📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 ছুড়ে ফেলুন গাফিলতির চাদর

📄 ছুড়ে ফেলুন গাফিলতির চাদর


প্রিয় মুসলিম ভাই, মহান রব্বুল আলামিনের ইবাদত থেকে গাফিল থেকো না, যিনি তোমার জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রেখেছেন এবং তোমার দিন ও নিশ্বাসের পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সবকিছুই তোমার হাতছাড়া হয়ে যাক; কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য যেন তোমার হাতছাড়া না হয়।
لهاك النوم عن طلب الأماني وعن تلك الكوانس في الجنان تعيش مخلدًا لا موت فيها وتلهو في الخيام مع الحسان تيقظ من منامك إن خيرا من النوم التهجد بالقرآن
'ঘুম তোমাকে তোমার স্বপ্ন পূরণের পথ থেকে বিমুখ করে রেখেছে। জান্নাতের সুরম্য প্রাসাদ থেকেও। যেখানে তুমি আজীবন থাকবে। মৃত্যু নেই সেখানে। আরামদায়ক তাঁবুতে বসে সুন্দরী সঙ্গিনী নিয়ে মত্ত থাকবে তুমি সেখানে। এসব পেতে চাইলে ঘুম থেকে উঠে যাও। এই ঘুমের চেয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে তাহাজ্জুদ পড়া অনেক উত্তম।'
আবুল জুয়াইরিয়া বলেন, 'আমি ছয় মাস ইমাম আবু হানিফা -এর সাহচর্যে ছিলাম। তাকে কোনো রাতে আমি বিছানায় পিঠ রাখতে দেখিনি।'
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর ব্যাপারে তার ছেলে বলেন, 'আমার পিতা প্রতিদিন কুরআনের এক-সপ্তমাংশ তিলাওয়াত করতেন। ইশার নামাজের পরে কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তারপর উঠে যেতেন এবং ফজর পর্যন্ত নামাজ ও দুআয় মশগুল থাকতেন।'
সালিহিনের ইবাদতের যেসব চিত্র এতক্ষণ ধরে আমি আপনাদের দেখালাম, এতে তাদের আমলের পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য ফুটে উঠেনি। তাদের ইবাদতের পরিধি ও আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের কর্মসূচি আরও সমৃদ্ধ ও ব্যাপক ছিল। কারণ তারা জানতেন, এই দুনিয়া আমলের স্থান। দুনিয়ার এ জীবনে আমল আছে, হিসাব নেই। আর আখিরাতের জীবনে হিসাব আছে, আমল নেই।
অনেক সালাফের ব্যাপারেই প্রসিদ্ধি আছে, তারা রাতভর ইবাদত করতেন; ইশার সালাতের অজু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করতেন। তাদের কারও নাম-পরিচয় আমরা জানি, কারও জানি না। পরিচিতজনদের কয়েকজন হলেন:
• সাইদ বিন মুসাইয়িব, সাফওয়ান বিন সুলাইম ও মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির। তারা ছিলেন মদিনার অধিবাসী।
• ফুজাইল ও উহাইব। তারা ছিলেন মক্কার অধিবাসী।
• তাউস ও ওয়াহাব। তারা ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী।
• রবি বিন খুসাইম ও হাকাম। তারা ছিলেন কুফার অধিবাসী।
• আবু সুলাইমান দারানি ও আবু জাবির। তারা ছিলেন পারস্যের অধিবাসী।
• আরও আছেন সুলাইমান তাইমি, মালিক বিন দিনার ও ইয়াজিদ রাকাশি।
প্রিয় মুসলিম ভাই,
ইবনে ইসহাক বলেন, 'একবার আব্দুর রহমান আসওয়াদ আমাদের এখানে হজ করতে এলেন। হজ করতে গিয়ে তার এক পা আঘাতপ্রাপ্ত হলো, তা সত্ত্বেও রাতে তিনি এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে ফজর পর্যন্ত নামাজ পড়লেন।'
মাসরুক -এর স্ত্রী বলেন, 'মাসরুকের কোনো অসুখ ছিল না, তবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার কারণে তার পা-দুটি ফুলে গিয়েছিল।'
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমার পিতা প্রতিদিন রাতে-দিনে তিনশ রাকআত নফল নামাজ পড়তেন। কুরআন মাখলুক না হওয়ার প্রবক্তা হওয়ায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি রাত-দিন মিলিয়ে দেড়শ রাকআত নফল নামাজ পড়তেন। মাঝেমধ্যে একশ আশি রাকআত পর্যন্ত পড়তেন। তিনি প্রতিদিন এক-সপ্তমাংশ কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এভাবে সাত দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। আবার দিনের নামাজ ব্যতীত শুধু রাতের নামাজেও প্রতি সাত দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। ইশার নামাজের পর অল্পক্ষণের জন্য তিনি ঘুমাতেন। তারপর উঠে ফজর পর্যন্ত নামাজ ও দুআয় মশগুল থাকতেন।'
সুলাইমান তাইমি প্রতি সিজদায় সত্তর বার তাসবিহ পড়তেন!
কীভাবে তারা এত ইবাদত করতে সক্ষম হতেন?! আমরা তো আল্লাহর কাছে নিজেদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার অভিযোগ করা ছাড়া কিছুই করতে পারি না!
فكم بين مشغول بطاعة ربه وآخر بالذنب الثقيل مقيد فهذا سعيد بالجنان منعم وذاك شقي في الجحيم مخلد كأني بنفسي في القيامة واقف وقد فاض دمعي والمفاصل ترعد
'আল্লাহর ইবাদতে রت ব্যক্তি আর গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির মাঝে কী বিশাল পার্থক্য! একজন চির শান্তির জান্নাতের নিয়ামতসমূহ পেয়ে ধন্য, আরেকজন চির অশান্তির জাহান্নাম পেয়ে দুর্ভাগা। আমি মাঝেমধ্যে নিজেকে কিয়ামতের মাঠে কল্পনা করি। তখন ভয়ে আমার চোখ প্লাবিত হয়, শরীরের জোড়াগুলো ঢিলা হয়ে যায়।'
আল্লাহর প্রতি মহব্বতের আরেকটি নিদর্শন হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করা। এই মুনাজাতে যে স্বাদ ও আনন্দ পাওয়া যায়, দুনিয়ার কোনো খুশি-আনন্দ ও স্বাদ-উপভোগ তার কাছে কিছুই নয়। এ সম্পর্কে আবু সুলাইমান-এর কথাটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, 'রাত জেগে ইবাদতকারীরা আঁধারের মাঝে যে স্বাদ খুঁজে পায়, তা খেল-তামাশায় লিপ্ত লোকেরাও পায় না। যদি রাত না হতো, তবে রাতের ইবাদতকারীরা দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে চাইত না। '
ইবনে মুনকাদির বলেন, 'দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগের মধ্যে কেবল তিনটি অবশিষ্ট থাকে : রাতের ইবাদত, বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ ও জামাআতে নামাজ।
আমাদের সালাফগণ ইবাদতে স্বাদ অনুভব করতেন, আর বর্তমান যুগের অবস্থা হলো, মানুষ ইবাদতকে খুব ভারী মনে করে এবং ইবাদত থেকে পালিয়ে বেড়ায়।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলা থেকে বিমুখ হয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি, যে নিজেকে বাদ দিয়ে মানুষজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যে রাতকে আমরা অহেতুক কাজে নষ্ট করি, সেই রাত কেটে যখন ভোর হতো তারা ব্যথিত হতেন। রাতে ইবাদত করে এবং দিনে রোজা রেখে তারা আনন্দিত হতেন। কী পার্থক্য তাদের ও আমাদের মাঝে!? আমরাও কি পারি না তাদের মতো হতে?
রাতের বিদায় যে তাদের জন্য কতটা কষ্টকর ছিল, তা আলি বিন বিকার-এর কথা থেকে বোঝা যায়। তিনি বলেন, 'গত চল্লিশ বছর ধরে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করে, তা হলো ফজরের আগমন।'
صلاتك نور والعباد رقود ** ونومك ضد للصلاة عنيد
'মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন উঠে নামাজ পড়া তোমার জন্য নুর। এই নামাজের সবচেয়ে বড় বাধা হলো তোমার ঘুম।'
তুমি কি খেয়াল করেছ, ইবাদতের প্রতি তাদের কীরূপ ভালোবাসা ছিল? ইবাদতে কেমন ধারাবাহিকতা ছিল তাদের? এ জন্যই তো আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ইবাদতকে দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগে পরিণত করে দিয়েছিলেন।
সাবিত বুনানি বলতেন, 'কিয়ামুল লাইলে যে স্বাদ আমি পাই, তা অন্য কোনো কিছুতে পাই না।'
রাত ছিল তাদের জন্য আমল ও ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। আসমান-জমিনের পালনকর্তার সাথে একান্তে মুনাজাতের অমূল্য মুহূর্ত। তাই তো রাতের আগমনে তারা আনন্দিত হতেন এবং বিদায়ে ব্যথিত হতেন।
মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তার মৃত্যুর সময় কাছে চলে আসলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমি না দুনিয়ার প্রতি আসক্তির কারণে কাঁদছি, না মৃত্যুর ভয়ে অস্থির হয়ে কাঁদছি। আমি কাঁদছি মধ্যাহ্নের তৃষ্ণা (যা রোজা রাখার ফলে অনুভব করতাম) এবং শীতের রাতের ইবাদতের বিরহে।'
শীতকালে দিনে রোজা রাখতে এবং রাতে নামাজ পড়তে অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে বেশি সুবিধাজনক। এ জন্য রাসুলুল্লাহ এর নাম দিয়েছেন 'অনায়াসলব্ধ গনিমত'।
بكي الباكون للرحمن ليلاً ** وباتوا وهم لا يسأمونا بقاع الأرض من شوق إليهم ** تحن متى عليها يسجدونا
'গভীর রজনীতে ক্রন্দনকারী রহমানের ভয়ে অঝোর ধারায় কাঁদে। ঘুমহীন রাত কেটে যায় তাদের। বিরক্তি আসে না একটুও। জমিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে, কবে তাহাজ্জুদগুজার বান্দারা তার ওপর সিজদাবনত হবে।'
খুলদি বলেন, 'জনৈক মৃত ব্যক্তিকে আমি স্বপ্নে দেখলাম। তাকে বললাম, "আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?” তিনি বললেন, “কিতাবের ইবারত, সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম মাসআলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রুসুম- রেওয়াজ কোনো কিছুই কাজে আসেনি। আমার উপকারে এসেছে কেবল সেই দুই রাকআত নামাজ, যা আমি রাতের শেষ প্রহরে পড়তাম।"
প্রিয় পাঠক, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
و من كان يرغب في النجاة فما له غير اتباع المصطفى فيما أتى ذاك السبيل المستقيم وغيره سبل الظلالة والغواية والردى فاتبع كتاب الله والسنن التى صحت فذاك إن اتبعت هو الهدى
'মুক্তি পেতে চাও? মুক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণেই নিহিত। তাঁর আনীত দ্বীনই একমাত্র সরল পথ। বাকি সব গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতা। সুতরাং যদি হিদায়াতের পথে পরিচালিত হতে চাও, তাহলে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহর অনুসরণ করো।'

টিকাঃ
১১১. আল-ফাওয়ায়িদ : ১২৯ পৃ.।
১১২. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান : ২২৫ পৃ.।
১১৩. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১১৪. আস-সিয়ার: ১১/২১৪।
১১৫. আস-সিয়ার: ৫/১২।
১১৬. আল-মুদহিশ: ৪৩১ পৃ.।
১১৭. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৭ পৃ.।
১১৮. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১৫১ পৃ.।
১১৯. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২০. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২১. আল-ফাওয়ায়িদ: ১০৮ পৃ.।
১২২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২৩. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২৬৫ পৃ.।
১২৪. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৬২।
১২৫. সুনানুত তিরমিজি: ৭৯৭, মুসনাদু আহমাদ: ১৮৯৫৯।
১২৬. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ৩৩১ পৃ.।
১২৭. আস-সিয়ার: ২৩/৩১৪।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 তাহাজ্জুদ আদায়ে সহায়ক কিছু কাজ

📄 তাহাজ্জুদ আদায়ে সহায়ক কিছু কাজ


যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে চায়, পুণ্যবানদের কাতারে শামিল হতে চায়, তার জন্য নিচের উপায়গুলো অবলম্বন করা আবশ্যক :
১. অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা। কারণ বেশি খেলে পানিও বেশি খেতে হয়। এতে শরীরে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেয়ে ঘুম প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২. দিনের বেলা শরীরকে খুব বেশি ক্লান্ত করে দেয় এমন কর্ম থেকে বিরত থাকা; কারণ এর ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও স্নায়ুকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে। কাজেই রাতে খুব ভারী ঘুম আসে।
৩. দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমানো। এটা সুন্নাতও বটে। আর কিয়ামুল লাইলের জন্য সহায়কও।
৪. অন্তরে মুমিনদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না থাকা। বিদআত, কুসংস্কার এবং দুনিয়াবি চিন্তা থেকে মুক্ত থাকা। কেননা এইসব রোগ আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ করে দেয়।
৫. দিনে গুনাহ করা থেকে বিরত থাকা। কারণ গুনাহ কলবকে শক্ত করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৬. অন্তরে দুনিয়ার দীর্ঘ আশা লালন না করা। তাকওয়া অবলম্বন করা। কিয়ামত দিবস ও জাহান্নামের বিভীষিকা সম্পর্কে চিন্তা করা।
প্রিয় ভাই,
মনে রেখো, তাহাজ্জুদ পড়তে পড়তে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পা ফুলে যেত। এ ছাড়াও আমাদের সালাফে সালিহীন এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানগণ নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তুমি কি চাও না সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জান্নাতে তাঁদের প্রতিবেশী হতে? তুমি কি চাও না আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত দল: নবি, সিদ্দিক, শহিদ ও নেককারদের সঙ্গী হতে? এঁরাই তো সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী!
প্রিয় মুসলিম ভাই, তুমি চাইলে সালাফের যোগ্য খালাফ হতে পারো। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তুমি কিয়ামুল লাইল আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে ওঠো; আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে মুনাজাত করো। এতে তোমার কলব জীবন্ত হয়ে উঠবে; হৃদয়ে জ্বলে উঠবে ইমানের দীপশিখা।
আল্লাহ তাআলা আমাকে, তোমাকে এবং সবাইকে সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন :
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ - آخِذِينَ مَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُحْسِنِينَ - كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا
يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ )
'মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাত ও ঝরনাধারার মাঝে। তাদের রবের দেওয়া নিয়ামত উপভোগ করবে। কারণ পার্থিব জীবনে তারা নেককার ছিল। তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। '

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 রাসুলুল্লাহ ﷺ যেভাবে কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন

📄 রাসুলুল্লাহ ﷺ যেভাবে কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন


রাসুলুল্লাহ ঘরে কিংবা সফরে যেখানেই থাকতেন না কেন, কখনো তাহাজ্জুদ ছাড়তেন না। তিনি সাধারণত এগারো রাকআত বা তেরো রাকআত তাহাজ্জুদ পড়তেন। রাতের প্রথম ভাগে চার অথবা ছয় রাকআত পড়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেন। ঘুম থেকে উঠে প্রথমে মিসওয়াক করতেন। এরপর আল্লাহর জিকির করতেন। ঘুম থেকে ওঠার সময় বলতেন:
«الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا، وَإِلَيْهِ النُّشُورُ»
'সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে মৃত্যুর পরে পুনরায় জীবিত করেছেন। তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
তারপর তিনি পবিত্রতা অর্জন করে সংক্ষিপ্ত আকারে দুই রাকআত নামাজ পড়তেন। কখনো কখনো তিনি মধ্যরাতে উঠে যেতেন। মাঝেমধ্যে এর কিছুক্ষণ আগে বা পরেও উঠতেন। অনেক সময় মোরগের ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠতেন। মোরগ সাধারণত রাতের দ্বিতীয় ভাগে ডাকে। আর প্রায়ই তিনি কিয়ামুল লাইল ধারাবাহিকভাবে আদায় করতেন, কখনো আবার মাঝখানে ঘুমোতেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাহাজ্জুদ ও বিতির কয়েক পদ্ধতিতে আদায় করতেন।
প্রথম পদ্ধতি :
রাসুলুল্লাহ ﷺ অধিকাংশ সময় কিয়ামুল লাইল ধারাবাহিকভাবে টানা আদায় করতেন, কখনো আবার মাঝখানে বিরতি দিতেন। যেমন ইবনে আব্বাস রা. যে রাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে ছিলেন, সে রাতের হাদিসে এসেছে, 'রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক করলেন। তারপর অজু করে তিলাওয়াত করলেন:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
'নিশ্চয় আসমানমণ্ডলী ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।'
এই আয়াত থেকে শুরু করে এ সুরার শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে নামাজে দাঁড়িয়ে দুই রাকআত নামাজ পড়লেন। সে নামাজের কিয়াম, রুকু ও সিজদা খুবই দীর্ঘ ছিল। তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন। এভাবে তিনবারে মোট ছয় রাকআত নামাজ পড়লেন। প্রতিবারেই মিসওয়াক করলেন, অজু করলেন এবং উক্ত আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করলেন। তারপর তিন রাকআত বিতির পড়লেন। এরপরেই মুয়াজ্জিন আজান দিল। তখন তিনি এই দুআ পড়তে পড়তে মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন :
«اللهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَأَمَامِي نُورًا، وَخَلْفِي نُورًا، وَفَوْقِي نُورًا، وَتَحْتِي نُورًا، وَاجْعَلْ لِي نُورًا»
'হে আল্লাহ, আমার কলবে নুর দান করুন। আমার কানে, চোখে, ডানে, বামে, সামনে, পেছনে, ওপরে ও নিচে নুর দান করুন। আমাকে নুর দান করুন।'
ইবনে আব্বাস সংক্ষিপ্ত আকারে দুই রাকআত নামাজ পড়ে শুরু করার কথা উল্লেখ করেননি, যেটা আয়িশা উল্লেখ করেছেন। হয়তো রাসুলুল্লাহ কখনো এ দুই রাকআত পড়তেন, কখনো ছেড়ে দিতেন অথবা এও হতে পারে যে, এর দুই রাকআতের কথা আয়িশা -এর মনে ছিল, কিন্তু ইবনে আব্বাস -এর মনে ছিল না।
দ্বিতীয় পদ্ধতি : যেভাবে আয়িশা বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ প্রথমে সংক্ষিপ্ত আকারে দুই রাকআত পড়ে শুরু করতেন। এরপর এগারো রাকআত পূর্ণ করতেন। প্রতি দুই রাকআত পরপর সালাম ফেরাতেন এবং এক রাকআত বিতির পড়তেন।
তৃতীয় পদ্ধতি : উপরিউক্ত পদ্ধতিতে তেরো রাকআত পড়তেন।
চতুর্থ পদ্ধতি : আট রাকআত পড়তেন। প্রতি দুই রাকআত পরপর সালাম ফেরাতেন। তারপর এক সালামে পাঁচ রাকআত বিতির পড়তেন। পাঁচ রাকআতের মধ্যে কেবল সর্বশেষ রাকআতে বসতেন। মাঝখানে কোনো রাকআতে বসতেন না।
পঞ্চম পদ্ধতি : নয় রাকআত পড়তেন। প্রথমে টানা আট রাকআত পড়তেন। মাঝখানে কোনো রাকআতে বসতেন না। কেবল অষ্টম রাকআতে বসতেন। অষ্টম রাকআতে বসে আল্লাহর জিকির ও হামদ পাঠ করতেন এবং দুআ করতেন। এরপর সালাম না ফিরিয়ে নবম রাকআতের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। তারপর বসে তাশাহহুদ পড়ে সালাম ফেরাতেন। সালাম ফেরানোর পর বসে বসে দুই রাকআত পড়তেন।
ষষ্ঠ পদ্ধতি : পঞ্চম প্রকারে উল্লেখিত নয় রাকআতের মতো করে সাত রাকআত পড়তেন। তারপর বসে বসে আর দুই রাকআত পড়তেন।
সপ্তম পদ্ধতি : দুই রাকআত দুই রাকআত করে নামাজ পড়তেন। তারপর তিন রাকআত বিতির পড়তেন। শেষের দুই রাকআত ও বিতিরকে আলাদা করতেন না।
অষ্টম পদ্ধতি : নাসায়ি হুজাইফা-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রমাদানে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পাশে নামাজ পড়লেন। রুকুতে গিয়ে তিনি (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى) পড়লেন। কিয়ামে যতক্ষণ ছিলেন, রুকুতেও ঠিক ততক্ষণ ছিলেন। তারপর রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় (سَمِعَ الله لِمَنْ حَمِدَهُ) পড়লেন। রুকু থেকে দাঁড়িয়ে ঠিক ততক্ষণ দাঁড়ালেন, যতক্ষণ রুকুতে ছিলেন। তারপর সিজদায় গেলেন। সিজদায় গিয়ে (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى) পড়লেন। সিজদায় ততক্ষণ ছিলেন, যতক্ষণ কিয়ামে ছিলেন। সিজদা থেকে উঠে (رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي) পড়লেন। এখানেও ঠিক ততক্ষণ অবস্থান করলেন, যতক্ষণ কিয়াম অবস্থায় ছিলেন। এরপর প্রথম সিজদার মতো দ্বিতীয় সিজদা করলেন। এভাবে কেবল চার রাকআত আদায় করলেন। ততক্ষণে বিলাল নামাজ এর জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ডাকতে আসলেন।
রাসুলুল্লাহ কখনো রাতের প্রথম ভাগে, কখনো মধ্যভাগে, কখনো শেষভাগে বিতির পড়তেন। এক রাতে সকাল পর্যন্ত কেবল একটি আয়াতই পড়তে থাকলেন। আয়াতটি হলো :
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الحكيم
‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা আপনার দাস এবং যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে আপনিই পরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞ।’

টিকাঃ
১২৮. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ১৫-১৮।
১২৯. সহিহুল বুখারি: ৬৩১২, সহিহু মুসলিম: ২৭১১।
১৩০. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৯০।
১৩১. সহিহু মুসলিম: ৭৬৩।
১৩২. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৮।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 তথ্যসূত্র

📄 তথ্যসূত্র


১- إحياء علوم الدين لأبي حامد الغزالي دار الكتب العلمية ط ١، ١٤٠٦ هـ
২- بستان العارفين للإمام أبي يحيي زكريا بن شرف النووي، حققه محمد الجار.
৩- تاريخ بغداد لأبي بكر أحمد بن علي الخطيب البغدادي، دار الكتب العلمية.
৪- تذكرة الحفاظ للإمام الذهبي، دار إحياء التراث العربي.
৫- تفسير ابن كثير، للإمام أبي الفداء إسماعيل بن كثير، دار الفكر ١٤٠١هـ
৬- جامع العلوم والحكم، ابن رجب الحنبلي، ط ٥، ١٤٠٠هـ
٧- الجواب الكافي لمن سأل عن الدواء الشافي لابن قيم الجوزية ط ١، ١٤٠٧هـ
৮- حلية الأولياء وطبقات الأصفياء، للحافظ أبي نعيم، دار الكتاب العربي.
৯- رهبان الليل، سيد بن الحسين العفاني، مكتبة ابن تيمية ط ١، ١٤٠٧هـ
১০- যাদ আল-মা'আদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, লি ইবনি কাইয়্যিমিল জাওযিয়্যাহ, তাহকিক শু'আইব আল-আরনাউত, ওয়া আব্দ আল-কাদির আল-আরনাউত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ ১৪০২ হিঃ।
১১- আয-যুহদ লিল ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, দিরাসাহ ওয়া তাহকিক মুহাম্মাদ আস-সাঈদ, দার আল-কিতাব আল-আরাবি, তা ১, ১৪০৬ হিঃ।
১২- আয-যাহর আল-ফাইয়্যিহ ফি যিকর মান তানাযযাহ আন আয-যুনুব ওয়াল কাবাইহ, মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আল-জাযারি, তাহকিক মুহাম্মাদ বাসইউনি, দার আল-কিতাব আল-আরাবি, তা ১, ১৪০৬ হিঃ।
১৩- সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, আয-যাহাবি, তাহকিক শু'আইব আল-আরনাউত ওয়া হুসাইন আল-আসাদ, মুআসসাসাতুর রিসালাহ ১৪০১ হিঃ।
১৪- শাযারাত আয-যাহাব ফি আখবার মান যাহাব লি ইবনিল ইমাদ আল-হাম্বলী, দার ইহইয়া আত-তুরাস আল-আরাবি।
১৫- সিফাত আস-সাফওয়া লি ইবনিল জাওযি, তাহকিক মাহমুদ ফাখুরি, ওয়া মুহাম্মাদ রাওওয়াস, দার আল-মা'রিফা ১৪০৫ হিঃ।
১৬- সাইদ আল-খাতির লি ইবনিল জাওযি, দার আল-কিতাব আল-আরাবি, তা ২, ১৪০৭ হিঃ।
১৭- তাবাকাত আশ-শাফিয়্যাহ লি তাজ আদ-দীন আবি নাসর আব্দুল ওয়াহহাব বিন আলী আস-সুবকি, তাহকিক মাহমুদ মুহাম্মাদ তানাহি ওয়া রাফিকিহি, দার ইহইয়া আল-কুতুব আল-আরাবিয়্যাহ।
١٨ - عقد اللؤلؤ والمرجان في وظائف شهر رمضان، إبراهيم بن عبيد.
١٩ - الفوائد لابن القيم الجوزية، دار النفائس.
٢٠- كتاب الزهد الكبير للإمام الحافظ أبو بكر أحمد بن الحسين البيهقي، حققه الشيخ عامر أحمد حيدر، مؤسسة الكتب الثقافية ط ١، ١٤٠٨هـ
٢١- مختصر قيام الليل، شيخ الإسلام أبي عبد الله محمد بن نصر المروزي، اختصرهما العلامة أحمد بن علي المقريزي.
٢٢- المدهش لأبي الفرج جمال الدين الجوزي، ضبطه وصححه د. مروان قباني، دار الكتب العلمية ط ٢ ، ١٤٠٥هـ
٢٣- مناقب الإمام أحمد للحافظ أبي الفرج عبد الرحمن بن الجوزي ۱۳۹۹ هـ، مكتبة الخاني.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00