📄 নেককার পরিবার
যেহেতু কিয়ামুল লাইলের জন্য মহা প্রতিদান ও বড় সাওয়াব রয়েছে, রাসুলুল্লাহ পরিবারের সবাইকে এ মহা কল্যাণ কাজে শরিক করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন :
رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى، وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ، فَإِنْ أَبَتْ، نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ، رَحِمَ اللَّهُ امْرَأَةٌ قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ، وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا، فَإِنْ أَبَى، نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ»
'আল্লাহ তাআলা সেই পুরুষের প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়। স্ত্রী উঠতে না চাইলে মুখে পানির ছিঁটা দেয়। আল্লাহ তাআলা সেই মহিলার প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং স্বামীকেও জাগিয়ে দেয়। স্বামী উঠতে না চাইলে তার মুখে পানির ছিঁটা দেয়।'
তিনি আরও ইরশাদ করেন :
مَنِ اسْتَيْقَظَ مِنَ اللَّيْلِ وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ، فَصَلَّيَا رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا، كُتِبَا مِنَ الذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا، وَالذَّاكِرَاتِ»
'যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়, তারপর উভয়ে একত্রে দুই রাকআত নামাজ পড়ে, তাদের দুজনের নাম আল্লাহর অধিক জিকিরকারী নারী- পুরুষের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়।'
রাসুলুল্লাহ -এর এই উৎসাহে সালাফগণ উৎসাহিত হয়েছিলেন। তাই তারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও তাহাজ্জুদের জন্য ডেকে দিতেন।
কাসিম বিন রাশিদ শাইবানি বলেন, 'রিফাত বিন সালিহ স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে মেহমান হলেন। রাতে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নামাজ পড়েন। আর রাতের শেষ প্রহরে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন :
يا أيها الركب المعرسونا أكل هذا الليل ترقدونا؟ ألا تقومون فتصلونا؟
“হে ঘুমন্ত কাফেলা, রাতভর কি ঘুমিয়েই কাটাবে? উঠে তাহাজ্জুদ পড়বে না?"
তিনি বলেন, 'তার ডাক শুনে পরিবারের সবাই জেগে ওঠে। কেউ হাত তুলে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করে, কেউ প্রাণখুলে দুআ করে, কেউ তিলাওয়াত করে, কেউ অজু করে। এভাবে যার যার মতো করে সবাই ইবাদতে লেগে যায়। এরপর ফজর হলে উচ্চ আওয়াজে তিনি ঘোষণা করতেন, "ফজরের সময় নৈশভ্রমণকারীরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।”
امنع جفونك أن تذوق مناما وذر الدموع على الخدود سجاما واعلم بأنك ميت ومحاسب يا من على سخط الجليل أقاما لله قوم أخلصوا في حبه فرضي بهم واختصهم خداما قوم إذا جن الظلام عليهم باتوا هنالك سجدًا وقياما خمص البطون من التعفف ضمرا لا يعرفون سوى الحلال طعاما
'চোখদুটোকে ঘুমের স্বাদ থেকে দূরে রাখো। প্রবলবেগে অশ্রুধারা ছেড়ে দাও গণ্ডদ্বয়ের ওপর। হে মহান ক্ষমতাধরের ক্রোধে নিপতিত, জেনে রাখো, তোমাকে একদিন মরতে হবে এবং হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা তাঁকে স্বচ্ছ হৃদয়ে ভালোবাসে। তিনিও তাদের ভালোবাসেন। আর তাদেরকে কবুল করে নিয়েছেন দ্বীনের সেবক হিসেবে। রাত যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা অবনত মস্তকে রবের দরবারে হাজিরা দেয়। খাদ্যাভাবে তাদের পেট যতই সংকুচিত হয়ে পড়ুক, যতই তাদের শরীর হোক হাড্ডিসার, হালাল ছাড়া কোনো খাবার ধরেও দেখে না তারা।'
রিয়াহ কাইসি একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। রাত শেষে সকাল হলে মেয়েটি রুটি বানানোর জন্য আটা মাখতে লেগে গেলেন। রিয়াহ কাইসি বললেন, 'তোমার এই কাজের সহায়তার জন্য কোনো মহিলা রাখলে বোধ হয় ভালো হতো।' মেয়েটি বলল, 'আমার বিয়ে হয়েছে রিয়াহ কাইসির সাথে, কোনো নাফরমান জালিমের সাথে আমার বিয়ে হয়নি।' পরের রাতে মেয়েটিকে পরীক্ষা করার জন্য রিয়াহ কাইসি ঘুমিয়ে পড়লেন। রাতের প্রথম চতুর্থাংশে মেয়েটি নামাজ পড়লেন। তারপর ডেকে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' তিনি 'উঠব' বলেও উঠলেন না। পরবর্তী চতুর্থাংশও মেয়েটি নামাজ পড়ে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' এবারেও তিনি 'উঠব' বললেন; কিন্তু উঠলেন না। পরবর্তী চতুর্থাংশেও মেয়েটি নামাজ পড়লেন। আবার ডেকে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' তিনি বললেন, 'উঠছি।' তখন মেয়েটি বললেন, 'রাত শেষ হতে চলেছে, নেককার লোকেরা সবাই একত্রিত হয়েছেন; কিন্তু আপনি এখনো ঘুমিয়ে আছেন। হে রিয়াহ, আমি জানি না, কীসে আপনাকে প্রতারিত করে রেখেছে।' বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর বাকি চতুর্থাংশেও মেয়েটি নামাজ পড়লেন।'
হাবিব আজমি বিন মুহাম্মাদ -এর স্ত্রী এক রাতে ঘুম থেকে উঠলেন। হাবিব আজমি তখনও ঘুমিয়ে ছিলেন। রাতের শেষ প্রহর শুরু হলে তাকে ডেকে দিলেন এবং বললেন, 'উঠুন, রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। আপনার সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ পথ; অথচ পাথেয় খুব স্বল্প! নেককারদের কাফেলা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আমরাই কেবল পেছনে পড়ে আছি।'
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, আখিরাতে কামিয়াব হতে চায়, সে যেন তার অন্তরকে সব সময় লক্ষ্য অর্জনের পথে অবিচল রাখে; জিহ্বাকে বেহুদা কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে-আল্লাহর জিকির ও ইমান-জাগানিয়া আলোচনায় ব্যাপৃত থাকে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং প্রবৃত্তির আনুগত্য থেকে নিজেকে বিরত রাখে। ওয়াজিব ও মুসতাহাব আমলগুলো মনোযোগ সহকারে আদায় করে। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত এইভাবে জীবনযাপন করে।
হাসসান বিন আবু সিনান -এর স্ত্রী বলেন, 'হাসসান আমার সাথে এক বিছানায় ঘুমাতেন। তারপর আমার সাথে কৌশল করতেন, যেভাবে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে কৌশল করে। যখন মনে করতেন যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, সন্তর্পণে বিছানা থেকে বের হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। আমি তাকে বললাম, “হে আবু আব্দুল্লাহ, নিজেকে আর কত কষ্ট দেবেন? নিজের প্রতি একটু নম্র হোন” তিনি বললেন, “চুপ করো, কী বলো এসব তুমি?! অচিরেই আমি তো এক ঘুমের রাজ্যে চলে যাব, যে ঘুম থেকে উঠব দীর্ঘকাল পরে।”
হে পাঠক, সফর শেষ হয়, যদি মুসাফির রাস্তার ওপর অটল থাকে এবং রাতেও সফর অব্যাহত রাখে। মুসাফির যদি রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায়, তবে সে তার গন্তব্যে কীভাবে পৌঁছুবে?
হাসান বিন আবু সালিহ -এর এক দাসী ছিল। তিনি তাকে অন্য এক পরিবারের কাছে বিক্রি করে দিলেন। ফজর হওয়ার আগে সেই দাসীটি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। এবং 'আস-সালাহ আস-সালাহ'—নামাজ, নামাজ—বলে ডাকতে শুরু করলেন। নতুন পরিবারের লোকেরা তাকে বলল, 'ফজর হতে এখনো অনেক সময় বাকি। ফজরের ওয়াক্ত আসার আগে আমাদের ডেকো না।' দাসীটি অবাক হয়ে বললেন, 'আপনারা কি শুধু ফরজ নামাজই আদায় করেন?!' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর দাসীটি হাসান-এর কাছে ফিরে আসলেন এবং বললেন, 'হে আমার মনিব, আপনি আমাকে এমন পরিবারের কাছে বিক্রি করেছেন, যারা শুধু ফরজ নামাজ আদায় করে। আমাকে তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিন।' তারপর তিনি সেই দাসীকে পুনরায় নিজের কাছে নিয়ে আসলেন।
ইবরাহিম বিন ওয়াকি বলেন, 'আমার পিতা রাতে যখন নামাজ পড়তে উঠতেন, তখন বাড়ির অন্যরাও নামাজ পড়তে উঠে যেতেন। এমনকি আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ দাসীটিও নামাজে দাঁড়িয়ে যেত।'
প্রিয় ভাই, দেখেছ তো, আমাদের সালাফগণ কীভাবে পুরো পরিবারে কল্যাণ ছড়িয়ে দিতেন? এমনকি তাদের ইবাদতের প্রভাব খাদিমদের ওপরেও পড়ত।
আবু হুরাইরা -এর একটি রাতের দিকে লক্ষ করো। কীভাবে তাঁর রাত কাটত। আবু উসমান নাহদি বলেন, ‘আমি আবু হুরাইরা -এর বাড়িতে সাত দিনের জন্য মেহমান হলাম। তখন আমি দেখলাম, তিনি, তাঁর স্ত্রী ও তাঁর দাসী রাতকে তিনভাগে ভাগ করে নেন। একভাগে নিজে, একভাগে স্ত্রী এবং অপরভাগে দাসী নামাজ পড়েন এবং প্রত্যেকেই তার সময় শেষ হলে অপরজনকে ডেকে দেন। ’
আমার ভাই, দেখলে তো, সালাফগণ কীভাবে রাত্রিযাপন করতেন? কীভাবে তারা সময়ের মূল্যায়ন করতেন? কিন্তু আফসোস, আমরা কোনো পরোয়া ছাড়াই আমাদের সময় ও জীবনকে নষ্ট করে চলছি! হেলায় কেটে যাওয়া সময়ের জন্য একটু মায়াও জাগে না আমাদের মনে! যেন সময়ই সবচেয়ে নগণ্য ও তুচ্ছ বস্তু আমাদের কাছে! অথচ প্রতিটি মিনিট একেকটি মূল্যবান সম্পদ। যে নিশ্বাস আমরা ছেড়ে দিই, সেটি আর কখনো ফিরে আসবে না। এই জীবনের প্রতিটি অংশের হিসাব নেওয়া হবে। তাই হিসাবের জন্য তৈরি হও। সময়কে মূল্যায়ন করো।
সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, যে যতদিন শরীরে শক্তি ছিল, ততদিন শক্তিকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করেছে; আর যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখন আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে অক্ষম হয়ে পড়েছে।
জুবাইদ বিন হারিস (রহঃ) রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। একভাগ নিজের জন্য, একভাগ তার প্রথম ছেলের জন্য, আরেক ভাগ দ্বিতীয় ছেলে আব্দুর রহমানের জন্য। তার অংশে তিনি ইবাদত করতেন। তারপর প্রথম সন্তানকে বলতেন, 'ওঠো, নামাজ পড়ো।' ছেলে উঠতে অলসতা করলে তার অংশেও তিনি নামাজ পড়তেন। তারপর তৃতীয় ভাগ শুরু হলে দ্বিতীয় ছেলেকে বলতেন, 'ওঠো, নামাজ পড়ো।' সেও যদি উঠতে অলসতা করে, তার অংশেও তিনি নামাজ পড়তেন। এভাবে রাতভর নামাজ পড়তেন।
হাসান বিন আলি (রহঃ) রাতের প্রথম ভাগে নামাজ পড়তেন। আর হুসাইন (রহঃ) রাতের শেষ ভাগে নামাজ পড়তেন। এভাবে দুই ভাই মিলে সারা রাত নামাজ পড়তেন।
يا نائم الليل كم ترقد؟ .. قم يا حبيبي قد دنا الموعد وخذ من الليل وأوقاته .. وردا إذا ما هجع الرقد
'হে ঘুমন্ত, আর কত ঘুমাবে? ওঠো হে বন্ধু, মৃত্যু কাছেই চলে এসেছে। ঘুমন্তরা যখন ঘুমে বেঘোর থাকে, রাতের একটি অংশে তুমি ইবাদত করো।'
সুলাইমান তাইমি (রহঃ) সপরিবারে রাতে ইবাদত করার জন্য রাতকে ভাগ করে নিতেন। বলতেন, 'এসো, আমরা রাতকে ভাগ করে নিই। তোমরা চাইলে রাতের প্রথম অংশেও ইবাদত করতে পারো, আবার চাইলে শেষ অংশেও ইবাদত করতে পারো।'
ওয়াকি বিন জাররাহ বলেন, 'সালিহ বিন হাই- এর দুই ছেলে আলি ও হাসান এবং তাদের মা রাতকে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন। প্রথম ভাগে আলি ইবাদত করতেন। তারপর তিনি ঘুমিয়ে যেতেন এবং হাসান উঠে দ্বিতীয় ভাগে ইবাদত করতেন। এরপর হাসান ঘুমিয়ে যেতেন এবং তাদের মা উঠে রাতের অবশিষ্ট এক- তৃতীয়াংশে ইবাদত করতেন। যখন তাদের মা মারা গেলেন, তখন দুই ভাই মিলে রাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নিলেন এবং দুই ভাই মিলে ফজর পর্যন্ত ইবাদত করতেন। পরে আলি মারা গেলে হাসান একাই সারা রাত ইবাদত করতেন।'
يا راقد الليل انتبه .. إن الخطوب لها سري ثقة الفتى بزمانه .. ثقة محللة العرى
'হে ঘুমন্ত ব্যক্তি, সজাগ হও; কারণ রাতের দুর্যোগ গুপ্ত থাকে। যুবক তার সময়ের ওপর ভরসা করে থাকে; কিন্তু এ ভরসা পুরোটাই ভিত্তিহীন।'
টিকাঃ
৮৬. বাইহাকি রচিত কিতাবুজ জুহদ: ২৮২ পৃ.।
৮৭. সুনানু আবি দাউদ : ১৩০৮, সুনানুন নাসায়ি: ১৬১০।
৮৮. সুনানু আবি দাউদ: ১৪৫১।
৮৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২২৯।
৯০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪৪৪ পৃ.।
৯১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৩৫।
৯২. আল-ফাওয়ায়িদ : ১৩১ পৃ.।
৯৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৩/১৭৭, আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
৯৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩১ পৃ.।
৯৫. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
৯৬. আস-সিয়ার : ৯/১৪৯, সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৭১।
৯৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ১/৬৯২, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রচিত আজ-জুহদ: ২৫৯ পৃ.।
৯৮. বাইহাকি রচিত কিতাবুজ জুহদ: ২৮৪।
৯৯. আস-সিয়ার: ৫/২৯৬।
১০০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৯।
১০১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৫২।
📄 সালাফের বিস্ময়কর রাত্রি জাগরণ
সালাফের জীবনী পড়লে মনে হয় ইবাদতময় এক পরিবেশে আমরা প্রবেশ করেছি, তাদের সবরের দৈর্ঘ্য ও ইবাদতে মনোযোগ দেখে আমরা বিস্মিত হই।
কাতাদা বিন দিআমা বলেন, 'রাত জেগে ইবাদতকারীদের খুব কমই মুনাফিক হয়।'
কেননা, মুনাফিকদের জন্য ইবাদত করাও অনেক কষ্টকর। রাত জেগে কিয়ামুল লাইল আদায় করার কথা তো বলাই বাহুল্য। পক্ষান্তরে যারা সত্যিকারের মুমিন, তারা ইবাদতের মাঝে স্বাদ পায়। তাই তারা না ঘুমিয়ে ইবাদত করে। যে ব্যক্তি রাতের আগমনের অপেক্ষায় থাকে এবং ইবাদতময় একটি রাত যাপন করতে পেরে আনন্দিত হয়, তার চোখে কীভাবে ঘুম নামতে পারে।
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'সূর্যাস্তের পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া আঁধার দেখে আমার মন আনন্দে ভরে যায়; কারণ এই অন্ধকার আমাকে রবের সাথে একান্তে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আর সূর্যোদয়ের পর যখন চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন আমার মনজুড়ে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে; কারণ তখন আমার চারপাশে মানুষের সমাগম শুরু হয়।'
ইবনে আবি জিব -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি সারা রাত নামাজ পড়তেন। ইবাদতের ময়দানে খুব চেষ্টা-মুজাহাদা করতেন। তিনি এত বেশি ইবাদত করতেন যে, যদি তাকে বলা হতো, ‘আগামীকাল কিয়ামত হবে’ তবুও তিনি স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত করার সুযোগ পেতেন না। প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা?!
একবার দাইগাম দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর দাঁড়াতে অক্ষম হয়ে পড়লে বসে ইবাদত করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বসে ইবাদত করতে অক্ষম হয়ে পড়লে শুয়ে শুয়ে ইবাদত করতে লাগলেন। একসময় সিজদাবনত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি তার দু'আয় বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করি, সুতরাং আপনি আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করুন। '
কী আশ্চর্য! আমাদের অনেককে আল্লাহ তাআলা সুস্থতা, শক্তি ও উদ্যম দান করেছেন; কিন্তু তাদের আমলের পরিমাণ সমান নয়। অনেকে তো তিন রাকআত বিতিরও পড়ে না! অথচ সে যদি সারা রাত নামাজ পড়ে, তবুও এতটুকু দুর্বল হবে না। অনেক যুবক শরীরচর্চার জন্য প্রতিদিন তিন কি চার কিলোমিটার দৌড়ায়। এ নিয়ে তারা আবার গর্বও করে; কিন্তু তারাই আবার রাতে মাত্র দুই রাকআত নামাজ পড়তে অবহেলা করে। উসমান দিনে রোজা রাখতেন এবং রাতে নামাজ পড়তেন। কেবল রাতের প্রথমাংশে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমাতেন।
ইমাম আবু হানিফা রাতের অর্ধাংশ ইবাদত করতেন। একদিন তিনি কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা বলল, 'এই ব্যক্তি সারা রাত জেগে থেকে ইবাদত করেন।' তখন তিনি মনে মনে বললেন, 'যে গুণ আমার মাঝে নেই, সে গুণে গুণান্বিত হওয়াতে আমি লজ্জা অনুভব করি।' এর পর থেকে তিনি সারা রাত ইবাদত করতেন। বর্ণিত আছে যে, এর পর থেকে তার কোনো বিছানাই ছিল না!
এই যে ইবাদতে তাদের ধৈর্য ও অটলতা, এটি নেককারদের জন্য আল্লাহর বিশেষ একটি সাহায্য। না হলে এমনটি সম্ভব হতো না। যেমন, ফুজাইল বলেন, 'রাতের প্রথম ভাগে যখন আমি উপনীত হই, তখন রাতের দৈর্ঘ্য আমার মনে ভয় ধরিয়ে দেয়—এত দীর্ঘ রাত কীভাবে ইবাদতে কাটাব? এ ভয় নিয়ে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইবাদত শুরু করি। পরে দেখা যায়, মন ভরে ইবাদত করার পূর্বেই সকাল হয়ে যায়।
مَا يَقُوْمُ اللَّيْلَ إِلَّا .. مَنْ لَهُ عَزْمٌ وَجِدْ لَيْسَ شَيْءٌ كَصَلَاةِ الـ .. لَيْلِ لِلْقَبْرِ يُعِدُّ
‘রাতে কেবল সে-ই ইবাদত করতে পারে, যার ইচ্ছা দৃঢ়, মনোবল শক্ত। আর জানোই তো, রাতের নামাজের মতো কবরজীবনের জন্য উপকারী কোনো আমল নেই। '
ইবনে জুরাইজ -এর কথাটি একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনো। তিনি বলেন, 'আমি আঠারো বছর যাবৎ আতা বিন আবু রাবাহ -এর সংশ্রবে ছিলাম। তিনি অতিশয় বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরও যখন তাহাজ্জুদ পড়তে দাঁড়াতেন, তখন এক রাকআতে সুরা বাকারা থেকে দুইশ আয়াত তিলাওয়াত করতেন। একটু এদিক সেদিক নড়াচড়াও করতেন না।'
বিশর বিন মুফাজ্জল ফুজায়েল -এর জন্য মসজিদে একটি চাটাই বিছিয়ে দিতেন। রাতের প্রথম ভাগে তিনি কিছুক্ষণ নামাজ পড়তেন। ঘুম বেশি আসলে সেই চাটাইয়ের ওপর শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তারপর উঠে আবার নামাজ পড়তেন। ঘুম আসলে আবার কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। এরপর আবার জেগে উঠে ইবাদত করতেন। এভাবে সকাল হয়ে যেত।
টিকাঃ
১০২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১০৩. আস-সিয়ার: ৭/১৪১।
১০৪. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
১০৫. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ১৮৯ পৃ.।
১০৬. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১০৭. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১০৮. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ২৯৫ পৃ.।
১০৯. আস-সিয়ার: ৫/৮৭।
১১০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৩৮।
📄 ছুড়ে ফেলুন গাফিলতির চাদর
প্রিয় মুসলিম ভাই, মহান রব্বুল আলামিনের ইবাদত থেকে গাফিল থেকো না, যিনি তোমার জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রেখেছেন এবং তোমার দিন ও নিশ্বাসের পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সবকিছুই তোমার হাতছাড়া হয়ে যাক; কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য যেন তোমার হাতছাড়া না হয়।
لهاك النوم عن طلب الأماني وعن تلك الكوانس في الجنان تعيش مخلدًا لا موت فيها وتلهو في الخيام مع الحسان تيقظ من منامك إن خيرا من النوم التهجد بالقرآن
'ঘুম তোমাকে তোমার স্বপ্ন পূরণের পথ থেকে বিমুখ করে রেখেছে। জান্নাতের সুরম্য প্রাসাদ থেকেও। যেখানে তুমি আজীবন থাকবে। মৃত্যু নেই সেখানে। আরামদায়ক তাঁবুতে বসে সুন্দরী সঙ্গিনী নিয়ে মত্ত থাকবে তুমি সেখানে। এসব পেতে চাইলে ঘুম থেকে উঠে যাও। এই ঘুমের চেয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে তাহাজ্জুদ পড়া অনেক উত্তম।'
আবুল জুয়াইরিয়া বলেন, 'আমি ছয় মাস ইমাম আবু হানিফা -এর সাহচর্যে ছিলাম। তাকে কোনো রাতে আমি বিছানায় পিঠ রাখতে দেখিনি।'
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর ব্যাপারে তার ছেলে বলেন, 'আমার পিতা প্রতিদিন কুরআনের এক-সপ্তমাংশ তিলাওয়াত করতেন। ইশার নামাজের পরে কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তারপর উঠে যেতেন এবং ফজর পর্যন্ত নামাজ ও দুআয় মশগুল থাকতেন।'
সালিহিনের ইবাদতের যেসব চিত্র এতক্ষণ ধরে আমি আপনাদের দেখালাম, এতে তাদের আমলের পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য ফুটে উঠেনি। তাদের ইবাদতের পরিধি ও আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের কর্মসূচি আরও সমৃদ্ধ ও ব্যাপক ছিল। কারণ তারা জানতেন, এই দুনিয়া আমলের স্থান। দুনিয়ার এ জীবনে আমল আছে, হিসাব নেই। আর আখিরাতের জীবনে হিসাব আছে, আমল নেই।
অনেক সালাফের ব্যাপারেই প্রসিদ্ধি আছে, তারা রাতভর ইবাদত করতেন; ইশার সালাতের অজু দিয়ে ফজরের সালাত আদায় করতেন। তাদের কারও নাম-পরিচয় আমরা জানি, কারও জানি না। পরিচিতজনদের কয়েকজন হলেন:
• সাইদ বিন মুসাইয়িব, সাফওয়ান বিন সুলাইম ও মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির। তারা ছিলেন মদিনার অধিবাসী।
• ফুজাইল ও উহাইব। তারা ছিলেন মক্কার অধিবাসী।
• তাউস ও ওয়াহাব। তারা ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী।
• রবি বিন খুসাইম ও হাকাম। তারা ছিলেন কুফার অধিবাসী।
• আবু সুলাইমান দারানি ও আবু জাবির। তারা ছিলেন পারস্যের অধিবাসী।
• আরও আছেন সুলাইমান তাইমি, মালিক বিন দিনার ও ইয়াজিদ রাকাশি।
প্রিয় মুসলিম ভাই,
ইবনে ইসহাক বলেন, 'একবার আব্দুর রহমান আসওয়াদ আমাদের এখানে হজ করতে এলেন। হজ করতে গিয়ে তার এক পা আঘাতপ্রাপ্ত হলো, তা সত্ত্বেও রাতে তিনি এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে ফজর পর্যন্ত নামাজ পড়লেন।'
মাসরুক -এর স্ত্রী বলেন, 'মাসরুকের কোনো অসুখ ছিল না, তবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার কারণে তার পা-দুটি ফুলে গিয়েছিল।'
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল -এর ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমার পিতা প্রতিদিন রাতে-দিনে তিনশ রাকআত নফল নামাজ পড়তেন। কুরআন মাখলুক না হওয়ার প্রবক্তা হওয়ায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি রাত-দিন মিলিয়ে দেড়শ রাকআত নফল নামাজ পড়তেন। মাঝেমধ্যে একশ আশি রাকআত পর্যন্ত পড়তেন। তিনি প্রতিদিন এক-সপ্তমাংশ কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এভাবে সাত দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। আবার দিনের নামাজ ব্যতীত শুধু রাতের নামাজেও প্রতি সাত দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। ইশার নামাজের পর অল্পক্ষণের জন্য তিনি ঘুমাতেন। তারপর উঠে ফজর পর্যন্ত নামাজ ও দুআয় মশগুল থাকতেন।'
সুলাইমান তাইমি প্রতি সিজদায় সত্তর বার তাসবিহ পড়তেন!
কীভাবে তারা এত ইবাদত করতে সক্ষম হতেন?! আমরা তো আল্লাহর কাছে নিজেদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার অভিযোগ করা ছাড়া কিছুই করতে পারি না!
فكم بين مشغول بطاعة ربه وآخر بالذنب الثقيل مقيد فهذا سعيد بالجنان منعم وذاك شقي في الجحيم مخلد كأني بنفسي في القيامة واقف وقد فاض دمعي والمفاصل ترعد
'আল্লাহর ইবাদতে রت ব্যক্তি আর গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির মাঝে কী বিশাল পার্থক্য! একজন চির শান্তির জান্নাতের নিয়ামতসমূহ পেয়ে ধন্য, আরেকজন চির অশান্তির জাহান্নাম পেয়ে দুর্ভাগা। আমি মাঝেমধ্যে নিজেকে কিয়ামতের মাঠে কল্পনা করি। তখন ভয়ে আমার চোখ প্লাবিত হয়, শরীরের জোড়াগুলো ঢিলা হয়ে যায়।'
আল্লাহর প্রতি মহব্বতের আরেকটি নিদর্শন হলো, রাতের অন্ধকারে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করা। এই মুনাজাতে যে স্বাদ ও আনন্দ পাওয়া যায়, দুনিয়ার কোনো খুশি-আনন্দ ও স্বাদ-উপভোগ তার কাছে কিছুই নয়। এ সম্পর্কে আবু সুলাইমান-এর কথাটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, 'রাত জেগে ইবাদতকারীরা আঁধারের মাঝে যে স্বাদ খুঁজে পায়, তা খেল-তামাশায় লিপ্ত লোকেরাও পায় না। যদি রাত না হতো, তবে রাতের ইবাদতকারীরা দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে চাইত না। '
ইবনে মুনকাদির বলেন, 'দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগের মধ্যে কেবল তিনটি অবশিষ্ট থাকে : রাতের ইবাদত, বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ ও জামাআতে নামাজ।
আমাদের সালাফগণ ইবাদতে স্বাদ অনুভব করতেন, আর বর্তমান যুগের অবস্থা হলো, মানুষ ইবাদতকে খুব ভারী মনে করে এবং ইবাদত থেকে পালিয়ে বেড়ায়।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তাআলা থেকে বিমুখ হয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে; তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওই ব্যক্তি, যে নিজেকে বাদ দিয়ে মানুষজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
যে রাতকে আমরা অহেতুক কাজে নষ্ট করি, সেই রাত কেটে যখন ভোর হতো তারা ব্যথিত হতেন। রাতে ইবাদত করে এবং দিনে রোজা রেখে তারা আনন্দিত হতেন। কী পার্থক্য তাদের ও আমাদের মাঝে!? আমরাও কি পারি না তাদের মতো হতে?
রাতের বিদায় যে তাদের জন্য কতটা কষ্টকর ছিল, তা আলি বিন বিকার-এর কথা থেকে বোঝা যায়। তিনি বলেন, 'গত চল্লিশ বছর ধরে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করে, তা হলো ফজরের আগমন।'
صلاتك نور والعباد رقود ** ونومك ضد للصلاة عنيد
'মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন উঠে নামাজ পড়া তোমার জন্য নুর। এই নামাজের সবচেয়ে বড় বাধা হলো তোমার ঘুম।'
তুমি কি খেয়াল করেছ, ইবাদতের প্রতি তাদের কীরূপ ভালোবাসা ছিল? ইবাদতে কেমন ধারাবাহিকতা ছিল তাদের? এ জন্যই তো আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ইবাদতকে দুনিয়ার স্বাদ-উপভোগে পরিণত করে দিয়েছিলেন।
সাবিত বুনানি বলতেন, 'কিয়ামুল লাইলে যে স্বাদ আমি পাই, তা অন্য কোনো কিছুতে পাই না।'
রাত ছিল তাদের জন্য আমল ও ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। আসমান-জমিনের পালনকর্তার সাথে একান্তে মুনাজাতের অমূল্য মুহূর্ত। তাই তো রাতের আগমনে তারা আনন্দিত হতেন এবং বিদায়ে ব্যথিত হতেন।
মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, তার মৃত্যুর সময় কাছে চলে আসলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। বলা হলো, 'আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমি না দুনিয়ার প্রতি আসক্তির কারণে কাঁদছি, না মৃত্যুর ভয়ে অস্থির হয়ে কাঁদছি। আমি কাঁদছি মধ্যাহ্নের তৃষ্ণা (যা রোজা রাখার ফলে অনুভব করতাম) এবং শীতের রাতের ইবাদতের বিরহে।'
শীতকালে দিনে রোজা রাখতে এবং রাতে নামাজ পড়তে অন্যান্য মৌসুমের চেয়ে বেশি সুবিধাজনক। এ জন্য রাসুলুল্লাহ এর নাম দিয়েছেন 'অনায়াসলব্ধ গনিমত'।
بكي الباكون للرحمن ليلاً ** وباتوا وهم لا يسأمونا بقاع الأرض من شوق إليهم ** تحن متى عليها يسجدونا
'গভীর রজনীতে ক্রন্দনকারী রহমানের ভয়ে অঝোর ধারায় কাঁদে। ঘুমহীন রাত কেটে যায় তাদের। বিরক্তি আসে না একটুও। জমিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে, কবে তাহাজ্জুদগুজার বান্দারা তার ওপর সিজদাবনত হবে।'
খুলদি বলেন, 'জনৈক মৃত ব্যক্তিকে আমি স্বপ্নে দেখলাম। তাকে বললাম, "আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?” তিনি বললেন, “কিতাবের ইবারত, সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম মাসআলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রুসুম- রেওয়াজ কোনো কিছুই কাজে আসেনি। আমার উপকারে এসেছে কেবল সেই দুই রাকআত নামাজ, যা আমি রাতের শেষ প্রহরে পড়তাম।"
প্রিয় পাঠক, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা!?
و من كان يرغب في النجاة فما له غير اتباع المصطفى فيما أتى ذاك السبيل المستقيم وغيره سبل الظلالة والغواية والردى فاتبع كتاب الله والسنن التى صحت فذاك إن اتبعت هو الهدى
'মুক্তি পেতে চাও? মুক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণেই নিহিত। তাঁর আনীত দ্বীনই একমাত্র সরল পথ। বাকি সব গোমরাহি ও পথভ্রষ্টতা। সুতরাং যদি হিদায়াতের পথে পরিচালিত হতে চাও, তাহলে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহর অনুসরণ করো।'
টিকাঃ
১১১. আল-ফাওয়ায়িদ : ১২৯ পৃ.।
১১২. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান : ২২৫ পৃ.।
১১৩. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১১৪. আস-সিয়ার: ১১/২১৪।
১১৫. আস-সিয়ার: ৫/১২।
১১৬. আল-মুদহিশ: ৪৩১ পৃ.।
১১৭. মানাকিবুল ইমাম আহমাদ: ৩৫৭ পৃ.।
১১৮. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১৫১ পৃ.।
১১৯. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২০. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২১. আল-ফাওয়ায়িদ: ১০৮ পৃ.।
১২২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১২৩. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২৬৫ পৃ.।
১২৪. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/২৬২।
১২৫. সুনানুত তিরমিজি: ৭৯৭, মুসনাদু আহমাদ: ১৮৯৫৯।
১২৬. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ৩৩১ পৃ.।
১২৭. আস-সিয়ার: ২৩/৩১৪।
📄 তাহাজ্জুদ আদায়ে সহায়ক কিছু কাজ
যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে চায়, পুণ্যবানদের কাতারে শামিল হতে চায়, তার জন্য নিচের উপায়গুলো অবলম্বন করা আবশ্যক :
১. অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা। কারণ বেশি খেলে পানিও বেশি খেতে হয়। এতে শরীরে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেয়ে ঘুম প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২. দিনের বেলা শরীরকে খুব বেশি ক্লান্ত করে দেয় এমন কর্ম থেকে বিরত থাকা; কারণ এর ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও স্নায়ুকোষ দুর্বল হয়ে পড়ে। কাজেই রাতে খুব ভারী ঘুম আসে।
৩. দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমানো। এটা সুন্নাতও বটে। আর কিয়ামুল লাইলের জন্য সহায়কও।
৪. অন্তরে মুমিনদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ না থাকা। বিদআত, কুসংস্কার এবং দুনিয়াবি চিন্তা থেকে মুক্ত থাকা। কেননা এইসব রোগ আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ করে দেয়।
৫. দিনে গুনাহ করা থেকে বিরত থাকা। কারণ গুনাহ কলবকে শক্ত করে দেয় এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৬. অন্তরে দুনিয়ার দীর্ঘ আশা লালন না করা। তাকওয়া অবলম্বন করা। কিয়ামত দিবস ও জাহান্নামের বিভীষিকা সম্পর্কে চিন্তা করা।
প্রিয় ভাই,
মনে রেখো, তাহাজ্জুদ পড়তে পড়তে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পা ফুলে যেত। এ ছাড়াও আমাদের সালাফে সালিহীন এবং উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানগণ নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তুমি কি চাও না সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জান্নাতে তাঁদের প্রতিবেশী হতে? তুমি কি চাও না আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত দল: নবি, সিদ্দিক, শহিদ ও নেককারদের সঙ্গী হতে? এঁরাই তো সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী!
প্রিয় মুসলিম ভাই, তুমি চাইলে সালাফের যোগ্য খালাফ হতে পারো। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তুমি কিয়ামুল লাইল আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে ওঠো; আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে মুনাজাত করো। এতে তোমার কলব জীবন্ত হয়ে উঠবে; হৃদয়ে জ্বলে উঠবে ইমানের দীপশিখা।
আল্লাহ তাআলা আমাকে, তোমাকে এবং সবাইকে সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের ব্যাপারে তিনি বলেছেন :
إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ - آخِذِينَ مَا آتَاهُمْ رَبُّهُمْ إِنَّهُمْ كَانُوا قَبْلَ ذَلِكَ مُحْسِنِينَ - كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا
يَهْجَعُونَ - وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ )
'মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাত ও ঝরনাধারার মাঝে। তাদের রবের দেওয়া নিয়ামত উপভোগ করবে। কারণ পার্থিব জীবনে তারা নেককার ছিল। তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। '