📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 মুসলিম বিশ্বে নারী-অধিকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও র‍্যান্ডের পর্যবেক্ষণ

📄 মুসলিম বিশ্বে নারী-অধিকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও র‍্যান্ডের পর্যবেক্ষণ


র‍্যান্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মুসলিম দেশগুলোতে নারী-অধিকারের প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে। যেমন র‍্যান্ড কর্পোরেশন বিল্ডিং মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক রিপোর্টটিতে দাবি করেছে যে, মুসলিম দেশগুলোতে সরকারি সংস্থার বাইরে বেসরকারি এমন সংস্থা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যারা নারী-পুরুষের মাঝে সমতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সামাজিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
র‍্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম দেশগুলোর সংবিধানও তদন্ত করে। যদি তারা সংবিধানে এমন কোনো ধারা দেখতে পায়, যেটা জেন্ডার ইকুয়ালিটিকে (লিঙ্গসমতাকে) সমর্থন করে, তবে তারা এই ধারাকে বহাল ও সংরক্ষিত রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করে। যেমনটা তারা আফগানিস্তানে আমেরিকান শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে পর্যালোচনা করার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে।
২০০৭ সালের রিপোর্টে তারা মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা নারী-অধিকারের দাবিতে কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করার জন্য পরিকল্পনা প্রদান করেছে। সেখানে তারা জাতিসংঘ থেকে সাহায্যপ্রাপ্তির উপযুক্ত মডারেট মুসলিম হওয়ার অন্যতম শর্ত রেখেছে-নারী-অধিকারের পশ্চিমা ধারণাকে সম্মান করা।
এমনকি র‍্যান্ড কর্পোরেশনের একজন গবেষক এমন কোনো ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যে রাষ্ট্রে নারীর অবাধ স্বাধীনতা থাকবে না। নারীর অবাধ স্বাধীনতা না থাকা দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো, নারীর পোশাকের নির্দিষ্ট নীতিমালা আরোপ করা, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাক্ষেত্রে ফ্রি-মিক্সিংকে নিষিদ্ধ করা কিংবা কেবলমাত্র নারীদের জন্য বিশেষ কোনো সার্ভিস চালু করা।
র‍্যান্ড কর্পোরেশন কিংবা পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক কথিত নারী-অধিকারকে এত গুরুত্বের সাথে দেখা, এই ইস্যুকে মুসলিম বিশ্বের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করা এবং যেসব ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান নারী-অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে, তাদেরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া ও সহায়তা করা-এতকিছু তারা কখনোই মুসলিম নারীদেরকে তাদের উপযুক্ত সম্মান কিংবা দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য করছে না; বরং এর পেছনে তাদের সাম্রাজ্যবাদী কিছু উদ্দেশ্য আছে, যেগুলো তারা মুসলিম নারীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চায়।
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের সাথে সংশ্লিষ্ট নন এমন একজন আমেরিকান নারী গবেষক বলেন, 'নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব দিলে গোটা দীন ও সকল মুমিনদের ওপর আক্রমণ করা খুব সহজ একটি বিষয়। মুসলিম নারীদের প্রতি পরিকল্পিত এই গুরুত্বারোপ ইসলামি প্রথা ও নৈতিকতার অধঃপতনের উদ্দেশ্যে একটি প্রাচ্যবাদী প্রকল্প হতে পারে। এজন্য করণীয় হলো, মুসলিম নারীদের ইসলামের ছায়াতল থেকে মুক্ত করা, যদিও সেটা করতে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়।'
সুতরাং নারী-অধিকারের ইস্যুকে পশ্চিমাদের এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ আমাদের সামনে স্পষ্ট। এর মাধ্যমে তারা মুসলিম-সমাজে নিজেদের আদর্শ ও চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। পশ্চিমা সেকুলার ও লিবারেল চিন্তাকে মুসলিমদের মাঝে ব্যাপক করতে চায়। সর্বোপরি মুসলিমদের তাদের দীনের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চায়।

টিকাঃ
১৯. Building moderate muslim networks, angel rabasa & others, rand 2007, p. 83
২০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৩-৮৪
২১. democracy and islam in the new constitution of afganistan, rand
২২. Building moderate muslim networks, p 67
২৩. Islamic fundamentalism in afganistan: its charaterc and prospects, rand 1991, p 31
২৪. Algeria: the next fundamentalist state? Rand 1996
২৫. নাজরাতুল গারবি ইলাল হিজাব, পৃষ্ঠা ৮৭

📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 র‍্যান্ড কর্পোরেশনের দৃষ্টিতে ইসলামি শরিয়াহ ও নারী-অধিকার

📄 র‍্যান্ড কর্পোরেশনের দৃষ্টিতে ইসলামি শরিয়াহ ও নারী-অধিকার


র‍্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, সমাজের নারীদের পিছিয়ে থাকার জন্য ইসলামি শরিয়াহ দায়ী। কারণ ইসলামি শরিয়াহ নারীর ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধান ও শর্তারোপ করার মাধ্যমে তাদেরকে সমাজ থেকে পিছিয়ে রাখে। নাইন ইলেভেনের পর প্রকাশিত র‍্যান্ড কর্পোরেশনের এক রিপোর্টে বলা হয়, শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা উগ্রবাদী মুসলিমদের রাজনৈতিক সূচিপত্রের প্রধান বিষয়। আর শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা নারীদের ওপর বিভিন্ন শর্তারোপ করার মাধ্যমে মূলত নারী-অধিকারকে খর্ব করে।
র‍্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক ২০০৭ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি উগ্রবাদী মুসলিমদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, তবে সেটা বিশেষভাবে সমাজে নারীদের অবস্থানকে ধ্বংস করে দেবে। কারণ, নারীরা শরিয়াহ আইনের অধীনে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। ফলে এই শরিয়াহ আইন গণতান্ত্রিক রূপায়নকে এবং যারা নারী-অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে তাদের সকল প্রচেষ্টাকে বিনষ্ট করে দেবে।
পাশাপাশি রিপোর্টটিতে লিবারেল ও সেকুলারদের আহবান করা হয়েছে, শরিয়াহর অধীন সকল প্রকার বৈষম্য ও ধর্মান্ধমূলক আচরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং এমন রাজনৈতিক ও বিচারব্যবস্থা তৈরিতে কাজ করতে, যেখান থেকে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে কর্মরত সংস্থাগুলোর বিস্তার লাভ হয়।
পাশাপাশি র‍্যান্ড নারীদের কট্টর ইসলাম ও ইসলামি শরিয়াহর জড়, আবদ্ধ ও অকেজো ব্যাখ্যার (র‍্যান্ডের দাবি অনুযায়ী) বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্যও উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, তাদের ধারণা অনুযায়ী কট্টর ইসলাম ও শরিয়াহর পুরাতন ব্যাখ্যার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় নারীরা।

টিকাঃ
২৬. উগ্রবাদী মুসলিম দ্বারা তারা সেসব মুসলিমদের বুঝিয়ে থাকে, যারা মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা আদর্শের প্রভাবের বিরোধিতা করে এবং ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করে।
২৭. The muslim world after 9/11, p 27
২৮. সিভিল সোসাইটি কিংবা গণতান্ত্রিক সমাজ বলা হয় এমন সমাজকে, যে সমাজ নিজ আইনকানুন গঠনের ক্ষেত্রে ঐশী কোনো উৎসের ওপর নির্ভর করে না; বরং পরিপূর্ণ পশ্চিমা মূলনীতির ওপর নির্ভর করে।
২৯. Building moderate muslim networks, p 84

📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 র‍্যান্ডের অপবাদের জবাব

📄 র‍্যান্ডের অপবাদের জবাব


র‍্যান্ডের বক্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়াহ বিভিন্ন শর্তারোপ করে নারী-অধিকারকে খর্ব করে। এই বক্তব্য দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো, নারীদের মাহরামবিহীন সফরে বাধা দেওয়া, ফ্রি-মিক্সিংয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, বেপর্দা চলতে নিষেধ করাসহ এই ধরনের কিছু বিধানাবলি। এই দাবি সত্য এবং এরকম বিধিনিষেধ ইসলাম কেবল নারীদের ওপরই আরোপ করেনি; বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপরই ইসলাম বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আর এই বিধিনিষেধ আরোপের ব্যাপারটি আল্লাহর উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের দাবি, মুসলিমরা যে ইসলামকে গ্রহণ করে, সেই দীনের দাবি। বস্তুত প্রকৃত মুসলিম নরনারীরা বিশ্বাস করে, শরিয়াহর বিধান পালন করতে পারা এবং তার নিষেধাজ্ঞা থেকে বেঁচে থাকতে পারা তাদের মৌলিক অধিকার। কারণ ইসলাম শব্দের অর্থই হলো, আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়াহর বিধানের সামনে আত্মসমর্পণ ও নতি স্বীকার করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمُ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا . فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا .
'আমি প্রত্যেক রাসুলকে এ উদ্দেশ্যেই কেবল পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর হুকুমে তাঁর আনুগত্য করা হবে। তারা যখন তাদের নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল, তখন যদি তারা তোমার দরবারে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসুলও তাদের জন্য মাগফিরাতের দুআ করত, তবে তারা আল্লাহকে অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুই পেত।'
(হে নবী!) আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক মানে, তারপর আপনি যে রায় দেন, সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ না করে এবং অবনত মস্তকে তা গ্রহণ করে নেয়।'
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, لِلَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمُ الْحُسْنَى وَالَّذِينَ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَهُ لَوْ أَنَّ لَهُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَمِثْلَهُ مَعَهُ لَا فُتَدَوْا بِهِ أُولَئِكَ لَهُمْ سُوءُ الْحِسَابِ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ .
'যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান। আর যারা তার ডাকে সাড়া দেয়নি, তারা যদি দুনিয়ার সমুদয় সম্পদ ও তার সমপরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যায়, তবুও তারা (কিয়ামতের দিন) নিজেদের প্রাণ রক্ষার্থে তা সবই দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। বস্তুত তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট রকমের হিসাব এবং তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম; অনন্তর শয্যাস্থল হিসেবে তা বড়ই নিকৃষ্টস্থল!"
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের আরও একটি বক্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়াহর কারণে নারীরা সমাজে পিছিয়ে থাকে। তাদের এমন বক্তব্য সম্পূর্ণ অমূলক। ইসলামি শরিয়াহই নারীর সম্মান, মর্যাদা, সহায়তা ও তার অধিকার রক্ষায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। শরিয়াহর বিধানগুলো নিয়ে কেউ যদি একনিষ্ঠ হৃদয় দিয়ে গবেষণা করে, তবে সে নিশ্চিত এই স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে। এমনকি পশ্চিমা অনেক গবেষকও উপরোক্ত স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে।
আমেরিকান একজন নারী গবেষকের দাবি হলো, ইসলামি বিশ্বে নারী-অধিকার তখনই খর্ব হয়েছে, যখন পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামي দুনিয়ায় প্রবেশ করেছে। যারা কথিত নারীমুক্তি ও নারী-আধুনিকায়নের স্লোগান দিয়ে বেড়ায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপ যখন সিরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে, তখন তুলা শিল্পে মুসলিমদের যে অবস্থান ছিল, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ওষুধজগতে নারীদের যে অগ্রগতি ছিল, ইউরোপীয় উপনিবেশের ফলে মুসলিম নারীরা তাও খুইয়ে বসে। পশ্চিমায়ন ও আধুনিকায়নের ফলে উপনিবেশ আমলে প্রতিটি মুসলিম দেশেই এই অবনতি ঘটে।
যে ইউরোপ মুসলিম নারীদের ইসলামি শরিয়াহ থেকে মুক্ত করার জন্য এত হয়রান, লিবারেল মতাদর্শের চাপে তাদের দেশের নারীদের অবস্থা কী রকম নাজুক, তারা কি তা লক্ষ করেছে? পরিবার ভাঙ্গন, অবাধ্য সন্তান, গর্ভপাত, নানা যৌনরোগ, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, আত্মহত্যাসহ ভয়াবহ সব সামাজিক সংকট তাদের পুরো সমাজকে আজ গ্রাস করে নিয়েছে। পরিসংখ্যাগুলোর তথ্যমতে ইউরোপে নবমুসলিমদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম নারীদের যে শরিয়াহ থেকে মুক্ত করার জন্য হামলে পড়ছে, তাদের নারীসমাজই অধিক হারে ইসলামি শরিয়াহর ছায়াতলে আশ্রয় নিতে পাগলপারা হয়ে যাচ্ছে। কী এর কারণ?
এর কারণ হচ্ছে, জাতিসংঘ ও র‍্যান্ড কর্পোরেশনের মতো সংস্থাগুলো যে বিষয়গুলোকে নারীর উন্নতি ভাবছে, সেগুলো কখনোই একজন নারীর জন্য উন্নতির বিষয় নয়; বরং এই বিষয়গুলো প্রথমত দুনিয়াতে, অতঃপর আখিরাতে তার অধঃপতনের কারণ। তারা অধিকার ও উন্নতির নামে নারীদের ওপর বোঝা ও শোষণ চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদেরকে পরিবারের কোমলতা ও নারীত্বের পবিত্রতা থেকে চিরতরে বঞ্চিত করে দিচ্ছে।
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের আরেকটি বক্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়াহর অধীনে নারীরা চরম বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়। এই কথার উত্তরে আমরা বলব, ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত বৈষম্য (বিভাজন) ইসলামি শরিয়াতের সুন্দরতম বাস্তবতা, যা আমরা কখনোই অস্বীকার করব না। তা ছাড়া এই বৈষম্য (বিভাজন) জুলুম ও অন্যায় নয়। এই বিভাজনের পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ ও প্রয়োজনীয়তা আছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, নারী-পুরুষ কেউ যেন একে অপরের সাথে সমতা কামনা না করে। তিনি বলেন,
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِنْ فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.
'যেসব জিনিসের দ্বারা আমি তোমাদের কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি তার আকাঙ্ক্ষা করো না। পুরুষ যা অর্জন করে, তাতে তার অংশ থাকবে এবং নারী যা অর্জন করে, তাতে তার অংশ থাকবে। আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।'
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মহান আল্লাহ তোমাদের একে অপরকে যেসব বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা নিজেদের জন্য সেটা কামনা করো না।' উল্লেখ্য, আয়াতটি এমন কিছু নারীর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল, যারা সবকিছুতে পুরুষের মতো অবস্থান কামনা করত এবং পুরুষের ওপর যেসব দায়িত্ব রয়েছে, তাদের ওপরও সেসব দায়িত্ব বর্তানোর আকাঙ্ক্ষা রাখত। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের এই ভ্রান্ত কামনা থেকে বারণ করেছেন এবং আল্লাহর কাছেই শ্রেষ্ঠত্ব চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
দুনিয়ার সকল বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছেই স্পষ্ট থাকার কথা যে, ন্যায়সঙ্গত বৈষম্য (বিভাজন) একটি যৌক্তিক ও জরুরি বিষয়। শরিয়াহ বহির্ভূত কথিত সমতা কখনোই মানব জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে না। এজন্য ইসলামি শরিয়াহ ন্যায়সম্মত বিভাজনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ আদল ও ইনসাফ এই বিভাজনের দাবি করে। তবে ইসলামি শরিয়ায় জুলুমের ওপর প্রতিষ্ঠিত কোনো বৈষম্যের স্থান নেই। কারণ মহান আল্লাহ তাআলা অণু পরিমাণ জুলুমও তাঁর বান্দাদের ওপর চাপিয়ে দেন না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ وَإِنْ تَكُ حَسَنَةٌ يُضَاعِفَهَا وَيُؤْتِ مِنْ لَدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا .
'আল্লাহ কারও প্রতি অণু-পরিমাণও জুলুম করেন না। আর যদি কোনো সৎকর্ম হয়, তবে তাকে কয়েক গুণে পরিণত করেন এবং নিজের পক্ষ হতে মহাপুরস্কার দান করেন।'
অন্যত্র ইরশাদ করেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ .
'প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মানুষের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না। কিন্তু মানুষ নিজেই নিজের প্রতি জুলুম করে।'
মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়ার জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ .
'(হে নবী!) আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।'
এই রহমত কখনো নারীদের বিরুদ্ধে জুলুমভিত্তিক বৈষম্যের স্বীকৃতি দেয় না। ইসলামি শরিয়াহর সমস্ত মূলনীতি ও বিধানাবলি জুলুম, স্ববিরোধিতা, অপূর্ণাঙ্গতা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কারণ এই শরিয়াহ যিনি তৈরি করেছেন, তিনি হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। আর আল্লাহ তাআলা হলেন কামালে মুতলাক (স্বয়ং পরিপূর্ণ) একক সত্তা। পক্ষান্তরে শরিয়াহর বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের তৈরি কোনো ধারণা ও আইন উপরিউক্ত ত্রুটিসমূহ থেকে মুক্ত নয়। কারণ এই ধারণা ও আইন মানবসত্তা থেকে নির্গত। আর মানুষ এক অপূর্ণাঙ্গ সত্তা, যে নিজেকে অজ্ঞতা, জুলুম, শূন্যতা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে শতভাগ মুক্ত রাখতে পারে না।
সৎভাবে ইসলামি শরিয়াহর বিধানসমূহ নিয়ে পর্যালোচনা করলে সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, ইসলামই নারীকে তার যথাযথ অধিকার প্রদান করেছে। ইসলামি শরিয়ায় বাহ্যত নারী-পুরুষের মাঝে বিধানগত যেসব বিভাজন দেখা যায়, সেগুলো মূলত নারীদের কল্যাণ কিংবা সমাজের সাধারণ কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখেই প্রদান করা হয়েছে। পরম দয়ালু সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ তাআলাই নারী-পুরুষ উভয় জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। নারীর প্রকৃতি, সক্ষমতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক অবগত। ফলে নারীর সেবা নিশ্চিত করতেই তিনি পুরুষদের ওপর অতিরিক্ত কিছু বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন, যেটা নারীর জন্য কষ্টকর হবে। ইসলামি শরিয়াহ এসেছে মানুষের মাঝে ন্যায় নিশ্চিত করতে, সমতা নয়। ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ইসলামি শরিয়াহর ভিত্তিই হলো, দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার কল্যাণ নিশ্চিত করা। শরিয়াহর পুরোটাই ইনসাফ, রহমত ও কল্যাণে ভরপুর। যা আলো থেকে জুলুমের দিকে, রহমত থেকে গজবের দিকে, কল্যাণ থেকে অকল্যাণের দিকে এবং উপকারিতা থেকে অপকারিতার দিকে নিয়ে যাবে, সেটা শরিয়াহ হতে পারে না। অর্থাৎ শরিয়াহই একমাত্র কল্যাণ, ন্যায় ও রহমত। এর বাইরে ন্যায় ও কল্যাণের কোনো অস্তিত্ব নেই। '
যখন একজন নারী ইসলামি শরিয়াহর প্রবর্তকের গুণাবলি সম্পর্কে জানবে তখন তার অন্তর এই বিশ্বাসে ছেয়ে যাবে যে, নিশ্চয় ইসলামি শরিয়াহ আমার ওপর জুলুম করেনি। আমি যে বাহ্যিক বিভাজনগুলো দেখতে পাচ্ছি, সেগুলো ইনসাফের মানদণ্ডে সর্বোচ্চ চূড়ায় উত্তীর্ণ। কারণ মহান আল্লাহ তাআলা সর্বশক্তিশালী, সর্বজ্ঞানী এবং তিনি সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তিনি সকল বিচারকের বিচারক। তিনি গায়েব জানেন। তিনি দয়ালু, মুমিনদের ব্যাপারে আরও দয়ালু। তিনি ন্যায় ও অনুগ্রহের আদেশ দেন, জালিমদের পছন্দ করেন না। সমস্ত জগতের তিনিই সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং তিনি যে বিধান নির্ধারণ করেছেন, তা কখনোই জুলুম ও অকল্যাণের কারণ হতে পারে না। যদিও বাহ্যত সেই বিধান বৈষম্যপূর্ণ মনে হতে পারে।
ইসলাম ন্যায়ের কথা বলে। ইসলামে শরিয়াহবহির্ভূত সমতার কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ শরিয়াহবহির্ভূত সমতা বান্দাকে জুলুম ও অন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنْثَى.
'পুরুষ কখনো নারীর মতো না।'
তিনি আরও বলেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةً وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ.
'আর স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের প্রতি (স্বামীদের) অধিকার রয়েছে। অবশ্য তাদের ওপর পুরুষদের এক স্তরের শ্রেষ্ঠত্ব (দায়িত্ব) রয়েছে। আল্লাহ পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়। '
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ.
'পুরুষ নারীদের অভিভাবক, যেহেতু আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষগণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে। '
ইবনে উসাইমিন রহিমাহুল্লাহ বলেন, এই আয়াতে সমতার কথা বলা হয়নি। কারণ সমতার দাবি হলো, দুটো জিনিসের মাঝে সমান বিধান করা। কিন্তু ইনসাফের দাবি হলো, সেই দুটি জিনিসের মাঝে সমতার বিধান না করে পার্থক্য করা। এজন্য আমরা যদি আদলের কথা বলি, তবে সকল সমস্যা দূর হয়ে যায়। কারণ আদলের অর্থ দুজনের মাঝে নিছক সমতার বিধান করা নয়; বরং যে যেটা পাওয়ার যোগ্য তাকে সেটা প্রদান করা। অনেকেই মারাত্মক ভুল কথা বলেন যে, ইসলাম সমতার ধর্ম। না, বরং ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম। এজন্যই পবিত্র কুরআন বেশ কয়েকবার বিভিন্নভাবে সমতাকে নাকচ করেছে। পবিত্র কুরআনে একটি হরফও পাওয়া যাবে না, যা সমতার নির্দেশ করে; বরং পবিত্র কুরআন বারবার আদল তথা ন্যায়ের নির্দেশ দিয়েছে।
ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'নবি-রাসুল প্রেরণ এবং কিতাব অবতীর্ণের উদ্দেশ্য হলো কিসত তথা ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। আর ন্যায় হলো, সমজাতীয় দুটি বস্তুর মাঝে সমতার বিধান করা। এই সমতা আবশ্যক ও প্রশংসনীয়। আর যদি দুটি বিষয় সমজাতীয় না হয়, তবে পার্থক্য করাই হলো ন্যায়।' সুতরাং সমজাতীয় নয় এমন দুই বিষয়ের মাঝে সমতার বিধান করা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি।
র‍্যান্ডের আরেকটি বক্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়াহর যেসব পুরোনো, অপরিবর্তনশীল ব্যাখ্যা আছে, মুসলিম নারীদের তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ এই ব্যাখ্যাগুলোর নির্মম শিকার নারীরাই বেশি হয়। তাদের এই বক্তব্য থেকে মনে হতে পারে, তারা কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী না, কুরআন-সুন্নাহর পুরোনো ব্যাখ্যার বিরোধী। যেগুলো তাদের কাছে বর্তমান যুগে অকেজো ও বাস্তবতাবিরোধী মনে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো তারা মূলত পুরো ইসলামেরই বিরোধী। কুরআন-সুন্নাহর পুরাতন, সংস্কারহীন যে ব্যাখ্যার তারা বিরোধিতা করছে, এর বিপরীতে আসলে তারা কোন ধরনের ব্যাখ্যা চায়? তারা ইসলামি শরিয়াহর এমন ব্যাখ্যাই চায়, যেটা পশ্চিমা মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির অনুগামী হবে। যদিও সেই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোনো সহিহ হাদিসকে অস্বীকার করা লাগুক-না কেন, পূর্ববর্তী উলামায়ে সালাফের ফিকহ ও বুঝকে প্রত্যাখ্যান করতে হোক-না কেন! অর্থাৎ তারা এমন ব্যাখ্যাকে মুসলিমদের মাঝে জনপ্রিয় করতে চায়, যে ব্যাখ্যার কোনো ইলমি ভিত্তি থাকবে না। এ ব্যাখ্যার ভিত্তি একটাই হবে, প্রবৃত্তির বাসনা পূরণ ও পশ্চিমের সাথে তাল মেলানো।

টিকাঃ
৩০. তাদের নিকট জড় ও আবদ্ধ ব্যাখ্যা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কুরআন-সুন্নাহর সেই বুঝ যা সাহাবায়ে কেরাম থেকে নিয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের নিকট পৌঁছেছে।
৩১. Building moderate muslim networks, p 80
৩২. সুরা নিসা, আয়াত ৬৪-৬৫
৩৩. সুরা রাদ, আয়াত ১৮
৩৪. হাযারাতুল আরব, গাস্টিভ লেবন (১৮৮১-১৯৩১), আরবি অনুবাদ: আছিল যুয়িতার পৃষ্ঠা ৪০১
৩৫. নজরাতুল গারবি ইলাল হিজাব, পৃষ্ঠা ৫১-৫২
৩৬. সুরা নিসা, আয়াত ৩২
৩৭. তাফসিরে তবারি, দারুল মাআরিফ মিশর (আহমাদ শাকেরের তাহকিককৃত), ৮/২৬০
৩৮. সুরা নিসা, আয়াত ৪০
৩৯. সুরা ইউনুস, আয়াত ৪৪
৪০. সুরা আম্বিয়া, আয়াত ১০৭
৪১. আল মাদখাল লিদিরাসাতিশ শারিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, মুআসসাসাতুর রিসালাহ বৈরুত, পৃষ্ঠা ৩৯-৪০
৪২. ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন আন রাব্বিল আলামিন, দারুল জিল বৈরুত, ৩/৩
৪৩. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ৩৬
৪৪. সুরা বাকারাহ, আয়াত ২২৮
৪৫. সুরা নিসা, আয়াত ৩৪
৪৬. শরহুল আকিদাতিল ওয়াসাতিয়্যাহ, ১৮৮-১৮৯
৪৭. মাজমুউল ফাতাওয়া, ২০/৮২

📘 আধুনিক প্রাচ্যবাদের কবলে মুসলিম নারী সমাজ > 📄 র‍্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক মুসলিম দেশগুলোতে নারী-অধিকারের সাংবিধানিক অগ্রগতির পর্যবেক্ষণ

📄 র‍্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক মুসলিম দেশগুলোতে নারী-অধিকারের সাংবিধানিক অগ্রগতির পর্যবেক্ষণ


জাতিসংঘ পুরো বিশ্বে নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারটিকে তাদের একটি মৌলিক মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছে। তা সত্ত্বেও র‍্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম দেশগুলোতে সাংবিধানিক ও আইনি জায়গায় নারী-অধিকারের অবস্থাকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে র‍্যান্ড কর্পোরেশন কর্তৃক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি Woodrow Wilson international center for scholars এর সাথে যৌথ উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়। যার নাম ছিল, best practices : progressive family laws in muslim countries, অর্থাৎ সর্বোত্তম অনুশীলন : প্রসঙ্গ মুসলিম দেশসমূহে প্রগতিশীল পারিবারিক আইন।
উভয় পক্ষের যৌথ অংশগ্রহণে প্রকল্পটি তৈরি করা হয় এবং সেন্টারটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে তা আরবি ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় আপলোড করা হয়। প্রকল্পটির রিপোর্টে বলা হয়, আমাদের প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংক্ষিপ্তভাবে এমন কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা, যা মুসলিম দেশগুলোতে প্রগতিশীল পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম অনুশীলনের নির্দেশনা দেবে। এর মাধ্যমে আমরা আশা করি, কিছু কিছু মুসলিম দেশে বিচার-বিষয়ক ও আইন-বিষয়ক ক্ষেত্রে যেসব ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন হয়েছে, সেগুলোর দিকে আরও বেশি দৃষ্টিপাত করতে পারব এবং অন্যান্য দেশ ও কর্মী-যারা এই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে—তাদের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারব।
জাযায়ের, মিশর, জর্ডান, লেবানন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তান, সিরিয়া, তুরস্কসহ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশকেই এই প্রকল্পের আওতায় উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টের সবশেষে তারা নারী ও পরিবার সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বেশ কিছু ধারা ও আইন উল্লেখ করেছে। যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আইনি ক্ষেত্রে মুসলিমরা যেন কুরআন-সুন্নাহকে অপসারণ করে পশ্চিমা আদর্শকে গ্রহণ করে নেয়। প্রকল্পটিতে যেসব প্রস্তাবনা এসেছে তার কিছু নমুনা নিচে উল্লেখ করা হচ্ছে—
১. বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ। প্রস্তাবনাটিতে বিভিন্ন দেশের সর্বনিম্ন বয়সের মাঝে তুলনাপূর্বক আলজেরিয়ার আইনের প্রশংসা করা হয়েছে। আলজেরিয়া ১৮ বছর বয়সকে বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স হিসেবে আইন পাশ করেছে। তবে র‍্যান্ড ও তাদের সাথে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানটি কেবল সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণই নয়; বরং যারা এই বয়স সীমালঙ্ঘন করবে, তাদের দণ্ডনীয় শাস্তির দাবিও করেছে।
২. দ্বিতীয় বিয়ে। এই ক্ষেত্রে তারা তিউনিসিয়াকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দেশটি দ্বিতীয় বিয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং কেউ একের অধিক বিয়ে করলে তার জন্য নির্ধারিত মেয়াদে জেল অথবা জরিমানার কিংবা উভয়টিরই আইন পাশ করেছে। পাশাপাশি তুরস্ক ও লেবাননসহ আরও কিছু দৃষ্টান্ত তারা দেখিয়েছে। যেখানে একাধিক বিয়ের ওপর নানা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
৩. অভিভাবকের অনুমতি। এই প্রস্তাবনায় তারা নারীর ওপর পিতা, ভাই ও অন্যান্য পুরুষদের অভিভাবকত্ব (পবিত্র কুরআনে যাকে কাওয়ামাহ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে) এবং নেতৃত্বের সমালোচনা করেছে।
৪. কর্মের অধিকার। এই ক্ষেত্রে তারা ২০০৪ সালে মরক্কোর আইনে যে সংস্কার সাধিত হয়েছে, সেটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আইনটি হলো, নারী তার কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন। স্বামী কিংবা পিতা কেউই তাকে কর্মক্ষেত্র থেকে বারণ করতে পারবে না। উপরন্তু তাদের আনুগত্যও নারীর জন্য আবশ্যক নয়।
র‍্যান্ড কর্পোরেশনের অন্য রিপোর্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফুটে উঠেছে। সেখানে তারা দাবি করছে যে, মরক্কোতে এই ধরনের পরিবর্তন সাধন সফল হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো, রাজনৈতিক ও সংসদীয় কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়া।
বর্তমান সময়ে নারীদের অধিক হারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ পশ্চিমা আগ্রাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। নারী-অধিকার কিংবা সমতার সাথে অধিক হারে রাজনীতিতে নারীদের পদচারণার কোনো সম্পর্ক নেই; বরং এর পরিপূর্ণ সম্পর্ক পশ্চিমা স্বার্থের সাথে। নারীদের ব্যবহার করে তারা মুসলিম বিশ্বে এমন কিছু পরিবর্তন সাধন করতে চায়, যা ইসলামি শরিয়াহর বিধিবিধানকে বিলুপ্ত করবে কিংবা বিকৃত করে ফেলবে। এর এক জঘন্য দৃষ্টান্ত হলো, 'হুদা শারাওয়ী'। এই নারী ছিল মিশরে ওয়েস্টার্নাইজেশন মুভমেন্টের (পাশ্চাত্যকরণ আন্দোলনের) অন্যতম একজন নেত্রী। ১৯২৩ সালে হুদা শারাওয়ী মিশরে একটি নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সংগঠনটি তালাকের বিধানে পরিবর্তন, ব্যাপকভাবে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রদান ও একাধিক বিয়েকে নিষিদ্ধ করাসহ এই ধরনের বেশ কিছু শরিয়াহবিরোধী দাবি নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আফগানিস্তানে যিনার শাস্তিসহ নারী-সংক্রান্ত শরয়ি বিধানগুলোর ব্যাপারে র‍্যান্ড কর্পোরেশনের দাবি হলো, এগুলো পরিবর্তন করা উচিত। কারণ নারী- অধিকারের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন এই বিধানগুলো নাকচ করে। বিশেষ করে হুদুদ তথা দণ্ডবিধি-সংক্রান্ত বিধানগুলো। এজন্য আফগানের নারীসমাজের প্রতি তাদের পরামর্শ ছিল, তারা যেন দণ্ডবিধিসহ এমন যেকোনো আচরণ ও চর্চা বাতিল এবং সংশোধন করার জন্য কাজ করে, যা পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে নারীর প্রতি বৈষম্য তৈরি করে।
এতে সুস্পষ্ট হয়ে যায়, নারীদের অধিকার প্রশ্নে র‍্যান্ড কর্পোরেশনসহ পশ্চিমা মদদপুষ্ট সংস্থাগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, স্বয়ং মুসলিম নারীদের ব্যবহার করেই ইসলামি শরিয়াহর বিধানকে অকার্যকর কিংবা বিকৃত করা। আর এজন্য তারা সুস্পষ্টভাবে কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে কিছু ধারণা মুসলিম মেয়েদের ভেতর বদ্ধমূল করে দিচ্ছে। সেগুলো হলো-
১. ইসলামি শরিয়াহ তাকে বস্তাবন্দি করে রাখে এবং তার উন্নতির পথকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. ইসলামি শরিয়াহ পুরুষদের পক্ষ নিয়ে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে।
৩. নারীদের দায়িত্ব হলো, ইসলামি শরিয়াহর এসব প্রথা, বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব ও বন্দিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
৪. নারীদের আরও দায়িত্ব হলো, অধিক হারে রাজনৈতিক ও বিচার-বিষয়ক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা এবং এই ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের জন্য বেশি বেশি দৃষ্টান্ত তৈরি করা।
পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামি শরিয়াহকে পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে নারীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার অহরহ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় উপনিবেশ আমলে। যেমন সিরিয়াতে ফ্রান্সের উপনিবেশ আমলের কথা আলোচনা করতে গিয়ে শায়খ আব্দুর রহমান বিন হাসান আল মাইদানি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'ফ্রান্স যখন শামে পুরো ইসলামি শরিয়াহর বিরোধী ব্যক্তিগত আইনি কাঠামো পাশ করে, তখন তার পিতা শায়খ হাসান রহিমাহুল্লাহ একদল মানুষ নিয়ে এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান, ফলে ফ্রান্স এই আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই আইনি কাঠামো বাতিল করলেও তারা আরও জঘন্য কাজ করে। তারা মুসলিমদের ভেতর থেকেই নতুনভাবে একটি প্রজন্মকে প্রতিপালন করতে থাকে। যাদের ভেতর নেই ইসলামের কোনো বৈশিষ্ট্য, ইসলামি শরিয়াহর প্রতি যাদের নেই বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ। তারা মুসলিম দেশের জন্য ফ্রান্সের চেয়েও আরও জঘন্য বিধান ও সংবিধান প্রণয়ন করে। এভাবেই ইসলামের শত্রুরা মুসলিমদের দ্বারা চাহিদাগুলো বাস্তবায়ন করে। তারা নিজেদের হাতকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে দূরে রেখে মুসলিমদের ভেতর তাদের উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়ন করে আসছে।'
সুতরাং মুসলিম দেশগুলোতে বিভিন্ন ইউথ (যুব) ও নারীবাদী সংস্থাগুলোর প্রভাব সম্পর্কে বেখবর থাকা সম্ভব না। এই সংস্থাগুলো বিভিন্ন তদবির চালিয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রণালীতে প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের সংস্থাগুলো দেশে পশ্চিমা মূল্যবোধ বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টিকারী দল হিসেবে কাজ করছে।
র‍্যান্ডের রিপোর্টগুলোতে আমরা দেখতে পাই, তারা মুসলিম দেশের বিভিন্ন নারীর কার্যক্রমকে অত্যন্ত প্রশংসার সাথে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। যেমন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমানের স্ত্রীর কথা র‍্যান্ডের রিপোর্টে উঠে এসেছে। যে নারী কুরআনের নারীবাদী ব্যাখ্যার দাবি তুলে একাধিক বিয়ের বিরোধিতা করেছে। এ ছাড়াও পুরো বিশ্বের মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন নারীকে তারা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যারা কুরআন-সুন্নাহকে পাশ্চাত্যের স্বার্থ অনুযায়ী বিকৃত ও পরিবর্তন করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
নারীবাদী সংস্থাগুলো নারীদের ব্যাপকহারে রাজনৈতিক ময়দানে টেনে আনার অধিকার দাবি করার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম পরিবার কাঠামোতে পরিবর্তন সাধন এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুষঙ্গকে বিলুপ্তিকরণ, যেগুলো এখনো পর্যন্ত মুসলিম পরিবারগুলোর কাঠামো ও পবিত্রতাকে সংরক্ষণ করে রেখেছে।
উপনিবেশবাদী দেশগুলোর সাথে এসব নারীবাদী সংস্থাগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। এরা সেসব দেশের দূতাবাস থেকে প্রতিনিয়ত মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। পাশাপাশি মুসলিমদেশগুলোতে ক্রমান্বয়ে আন্তর্জাতিক নারীবাদী ইউথ সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এমনকি কিছু কিছু নারীবাদী সংস্থা প্রতিষ্ঠাই হয়েছে ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ Women living under muslim laws নামক সংস্থাটির কথা বলা যায়। এটি ১৯৮৪ সালে মরক্কো, সুদান, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান, মৌরিতানিয়া ও তানজানিয়া থেকে মোট নয়জন নারী নিয়ে ফ্রান্সের মান্টপিলিয়ার শহরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের নারীদের সাথে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা এবং নারীবাদী আন্দোলনকে সহায়তা করা সংস্থাটির লক্ষ্য। সংস্থাটি এই পর্যন্ত প্রায় ৭০ টিরও অধিক রাষ্ট্রের নারীদের সাথে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক তৈরির পেছনে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম নারীদের ইসলামি শরিয়াহর ক্ষমতা ও অধীনস্থতা থেকে স্বাধীন করা। এজন্য তাদের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম একটি প্রকল্প ছিল, নারীদের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের তাফসির তৈরি করা। বিশেষত নারী-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। কারণ তাদের মতে সালাফদের ব্যাখ্যাগুলো পুরুষবাদী ব্যাখ্যা। যেগুলো নারীদের ওপর বৈষম্য ও বন্দিত্ব চাপিয়ে দিয়েছে ইসলামের নামে (নাউজুবিল্লাহ)। সংস্থাটি বিভিন্ন সময় সেসব রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ও আংশিক অবরোধও তৈরি করেছে, যারা নারীবাদী সংস্থাগুলোর আহবানে সাড়া দেয়নি।
আন্তর্জাতিক নারীবাদী সংস্থাগুলোর এই বিস্তৃতি একবিংশ শতাব্দীতে এসে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই শতাব্দীর শুরুতেই তারা বিভিন্ন দেশের নারীবাদী আন্দোলনগুলোর সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্য মুসলিম বিশ্বে এসব সেকুলার ওয়েস্টার্ন নারীবাদী আন্দোলনগুলোর ভ্রষ্টতা মুসলিমদের সামনে ব্যাপকভাবে প্রকাশ করতে হবে। এই সংস্থাগুলোই সমাজে মুসলিম তরুণ-তরুণীদের মাঝে ধর্মহীনতার নব্য স্রোত তৈরি করছে। দেখা যাবে এরা বহির্বিশ্বের সন্দেহভাজন বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে।
বহিরাগত প্রভাব কখনোই রাষ্ট্রের ভেতরে এককভাবে পরিবর্তন সাধন করতে পারে না, যতক্ষণ না রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোনো মাধ্যম ও সহযোগী পাওয়া যায়। বিভিন্ন ইউথ ও নারীবাদী সংস্থাগুলো হলো তাদের সেই সহযোগী। এই সংস্থাগুলোর সাথে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও দেখা যায়। এতে মুসলিম দেশগুলোতে শরিয়াহ আইনকে কোণঠাসা ও নেতিবাচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রক্রিয়াটি খুব সুস্পষ্টভাবেই ফুটে ওঠে।
সংস্থাগুলো তরুণ-তরুণীদের মাঝে পশ্চিমা ধারণাগুলো চমকপ্রদভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর অন্যদিকে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তা বাস্তবায়নের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

টিকাঃ
৪৮. Best practices : progressive family laws in muslim countries, p 6
৪৯. ১৮ বছর বয়সকে বিয়ের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করার ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ইলমি ম্যাগাজিন আল কাউসারের নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি পড়া উপকারী হবে বলে মনে করি-https://www. alkawsar.com/bn/article/1942/
৫০. Best practices: progressive family laws in muslim countries
৫১. More freedom, less terror, p 145
৫২. ১৮৭৯-১৯৪৭। উপনিবেশ আমলের একজন মিশরীয় নারীবাদী নেত্রী। ফ্রান্সে পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখানকার ইউরোপীয় সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশে ফেরে। তারপর মিশরে মুসলিম নারীদের মাঝে পশ্চিমা ফেমিনিজম (নারীবাদ) আন্দোলনকে প্রচার করা শুরু করে। মুসলিম বিশ্বে নারীবাদী চিন্তার প্রচারক হিসেবে প্রথম সারির একজন নারী হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। নারীবাদী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এই নারীর।
৫৩. এখানে একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, যিনা, অশ্লীলতাসহ এই ধরনের দণ্ডবিধি কেবল নারীদের জন্য নয়; বরং পুরুষদের ওপরও এই বিধানগুলো সমানভাবে প্রয়োগ হবে। তথাপি তারা নারীদের বিশেষভাবে এই বিধানগুলোর বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। এর কারণ হলো, তারা যিনা ও অশ্লীলতাকে নারীদের বিশেষ অধিকার দেখিয়ে মূলত নারীদের জাতীয়ভাবে পুরুষদের জন্য ভোগ্যপণ্য বানাতে চায়।
৫৪. Women and nation building, p 31, 34
৫৫. আজনিহাতুল মাকরিস সালাসাহ, পৃষ্ঠা ২২৬-২২৮
৫৬. Building moderate muslim networks, p 83
৫৭. আল হারাকাতুন নিসাউইয়্যাহ ওয়া সিলাতুহা বিল ইস্তি'মার, পৃষ্ঠা ৮৯
৫৮. ১৯৪৫ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিনতুন নাইল নামক সংস্থাটিও বৃটেন সরকারের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এবং তারা ব্রিটিশ ও আমেরিকান দূতাবাস থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা লাভ করত। বর্তমানে বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যাপারটি আরও বিস্তর ও ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। (আল হারাকাতুন নিসাউইয়্যাহ ওয়া সিলাতুহা বিল ইস্তি'মার)
৫৯. শাবাকাতুল আমালিন নিসাউইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৩, ১৩৭, ১৪৯
৬০. আল উদওয়ান আলাল মারআতিল মুসলিমাহ ফিল মুতামারাতিদ দাওলিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00