📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল

📄 তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল


ইমাম আবু হানিফা এক রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ
'বরং কিয়ামত তাদের প্রতিশ্রুত সময় এবং কিয়ামত ঘোরতর বিপদ ও তিক্ততর। '
কাকুতি-মিনতি করে কেঁদে কেঁদে বারবার এই আয়াত পড়তে থাকলেন।
সুলাইমান তাইমি -এর মুয়াজ্জিন বলেন, 'ইশার নামাজের পর সুলাইমান তাইমি আমার পাশে নামাজ পড়ছিলেন। আমি শুনলাম যে, তিনি নামাজে সুরা মুলক তিলাওয়াত করছেন। পড়তে পড়তে যখন এই আয়াত পর্যন্ত আসলেন :
فَلَمَّا رَأَوْهُ زُلْفَةً سِيئَتْ وُجُوهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَقِيلَ هَذَا الَّذِي كُنْتُمْ بِهِ تَدَّعُونَ
"যখন তারা সেই প্রতিশ্রুতিকে আসন্ন দেখবে, তখন কাফিরদের মুখমণ্ডল মলিন হয়ে পড়বে এবং বলা হবে, এটাই তো তোমরা চাইতে। "
তিনি বারবার এই আয়াত পড়তে লাগলেন। এদিকে নামাজ শেষ করে মুসল্লিরাও সবাই চলে গেল। আমিও তাকে সেখানে রেখে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলাম। পরে ফজরের সময় আজান দেওয়ার জন্য মসজিদে এসে দেখি, তিনি আগের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সেই আয়াতটিই এখনো তিলাওয়াত করছেন!'
ইবাদতগুজার বান্দারা যখন দুনিয়ার বাস্তবতা ও পার্থিব জীবনের অসারতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, তখন তারা চিরস্থায়ী জীবনের জন্য ক্ষণস্থায়ী জীবনের কামনাবাসনাগুলোকে বিলীন করে দেয়। গাফিলতির ঘুম যখন তাদের ভাঙে, তখন তারা কঠোর মেহনত ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অলসতার দিনগুলোতে নষ্ট করা সময়গুলো পুনরুদ্ধার করে নেয়। গন্তব্যহীন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর যেহেতু তারা গন্তব্যের খোঁজ পেয়েছে; তাই কঠিন মেহনত করে দূরের গন্তব্যকে কাছে নিয়ে আসে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা প্রতিশ্রুত কিয়ামত দিবসের কথা স্মরণ করে :
(هَذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ) 'আজ তোমাদের সেই দিন, যেদিনের ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। '

টিকাঃ
৭৪. সুরা আল-কমার, ৫৪: ৪৬।
৭৫. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩৫৭।
৭৬. সুরা আল-মুলক, ৬৭ : ২৭।
৭৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৯।
৭৮. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৩।
৭৯. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬০ পৃ.।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 রাত্রি জাগরণের সুখ

📄 রাত্রি জাগরণের সুখ


জনৈক সালাফকে বলা হলো, 'রাত কেমন কাটালেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'রাতে আমার দুই ধরনের অবস্থা ছিল : রাতের অন্ধকার যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ আমি আনন্দিত ছিলাম। আর যখন অন্ধকার শেষ হয়ে ফজরের আলো উদ্ভাসিত হলো, তখন আমি ব্যথিত হলাম। কেমন যেন আমার আনন্দ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পূর্বেই কষ্ট শুরু হয়ে গেল।’
উহাইব বিন ওয়ারদ তার এক জ্বালাময়ী ভাষণে বলেন, 'যদি আল্লাহর দিকে প্রতিযোগিতায় কাউকে তোমার আগে যেতে না দেওয়ার সামর্থ্য তোমার থাকে, তবে তা-ই করো। '
প্রিয় ভাই আমার, এই উম্মাহর মাঝেই আছে কল্যাণের পথে অগ্রগামী ব্যক্তি। তারা কোন পথে আর তুমি কোন পথে?
কাতাদা বলেন, 'ফেরেশতাগণ মুমিনের শীতকাল নিয়ে আনন্দিত হয়। কেননা শীতকালে দিন ছোট হয়—মুমিন তাতে রোজা রাখে। আর রাত দীর্ঘ হয়—মুমিন তাতে ইবাদত করে।'
যখন আমির -এর মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি কাঁদতে লাগলেন। স্বজনরা বলল, 'হে আমির, আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না। দুনিয়ার প্রতি লোভ বা আসক্তির কারণেও কাঁদছি না। আমি কাঁদছি (রোজাদার অবস্থায়) মধ্যাহ্নের তৃষ্ণা ও শীতকালের রাতের নামাজের জন্য।'
দুনিয়াদারদের সঙ্গে দুনিয়া কেমন কঠোর আচরণ করে এবং পার্থিব জীবনে দীর্ঘ আশা পোষণকারীরা কীভাবে প্রতারিত হয়, তা আল্লাহর আবিদ বান্দারা ভালোভাবেই লক্ষ করে। শয়তানের কর্তৃত্ব ও নফসের ক্ষমতাও তারা উপলব্ধি করতে পারে। তাই তারা আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে এবং নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে।

টিকাঃ
৮০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৮১।
৮১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৭৭।
৮২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
৮৩. রুহবানুল লাইল : ৩৬ পৃ.।
৮৪. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রচিত আজ-জুহদ : ৩২৩ পৃ.।
৮৫. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬২ পৃ.।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 নেককার পরিবার

📄 নেককার পরিবার


যেহেতু কিয়ামুল লাইলের জন্য মহা প্রতিদান ও বড় সাওয়াব রয়েছে, রাসুলুল্লাহ পরিবারের সবাইকে এ মহা কল্যাণ কাজে শরিক করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন :
رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى، وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ، فَإِنْ أَبَتْ، نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ، رَحِمَ اللَّهُ امْرَأَةٌ قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ، وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا، فَإِنْ أَبَى، نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ»
'আল্লাহ তাআলা সেই পুরুষের প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়। স্ত্রী উঠতে না চাইলে মুখে পানির ছিঁটা দেয়। আল্লাহ তাআলা সেই মহিলার প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং স্বামীকেও জাগিয়ে দেয়। স্বামী উঠতে না চাইলে তার মুখে পানির ছিঁটা দেয়।'
তিনি আরও ইরশাদ করেন :
مَنِ اسْتَيْقَظَ مِنَ اللَّيْلِ وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ، فَصَلَّيَا رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا، كُتِبَا مِنَ الذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا، وَالذَّاكِرَاتِ»
'যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়, তারপর উভয়ে একত্রে দুই রাকআত নামাজ পড়ে, তাদের দুজনের নাম আল্লাহর অধিক জিকিরকারী নারী- পুরুষের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়।'
রাসুলুল্লাহ -এর এই উৎসাহে সালাফগণ উৎসাহিত হয়েছিলেন। তাই তারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও তাহাজ্জুদের জন্য ডেকে দিতেন।
কাসিম বিন রাশিদ শাইবানি বলেন, 'রিফাত বিন সালিহ স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে আমাদের বাড়িতে মেহমান হলেন। রাতে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নামাজ পড়েন। আর রাতের শেষ প্রহরে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন :
يا أيها الركب المعرسونا أكل هذا الليل ترقدونا؟ ألا تقومون فتصلونا؟
“হে ঘুমন্ত কাফেলা, রাতভর কি ঘুমিয়েই কাটাবে? উঠে তাহাজ্জুদ পড়বে না?"
তিনি বলেন, 'তার ডাক শুনে পরিবারের সবাই জেগে ওঠে। কেউ হাত তুলে আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করে, কেউ প্রাণখুলে দুআ করে, কেউ তিলাওয়াত করে, কেউ অজু করে। এভাবে যার যার মতো করে সবাই ইবাদতে লেগে যায়। এরপর ফজর হলে উচ্চ আওয়াজে তিনি ঘোষণা করতেন, "ফজরের সময় নৈশভ্রমণকারীরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে।”
امنع جفونك أن تذوق مناما وذر الدموع على الخدود سجاما واعلم بأنك ميت ومحاسب يا من على سخط الجليل أقاما لله قوم أخلصوا في حبه فرضي بهم واختصهم خداما قوم إذا جن الظلام عليهم باتوا هنالك سجدًا وقياما خمص البطون من التعفف ضمرا لا يعرفون سوى الحلال طعاما
'চোখদুটোকে ঘুমের স্বাদ থেকে দূরে রাখো। প্রবলবেগে অশ্রুধারা ছেড়ে দাও গণ্ডদ্বয়ের ওপর। হে মহান ক্ষমতাধরের ক্রোধে নিপতিত, জেনে রাখো, তোমাকে একদিন মরতে হবে এবং হিসাবের মুখোমুখি হতে হবে। আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা তাঁকে স্বচ্ছ হৃদয়ে ভালোবাসে। তিনিও তাদের ভালোবাসেন। আর তাদেরকে কবুল করে নিয়েছেন দ্বীনের সেবক হিসেবে। রাত যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা অবনত মস্তকে রবের দরবারে হাজিরা দেয়। খাদ্যাভাবে তাদের পেট যতই সংকুচিত হয়ে পড়ুক, যতই তাদের শরীর হোক হাড্ডিসার, হালাল ছাড়া কোনো খাবার ধরেও দেখে না তারা।'
রিয়াহ কাইসি একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। রাত শেষে সকাল হলে মেয়েটি রুটি বানানোর জন্য আটা মাখতে লেগে গেলেন। রিয়াহ কাইসি বললেন, 'তোমার এই কাজের সহায়তার জন্য কোনো মহিলা রাখলে বোধ হয় ভালো হতো।' মেয়েটি বলল, 'আমার বিয়ে হয়েছে রিয়াহ কাইসির সাথে, কোনো নাফরমান জালিমের সাথে আমার বিয়ে হয়নি।' পরের রাতে মেয়েটিকে পরীক্ষা করার জন্য রিয়াহ কাইসি ঘুমিয়ে পড়লেন। রাতের প্রথম চতুর্থাংশে মেয়েটি নামাজ পড়লেন। তারপর ডেকে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' তিনি 'উঠব' বলেও উঠলেন না। পরবর্তী চতুর্থাংশও মেয়েটি নামাজ পড়ে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' এবারেও তিনি 'উঠব' বললেন; কিন্তু উঠলেন না। পরবর্তী চতুর্থাংশেও মেয়েটি নামাজ পড়লেন। আবার ডেকে বললেন, 'উঠুন, হে রিয়াহ।' তিনি বললেন, 'উঠছি।' তখন মেয়েটি বললেন, 'রাত শেষ হতে চলেছে, নেককার লোকেরা সবাই একত্রিত হয়েছেন; কিন্তু আপনি এখনো ঘুমিয়ে আছেন। হে রিয়াহ, আমি জানি না, কীসে আপনাকে প্রতারিত করে রেখেছে।' বর্ণনাকারী বলেন, 'এরপর বাকি চতুর্থাংশেও মেয়েটি নামাজ পড়লেন।'
হাবিব আজমি বিন মুহাম্মাদ -এর স্ত্রী এক রাতে ঘুম থেকে উঠলেন। হাবিব আজমি তখনও ঘুমিয়ে ছিলেন। রাতের শেষ প্রহর শুরু হলে তাকে ডেকে দিলেন এবং বললেন, 'উঠুন, রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। আপনার সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ পথ; অথচ পাথেয় খুব স্বল্প! নেককারদের কাফেলা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আমরাই কেবল পেছনে পড়ে আছি।'
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়, আখিরাতে কামিয়াব হতে চায়, সে যেন তার অন্তরকে সব সময় লক্ষ্য অর্জনের পথে অবিচল রাখে; জিহ্বাকে বেহুদা কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে-আল্লাহর জিকির ও ইমান-জাগানিয়া আলোচনায় ব্যাপৃত থাকে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং প্রবৃত্তির আনুগত্য থেকে নিজেকে বিরত রাখে। ওয়াজিব ও মুসতাহাব আমলগুলো মনোযোগ সহকারে আদায় করে। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত এইভাবে জীবনযাপন করে।
হাসসান বিন আবু সিনান -এর স্ত্রী বলেন, 'হাসসান আমার সাথে এক বিছানায় ঘুমাতেন। তারপর আমার সাথে কৌশল করতেন, যেভাবে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে কৌশল করে। যখন মনে করতেন যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, সন্তর্পণে বিছানা থেকে বের হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। আমি তাকে বললাম, “হে আবু আব্দুল্লাহ, নিজেকে আর কত কষ্ট দেবেন? নিজের প্রতি একটু নম্র হোন” তিনি বললেন, “চুপ করো, কী বলো এসব তুমি?! অচিরেই আমি তো এক ঘুমের রাজ্যে চলে যাব, যে ঘুম থেকে উঠব দীর্ঘকাল পরে।”
হে পাঠক, সফর শেষ হয়, যদি মুসাফির রাস্তার ওপর অটল থাকে এবং রাতেও সফর অব্যাহত রাখে। মুসাফির যদি রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে এবং সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায়, তবে সে তার গন্তব্যে কীভাবে পৌঁছুবে?
হাসান বিন আবু সালিহ -এর এক দাসী ছিল। তিনি তাকে অন্য এক পরিবারের কাছে বিক্রি করে দিলেন। ফজর হওয়ার আগে সেই দাসীটি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। এবং 'আস-সালাহ আস-সালাহ'—নামাজ, নামাজ—বলে ডাকতে শুরু করলেন। নতুন পরিবারের লোকেরা তাকে বলল, 'ফজর হতে এখনো অনেক সময় বাকি। ফজরের ওয়াক্ত আসার আগে আমাদের ডেকো না।' দাসীটি অবাক হয়ে বললেন, 'আপনারা কি শুধু ফরজ নামাজই আদায় করেন?!' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' এরপর দাসীটি হাসান-এর কাছে ফিরে আসলেন এবং বললেন, 'হে আমার মনিব, আপনি আমাকে এমন পরিবারের কাছে বিক্রি করেছেন, যারা শুধু ফরজ নামাজ আদায় করে। আমাকে তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিন।' তারপর তিনি সেই দাসীকে পুনরায় নিজের কাছে নিয়ে আসলেন।
ইবরাহিম বিন ওয়াকি বলেন, 'আমার পিতা রাতে যখন নামাজ পড়তে উঠতেন, তখন বাড়ির অন্যরাও নামাজ পড়তে উঠে যেতেন। এমনকি আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ দাসীটিও নামাজে দাঁড়িয়ে যেত।'
প্রিয় ভাই, দেখেছ তো, আমাদের সালাফগণ কীভাবে পুরো পরিবারে কল্যাণ ছড়িয়ে দিতেন? এমনকি তাদের ইবাদতের প্রভাব খাদিমদের ওপরেও পড়ত।
আবু হুরাইরা -এর একটি রাতের দিকে লক্ষ করো। কীভাবে তাঁর রাত কাটত। আবু উসমান নাহদি বলেন, ‘আমি আবু হুরাইরা -এর বাড়িতে সাত দিনের জন্য মেহমান হলাম। তখন আমি দেখলাম, তিনি, তাঁর স্ত্রী ও তাঁর দাসী রাতকে তিনভাগে ভাগ করে নেন। একভাগে নিজে, একভাগে স্ত্রী এবং অপরভাগে দাসী নামাজ পড়েন এবং প্রত্যেকেই তার সময় শেষ হলে অপরজনকে ডেকে দেন। ’
আমার ভাই, দেখলে তো, সালাফগণ কীভাবে রাত্রিযাপন করতেন? কীভাবে তারা সময়ের মূল্যায়ন করতেন? কিন্তু আফসোস, আমরা কোনো পরোয়া ছাড়াই আমাদের সময় ও জীবনকে নষ্ট করে চলছি! হেলায় কেটে যাওয়া সময়ের জন্য একটু মায়াও জাগে না আমাদের মনে! যেন সময়ই সবচেয়ে নগণ্য ও তুচ্ছ বস্তু আমাদের কাছে! অথচ প্রতিটি মিনিট একেকটি মূল্যবান সম্পদ। যে নিশ্বাস আমরা ছেড়ে দিই, সেটি আর কখনো ফিরে আসবে না। এই জীবনের প্রতিটি অংশের হিসাব নেওয়া হবে। তাই হিসাবের জন্য তৈরি হও। সময়কে মূল্যায়ন করো।
সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, যে যতদিন শরীরে শক্তি ছিল, ততদিন শক্তিকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করেছে; আর যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখন আল্লাহর অবাধ্য হওয়া থেকে অক্ষম হয়ে পড়েছে।
জুবাইদ বিন হারিস (রহঃ) রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। একভাগ নিজের জন্য, একভাগ তার প্রথম ছেলের জন্য, আরেক ভাগ দ্বিতীয় ছেলে আব্দুর রহমানের জন্য। তার অংশে তিনি ইবাদত করতেন। তারপর প্রথম সন্তানকে বলতেন, 'ওঠো, নামাজ পড়ো।' ছেলে উঠতে অলসতা করলে তার অংশেও তিনি নামাজ পড়তেন। তারপর তৃতীয় ভাগ শুরু হলে দ্বিতীয় ছেলেকে বলতেন, 'ওঠো, নামাজ পড়ো।' সেও যদি উঠতে অলসতা করে, তার অংশেও তিনি নামাজ পড়তেন। এভাবে রাতভর নামাজ পড়তেন।
হাসান বিন আলি (রহঃ) রাতের প্রথম ভাগে নামাজ পড়তেন। আর হুসাইন (রহঃ) রাতের শেষ ভাগে নামাজ পড়তেন। এভাবে দুই ভাই মিলে সারা রাত নামাজ পড়তেন।
يا نائم الليل كم ترقد؟ .. قم يا حبيبي قد دنا الموعد وخذ من الليل وأوقاته .. وردا إذا ما هجع الرقد
'হে ঘুমন্ত, আর কত ঘুমাবে? ওঠো হে বন্ধু, মৃত্যু কাছেই চলে এসেছে। ঘুমন্তরা যখন ঘুমে বেঘোর থাকে, রাতের একটি অংশে তুমি ইবাদত করো।'
সুলাইমান তাইমি (রহঃ) সপরিবারে রাতে ইবাদত করার জন্য রাতকে ভাগ করে নিতেন। বলতেন, 'এসো, আমরা রাতকে ভাগ করে নিই। তোমরা চাইলে রাতের প্রথম অংশেও ইবাদত করতে পারো, আবার চাইলে শেষ অংশেও ইবাদত করতে পারো।'
ওয়াকি বিন জাররাহ বলেন, 'সালিহ বিন হাই- এর দুই ছেলে আলি ও হাসান এবং তাদের মা রাতকে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন। প্রথম ভাগে আলি ইবাদত করতেন। তারপর তিনি ঘুমিয়ে যেতেন এবং হাসান উঠে দ্বিতীয় ভাগে ইবাদত করতেন। এরপর হাসান ঘুমিয়ে যেতেন এবং তাদের মা উঠে রাতের অবশিষ্ট এক- তৃতীয়াংশে ইবাদত করতেন। যখন তাদের মা মারা গেলেন, তখন দুই ভাই মিলে রাতকে দুই ভাগে ভাগ করে নিলেন এবং দুই ভাই মিলে ফজর পর্যন্ত ইবাদত করতেন। পরে আলি মারা গেলে হাসান একাই সারা রাত ইবাদত করতেন।'
يا راقد الليل انتبه .. إن الخطوب لها سري ثقة الفتى بزمانه .. ثقة محللة العرى
'হে ঘুমন্ত ব্যক্তি, সজাগ হও; কারণ রাতের দুর্যোগ গুপ্ত থাকে। যুবক তার সময়ের ওপর ভরসা করে থাকে; কিন্তু এ ভরসা পুরোটাই ভিত্তিহীন।'

টিকাঃ
৮৬. বাইহাকি রচিত কিতাবুজ জুহদ: ২৮২ পৃ.।
৮৭. সুনানু আবি দাউদ : ১৩০৮, সুনানুন নাসায়ি: ১৬১০।
৮৮. সুনানু আবি দাউদ: ১৪৫১।
৮৯. সিফাতুস সাফওয়াহ : ২/২২৯।
৯০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪৪৪ পৃ.।
৯১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৪/৩৫।
৯২. আল-ফাওয়ায়িদ : ১৩১ পৃ.।
৯৩. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৩/১৭৭, আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
৯৪. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৩১ পৃ.।
৯৫. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
৯৬. আস-সিয়ার : ৯/১৪৯, সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৭১।
৯৭. সিফাতুস সাফওয়াহ : ১/৬৯২, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রচিত আজ-জুহদ: ২৫৯ পৃ.।
৯৮. বাইহাকি রচিত কিতাবুজ জুহদ: ২৮৪।
৯৯. আস-সিয়ার: ৫/২৯৬।
১০০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৯।
১০১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৫২।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 সালাফের বিস্ময়কর রাত্রি জাগরণ

📄 সালাফের বিস্ময়কর রাত্রি জাগরণ


সালাফের জীবনী পড়লে মনে হয় ইবাদতময় এক পরিবেশে আমরা প্রবেশ করেছি, তাদের সবরের দৈর্ঘ্য ও ইবাদতে মনোযোগ দেখে আমরা বিস্মিত হই।
কাতাদা বিন দিআমা বলেন, 'রাত জেগে ইবাদতকারীদের খুব কমই মুনাফিক হয়।'
কেননা, মুনাফিকদের জন্য ইবাদত করাও অনেক কষ্টকর। রাত জেগে কিয়ামুল লাইল আদায় করার কথা তো বলাই বাহুল্য। পক্ষান্তরে যারা সত্যিকারের মুমিন, তারা ইবাদতের মাঝে স্বাদ পায়। তাই তারা না ঘুমিয়ে ইবাদত করে। যে ব্যক্তি রাতের আগমনের অপেক্ষায় থাকে এবং ইবাদতময় একটি রাত যাপন করতে পেরে আনন্দিত হয়, তার চোখে কীভাবে ঘুম নামতে পারে।
ফুজাইল বিন ইয়াজ বলেন, 'সূর্যাস্তের পর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া আঁধার দেখে আমার মন আনন্দে ভরে যায়; কারণ এই অন্ধকার আমাকে রবের সাথে একান্তে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আর সূর্যোদয়ের পর যখন চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন আমার মনজুড়ে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে; কারণ তখন আমার চারপাশে মানুষের সমাগম শুরু হয়।'
ইবনে আবি জিব -এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি সারা রাত নামাজ পড়তেন। ইবাদতের ময়দানে খুব চেষ্টা-মুজাহাদা করতেন। তিনি এত বেশি ইবাদত করতেন যে, যদি তাকে বলা হতো, ‘আগামীকাল কিয়ামত হবে’ তবুও তিনি স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত করার সুযোগ পেতেন না। প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় আমরা?!
একবার দাইগাম দাঁড়িয়ে ইবাদত করতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর দাঁড়াতে অক্ষম হয়ে পড়লে বসে ইবাদত করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বসে ইবাদত করতে অক্ষম হয়ে পড়লে শুয়ে শুয়ে ইবাদত করতে লাগলেন। একসময় সিজদাবনত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি তার দু'আয় বলতেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করি, সুতরাং আপনি আমার সাথে সাক্ষাৎ করাকে পছন্দ করুন। '
কী আশ্চর্য! আমাদের অনেককে আল্লাহ তাআলা সুস্থতা, শক্তি ও উদ্যম দান করেছেন; কিন্তু তাদের আমলের পরিমাণ সমান নয়। অনেকে তো তিন রাকআত বিতিরও পড়ে না! অথচ সে যদি সারা রাত নামাজ পড়ে, তবুও এতটুকু দুর্বল হবে না। অনেক যুবক শরীরচর্চার জন্য প্রতিদিন তিন কি চার কিলোমিটার দৌড়ায়। এ নিয়ে তারা আবার গর্বও করে; কিন্তু তারাই আবার রাতে মাত্র দুই রাকআত নামাজ পড়তে অবহেলা করে। উসমান দিনে রোজা রাখতেন এবং রাতে নামাজ পড়তেন। কেবল রাতের প্রথমাংশে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমাতেন।
ইমাম আবু হানিফা রাতের অর্ধাংশ ইবাদত করতেন। একদিন তিনি কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা বলল, 'এই ব্যক্তি সারা রাত জেগে থেকে ইবাদত করেন।' তখন তিনি মনে মনে বললেন, 'যে গুণ আমার মাঝে নেই, সে গুণে গুণান্বিত হওয়াতে আমি লজ্জা অনুভব করি।' এর পর থেকে তিনি সারা রাত ইবাদত করতেন। বর্ণিত আছে যে, এর পর থেকে তার কোনো বিছানাই ছিল না!
এই যে ইবাদতে তাদের ধৈর্য ও অটলতা, এটি নেককারদের জন্য আল্লাহর বিশেষ একটি সাহায্য। না হলে এমনটি সম্ভব হতো না। যেমন, ফুজাইল বলেন, 'রাতের প্রথম ভাগে যখন আমি উপনীত হই, তখন রাতের দৈর্ঘ্য আমার মনে ভয় ধরিয়ে দেয়—এত দীর্ঘ রাত কীভাবে ইবাদতে কাটাব? এ ভয় নিয়ে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ইবাদত শুরু করি। পরে দেখা যায়, মন ভরে ইবাদত করার পূর্বেই সকাল হয়ে যায়।
مَا يَقُوْمُ اللَّيْلَ إِلَّا .. مَنْ لَهُ عَزْمٌ وَجِدْ لَيْسَ شَيْءٌ كَصَلَاةِ الـ .. لَيْلِ لِلْقَبْرِ يُعِدُّ
‘রাতে কেবল সে-ই ইবাদত করতে পারে, যার ইচ্ছা দৃঢ়, মনোবল শক্ত। আর জানোই তো, রাতের নামাজের মতো কবরজীবনের জন্য উপকারী কোনো আমল নেই। '
ইবনে জুরাইজ -এর কথাটি একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনো। তিনি বলেন, 'আমি আঠারো বছর যাবৎ আতা বিন আবু রাবাহ -এর সংশ্রবে ছিলাম। তিনি অতিশয় বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরও যখন তাহাজ্জুদ পড়তে দাঁড়াতেন, তখন এক রাকআতে সুরা বাকারা থেকে দুইশ আয়াত তিলাওয়াত করতেন। একটু এদিক সেদিক নড়াচড়াও করতেন না।'
বিশর বিন মুফাজ্জল ফুজায়েল -এর জন্য মসজিদে একটি চাটাই বিছিয়ে দিতেন। রাতের প্রথম ভাগে তিনি কিছুক্ষণ নামাজ পড়তেন। ঘুম বেশি আসলে সেই চাটাইয়ের ওপর শুয়ে কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তারপর উঠে আবার নামাজ পড়তেন। ঘুম আসলে আবার কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। এরপর আবার জেগে উঠে ইবাদত করতেন। এভাবে সকাল হয়ে যেত।

টিকাঃ
১০২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
১০৩. আস-সিয়ার: ৭/১৪১।
১০৪. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ১৮ পৃ.।
১০৫. ইমাম আহমাদ রচিত আজ-জুহদ: ১৮৯ পৃ.।
১০৬. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১০৭. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
১০৮. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ২৯৫ পৃ.।
১০৯. আস-সিয়ার: ৫/৮৭।
১১০. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৩৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00