📄 ভূমিকা
উপনিবেশের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞাত প্রত্যেক ব্যক্তিই এ বিষয়টি স্বীকার করবে যে, ইসলামি বিশ্বে পরিবর্তন সাধনের ক্ষেত্রে ইউরোপের অন্যতম টার্গেট ছিল মুসলিম নারীসমাজ। মুসলিম-সমাজে তাদের কর্তৃত্ব ও আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারী-সংক্রান্ত বিষয়াবলিকে তারা প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বর্তমানেও আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে নারী সংশ্লিষ্ট অসার কিছু স্লোগানকে। আধুনিক মিডিয়া ও যোগাযোগ-মাধ্যম ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় কল্যাণে এই আগ্রাসনের মাত্রা ও ব্যাপকতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পশ্চিমায়ন, জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতায়নের ফলে মুসলিমদের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন একটি শৈল্পিক ও বৈধ রূপ ধারণ করেছে। যার দরুন পশ্চিমের এই মানসিক দাসত্বকেই মুসলিম নারীরা স্বাধীনতা ও প্রগতি হিসেবে বিশ্বাস করে নিচ্ছে।
নারী-স্বাধীনতা, নারী-অধিকার, জেনডার ইকুয়ালিটি (লিঙ্গসমতা)-এর মতো মুখরোচক স্লোগানগুলো মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পলিসিতে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। জাতিসংঘ ও আমেরিকার পলিসি মেকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো র্যান্ড কর্পোরেশন। এই র্যান্ড কর্পোরেশন পশ্চিমা রাজনৈতিক পলিসিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘের অধীনে র্যান্ড কর্পোরেশনের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৫ সালে। এরপর ১৯৪৮ সালে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই র্যান্ড কর্পোরেশন তার নিজস্ব গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে আমেরিকাকে পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য অন্যান্য জাতি ও রাষ্ট্রের ব্যাপারে জাতিসংঘের পলিসি মেকার হিসেবে কাজ করছে। ৪৫ টি দেশের প্রায় ১৬০০ কর্মী প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছে।
র্যান্ড কর্পোরেশনের বিভিন্ন গবেষণায় সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে ইসলাম ও মুসলিম জাতি। কারণ, পশ্চিমা বিশ্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে ইসলাম ও মুসলিম জাতিকেই একমাত্র হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে র্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্টগুলো যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে উপনিবেশের স্বার্থে প্রাচ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকায় আবিষ্কার করতে পারি। উপনিবেশ আমলে মুসলিম বিশ্বের ওপর আদর্শিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করার জন্য তৎকালীন প্রাচ্যবিদরা যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, র্যান্ড কর্পোরেশনের কার্যক্রমকে সেই প্রচেষ্টারই আধুনিক রূপ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি।
বর্তমানে মুসলিমদের আদর্শ ও জ্ঞানগতভাবে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার জন্য এমন অনেক প্রাচ্যবাদী প্রতিষ্ঠানই কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু র্যান্ড কর্পোরেশনের মতো সুবিন্যস্ত ও সুপরিকল্পিত গবেষণাকর্ম খুব কমই দৃষ্টিগোচর হবে। হতে পারে সম্প্রতি অন্য কিছু থিঙ্কট্যাঙ্ক র্যান্ডের স্থান দখল করে নিয়েছে। তথাপি র্যান্ডের রিপোর্টগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও বাস্তবতা এখনো বহাল আছে। বরং বলা ভালো, র্যান্ডের প্রাচ্যবাদী প্রচেষ্টাকে যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে অন্যান্য প্রাচ্যবাদী প্রচেষ্টাকেও আমরা খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারব এবং সতর্ক হতে পারব।
২০০৮ সালে র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম নারীদের নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল, 'Women and nation building' (নারী ও জাতি গঠন)। প্রতিষ্ঠানটির ছয়জন বিশেষজ্ঞ গবেষক রিপোর্টটি তৈরিতে কাজ করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলো 'শেরল বেনার্ড' (Cheryl Benard)।
একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, আলোচিত গবেষণাটি আফগানিস্তানের নারীদের কেন্দ্র করে প্রস্তুত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, আফগানে আমেরিকান শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কীভাবে সেখানকার নারীসমাজকে পশ্চিমা স্বার্থে ব্যবহার করা যায়। রিপোর্টটি আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হলেও তা সব মুসলিম অধ্যুষিত দেশেই মুসলিম নারীদের পশ্চিমায়ন করার একটি আদর্শিক রূপরেখা হিসেবে কাজ করছে। ফলে এই রিপোর্টটিকে সামনে রেখেই আমরা মুসলিম নারীদের প্রতি আধুনিক প্রাচ্যবাদের স্বরূপ খোঁজার চেষ্টা করব। অবশ্য প্রাসঙ্গিকভাবে র্যান্ড কর্পোরেশনের অন্যান্য রিপোর্ট কিংবা প্রাচ্যবাদী অন্যান্য প্রকল্পের আলোচনা আসতে পারে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে উইমেন এন্ড ন্যাশন বিল্ডিং নামক রিপোর্টটি।
এ গ্রন্থটি রচনার ক্ষেত্রে আমি মৌলিকভাবে শায়খ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ রচিত আল ইস্তিশরাকিয়্যুল আমরিকিয়্যুল হাদিস গ্রন্থ থেকে উপকৃত হয়েছি। পাশাপাশি শায়খ মুস্তফা আস সিবায়ি রহিমাহুল্লাহর আল মারআতু বাইনাল ইসলাম ওয়াল কানুন গ্রন্থ থেকেও অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। বিভিন্ন গ্রন্থের সহায়তা নিলেও এই গ্রন্থদুটিই ছিল রচনার মূল উপাদান।
এই কাজটি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সিজদাহ পাবলিকেশনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তিই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আমাদের সকলের প্রচেষ্টাকেই কবুল করে নিন এবং মুসলিম-সমাজ, বিশেষত মুসলিম নারীদের এই বইটির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত করুন। আমিন।
হাসসান বিন সাবিত ০৩ অক্টোবর ২০২১ ঈ. (রাত ১০: ৫৫)
টিকাঃ
১. আধুনিক প্রাচ্যবাদ, র্যান্ড কর্পোরেশন ও মডারেট মুসলিমদের অসারতা নিয়ে লেখকের পৃথক কাজের পরিকল্পনা আছে। সেখানে র্যান্ড কর্পোরেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
২. প্রাচ্যবাদ বলা হয়, পশ্চিম কর্তৃক প্রাচ্যের ভাষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, দীন ও আকিদা নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করাকে। আর এটা করা হয় প্রাচ্যকে নিছক জানার জন্য, কিংবা প্রাচ্যের ওপর পশ্চিমের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাচ্যের লোকদের নিজেদের সভ্যতা-সংস্কৃতির ব্যাপারে বিভ্রান্ত করে পশ্চিমের সভ্যতা-সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। (আল ইসলাম ওয়াল মুসলিমুন বাইনা আহকাদিত তাবশির ওয়া জিলালিল ইসতিশরাক, পৃষ্ঠা ৯০)
আর প্রাচ্যবিদ তাদের বলা হয়, যেসব অপ্রাচ্যরা প্রাচ্যকে নিয়ে গবেষণা করে এবং নিজেদের এই গবেষণাকে পশ্চিমা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও এনজিওকে প্রদান করে। যেন তারা এগুলো ব্যবহার করে মুসলিমদের ওপর নিজেদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। (আজনিহাতুল মাকরিস সালাসাহ, পৃষ্ঠা ২১)
৩. যদিও আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের অধঃপতনকাল শুরু হয়ে গেছে, তথাপি তাদের বিভিন্ন মতবাদ নিয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি; বরং তাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কিছুটা পরিবর্তন আসা শুরু করলেও পশ্চিমা দর্শনগুলোর প্রভাব পরিপূর্ণ বহাল আছে। তাই এখনই সময় এই মতবাদগুলোর ওপর শক্ত আঘাত হানার।
৪. একজন ইহুদি নারী। জন্মের পূর্বেই তার পিতা আমেরিকাতে চলে আসে। ১৯৫৩ সালে সে আমেরিকাতে জন্মগ্রহণ করে। শৈশব জীবনে সে জার্মান ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে একজন চাইল্ড অ্যাক্টর হিসেবেও কাজ করে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুত থেকে সে পররাষ্ট্রনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে এবং ইউনিভার্সিটি অফ ভিয়েনা থেকে রাজনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করে। শেরল বেনার্ড র্যান্ড কর্পোরেশনের একজন প্রভাবশালী গবেষক। বিশেষত ইসলামি বিশ্ব নিয়ে তার আগ্রহ অনেক। সেই জায়গা থেকে সে ইসলামি বিশ্ব নিয়ে র্যান্ডের প্রায় প্রতিটি গবেষণাতেই অংশগ্রহণ করেছে। তার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রিপোর্টটি হলো, সিভিল ডেমোক্রেটিক ইসলাম। যেটি ২০০৩ সালে র্যান্ড কর্পোরেশন থেকে প্রকাশিত হয়।
৫. আরও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সম্প্রতি আফগানে ইসলামি ইমারাহ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কথিত নারী-অধিকারের দোহাই দিয়েই তালেবানদের ইসলামি শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে। ইসলামি ইমারাত অফ আফগান ফ্রি-মিক্সিং, পতিতাবৃত্তি, নারী ক্রিকেট টিম, মিউজিক ও মুভি ইন্ড্রাস্ট্রি নিষিদ্ধ এবং হিজাবকে আবশ্যক করার ফলে কথিত মানবাধিকার সংস্থা, মিডিয়া ও নারীবাদী সংগঠনগুলো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। তারা আফগান নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে খুব উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করছে। প্রকৃতপক্ষে এটা সেই উপনিবেশবাদী চরিত্রের বহিঃকাশ। নারী-অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের আড়ালে তারা মূলত মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা পলিসি বাস্তবায়ন করে সাদা চামড়ার কলোনিয়ালিজম (উপনিবেশবাদ) টিকিয়ে রাখতে চায়। তাদের দাবি হলো, নারী-অধিকারের যে ধারণা পশ্চিমের সাথে মিলবে না, সেটাই পরাধীনতা ও পশ্চাৎপদতা। আর নারীদের সেই পরাধীনতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে রক্ষা করতে হলে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা হতে দেয়া যাবে না।
শরিয়াহর অধীনে মুসলিম নারীর ভিক্টিম চিত্রায়ন ওয়ার অন টেররেরই একটি প্রজেক্ট। ২০০১ সালে জর্জ বুশ আফগানযুদ্ধের শুরু থেকেই এই কারণ দেখায় যে, আমেরিকা যুদ্ধ করছে আফগান নারীদের মুক্তির জন্য, আমেরিকান সেনাদের লড়াই একটি নারীবাদী লড়াই। তার ফেমিনিস্ট স্ত্রী লরা বুশের বক্তব্য ছিল, আফগানযুদ্ধ মূলত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ; একই সাথে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার যুদ্ধ। (https://www.kebabcast.com/afghan- war-feminism-colonialism/) লিংকের প্রবন্ধে আফগানযুদ্ধে আমেরিকার নারীবাদী প্রকল্পের প্রকৃতি চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। দুয়েক স্থানে এ প্রবন্ধটি থেকে আমি নিজেও উপকৃত হয়েছি।
নারীদের মুক্ত করতে এসে পুরো বিশ্বে ন্যাটো বাহিনী কতটা শোষণ চালিয়েছে তা আমাদের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। স্বয়ং ন্যাটো বাহিনীর নারী সদস্যের প্রায় প্রত্যেকে যৌন হয়রানির শিকার হয়। তারা বিশ্বের বিভিন্ন ভূখণ্ডে তাদের মিশনগুলোতে স্থানীয় প্রচুর নারীদের ধর্ষণ করে যৌন নির্যাতন চালায়। (https://bit.ly/3y7JDqY) এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হাত থেকেও নারীরা রক্ষা পাচ্ছে না। সেবা ও চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ নিয়ে এদের অনেক কর্মীই দেশে দেশে বিভিন্ন নারীকে যৌন হয়রানি করে যাচ্ছে। (https://cutt.ly/fRyMcV)
📄 ফিরে দেখা
ইসলামপূর্ব পৃথিবীতে নারীদের অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তৎকালীন প্রতিটি জাতির ভেতর নারীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। আরব সমাজের কথাই ধরা যাক। সেখানে নারীদের না ছিল কোনো উত্তরাধিকার, না ছিল স্বামীর কাছে কোনো অধিকার, আর না ছিল তালাক ও বিয়ের কোনো সীমা। ছিল না তার নিজের প্রিয় মানুষটিকে পছন্দ করার অধিকার। কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়াকে তারা ভীষণ অশুভ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করত। মেয়ে সন্তান জন্ম নেওয়াকে আভিজাত্যের কলঙ্ক ভেবে তাকে জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলত। রোমান ও গ্রিক সাম্রাজ্যেও নারীদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা অধিকার ছিল না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স যখন ১৭ বছর, ৫৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে তখন একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় ছিল নারীকে কী হিসেবে বিবেচনা করা হবে? মানুষ হিসেবে না-কি অমানুষ হিসেবে? সবশেষে স্থির হয়, সে মানুষ হিসেবে বিবেচিত হবে বটে, তবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল পুরুষদের সেবার জন্য। পাশ্চাত্যবাসীর পক্ষ থেকে নারীর প্রতি এই অবজ্ঞা মধ্যযুগ পর্যন্ত বহাল ছিল। উক্ত সম্মেলনের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, সম্মেলনের বিষয়বস্তুটিই নারীসত্তার প্রতি চরম অবজ্ঞা। পশ্চিমা বিশ্ব তখন এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পারেনি যে, নারীরা মানুষ না-কি অমানুষ। এরপর যখন তারা নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখল, তখন তাদের সে ভাবাটাও ছিল নারীর অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করে।
নারীর প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা জঘন্য ছিল, তা কল্পনা করার মতো না। ১৮০৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ আইনে স্ত্রীকে বিক্রি করে দেওয়ার অধিকার স্বামীর জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই সময় স্ত্রীর মূল্য বেধে দেওয়া হয়েছিল ছয় পেনস। তখনকার ইউরোপের পুরুষরা ঋণ পরিশোধ না করতে পারলে পাওনাদারের কাছে নিজের স্ত্রীকে বন্ধক হিসেবেও রাখত। তাদেরকে বাজারে তুলত বিক্রির জন্য। এমনকি নারীদের বিক্রির জন্য আলাদা বাজারব্যবস্থাও ছিল।
সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে যখন বিশ্বের সকল অঞ্চল ও সমাজে নারী-জীবন ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, ঠিক তখনই আরবের বুকে মক্কা নগরীতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন ঘটে। নবুওয়াতপ্রাপ্তির মাধ্যমে তার পবিত্র জবানে ইসলামের ঐশী বাণীর আবির্ভাব হয়েছে এই পৃথিবীতে। ইসলাম এসে নারীকে দিয়েছে সর্বকালের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক অবস্থান। এই অবস্থান একই সাথে নারীকে তার যথার্থ অধিকার ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে এবং সমস্ত পাশবিকতা ও অনিরাপত্তার বলয় থেকে তাকে মুক্ত করেছে।
নারী-অধিকার প্রণয়নের ক্ষেত্রে ইসলামের সুন্দরতম দিক হলো, এখানে নারীর স্বভাব-প্রকৃতির ওপর পরিপূর্ণ লক্ষ রাখা হয়েছে এবং নারী-পুরুষকে এক সত্তা হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের মাঝে বণ্টননীতির ভিত্তিতে দায়িত্ব ও অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই ভারসাম্য পশ্চিমা নারী-অধিকারে রক্ষা করা হয়নি; বরং সেখানে নারীর নারীত্বের প্রতি শোষণ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নারী-পুরুষকে একে অপরের সহযোগী বানানোর পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মূলত ইসলাম আগমনের পর থেকেই পৃথিবীর বুকে নারীর প্রকৃত অধিকার বাস্তবায়নের ধারা শুরু হয়েছে। মুসলিম বিশ্বে নারী-অধিকারের প্রসঙ্গ কোনো সংকটের বিষয় ছিল না। নারীরা তাদের অধিকারপ্রাপ্তির জন্য পশ্চিমাদের মতো ফেমিনিস্ট (নারীবাদী) আন্দোলনের মুখাপেক্ষীও ছিল না। নারীদের কোনো আবদার ও আন্দোলন ছাড়াই ইসলাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের যথার্থ অধিকার বুঝিয়ে দিয়েছে।
আমরা ইসলামি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, মুসলিম দেশগুলোতে ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত নারীসমাজের চিত্র ছিল প্রায় একইরকম। খোলামেলা পোশাক পরিধান, ফ্রি-মিক্সিং, নাটক, সিনেমা, অভিনয়, নারীদের রাজনৈতিক তৎপরতা, কর্মসংস্থানের প্রতি ব্যাপক ঝোঁক ইত্যাদি ছিল না। বিচ্ছিন্ন কিছু দৃষ্টান্ত থাকলেও এটাই ছিল স্বাভাবিক চিত্র। নারীরা পরিবার ও প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্বকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করত। তবে শিক্ষাকার্যক্রম, গৃহশিল্প ও চিকিৎসাবিদ্যা—এই তিন সেক্টরে মুসলিম নারীদের বিরাট ভূমিকা আছে। তথাপি মুসলিম নারীদের মূল মনোযোগ ছিল পরিবার ও প্রজন্ম গঠন। রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিংবা পাইকারি হারে কর্মক্ষেত্রে বিচরণের যে সংস্কৃতি ও নিঃশর্ত দাবি বর্তমান সমাজে দেখা যায়, তখনকার যুগে এটা ছিল কল্পনাতীত বিষয়।
সামগ্রিকভাবে এই চিত্রে পরিবর্তন ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে মুসলিম দেশগুলোতে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে। যদিও প্রাচ্যবাদের সূচনা হয়েছিল উপনিবেশ আমলের আগেই। কিন্তু তখনকার সময় ইউরোপের লোকেরা প্রাচ্যকে পাঠ করত কেবল জ্ঞানতাত্ত্বিক জায়গা থেকে। কিংবা বলা যায়, গুটিকয়েক প্রাচ্যবিদ ইসলামি শরিয়াহর ওপর বিভিন্ন সংশয় ও বিকৃতি আরোপ করলে সেটা তখনকার সমাজে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি; বরং ইসলামি জ্ঞানশাস্ত্রের মাধ্যমেই তৎকালীন অনেক প্রাচ্যবিদ প্রভাবিত হয়েছে। কেউ কেউ তো ইসলামও গ্রহণ করেছে।
প্রাচ্যবাদে এক নতুন মোড় ও শক্তি আসে উপনিবেশ আমল থেকে। তখন একদিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছাড়াও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, উপনিবেশবাদী বিভিন্ন স্বার্থ প্রাচ্যবাদের সাথে জুড়ে যায়। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত থাকায় তারা মুসলিম-সমাজকে প্রভাবিত করতেও সক্ষম হয়। উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো মুসলিম-সমাজের মধ্য থেকে নারীদের বেছে নেয় ইসলামি শরিয়াহর সাথে তাদের আদর্শিক যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে।
সেই সূচনাকাল থেকেই কেন পশ্চিমারা মুসলিম-সমাজকে ধ্বংস করার জন্য মুসলিম তরুণীদের টার্গেট করেছে, এর কারণটা ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহর বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, 'উম্মাহর অর্ধেক হচ্ছে নারী, আর বাকি অর্ধেককেও জন্ম দিয়েছে নারী। তাই বলা যায়, পুরো উম্মাহই হলো নারী।' মুসলিম-সমাজ গঠনে নারীরা মৌলিক ভূমিকা পালন করে। ইসলাম একজন নারীকে সে অবস্থান ও ক্ষমতা দিয়েছে। একদিকে তারা মুসলিম-সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীও তাদের ওপর নির্ভরশীল। উপরন্তু তাদের গড়ে তোলা ও প্রভাবিত করার বিরাট ক্ষমতা নারীর হাতে বিদ্যমান। এজন্য পশ্চিমা বিশ্ব সেই উপনিবেশকাল থেকেই মুসলিম নারীদের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার অপচেষ্টা করেছে। কারণ, তাদের মতে নারীসমাজকে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রভাবিত করা মানে পুরো মুসলিম- সমাজকেই প্রভাবিত করা।
১৮ শতকের ফ্রান্স কর্তৃক আলজেরিয়ার কলোনাইজেশনের প্রক্রিয়ায় আলজেরীয় নারীদেরকে সে প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়। মুসলিম নারীর বোরকাকে উপস্থাপন করা হয় দাসত্বের প্রতীক হিসেবে। বিখ্যাত মার্তিনিকান দার্শনিক ফ্রাঞ্জ ফানো (Frantz Fanon) [১৯২৫-১৯৬১] Unveiling Algeria প্রবন্ধে লেখেন, 'যদি আমরা আলজেরীয় সমাজ ও এর প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দিতে চাই, তাহলে অবশ্যই তাদের নারীদের ওপর আমাদের বিজয়ী হতে হবে। পর্দার অন্তরাল থেকে ও সেসব বাড়িঘর থেকে তাদের খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখে এবং পুরুষরা তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকে।”
তারা বোঝে পরিবার ও সমাজ গঠন করা এবং তাকে নষ্ট করার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা কতটা কার্যকর।' আর সেই থেকেই তারা মুসলিম নারীদের মুক্ত করার আন্দোলন শুরু করে। মুসলিম নারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য উপনিবেশবাদীরা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রকে ব্যবহার করে থাকে।
এর মধ্যে প্রধান ক্ষেত্র হলো 'মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা'। উপনিবেশবাদীরা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে মুসলিম দেশগুলোতে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে এবং তাদের অধীনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসে। এসব প্রতিষ্ঠানে তারা মুসলিমদের পাশ্চাত্য আদর্শে গড়ে তোলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তারা নারী শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করায় যে, পশ্চিমা বিশ্বের নারীরা তোমাদের আদর্শ হওয়া উচিত। এজন্য তোমাদেরকে তাদের মতো পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে, রাস্তায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করে নিজেকে প্রকাশ করে চলতে হবে। এটাই প্রগতিশীলতা। কিন্তু ইসলাম তোমাদের এই উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম চায় তোমাদেরেকে ঘর-বন্দি করে রাখতে। এজন্য ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তোমাদের ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হবে।
নারীদের নষ্ট করার জন্য তাদের প্রয়োগকৃত দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি হলো, নতুন নতুন বিভিন্ন শাস্ত্র ও অঙ্গন মুসলিম দেশগুলোতে আমদানি করা। যেমন: ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, বিউটি ইন্ডাস্ট্রি, বিউটি কম্পিটিশন, ফ্যাশন ম্যাগাজিন ইত্যাদি বিষয়গুলো তারা মুসলিমদের মাঝে আমদানি করে, যা ইতিপূর্বে মুসলিম বিশ্বে ছিল না।” এসব পাশ্চাত্য পশু-সংস্কৃতি মুসলিম বিশ্বে আমদানির কারণে মুসলিম নারী-পুরুষ ভুলে যেতে থাকে পর্দার বিধান, ছুঁড়ে ফেলে ফ্রি-মিক্সিংয়ের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলার কঠোর নিষেধাজ্ঞা। দেহ প্রদর্শনের উন্মুক্ত বাজারে তারাও উন্মাদনায় লিপ্ত হয়ে যায়।
মিশরে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৮৯৪ সালে মার্ক ফাহমি (১৮৭০-১৯৫৫) আল মারআতু ফিশ শিরকি নামে একটি বই লেখে। মার্ক ফাহমি ছিল উপনিবেশবাদী, বিশেষত লর্ড ক্রোমারের আস্থাভাজন লোক। তার বইয়ে মুসলিম নারীদের নিয়ে উপনিবেশবাদীদের কর্মপন্থা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বইটিতে সে মৌলিকভাবে পাঁচটি দাবি তোলে- ১. ইসলামি হিজাবকে নিষিদ্ধ করা। ২. গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে ফ্রি-মিক্সিংয়ের বৈধতা দেওয়া। ৩. তালাককে শর্তযুক্ত করা এবং তা কেবল কাজির সামনে কার্যকর হওয়ার বিধান জারি করা।
৪. একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধ করা।
৫. অমুসলিমদের সাথে বিয়ের বৈধতা দেওয়া।
এটাই ছিল মুসলিম নারীদের নিয়ে উপনিবেশবাদী পরিকল্পনার প্রথম বীজ, যেই বীজ তারা মুসলিমদের অভ্যন্তরে অঙ্কুরিত করতে পেরেছিল। কাসিম আমিন ও হুদা শারাওয়ী-এর নারী-মুক্তি আন্দোলন এই বীজেরই ফসল। কাসিম আমিনের তাহরিরুল মারআহ ও আল মারআতুল জাদিদাহ বইদুটি উপনিবেশবাদী স্বার্থ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে। মিশরে লিখিত এসব বই ব্রিটিশ সরকারের তত্ত্বাবধানে অনূদিত হয়ে ভারতবর্ষেও বিস্তার লাভ করে। এখান থেকেই শুরু হয় নারী- অধিকার কিংবা নারী-মুক্তির নামে মুসলিম নারীদের পশ্চিমা ধর্মে ধর্মান্তরিত করা এবং সেই দোহাই দিয়ে শরিয়াহকে সংস্কার করার মিশন। যেই মিশন লর্ড ক্রোমারের নেতৃত্বে শুরু হয়ে আজ শেরল বেনার্ড এর মতো ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে চলমান আছে।
ক্রোমার তার Modern egypt বইতে মিশরকে পশ্চিমাকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলে, 'কেবল মোহাম্মাদান (মুসলিম) নীতিমালা আর প্রাচ্যীয় ধ্যানধারণার ভিত্তিতে গড়া সরকারকে ইউরোপ মেনে নিবে এমন ধারণা করাই হাস্যকর। মুসলিম দেশগুলোতে নারীর সামাজিক অবস্থান ইউরোপীয় ধ্যনধারণা প্রচারের ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। নতুন প্রজন্মের মিশরীয়দের বুঝিয়েসুঝিয়ে কিংবা প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে পশ্চিমা সভ্যতার মূল চেতনা ধারণ করাতে হবে।'
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদীরা শারিরীকভাবে মুসলিম দেশগুলো থেকে বিদায় নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের উপনিবেশ শেষ হয়ে যায়নি; বরং তারা মুসলিমদের ভেতর থেকে তাদের সভ্যতার ধারকবাহক এক শ্রেণির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায় এবং উপনিবেশের পূর্বে মুসলিম দেশগুলোতে যে শরিয়াহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করে যায়। রেখে যাওয়া এই ব্যবস্থা ও ব্যক্তিদের মাধ্যমে তারা মুসলিম-সমাজের ওপর আজও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ কায়েম করে রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা মুসলিম দেশগুলোতে বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন নামে ও রঙে যে পলিসি গ্রহণ করেছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আধুনিক প্রাচ্যবাদ।
আধুনিক এই প্রাচ্যবাদের সময়কালকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম কাল হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ৯/১১ পর্যন্ত; দ্বিতীয় কাল ৯/১১ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। ৯/১১ এর পর থেকে আধুনিক উপনিবেশবাদ ও প্রাচ্যবাদ নতুন মোড় লাভ করে। এই ঘটনার পর তারা বিশাল এক ধাক্কা অনুভব করে। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তাদের দাম্ভিকতার ঠুনকো দেয়াল। ফলে তারা হিংস্র কুকুরের মতো আফগানে আক্রমণ করে সেখানকার ইসলামি সরকারকে উৎখাত করে এবং সেই জায়গায় তাদের মদদপুষ্ট সরকারকে প্রতিষ্ঠা করে। এই ঘটনার পর তারা ইসলামকে সংস্কার করে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে অসাংঘর্ষিক একটি ধর্মে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টাকে জোরদার করে। কারণ তারা জানে, ইসলাম যদি তার আদি অবস্থার ওপর অবিচল থাকে, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে এর সংঘর্ষ নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে তারা ইসলামি বিশ্বের পক্ষ থেকে আরও বড় ধরনের আঘাতের সম্মুখীন হতে পারে। এজন্যই আমরা দেখি, মুসলিম-সমাজ নিয়ে আদর্শিক দিক থেকে র্যান্ড কর্পোরেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টগুলো ৯/১১ এর পর তৈরি।
প্রাচ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের দীর্ঘ এই পরিক্রমায় বর্তমান সময়ে এসে একটি ভয়াবহ পার্থক্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। সেটা হলো, আগের প্রাচ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের সময় অধিকাংশ মুসলিম এটা অনুভব করতে পেরেছিল যে, আমাদের ওপর কেউ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। যারা আমাদের দীন ও দেশের জন্য হুমকি। কিন্তু আধুনিক সময়ের প্রাচ্যবাদ ও উপনিবেশবাদকে মুসলিমরা অনুভব করতে পারছে না; বরং তারা এই উপনিবেশকে নিজেদের জন্য আশীর্বাদ মনে করে বসে আছে। আধুনিক উপনিবেশের চাপিয়ে দেওয়া আদর্শকে তারা প্রগতি ও উন্নতির সোপান মনে করছে।
কিন্তু আধুনিক উপনিবেশ আমাদের দীন ও শরিয়াহকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই। হারিয়ে যাওয়া সেই ভাবনা ও অস্থিরতাকে জাগরূক করতেই আপনাদের সামনে আধুনিক প্রাচ্যবাদের একটি দিক তুলে ধরছি। যে দিকটা এই উম্মাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ-নারীসমাজের সাথে সংশ্লিষ্ট।
টিকাঃ
৬. আল মারআতু বাইনাল ফিকহি ওয়াল কানুন, পৃষ্ঠা ১৭ নারীকে বিক্রি করার দৃশ্য দেখার জন্য নেটে wife selling লিখে সার্চ করলেই অনেক প্রামাণ্যচিত্র পেয়ে যাবেন।
৭. তুহফাতুল মাওলুদ ফি আহকামিল মাওলুদ, পৃষ্ঠা ১৬
৮. (নেইল ম্যাকমাস্টার- Burning the veil: The Algerian war and the 'emancipation of Muslim women) https://www.theguardian.com/world/2002/sep/21/gender.usa
৯. আজনিহাতুল মাকরিস সালাসাহ, পৃষ্ঠা ৪১৫
১০. আজনিহাতুল মাকরিস সালাসাহ, পৃষ্ঠা ৪১২-৪১৪
১১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪১৩, ৪২২
১২. ১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিশর দখল করে। দখলের পর থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত বৃটিশরা নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ করে মিশরকে শাসন করতে থাকে। এর মধ্যে ক্রোমার অন্যতম। সে ১৮৮২ থেকে ১৯০৭ পর্যন্ত মিশরের ক্ষমতায় অধিষ্ট ছিল। মূলত তার নেতৃত্বেই মুসলিম-সমাজের ভেতর পশ্চিমা চিন্তাধারার বক্তিত্ব তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
১৩. হারাকাতু তাহরিরুল মারআতি, আনোয়ার আল জুন্দি, পৃষ্ঠা ২৬
১৪. বলা হয়, কাসিম আমিনের তাহরিরুল মারআহ বইটির কিছু অধ্যায় মুহাম্মাদ আবদুহুর লেখা কিংবা বইটির সম্পাদনা তার হাতেই করা। মোটকথা, তাহরিরুল মারআহ বইটির সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
১৫. https://ia802606.us.archive.org/7/items/modernegypt00crom/ modernegypt00crom.pdf
📄 সারাংশ
সারাংশ : র্যান্ড কর্পোরেশন জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে যতগুলো যুক্তি দেখিয়েছে, তার সবগুলোই অবান্তর। এই দাবিগুলোর কোনো একাডেমিক ভিত্তি নেই। মুসলিম দেশগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমগুলো ছড়ানো এবং এগুলোর ব্যবহারকে কোনো প্রকার ডাক্তারি পরামর্শ ছাড়া ব্যাপক করার যেই প্রজেক্ট, এটা সম্পূর্ণ উপনিবেশবাদী একটি প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টে নারীর সুখ ও সুস্থতা, দেশের প্রকৃত উন্নতি ও সমৃদ্ধির সৎ চিন্তা থেকে উপনিবেশবাদী স্বার্থ বাস্তবায়নই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। র্যান্ড কর্পোরেশনের দাবিগুলো শত বছর আগে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও প্রাচ্যবাদের চিন্তারই পুনরাবৃত্তি। তবে তারা কেবল সেই চিন্তার বাস্তবায়ন, পদ্ধতি ও ভাষায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছে মাত্র।
সুতরাং মুসলিম নারীদের দায়িত্ব হলো, শত্রুরা যেই চক্রান্তের বীজ আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে, সেটাকে ভালোভাবে অনুধাবন করা এবং তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও লক্ষ্যে পৌঁছার সহযোগী না হওয়া; বরং মুসলিম উম্মাহর শক্তিকে বৃদ্ধি করা এবং নিজের সন্তানদের সৎ, যোগ্য ও শক্তিশালী মুমিন হিসেবে গড়ে তোলা। ক্যারিয়ার, সৌন্দর্য ইত্যাদির নেশায় নারীদের মাঝে মাতৃত্বের প্রতি যেই অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে, সেটাকে দূর করার জন্য আমাদের বোনদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মাতৃত্বকে অনেকে বন্দিত্ব হিসেবেও প্রচার করছে। মুসলিম বোনদেরই মাতৃত্বের স্বাদ ও তৃপ্তিকে নারীদের উপভোগ করাতে হবে। মাতৃত্বের পবিত্র ও পরম অনুভূতি মুসলিম তরুণীদের মাঝে জাগ্রত করতে হবে।
📄 উপসংহার
উপসংহার :
আমরা এতক্ষণ পর্যন্ত পুরো বইটিতে মুসলিম নারীদের সম্পর্কে আমেরিকান প্রাচ্যবাদী সংস্থা র্যান্ড কর্পোরেশনের বেশ কিছু রিপোর্টের অবস্থান ও তার সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পূর্বের আলোচনা থেকে আমাদের সামনে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়। নিম্নে পয়েন্ট আকারে আমরা সেগুলো তুলে ধরছি-
১. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ ইউরোপীয় বিভিন্ন প্রাচ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী সংস্থাগুলো মনে করে, মুসলিম বিশ্বে নারী-অধিকারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্যে পরিণত হতে হবে।
২. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ তার সহযোগী দল ও সংস্থাগুলো মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা নারী-অধিকারের যেই ধারণা চাপিয়ে দিতে চায়, তারা সেটার অগ্রগতি ও অবনতির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে এবং তারা ভালো করেই জানে যে, ইসলামি শরিয়াহ নারী-অধিকারের পশ্চিমা কনসেপ্টের সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক।
৩. এজন্য র্যান্ড কর্পোরেশনসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মুসলিম নারীদের, বিশেষত লিবারেল ও সেকুলারদের ইসলামি শরিয়াহর বিরুদ্ধে জনমত ও আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আহবান জানায়।
৪. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ প্রাচ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী সংস্থাগুলো মুসলিম বিশ্বে নারী-অধিকারের বিষয়টিকে চিন্তাযুদ্ধ চালানোর জন্য প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে।
৫. র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের চিন্তাযুদ্ধের জন্য মুসলিমদের ভেতর থেকে একদল সেনা তৈরি করছে। প্রচলিত পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিগুলো এই ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। তাদের পরিকল্পনা হলো, বহিরাগত কোনো পক্ষের পরিবর্তে যেন ভেতরের এই এজেন্ডাগুলোই ইসলামের বিরুদ্ধে চিন্তাযুদ্ধকে পরিচালনা করে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে যেন এদেরই কর্তৃত্ব থাকে।
৬. র্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, মুসলিম নারীদের অধিক হারে রাজনীতিতে প্রবেশ ও সক্রিয় হওয়ার দ্বারা খুব সহজেই কিছু কিছু শরিয়াহ আইনকে সংস্কার করা যেতে পারে। এজন্য তারা মুসলিম নারীদের, বিশেষত নারীদের মধ্যে যারা দুর্বল দীনি চেতনার অধিকারী, তাদের রাজনীতি ও বিচার কার্যালয়ে অধিক হারে অংশগ্রহণ করে দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠার জন্য আহবান জানায়।
৭. নারী-অধিকারের দাবির ক্ষেত্রে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠ কোনো ব্যাখ্যা নেই। যেই ব্যাখ্যা নারীর নিরাপত্তা ও শান্তি কিংবা সমাজের উন্নতি-অগ্রগতিকে নিশ্চিত করতে পারে।
৮. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ প্রাচ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা পদ্ধতিতে ন্যায়নিষ্ঠতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বলতে কোনো কিছু নেই। তাদের এসব গবেষণাতে ঔপনিবেশিক স্বার্থ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক পলিসি তৈরিকরণ ছাড়া আর কিছু নেই।
৯. তারা নারীদের বিশেষ করে এমন সব সেক্টরে নিয়ে আসতে চায়, ইসলামি শরিয়াহ যার অনুমোদন দেয় না এবং নারীদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য যাকে গ্রহণ করে না। যেমন: রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারকের আসন, সাধারণ নেতৃত্ব, ডিফেন্স বিভাগ ইত্যাদি।
১০. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ পশ্চিমা বিশ্ব নারী-অধিকার নিয়ে এত সরব হওয়ার উদ্দেশ্য কখনোই নারীকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা নারীর দেহ ও মনের প্রকৃতির প্রতি লক্ষ রেখে তার অধিকার নিশ্চিত করা নয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, তাদের উপনিবেশবাদী ও পুঁজিবাদী স্বার্থ বাস্তবায়ন করা।
১১. র্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, সমাজ ও দেশের উন্নতি সকল সেক্টরে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে হওয়া উচিত। এজন্য তারা ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশে নারীর কর্মের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যদি ফ্রি-মিক্সিং পরিবেশ বেশি বিরোধিতার মুখে পড়ে, তাহলে সাময়িকভাবে এবং পর্যায়ক্রমে ফ্রি-মিক্সিংয়ের পরিবেশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পৃথক কর্মসংস্থানকে তারা গ্রহণ করে।
১২. ঐতিহাসিক রীতি, মুসলিম উলামায়ে কেরামের মতামত ও পশ্চিমা কিছু গবেষকদের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণিত যে, মহিলাদের থেকে ঘরকে বিরান করে রাখা ও ফ্রি-মিক্সিংয়ের সংস্কৃতি চালু হওয়া সামাজিক অনেক ক্রাইসিসের জন্ম দেয়, আল্লাহর শাস্তি নামিয়ে আনে এবং একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেয়।
১৩. র্যান্ড কর্পোরেশনের রিপোর্টগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বব্যাপী মুসলিম নারীরা তাগরীবি বা ওয়েস্টার্নাইজেশন প্রজেক্টের শিকার হচ্ছে। যেই প্রজেক্টে তার দীন, সত্তা, পর্দা সবকিছুকে ধ্বংসের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
১৪. নারী বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের দোসরদের সাথে আমাদের দ্বন্দ্ব অত্যন্ত বিস্তৃত একটি ক্ষেত্র পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, দাতব্য সংস্থা-এই সবকিছু বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের সাথে জড়িত। সুতরাং বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হলে আমাদের উল্লিখিত সব দিক নিয়েই কাজ করতে হবে।
১৫. র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম বিশ্বে নারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পশ্চিমা সংস্কার সাধনের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখিয়েছে। এবং এ ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় পলিসি হলো, স্থানীয় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাকে অর্থায়ন করা এবং তাদের পরিকল্পনা প্রদান করা।
১৬. নারী ও তার পশ্চিমা অধিকারকে র্যান্ড কর্পোরেশন গণতন্ত্র ও লিবারেল মতাদর্শ বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে গণনা করে।
১৭. র্যান্ড কর্পোরেশনসহ প্রাচ্যবাদী ও পশ্চিমা উপনিবেশবাদী সংস্থাগুলো মুসলিম নারীদের সেসব ইসলামি সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহ দিয়ে সমাজ পরিচালনা করে কিংবা করতে চায়।
১৮. র্যান্ড কর্পোরেশন কিছু মুসলিম দেশে হিজাবের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এটিকে ইসলামকে কট্টরভাবে পালন করার প্রবণতা বৃদ্ধির আলামত হিসেবে দেখছে। পাশাপাশি তারা কিছু মুসলিম তরুণীর হিজাব পরিত্যাগ এবং তা পরিত্যাগ করতে সহায়ক কারণগুলোও উদঘাটন করার চেষ্টা করছে।
১৯. র্যান্ড কর্পোরেশন মুসলিম নারীদের হিজাব দীনি ড্রেস হওয়ার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করছে। তারা হিজাবকে কেবল একটি সামাজিক প্রথা হিসেবে দেখছে; বরং কেউ কেউ এটাকে রাজনৈতিক প্রতীক, এমনকি কেউ কেউ জঙ্গিবাদের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করছে।
২০. র্যান্ড কর্পোরেশনের কিছু গবেষক এবং ইউরোপীয় কিছু দেশ হিজাবকে নারীর স্বাধীনতা হিসেবে কল্পনাই করতে পারে না। একজন নারী যত আগ্রহ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই হিজাবকে গ্রহণ করুক না কেন, এটাকে তারা ব্রেইনওয়াশ কিংবা জোরজবরদস্তির ফলাফল মনে করে।
২১. ঘনবসতি-সম্পন্ন মুসলিম দেশগুলোতে র্যান্ড কর্পোরেশন জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেছে। যেমন: মিশর, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি। মুসলিম দেশগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। আর এই প্রজেক্টে পরিবারের প্রধান খুঁটি হিসেবে তারা নারীদের টার্গেট বানিয়েছে।
২২. জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রজেক্টে তাদের টার্গেট হলো, প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীর গড়ে দুই সন্তানের বেশি না থাকা এবং নানাভাবে নারীদের জন্মদানের ক্ষমতা, সম্ভাবনা ও ইচ্ছা কমিয়ে আনা।
২৩. র্যান্ড কর্পোরেশন মনে করে, জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রজেক্টে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হলো, জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি করা।
২৪. জন্মনিয়ন্ত্রণের পেছনে র্যান্ড কর্পোরেশন তাদের রিপোর্টগুলোতে যেসব দাবি, যুক্তি ও উপকারিতার কথা উল্লেখ করেছে, যেমন: মানুষের আয় বৃদ্ধি পাওয়া, দেশের সম্পদ ও অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়া, সরকারের চাপ কমা, এগুলো কোনো একাডেমিক আলাপ নয় এবং এই দাবিসমূহের কোনো ন্যায়নিষ্ঠ ভিত্তিও নেই। সম্পূর্ণ এই প্রজেক্টে তাদের উদ্দেশ্য উপনিবেশবাদী স্বার্থ বাস্তবায়ন করা এবং মুসলিমদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা।