📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 যৌবন ও তাহাজ্জুদ

📄 যৌবন ও তাহাজ্জুদ


হে মুসলিম যুবক,
কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমে নিজের মনোবল ও সাহসকে ধরে রাখো। কেননা মনোবল ও সাহসই হলো সবকিছুর মূল উৎস। সুতরাং যার সাহস ও মনোবল খাঁটি হবে, তার আমলও খাঁটি হবে। ইবনুল কাইয়িম এর একটি সূক্ষ্ম উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'কলব হলো পাখির মতো, যত ওপরে ওঠে তত বিপদাপদ থেকে দূরে থাকে। আর যত নিচে নামে তত বিপদাপদে পড়ে।'
আবু ইসমা বিন ইসাম বাইহাকি বলেন, 'আমি এক রাত আহমাদ বিন হাম্বল -এর ঘরে ছিলাম। তিনি আমার তাহাজ্জুদের অজুর জন্য পানি এনে রাখলেন। সকালে যখন দেখলেন, পানি ব্যবহার করা হয়নি, বলে উঠলেন “সুবহানাল্লাহ, যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করে, রাতে তার কোনো আমল নেই!?”'
বর্তমানের যুবক ভবিষ্যতের বৃদ্ধ। তাই শক্তিশালী ও উচ্চ মনোবলের অধিকারী যুবকশ্রেণিকে সুফইয়ান সাওরি -এর একটি উপদেশ শোনাতে চাই, তিনি নামাজ পড়ার পর যুবকদের দিকে ফিরে বলতেন, 'হে যুবক-সম্প্রদায়, তোমরা যদি এখন তাহাজ্জুদের নামাজ না পড়ো, তাহলে আর কখন পড়বে?!'
ইবরাহিম বিন শাম্মাস -এর সামনে আহমাদ বিন হাম্বল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। তখন তিনি বললেন, 'আমি আহমাদ বিন হাম্বলকে চিনি। সে যুবক, কিন্তু রাত জেগে ইবাদত করে।'
আফসোস, বর্তমানে আমাদের অধিকাংশ তাহাজ্জুদগুজারই হলো বৃদ্ধ ও বয়স্ক লোক। যুবকরা তাহাজ্জুদগুজার কবে হবে? অথচ যৌবনের এই সময়টা সুস্থতা, শক্তিমত্তা ও উদ্যমের সময়। এ সময়টাই রাত জেগে ইবাদত করার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। অপরদিকে বৃদ্ধকালে শরীর শক্তিহীন হয়ে পড়ে, শরীরের কম্পনভাব সৃষ্টি হয়, পিঠ কুঁজো হয়ে যায়। এত সব দুর্বলতা সত্ত্বেও বৃদ্ধরা যদি রাত জেগে নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, রুকুতে ঝুঁকে থাকতে পারে, সিজদায় কপাল ঠেকিয়ে রাখতে পারে, তাহলে যুবকরা কেন পারে না? এই দুঃখজনক পার্থক্যের কারণ কী? একজন সালাফের মুখেই শোনো।
শুমাইত বিন আজলান বলেন, 'আল্লাহ তাআলা মুমিনের শক্তি রেখেছেন তার অন্তরে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে নয়। তুমি কি বৃদ্ধকে দেখো না, যে কঠিন গরমের দিনেও দিব্যি রোজা রাখতে পারে এবং রাতে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে পারে; অথচ অনেক যুবক তা পারে না?'
একজন শতবর্ষী আলিমের গল্প শোনো। শত বর্ষে পদার্পণ করা সত্ত্বেও যার শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা পূর্ণ ছিল। একদিন তিনি একটি লম্বা লাফ দিলেন। এতে হিতাকাঙ্ক্ষীরা তাকে ভর্ৎসনা করলে তিনি বললেন, 'এই যে আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, এগুলোকে আমি যৌবনে গুনাহ থেকে হিফাজত করেছি। তাই বুড়োকালে আল্লাহ তাআলা এগুলোকে আমার জন্য অক্ষত রেখেছেন।'

টিকাঃ
৫০. আল-জাওয়াবুল কাফি: ৭০ পৃ.।
৫১. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৫৯।
৫২. আস-সিয়ার: ১১/৮।
৫৩. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৩৪১, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৩০।
৫৪. জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ২২৬ পৃ.'।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 সময়কে কাজে লাগান

📄 সময়কে কাজে লাগান


জনৈক আলিম একটি চরম সত্য কথা বলেছেন, 'পৃথিবীতে জান্নাতি সুখ উপভোগ করার মতো কোনো সময় নেই; কিন্তু রাত জেগে ইবাদতকারীরা প্রভুর সাথে যখন গভীর আলাপচারিতায় মগ্ন হয়, সে সময় তাদের সুখকে জান্নাতি সুখের সাদৃশ্যই বলা যায়।'
যখন ইবনে মাসউদ -এর চোখে ঘুম আসত, তখন তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ফজর পর্যন্ত মৌমাছির গুঞ্জনের মতো গুঞ্জন শোনা যেত তাঁর থেকে।
একদা রাতের শেষ প্রহরে তাউস এক ব্যক্তিকে তলব করলেন। লোকজন জানাল, সে ঘুমিয়ে আছে। তখন তাউস বললেন, 'রাতের শেষ প্রহরে কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, তা আমার ধারণায়ও ছিল না।
إِذَا مَا اللَّيْلُ أَظْلَمَ كَابَدُوهُ .. فَيُسْفِرُ عَنْهُمْ وَهُمْ رُكُوع أَطَارَ الْخَوْفُ نَوْمَهُمْ فَقَامُوا .. وَأَهْلُ الْأَمْنِ فِي الدُّنْيَا هُجُوع لَهُمْ تَحْتَ الظَّلَامِ وَهُمْ سُجُود .. أَنِينُ مِنْهُ تَنْفَرِجُ الضُّلُوع
'রাত যখন আবৃত হয় আঁধারের চাদরে, ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা আমলের সংগ্রামে। রুকু অবস্থায় তাদের সামনে উদ্ভাসিত হয় সুবহে সাদিক। আল্লাহর ভয় কেড়ে নেয় তাদের ঘুম; তাই তারা দাঁড়িয়ে যায় ইবাদতে—যখন দুনিয়াবাসী থাকে নিদ্রামগ্ন। রাতের আঁধারে সিজদাবনত হয়ে তারা ক্রন্দন করে। এ ক্রন্দনে তাদের পাঁজরগুলোও যেন পরস্পর আলাদা হয়ে যায়। '
আমর বিন দিনার রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। এক-তৃতীয়াংশে ঘুমাতেন, এক-তৃতীয়াংশে হাদিসের দরস প্রদান করতেন এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।
সময় থেকে পুরোপুরিভাবে ফায়দা হাসিল করার জন্য এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাই এমন সব মানুষকে, যারা দিনের সময়গুলো বরবাদ করে। তারপর রাতের সময়গুলো ঘুমিয়ে কাটায় কিংবা আবশ্যকীয় বিধানসমূহ পালন না করে নিষিদ্ধ কাজ করে নির্ঘুম থাকে। রাতভর ঘুমানো আর অনর্থক কাজ করে নির্ঘুম থাকা—দুইটাই সময়ের অপচয়। এর প্রতিটি সেকেন্ড ও নিশ্বাসের হিসাব দিতে হবে।
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আজিজ বিন সুলাইমান বলেন, 'আমার মাতা আমার পিতার বরাত দিয়ে বলেন, 'ঘুমের সাথে আবিদদের কীসের সম্পর্ক? আল্লাহর কসম, এই দুনিয়াতে শুধু সেটুকু ঘুমানো উচিত, যেটুকু না ঘুমালেই নয়।' মুহাম্মাদ বিন আব্দুল আজিজ বলেন, 'সত্যিই তার ঘুম এমনই ছিল। একান্ত অপারগ না হলে তিনি ঘুমাতেন না।'
আমাদের এই যুগে অনেক মানুষ নিদ্রাহীনতায় ভোগে। কিন্তু তারা নামাজ পড়ে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করার চেষ্টা করে না। বরং এদিক সেদিক করে বেফায়দা সময় কাটিয়ে দেয়। ঘুম তাদের অধরাই থেকে যায়। পাশাপাশি তাহাজ্জুদ পড়ার ও রোগ থেকে মুক্তি লাভের জন্য দুআ করার সুযোগটাও মিস করে ফেলে।
আল্লাহ তাআলা তাউস -এর ওপর রহম করুন। তিনি যখন বিছানার ওপর শুতেন, উত্তপ্ত কড়াইয়ের ফুটন্ত দানার মতো ছটফট করতেন। তারপর লাফ দিয়ে উঠে ফজর হওয়া পর্যন্ত নামাজ পড়তেন। এরপর বলতেন, 'জাহান্নামের স্মরণ আবিদদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।'
সম্মানিত পাঠক,
নেককাররা জানে, দুনিয়ার এ জীবন ক্ষণিকের। আবার আল্লাহর নির্দেশ (وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ) 'তোমরা পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে যাও তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই তারা আল্লাহর ইবাদতে রাত- দিন এক করে ফেলেছে।
হে ভাই, )فَفِرُّوا إِلَى اللهِ( 'আল্লাহর দিকে ধাবিত হও'— রবের এই ঘোষণাকে হৃদয়ের কানে শ্রবণ করো। আমলনামা গুটিয়ে ফেলার আগেই নেকির তালিকা দীর্ঘ করার চেষ্টা করো। গা থেকে ছুড়ে ফেলো গাফিলতির চাদর। জেগে ওঠো মরণ ঘুম থেকে। সামনের প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নাও। কেননা, দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার ময়দান।
নাফি বলেন, 'ইবনে উমর রাত জেগে নামাজ পড়তেন। কিছুক্ষণ পরপর জিজ্ঞেস করতেন, “নাফি, ভোররাত হয়েছে?” আমি বলতাম, “না, এখনো হয়নি।” তিনি পুনরায় নামাজ পড়া শুরু করতেন। যতক্ষণ না আমি বলতাম, "জি, এখন ভোররাত হয়েছে।” তখন তিনি বসে বসে ফজর হওয়া পর্যন্ত দুআ-ইসতিগফারে লেগে থাকতেন।
হাসান বিন আলি মাগরিব ও ইশারের মাঝামাঝি সময়ে নামাজ পড়তে থাকতেন। তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'এ সময়টাই তো রাতের শুরুভাগ।'
মানসুর বিন মুতামির প্রতিরাতে তার ঘরের ছাদের ওপর (কেঁদে কেঁদে) নামাজ পড়তেন। তার মৃত্যুর পর পাশের বাড়ির একটি ছোট বাচ্চা তার মাকে বলল, 'আম্মু, ওই বাড়ির ছাদের ওপর যে একটি বাচ্চা থাকত (কান্না করত), তাকে এখন দেখি না যে।' মা বলল, 'বেটা, সেটা কোনো বাচ্চা ছিল না। তিনি ছিলেন মানসুর। তিনি সদ্য মারা গেছেন।'
প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে আজ কোথায় আমরা?! كرر علي حديثهم يا حادي ** فحديثهم يجلو الفؤاد الصادي
'হে কাফিলার ঘোষক, আমাকে তাদের কথা আরও শোনাও। তাদের কথা আমার জংধরা হৃদয়টাকে কেমন যেন সাফ করে দিচ্ছে।'
উসাইদ বিছানায় শুয়ে এদিক সেদিক গড়াগড়ি করতেন উত্তপ্ত কড়াইয়ের ফুটন্ত দানার মতো। আর বলতেন, 'নিশ্চয় তুমি আরামদায়ক, তবে জান্নাতের বিছানা তোমার চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক।' তারপর ফজর পর্যন্ত নামাজে মশগুল থাকতেন।
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভই ছিল সালাফের একমাত্র লক্ষ্য। আব্দুল্লাহ বিন দাউদ বলেন, 'সালাফের কারও কারও বয়স চল্লিশ অতিক্রম করলে তারা বিছানা গুটিয়ে নিতেন। এরপর থেকে আর কখনো রাতে ঘুমাতেন না।'
ইবরাহিম তাইমি আমাদের ও সালাফের মাঝের এই ব্যবধানকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, 'তোমাদের এবং সালাফের মাঝে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। তাদের কাছে দুনিয়া আসলে তারা তা থেকে পলায়ন করত। আর দুনিয়া তোমাদের থেকে পলায়ন করছে; কিন্তু তোমরা তার পেছনে ছুটছ। '
দুনিয়া হলো প্রতিযোগিতার ময়দান। ধুলোবালি এখানে প্রতিযোগীদের গোপন করে রেখেছে। এ প্রতিযোগিতায় কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে আবার কেউ উটের ওপর সওয়ার হয়ে অংশ নিয়েছে।
তুমি নিজেকে যাচাই করে দেখো। দেখো, তুমি লক্ষ্যের দিকে পায়ে হেঁটে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছ, নাকি উটের ওপর সওয়ার হয়ে মধ্যম গতিতে, নাকি তেজি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে খুব দ্রুতগতিতে? তখন তুমিই বুঝবে, লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে গতি বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না।
মালিক বিন দিনার বলেন, 'দুর্ভাগ্যের আলামত চারটি : কলব শক্ত হওয়া, চোখ অশ্রুহীন হওয়া, আশা দীর্ঘ হওয়া এবং দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হওয়া।'
এক রাতে কাইস বিন মুসলিম মুহাম্মাদ বিন জাহাদাহ -এর সাথে দেখা করতে গেলেন। ইশার পর তিনি তার কাছে পৌঁছেন। তখন মুহাম্মাদ ইশার নামাজ শেষে মসজিদেই অবস্থান করছিলেন এবং নামাজ পড়ছিলেন। তা দেখে কাইস বিন মুসলিমও মসজিদের এক কোনায় গিয়ে নামাজ পড়া শুরু করে দিলেন। এভাবে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত দুইজন নামাজ পড়তে থাকলেন। কাইস তার গ্রামের মসজিদের ইমাম ছিলেন। তাই তিনি গ্রামে গিয়ে লোকদের ইমামতি করলেন। তাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ হলো না। মুহাম্মাদ তো জানতেই পারেননি, কাইস কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক মুসল্লি তাকে বলল, ‘গতরাতে আপনার বন্ধু কাইস আপনার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু আপনি তার দিকে ফিরেও তাকাননি।’ তিনি বললেন, ‘আমি তো জানি না, তিনি কোথায় ছিলেন।’ তারপর সকালে তিনি কাইস-এর কাছে গেলেন। কাইস বিন মুসলিম তাকে আসতে দেখে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। এরপর তারা দুজন কিছুক্ষণ একান্তে সময় কাটালেন এবং অঝোর ধারায় কাঁদলেন।”
আমাদের বর্তমান অবস্থা তো সম্পূর্ণ বিপরীত। ইমাম সালাম ফেরার সাথে সাথে আমাদের অনেকেই কোনো কারণ ছাড়া ডানে বামে তাকাতে শুরু করি। এতে মনের স্থিরতা চলে যায়। অনেক সময় নামাজের পর মাসনুন জিকিরসমূহ আদায়েও অলসতা চলে আসে।
মুগিরা বিন হাবিব (মালিক বিন দিনার-এর জামাতা) বলেন, 'মালিক বিন দিনার-এর মৃত্যু পর্যন্ত আমি তার সাথে তার বাড়িতে ছিলাম; কিন্তু আমি জানি না, তার আমল কী!' তিনি বললেন, 'আমি তার সাথে ইশার নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে ঘরে ফিরে আসলাম। তারপর পুরো রাতের জন্য একটি মখমলের কাপড় পরিধান করে নিলাম। পরে মালিক বিন দিনার আসলে তাকে রুটি দেওয়া হলো। রুটি খেয়ে তিনি নামাজ পড়তে দাঁড়ালেন। নামাজ শুরু করার পর দাড়ির ওপর হাত রেখে বলতে লাগলেন, “যখন আপনি পূর্বাপর সব মানুষকে একত্রিত করবেন, তখন দয়া করে মালিক বিন দিনারের এই শুভ্র কেশকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন।" তিনি এভাবেই বারবার বলতে থাকলেন। একসময় আমার চোখে ঘুম চলে আসলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দেখলাম, তিনি এখনো সেই আগের অবস্থায় আছেন। এক পা সামনে এগিয়ে দিয়ে, আরেক পা পেছনে রেখে বলছেন, “হে আমার রব, যখন আপনি পূর্বাপর সকল মানুষকে একত্রিত করবেন, তখন দয়া করে মালিক বিন দিনারের এই শুভ্র কেশকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দেবেন।” ফজর হওয়া পর্যন্ত তিনি এরূপ করতে থাকেন।'
الله قوما خلصوا في حبه .. فاختارهم ورضي بهم خداما قوم إذا جن الظلام عليهم .. أبصرت قوما سجدا وقياما فسيغنمون عرائسا بعرائس .. ويبوءون من الجنان خيامًا وتقر أعينهم بما أخفي لهم .. ويسمعون من الجليل سلامًا يتلذذون بذكره في ليلهم .. ويكابدون لدى النهار صياما
'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে, যারা তাঁকে খাঁটি মনে ভালোবাসে। তিনিও তাদের প্রতি হয়েছেন সন্তুষ্ট। আর তাদেরকে কবুল করে নিয়েছেন দ্বীনের সেবক হিসেবে।
রাত যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তারা অবনত মস্তকে রবের দরবারে হাজিরা দেয়। ফলে তারা জান্নাতে নিজেদের মহল তৈরি করে নেয় এবং অর্জন করে নেয় জান্নাতের সুন্দরী বধূদের। এ ছাড়াও তাদের জন্য আরও যতসব নিয়ামত লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তা দেখে তাদের চোখ জুড়াবে। আর তারা শুনতে পারবে পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম! তারা রাতের বেলা রবের জিকির করে উপভোগ করে, আর সারা দিন রোজা রেখে কষ্ট পেতে ভালোবাসে।'

টিকাঃ
৫৫. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
৫৬. আল-ইহইয়া: ১/৪১৯।
৫৭. আস-সিয়ার: ৫/৪২, সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/২৮৫।
৫৮. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ২৭০ পৃ.।
৫৯. আস-সিয়ার: ৫/৩০২।
৬০. আল-ইহইয়া: ১/৪২০।
৬১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৩।
৬২. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১ : ৫০।
৬৩. রুহবানুল লাইল: ৩৭ পৃ.।
৬৪. আস-সিয়ার: ৫/৪০৬, সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/১৩৩।
৬৫. বুসতানুল আরিফিন: ৪ পৃ.।
৬৬. আজ-জাহরুল ফায়িহ: ২০ পৃ.।
৬৭. আল-ইহইয়া: ৪/৪৩৫।
৬৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬৫ পৃ.।
৬৯. আস-সিয়ার: ৫/৬১, হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/২১২।
৭০. বাইহাকি রচিত কিতাবুজ জুহদিল কাবির: ১৯৫।
৭১. সিফাতুস সাফওয়াহ: ৩/১২৭।
৭২. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ২/৩৬১।
৭৩. উকুদুল লুলু ওয়াল মারজান: ৭৯ পৃ.।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল

📄 তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল


ইমাম আবু হানিফা এক রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ
'বরং কিয়ামত তাদের প্রতিশ্রুত সময় এবং কিয়ামত ঘোরতর বিপদ ও তিক্ততর। '
কাকুতি-মিনতি করে কেঁদে কেঁদে বারবার এই আয়াত পড়তে থাকলেন।
সুলাইমান তাইমি -এর মুয়াজ্জিন বলেন, 'ইশার নামাজের পর সুলাইমান তাইমি আমার পাশে নামাজ পড়ছিলেন। আমি শুনলাম যে, তিনি নামাজে সুরা মুলক তিলাওয়াত করছেন। পড়তে পড়তে যখন এই আয়াত পর্যন্ত আসলেন :
فَلَمَّا رَأَوْهُ زُلْفَةً سِيئَتْ وُجُوهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَقِيلَ هَذَا الَّذِي كُنْتُمْ بِهِ تَدَّعُونَ
"যখন তারা সেই প্রতিশ্রুতিকে আসন্ন দেখবে, তখন কাফিরদের মুখমণ্ডল মলিন হয়ে পড়বে এবং বলা হবে, এটাই তো তোমরা চাইতে। "
তিনি বারবার এই আয়াত পড়তে লাগলেন। এদিকে নামাজ শেষ করে মুসল্লিরাও সবাই চলে গেল। আমিও তাকে সেখানে রেখে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলাম। পরে ফজরের সময় আজান দেওয়ার জন্য মসজিদে এসে দেখি, তিনি আগের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সেই আয়াতটিই এখনো তিলাওয়াত করছেন!'
ইবাদতগুজার বান্দারা যখন দুনিয়ার বাস্তবতা ও পার্থিব জীবনের অসারতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়, তখন তারা চিরস্থায়ী জীবনের জন্য ক্ষণস্থায়ী জীবনের কামনাবাসনাগুলোকে বিলীন করে দেয়। গাফিলতির ঘুম যখন তাদের ভাঙে, তখন তারা কঠোর মেহনত ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অলসতার দিনগুলোতে নষ্ট করা সময়গুলো পুনরুদ্ধার করে নেয়। গন্তব্যহীন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর যেহেতু তারা গন্তব্যের খোঁজ পেয়েছে; তাই কঠিন মেহনত করে দূরের গন্তব্যকে কাছে নিয়ে আসে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তারা প্রতিশ্রুত কিয়ামত দিবসের কথা স্মরণ করে :
(هَذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ) 'আজ তোমাদের সেই দিন, যেদিনের ওয়াদা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল। '

টিকাঃ
৭৪. সুরা আল-কমার, ৫৪: ৪৬।
৭৫. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৩৫৭।
৭৬. সুরা আল-মুলক, ৬৭ : ২৭।
৭৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৯।
৭৮. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৩।
৭৯. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬০ পৃ.।

📘 আঁধার রাতে আলোর খোঁজে > 📄 রাত্রি জাগরণের সুখ

📄 রাত্রি জাগরণের সুখ


জনৈক সালাফকে বলা হলো, 'রাত কেমন কাটালেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'রাতে আমার দুই ধরনের অবস্থা ছিল : রাতের অন্ধকার যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ আমি আনন্দিত ছিলাম। আর যখন অন্ধকার শেষ হয়ে ফজরের আলো উদ্ভাসিত হলো, তখন আমি ব্যথিত হলাম। কেমন যেন আমার আনন্দ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পূর্বেই কষ্ট শুরু হয়ে গেল।’
উহাইব বিন ওয়ারদ তার এক জ্বালাময়ী ভাষণে বলেন, 'যদি আল্লাহর দিকে প্রতিযোগিতায় কাউকে তোমার আগে যেতে না দেওয়ার সামর্থ্য তোমার থাকে, তবে তা-ই করো। '
প্রিয় ভাই আমার, এই উম্মাহর মাঝেই আছে কল্যাণের পথে অগ্রগামী ব্যক্তি। তারা কোন পথে আর তুমি কোন পথে?
কাতাদা বলেন, 'ফেরেশতাগণ মুমিনের শীতকাল নিয়ে আনন্দিত হয়। কেননা শীতকালে দিন ছোট হয়—মুমিন তাতে রোজা রাখে। আর রাত দীর্ঘ হয়—মুমিন তাতে ইবাদত করে।'
যখন আমির -এর মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি কাঁদতে লাগলেন। স্বজনরা বলল, 'হে আমির, আপনি কাঁদছেন কেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না। দুনিয়ার প্রতি লোভ বা আসক্তির কারণেও কাঁদছি না। আমি কাঁদছি (রোজাদার অবস্থায়) মধ্যাহ্নের তৃষ্ণা ও শীতকালের রাতের নামাজের জন্য।'
দুনিয়াদারদের সঙ্গে দুনিয়া কেমন কঠোর আচরণ করে এবং পার্থিব জীবনে দীর্ঘ আশা পোষণকারীরা কীভাবে প্রতারিত হয়, তা আল্লাহর আবিদ বান্দারা ভালোভাবেই লক্ষ করে। শয়তানের কর্তৃত্ব ও নফসের ক্ষমতাও তারা উপলব্ধি করতে পারে। তাই তারা আল্লাহর দরবারে কাকুতি-মিনতি করে এবং নিজেদেরকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে।

টিকাঃ
৮০. সুরা আল-বাকারা, ২: ২৮১।
৮১. সিফাতুস সাফওয়াহ : ৩/৭৭।
৮২. আল-ইহইয়া: ১/৪২৩।
৮৩. রুহবানুল লাইল : ৩৬ পৃ.।
৮৪. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রচিত আজ-জুহদ : ৩২৩ পৃ.।
৮৫. আল-ফাওয়ায়িদ: ৬২ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00