৌরিতানিয়া ও তানজানিয়া থেকে মোট নয়জন নারী নিয়ে ফ্রান্সের মান্টপিলিয়ার শহরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের নারীদের সাথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা এবং নারীবাদী আন্দোলনকে সহায়তা করা সংস্থাটির লক্ষ্য। সংস্থাটি এই পর্যন্ত প্রায় ৭০ টিরও অধিক রাষ্ট্রের নারীদের সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক তৈরির পেছনে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম নারীদের ইসলামি শরিয়াহর ক্ষমতা ও অধীনস্থতা থেকে স্বাধীন করা। এজন্য তাদের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম একটি প্রকল্প ছিল, নারীদের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের তাফসির তৈরি করা। বিশেষত নারী-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। কারণ তাদের মতে সালাফদের ব্যাখ্যাগুলো পুরুষবাদী ব্যাখ্যা। যেগুলো নারীদের ওপর বৈষম্য ও বন্দিত্ব চাপিয়ে দিয়েছে ইসলামের নামে (নাউজুবিল্লাহ)। সংস্থাটি বিভিন্ন সময় সেসব রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ও আংশিক অবরোধও তৈরি করেছে, যারা নারীবাদী সংস্থাগুলোর আহবানে সাড়া দেয়নি।
আন্তর্জাতিক নারীবাদী সংস্থাগুলোর এই বিস্তৃতি একবিংশ শতাব্দীতে এসে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই শতাব্দীর শুরুতেই তারা বিভিন্ন দেশের নারীবাদী আন্দোলনগুলোর সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য মুসলিম বিশ্বে এসব সেকুলার ওয়েস্টার্ন নারীবাদী আন্দোলনগুলোর ভ্রষ্টতা মুসলিমদের সামনে ব্যাপকভাবে প্রকাশ করতে হবে। এই সংস্থাগুলোই সমাজে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মাঝে ধর্মহীনতার নব্য স্রোত তৈরি করছে। দেখা যাবে এরা বহির্বিশ্বের সন্দেহভাজন বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে।
বহিরাগত প্রভাব কখনোই রাষ্ট্রের ভেতরে এককভাবে পরিবর্তন সাধন করতে পারে না, যতক্ষণ না রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো মাধ্যম ও সহযোগী পাওয়া যায়। বিভিন্ন ইউথ ও নারীবাদী সংস্থাগুলো হলো তাদের সেই সহযোগী। এই সংস্থাগুলোর সাথে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও দেখা যায়। এতে মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়াহ আইনকে কোণঠাসা ও নেতিবাচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়াটি খুব সুস্পষ্টভাবেই ফুটে ওঠে।
সংস্থাগুলো তরুণ-তরুণীদের মাঝে পশ্চিমা ধারণাগুলো চমকপ্রদভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর অন্যদিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তা বাস্তবায়নের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
টিকাঃ
৪৮. Best practices : progressive family laws in muslim countries, p 6
৪৯. ১৮ বছর বয়সকে বিয়ের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করার ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ইলমি ম্যাগাজিন আল কাউসারের নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি পড়া উপকারী হবে বলে মনে করি-https://www. alkawsar.com/bn/article/1942/
৫০. Best practices: progressive family laws in muslim countries
৫১. More freedom, less terror, p 145
৫২. ১৮৭৯-১৯৪৭। উপনিবেশ আমলের একজন মিশরীয় নারীবাদী নেত্রী। ফ্রান্সে পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখানকার ইউরোপীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশে ফেরে। তারপর মিশরে মুসলিম নারীদের মাঝে পশ্চিমা ফেমিনিজম (নারীবাদ) আন্দোলনকে প্রচার করা শুরু করে। মুসলিম বিশ্বে নারীবাদী চিন্তার প্রচারক হিসেবে প্রথম সারির একজন নারী হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। নারীবাদী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এই নারীর।
৫৩. এখানে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, যিনা, অশ্লীলতাসহ এই ধরনের দণ্ডবিধি কেবল নারীদের জন্য নয়; বরং পুরুষদের ওপরও এই বিধানগুলো সমানভাবে প্রয়োগ হবে। তথাপি তারা নারীদের বিশেষভাবে এই বিধানগুলোর বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। এর কারণ হলো, তারা যিনা ও অশ্লীলতাকে নারীদের বিশেষ অধিকার দেখিয়ে মূলত নারীদের জাতীয়ভাবে পুরুষদের জন্য ভোগ্যপণ্য বানাতে চায়।
৫৪. Women and nation building, p 31, 34
৫৫. আজনিহাতুল মাকরিস সালাসাহ, পৃষ্ঠা ২২৬-২২৮
৫৬. Building moderate muslim networks, p 83
৫৭. আল হারাকাতুন নিসাউইয়্যাহ ওয়া সিলাতুহা বিল ইস্তি'মার, পৃষ্ঠা ৮৯
৫৮. ১৯৪৫ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিনতুন নাইল নামক সংস্থাটিও বৃটেন সরকারের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এবং তারা ব্রিটিশ ও আমেরিকান দূতাবাস থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা লাভ করত। বর্তমানে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যাপারটি আরও বিস্তর ও ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। (আল হারাকাতুন নিসাউইয়্যাহ ওয়া সিলাতুহা বিল ইস্তি'মার)
৫৯. শাবাকাতুল আমালিন নিসাউইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৩, ১৩৭, ১৪৯
৬০. আল উদওয়ান আলাল মারআতিল মুসলিমাহ ফিল মুতামারাতিদ দাওলিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪২১
📄 ইসলামি শরিয়াহ ও নারী-অধিকারের ব্যাপারে র্যান্ড কর্পোরেশনের অবস্থান ও মুসলিমদের দায়িত্ব
প্রথমত, র্যান্ড কর্পোরেশন নারী-অধিকারের কোনো গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক সংজ্ঞা উপস্থাপন করতে পারেনি। চাই সেটা নারীর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট হোক কিংবা সমাজের উন্নতি-অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট হোক। নারী-অধিকার সংশ্লিষ্ট স্লোগানগুলোর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার একমাত্র কারণ হলো পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়ন করা। ফলে তাদের মুখে এই কথা মানায় না যে, ইসলামি শরিয়াহ নারীর অধিকার খর্ব করেছে কিংবা ইসলামি শরিয়াহ নারীকে পিছিয়ে রাখছে। কারণ নারীর প্রকৃত অধিকার তারা কখনোই বাস্তবায়ন করতে চায় না; বরং নারীর প্রতি তাদের ব্যাপক আগ্রহের একমাত্র কারণ হলো, মুসলিমদের ভেতর পশ্চিমা স্বার্থ পাকাপোক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, র্যান্ড কর্পোরেশনের (জাতিসংঘসহ এই ধরনের বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর চরিত্রও এক) আলোচনার প্রধান চরিত্র হলো পলিসি মেকিং, অর্থাৎ নারী-অধিকার, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব নিয়ে তুলনামূলক কোনো আলোচনা তাদের নেই। তারা কেবল কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কিছু পলিসি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নারীর ব্যাপারে ইসলামি শরিয়াহর অবস্থান ও তার ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কোনো বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা তাদের আলোচনায় পাওয়া যায় না। ইসলামি শরিয়াহর এই বিধানটা কেন অন্যায় আর তাদের প্রস্তাবনাটা কেন ন্যায়—এসব প্রশ্নের কোনো সমাধান তারা দিতে পারবে না; বরং তারা যেটা করে সেটা হলো, ইসলামি শরিয়াহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য মুসলিম তরুণীদের পলিসি ঠিক করে দেওয়া। সুতরাং র্যান্ড কর্পোরেশনসহ নারীবাদী সংস্থাগুলো কখনো বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা উপস্থাপন করে না; বরং তারা পূর্বনির্ধারিত কিছু উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য মুসলিমদের ওপর বিভিন্ন পলিসি চাপিয়ে দেয় কিংবা মুখরোচক কিছু স্লোগানের আড়ালে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের লক্ষ্যটা হাতে ধরিয়ে দেয়। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী মুসলিমরা যা করে, সেটা সঠিক নাকি বেঠিক—র্যান্ড কর্পোরেশনের মতো আধুনিক প্রাচ্যবাদী সংস্থাগুলোর কাছে এর পর্যালোচনা নেই। তাদের কথিত গবেষকদের মূল আগ্রহ হলো, তাদের চাহিদা মুসলিমরা কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেই আলোচনা করা।
র্যান্ড কর্পোরেশন হলো আমেরিকার পলিসি মেকার থিঙ্কট্যাঙ্ক। যারা নারী অধিকারকে একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে মুসলিম-সমাজে তাদের উপনিবেশবাদী স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য। আর সেই স্বার্থগুলো হলো, মুসলিম নারীদের বিভ্রান্ত করা, তাদের মাধ্যমে সমাজকে নষ্ট করা, ইসলামি শরিয়াহকে বিলুপ্ত ও বিকৃত করা এবং সেসব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা, যেগুলো সমাজের নৈতিক স্থিতিশীলতা ও নারীর সম্মান-মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারে। র্যান্ড কর্পোরেশনও জানে যে, নারী-অধিকারের দাবির আড়ালে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, আমেরিকান পলিসি বাস্তবায়ন করা। এজন্য তারা আশঙ্কা করছে যে, মানুষ তাদের আসল রূপ জেনে যেতে পারে। যেমন আফগানে আমেরিকান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভের পর তারা নারী-অধিকারের নামে যেসব কার্যক্রম সেখানে পরিচালনা করে আসছিল, তার ব্যাপারে আশঙ্কা করে র্যান্ড কর্পোরেশন বলে, অবশ্যই আফগানের অধিকাংশ নারী-পুরুষ আমাদের কার্যক্রমের বিরোধিতা করবে। কারণ তারা নারী-অধিকারের ব্যাপারটিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার মনে করবে। অথচ এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার।"
নারী-অধিকার ও নারী-স্বাধীনতার নামে পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের ওপর যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, এটা একই সাথে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই যুদ্ধে আমাদের পবিত্র শরিয়াহকে সংরক্ষিত রাখতে চাইলে এবং পুরো পৃথিবীকে আন্তর্জাতিক মানবরচিত জাহালাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের মহৎ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষত প্রত্যেক এমন স্লোগান ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, যেগুলো বিকৃত নারী-অধিকার আন্দোলন, নারীবাদী সংস্থাকে ও নারী সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ-অসম্মত দাবিকে জোরদার করতে পারে। কারণ আমরা যদি এসব স্লোগান ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে দিনশেষে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।
এবং তারা আল্লাহর শরিয়াহকে অপসারিত করবে। এজন্যই মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَكْفُرُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ شَهِيدٌ عَلَى مَا تَعْمَلُونَ. قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ مَنْ آمَنَ تَبْغُونَهَا عِوَجًا وَأَنْتُمْ شُهَدَاءُ وَمَا اللهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّ وكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ .
'বলে দাও, হে কিতাবিগণ! আল্লাহর পথে বক্রতা সৃষ্টির চেষ্টা করে মুমিনদের জন্য তাতে অন্তরায় সৃষ্টি করছ কেন, অথচ তোমরা নিজেরাই প্রকৃত অবস্থার সাক্ষী? তোমরা যা কিছু করছ, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। হে মুমিনগণ! তোমরা যদি কিতাবিদের একটি দলের কথা মেনে নাও, তবে তারা তোমাদের তোমাদের ঈমান আনার পর পুনরায় কাফির বানিয়ে ছাড়বে। '
নিশ্চয় বান্দার জন্য ভয়াবহতার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো নারী-সংক্রান্ত ফিতনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি আমার পর পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর আর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।
অন্য হাদিসে তিনি নারীদের থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। কারণ পুরুষদের অন্তর নারীদের প্রতি ধাবিত থাকে এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্য উদগ্রীব থাকে।
মুসলিমদের জন্য উচিত হবে না, ফিকহের দুর্বলতম কিংবা অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুসরণের মাধ্যমে কিংবা জমহুর উলামায়ে কেরামের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়ন করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ.
'হে মুমিনগণ! যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তোমরা যদি তাদের কথা মানো, তবে তারা তোমাদেরকে তোমাদের পেছন দিকে (কুফরের দিকে) ফিরিয়ে দেবে। ফলে তোমরা উল্টে গিয়ে কঠিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
মুসলিম নারীদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু বোনদের তৎপর হওয়া উচিত, যারা ইলমি ও আদর্শিক যোগ্যতায় উত্তীর্ণ। এ সমস্ত বোনেরা মুসলিম তরুণীদের মাঝে ইসলামি শরিয়াহর বিধানগুলো আপসহীনভাবে হৃদয়ঙ্গম করে বোনদের সামনে তুলে ধরবেন। তারা প্রভাব বিস্তারকারী হবেন, প্রভাবিত হবেন না। তাদের বক্তব্য হবে সুস্পষ্ট, যেখানে থাকবে না পশ্চিমা সংস্কৃতির কাছে নতি স্বীকার। এর জন্য তারা পরিমিত পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করবেন। নারীদের জন্য বিশেষ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে তার আওতায় নারী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স ও কর্মশালার আয়োজন করবেন।
টিকাঃ
৬১. Women and nation building, p 132
৬২. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৯৯-১০০
৬৩. বুখারি, হাদিস ৫০৯৬
৬৪. তিনি বলেন, তোমরা দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকো এবং নারীদের থেকেও বেঁচে থাকো। মুসলিম, হাদিস ২৭৪২
৬৫. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৯